ঢাকা ০৩:২৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৪ মার্চ ২০২৬

বিশ্বসাহিত্যের অনুবাদে অসংগতি: একই বইয়ের ভিড়ে উপেক্ষিত বিশ্বসেরারা

বাংলা প্রকাশনা শিল্পে অনুবাদের ক্ষেত্রে এক অদ্ভুত অসংগতি দেখা যাচ্ছে। যখন বিশ্বসাহিত্যের অনেক কালজয়ী লেখকের রচনা বাংলাভাষী পাঠকের কাছে এখনো অধরা, ঠিক তখনই একই বইয়ের একাধিক অনুবাদে ভরে উঠছে বাজার। সম্প্রতি একুশে বইমেলা ঘিরে আলাপচারিতায় এই গুরুতর সংকটের কথা তুলে ধরেছেন খ্যাতিমান অনুবাদক ওয়াহিদ কায়সার।

ওয়াহিদ কায়সারের মতে, বাংলা একাডেমি বা কোনো কর্তৃপক্ষের কাছে বইয়ের, বিশেষত অনুবাদের, একটি ডিজিটাল ডেটাবেইজ না থাকার কারণেই এই সমস্যা প্রকট হচ্ছে। এর ফলে একজন অনুবাদক বা প্রকাশক জানতে পারছেন না, কোন বইয়ের অনুবাদ পূর্বে হয়েছে বা কোন বইয়ের চাহিদা রয়েছে। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, “মুরাকামির একই বইয়ের ৬-৭ বাংলা অনুবাদ থাকলেও বাংলা ভাষায় এখনো ইয়ান ম্যাকইউয়ান, ডন ডিলিলো, করম্যাক ম্যাকার্থি অথবা ফিলিপ রথের কোনো বই অনূদিত হয়নি। তাদের মতো লেখকদের বই বাংলায় অনূদিত না হবার ব্যাপারটি লজ্জার।” এই পরিস্থিতি একদিকে যেমন অনুবাদকদের শ্রম ও মেধার অপচয় করছে, অন্যদিকে তেমনি বিশ্বসাহিত্যের বিশাল ভাণ্ডার থেকে বাঙালি পাঠককে বঞ্চিত রাখছে।

চলতি একুশে বইমেলা নিয়েও প্রকাশনা শিল্পের অনিশ্চয়তা তুলে ধরেন কায়সার। তিনি জানান, মেলায় তার তিনটি অনুবাদের পাণ্ডুলিপি (সিজার আইরার ‘আমি যেভাবে একজন নান হয়েছিলাম’, রিশার্ত কাপুসচিন্সকির ‘জীবনের আরেকটা দিন’, ও লিওনোরা ক্যারিংটন গল্পসমগ্র) একটি বড় প্রকাশনা গ্রহণ করলেও, এবারের মেলায় বইগুলো প্রকাশে অপারগতা জানিয়েছে। প্রকাশকদের মধ্যে বই বিক্রির সাফল্য নিয়ে আশাবাদের অভাবই এর কারণ।

রমজান মাসে মেলা এবং সময় কমিয়ে আনার প্রভাব নিয়েও তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন। মধ্যবিত্ত পাঠক যারা বইমেলার জন্য অর্থ সঞ্চয় করেন, এবার ঈদ কেনাকাটার কারণে তাদের মনোযোগ বিচ্যুত হতে পারে। তিনি বাংলা একাডেমির ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। তার মতে, “এরকম একটা প্রতিষ্ঠানের আসলে উৎকণ্ঠা থাকার কথা না। তাদের আরও বেশি বলিষ্ঠ হওয়া দরকার ছিল।” ওয়াহিদ কায়সার মনে করেন, একুশে বইমেলার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা প্রকাশনা শিল্পের জন্য স্বাস্থ্যকর নয়। সারা বছর ধরে সুপরিকল্পিত উপায়ে বই প্রকাশ ও বিপণনের ব্যবস্থা না থাকলে অনেক ছোট প্রকাশনা বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

বইয়ের মান ও সম্পাদনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বড়ো প্রকাশনাগুলো কিছুটা নজর দিলেও, বাংলাদেশে সম্পাদনা এখনো একটি পেশা হিসেবে গড়ে ওঠেনি। ভালো সম্পাদকের অভাব এবং বইমেলার আগে জানুয়ারিতে তাড়াহুড়ো করে সম্পাদনার কারণে মান বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। লেখক-পাঠকের দূরত্ব কমাতেও বিপণনের গুরুত্ব অপরিসীম বলে তিনি উল্লেখ করেন। তার মতে, এদেশের প্রকাশনা শিল্পে বই লেখায় যতটা জোর দেওয়া হয়, বিপণনে ততটা করা হয় না।

নিজের অনুবাদ কর্মের প্রসঙ্গে ওয়াহিদ কায়সার রিশার্ত কাপুসচিন্সকির ‘ম্যাজিক জার্নালিজম’ এবং লিওনোরা ক্যারিংটনের বড়দের জন্য লেখা রূপকথার অভিনবত্ব তুলে ধরেন। তার মতে, কাপুসচিন্সকি সাধারণ মানুষের জীবনের গভীরে প্রবেশ করে জার্নালিজমকে নতুন মাত্রা দিয়েছেন, যার উত্তরসূরি একমাত্র সেভেতলানা আলেক্সিয়েভিচ।

সামগ্রিকভাবে, ওয়াহিদ কায়সারের এই পর্যবেক্ষণ বাংলা প্রকাশনা শিল্পের গভীরতর সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে। ডিজিটাল ডেটাবেইজ তৈরি, মানসম্মত সম্পাদনা এবং সুদূরপ্রসারী বিপণন কৌশলের মাধ্যমে এই শিল্পকে একটি টেকসই ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

মার্কিন সহকারী সচিবের ঢাকা সফর: মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি ও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা

বিশ্বসাহিত্যের অনুবাদে অসংগতি: একই বইয়ের ভিড়ে উপেক্ষিত বিশ্বসেরারা

আপডেট সময় : ০২:০২:২৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ৪ মার্চ ২০২৬

বাংলা প্রকাশনা শিল্পে অনুবাদের ক্ষেত্রে এক অদ্ভুত অসংগতি দেখা যাচ্ছে। যখন বিশ্বসাহিত্যের অনেক কালজয়ী লেখকের রচনা বাংলাভাষী পাঠকের কাছে এখনো অধরা, ঠিক তখনই একই বইয়ের একাধিক অনুবাদে ভরে উঠছে বাজার। সম্প্রতি একুশে বইমেলা ঘিরে আলাপচারিতায় এই গুরুতর সংকটের কথা তুলে ধরেছেন খ্যাতিমান অনুবাদক ওয়াহিদ কায়সার।

ওয়াহিদ কায়সারের মতে, বাংলা একাডেমি বা কোনো কর্তৃপক্ষের কাছে বইয়ের, বিশেষত অনুবাদের, একটি ডিজিটাল ডেটাবেইজ না থাকার কারণেই এই সমস্যা প্রকট হচ্ছে। এর ফলে একজন অনুবাদক বা প্রকাশক জানতে পারছেন না, কোন বইয়ের অনুবাদ পূর্বে হয়েছে বা কোন বইয়ের চাহিদা রয়েছে। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, “মুরাকামির একই বইয়ের ৬-৭ বাংলা অনুবাদ থাকলেও বাংলা ভাষায় এখনো ইয়ান ম্যাকইউয়ান, ডন ডিলিলো, করম্যাক ম্যাকার্থি অথবা ফিলিপ রথের কোনো বই অনূদিত হয়নি। তাদের মতো লেখকদের বই বাংলায় অনূদিত না হবার ব্যাপারটি লজ্জার।” এই পরিস্থিতি একদিকে যেমন অনুবাদকদের শ্রম ও মেধার অপচয় করছে, অন্যদিকে তেমনি বিশ্বসাহিত্যের বিশাল ভাণ্ডার থেকে বাঙালি পাঠককে বঞ্চিত রাখছে।

চলতি একুশে বইমেলা নিয়েও প্রকাশনা শিল্পের অনিশ্চয়তা তুলে ধরেন কায়সার। তিনি জানান, মেলায় তার তিনটি অনুবাদের পাণ্ডুলিপি (সিজার আইরার ‘আমি যেভাবে একজন নান হয়েছিলাম’, রিশার্ত কাপুসচিন্সকির ‘জীবনের আরেকটা দিন’, ও লিওনোরা ক্যারিংটন গল্পসমগ্র) একটি বড় প্রকাশনা গ্রহণ করলেও, এবারের মেলায় বইগুলো প্রকাশে অপারগতা জানিয়েছে। প্রকাশকদের মধ্যে বই বিক্রির সাফল্য নিয়ে আশাবাদের অভাবই এর কারণ।

রমজান মাসে মেলা এবং সময় কমিয়ে আনার প্রভাব নিয়েও তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন। মধ্যবিত্ত পাঠক যারা বইমেলার জন্য অর্থ সঞ্চয় করেন, এবার ঈদ কেনাকাটার কারণে তাদের মনোযোগ বিচ্যুত হতে পারে। তিনি বাংলা একাডেমির ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। তার মতে, “এরকম একটা প্রতিষ্ঠানের আসলে উৎকণ্ঠা থাকার কথা না। তাদের আরও বেশি বলিষ্ঠ হওয়া দরকার ছিল।” ওয়াহিদ কায়সার মনে করেন, একুশে বইমেলার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা প্রকাশনা শিল্পের জন্য স্বাস্থ্যকর নয়। সারা বছর ধরে সুপরিকল্পিত উপায়ে বই প্রকাশ ও বিপণনের ব্যবস্থা না থাকলে অনেক ছোট প্রকাশনা বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

বইয়ের মান ও সম্পাদনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বড়ো প্রকাশনাগুলো কিছুটা নজর দিলেও, বাংলাদেশে সম্পাদনা এখনো একটি পেশা হিসেবে গড়ে ওঠেনি। ভালো সম্পাদকের অভাব এবং বইমেলার আগে জানুয়ারিতে তাড়াহুড়ো করে সম্পাদনার কারণে মান বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। লেখক-পাঠকের দূরত্ব কমাতেও বিপণনের গুরুত্ব অপরিসীম বলে তিনি উল্লেখ করেন। তার মতে, এদেশের প্রকাশনা শিল্পে বই লেখায় যতটা জোর দেওয়া হয়, বিপণনে ততটা করা হয় না।

নিজের অনুবাদ কর্মের প্রসঙ্গে ওয়াহিদ কায়সার রিশার্ত কাপুসচিন্সকির ‘ম্যাজিক জার্নালিজম’ এবং লিওনোরা ক্যারিংটনের বড়দের জন্য লেখা রূপকথার অভিনবত্ব তুলে ধরেন। তার মতে, কাপুসচিন্সকি সাধারণ মানুষের জীবনের গভীরে প্রবেশ করে জার্নালিজমকে নতুন মাত্রা দিয়েছেন, যার উত্তরসূরি একমাত্র সেভেতলানা আলেক্সিয়েভিচ।

সামগ্রিকভাবে, ওয়াহিদ কায়সারের এই পর্যবেক্ষণ বাংলা প্রকাশনা শিল্পের গভীরতর সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে। ডিজিটাল ডেটাবেইজ তৈরি, মানসম্মত সম্পাদনা এবং সুদূরপ্রসারী বিপণন কৌশলের মাধ্যমে এই শিল্পকে একটি টেকসই ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব।