ঢাকা ০৩:২৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৪ মার্চ ২০২৬

“ঘুমিয়েছি” অজুহাত, গভীর রাতে তরুণদের ডিজিটাল জগৎ

রাত তখন গভীর, ঘড়ির কাঁটা বারোটা পেরিয়েছে। বন্ধুকে “ঘুমিয়েছি” জানিয়ে মেসেঞ্জার থেকে বের হলো রাফি। কিন্তু তার স্মার্টফোনটি তখনও সচল। অন্য কোনো সামাজিক মাধ্যমে সে তখন ব্যস্ত বন্ধুর স্টোরি দেখতে, প্রোফাইল ঘাঁটতে, অথবা সহযোদ্ধাদের সাথে ভার্চুয়াল গেমে। সকালে অবশ্য সেই চিরচেনা প্রশ্নটি ধেয়ে আসবেই – “ঘুমিয়েছিলে? অনলাইনে ছিলে কেন?”

দেশের তরুণ-তরুণীদের মধ্যে এই চিত্র এখন খুবই পরিচিত। একদিকে প্রিয়জনের কাছে “অফলাইন” সেজে থাকা, অন্যদিকে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সক্রিয় উপস্থিতি – এ যেন এক নতুন ধরনের ‘ডিজিটাল দ্বৈত সত্তা’ বা ‘ডাবল লাইফ’।

কেন এই ডিজিটাল দ্বৈত জীবন?

ব্যক্তিগত পরিসর ও গোপনীয়তার অন্বেষণ:
অনেকেই অনলাইনে থাকলেই প্রশ্নবাণে জর্জরিত হন – “কার সাথে কথা বলছো?”, “আমার মেসেজের উত্তর দিচ্ছো না কেন?” এই ধরনের অপ্রয়োজনীয় জবাবদিহি এড়াতে অনেক তরুণই নিজেদের অফলাইন দেখান। আবার ‘লাস্ট সিন’ বা ‘অ্যাক্টিভ নাও’ স্ট্যাটাস নিয়ে সম্পর্কের টানাপোড়েন কমাতে তারা অন্য প্ল্যাটফর্মে নিজেদের সক্রিয় রাখেন, যা তাদের কাছে নিরাপদ কৌশল।

মানসিক ক্লান্তি ও নীরব বিচরণ:
সারাদিনের চ্যাট, কল, নোটিফিকেশনের ভিড়ে অনেকেই মানসিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়েন। তখন “ঘুমাচ্ছি” বলা মানে আসলে নিজের জন্য একটু নির্জন সময় চাওয়া। হয়তো তারা কারো সাথে কথা বলতে চান না, কিন্তু একা একা স্ক্রল করে বা অন্য কারো প্রোফাইল ব্রাউজ করে সময় কাটাতে চান। পুরনো সম্পর্ক, নতুন ক্রাশ বা পরিচিতদের প্রোফাইল নীরবে দেখে নেওয়ার এই কৌতূহলও দ্বৈত উপস্থিতির জন্ম দেয়।

একান্ত বিনোদন ও ভার্চুয়াল মুক্তি:
চ্যাটিং এড়িয়ে অনেকে ঢুকে পড়েন অনলাইন গেমে। রাতের বেলায় এসব গেমে তরুণদের উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো। সেখানে পরিচিত মহলের প্রশ্ন কম, স্বাধীনতা বেশি – যা তাদের জন্য এক ধরনের ভার্চুয়াল মুক্তি।

সম্পর্কের ওপর প্রভাব কী?
এই অভ্যাসকে সবসময় নেতিবাচক বলা যায় না। অনেকে এটিকে ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও পরিসর রক্ষার প্রচেষ্টা হিসেবেই দেখেন। তবে সমস্যা তৈরি হয় তখনই, যখন এক পক্ষ এই কৌশলটি বুঝতে পারে না। এর ফলে সন্দেহ, ভুল বোঝাবুঝি এবং ছোটখাটো ঝগড়া সম্পর্কের চিড় ধরাতে পারে।

শেষ কথা
ডিজিটাল দুনিয়ায় সবসময় অনলাইনে থাকা মানেই সবার জন্য উন্মুক্ত থাকা নয়। কখনও “ঘুমাচ্ছি” মানে সত্যি ঘুম, আবার কখনও সেটি শুধু একটু নিঃশ্বাস নেওয়ার অজুহাত, নিজের মতো করে ডিজিটাল জগতে বিচরণ করার একটি কৌশল। তরুণদের এই ‘ডিজিটাল দ্বৈত সত্তা’ নিছক মিথ্যাচার নয়, বরং স্বাধীনতা, ক্লান্তি আর কৌতূহলের এক জটিল মিশেল – যা তাদের ব্যক্তিগত ডিজিটাল জীবনকে নতুন মাত্রা দিচ্ছে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

মার্কিন সহকারী সচিবের ঢাকা সফর: মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি ও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা

“ঘুমিয়েছি” অজুহাত, গভীর রাতে তরুণদের ডিজিটাল জগৎ

আপডেট সময় : ০২:০১:০৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ৪ মার্চ ২০২৬

রাত তখন গভীর, ঘড়ির কাঁটা বারোটা পেরিয়েছে। বন্ধুকে “ঘুমিয়েছি” জানিয়ে মেসেঞ্জার থেকে বের হলো রাফি। কিন্তু তার স্মার্টফোনটি তখনও সচল। অন্য কোনো সামাজিক মাধ্যমে সে তখন ব্যস্ত বন্ধুর স্টোরি দেখতে, প্রোফাইল ঘাঁটতে, অথবা সহযোদ্ধাদের সাথে ভার্চুয়াল গেমে। সকালে অবশ্য সেই চিরচেনা প্রশ্নটি ধেয়ে আসবেই – “ঘুমিয়েছিলে? অনলাইনে ছিলে কেন?”

দেশের তরুণ-তরুণীদের মধ্যে এই চিত্র এখন খুবই পরিচিত। একদিকে প্রিয়জনের কাছে “অফলাইন” সেজে থাকা, অন্যদিকে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সক্রিয় উপস্থিতি – এ যেন এক নতুন ধরনের ‘ডিজিটাল দ্বৈত সত্তা’ বা ‘ডাবল লাইফ’।

কেন এই ডিজিটাল দ্বৈত জীবন?

ব্যক্তিগত পরিসর ও গোপনীয়তার অন্বেষণ:
অনেকেই অনলাইনে থাকলেই প্রশ্নবাণে জর্জরিত হন – “কার সাথে কথা বলছো?”, “আমার মেসেজের উত্তর দিচ্ছো না কেন?” এই ধরনের অপ্রয়োজনীয় জবাবদিহি এড়াতে অনেক তরুণই নিজেদের অফলাইন দেখান। আবার ‘লাস্ট সিন’ বা ‘অ্যাক্টিভ নাও’ স্ট্যাটাস নিয়ে সম্পর্কের টানাপোড়েন কমাতে তারা অন্য প্ল্যাটফর্মে নিজেদের সক্রিয় রাখেন, যা তাদের কাছে নিরাপদ কৌশল।

মানসিক ক্লান্তি ও নীরব বিচরণ:
সারাদিনের চ্যাট, কল, নোটিফিকেশনের ভিড়ে অনেকেই মানসিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়েন। তখন “ঘুমাচ্ছি” বলা মানে আসলে নিজের জন্য একটু নির্জন সময় চাওয়া। হয়তো তারা কারো সাথে কথা বলতে চান না, কিন্তু একা একা স্ক্রল করে বা অন্য কারো প্রোফাইল ব্রাউজ করে সময় কাটাতে চান। পুরনো সম্পর্ক, নতুন ক্রাশ বা পরিচিতদের প্রোফাইল নীরবে দেখে নেওয়ার এই কৌতূহলও দ্বৈত উপস্থিতির জন্ম দেয়।

একান্ত বিনোদন ও ভার্চুয়াল মুক্তি:
চ্যাটিং এড়িয়ে অনেকে ঢুকে পড়েন অনলাইন গেমে। রাতের বেলায় এসব গেমে তরুণদের উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো। সেখানে পরিচিত মহলের প্রশ্ন কম, স্বাধীনতা বেশি – যা তাদের জন্য এক ধরনের ভার্চুয়াল মুক্তি।

সম্পর্কের ওপর প্রভাব কী?
এই অভ্যাসকে সবসময় নেতিবাচক বলা যায় না। অনেকে এটিকে ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও পরিসর রক্ষার প্রচেষ্টা হিসেবেই দেখেন। তবে সমস্যা তৈরি হয় তখনই, যখন এক পক্ষ এই কৌশলটি বুঝতে পারে না। এর ফলে সন্দেহ, ভুল বোঝাবুঝি এবং ছোটখাটো ঝগড়া সম্পর্কের চিড় ধরাতে পারে।

শেষ কথা
ডিজিটাল দুনিয়ায় সবসময় অনলাইনে থাকা মানেই সবার জন্য উন্মুক্ত থাকা নয়। কখনও “ঘুমাচ্ছি” মানে সত্যি ঘুম, আবার কখনও সেটি শুধু একটু নিঃশ্বাস নেওয়ার অজুহাত, নিজের মতো করে ডিজিটাল জগতে বিচরণ করার একটি কৌশল। তরুণদের এই ‘ডিজিটাল দ্বৈত সত্তা’ নিছক মিথ্যাচার নয়, বরং স্বাধীনতা, ক্লান্তি আর কৌতূহলের এক জটিল মিশেল – যা তাদের ব্যক্তিগত ডিজিটাল জীবনকে নতুন মাত্রা দিচ্ছে।