ঢাকা ০৩:২৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৪ মার্চ ২০২৬

শক্তিকন্যা: ভ্রাম্যমাণ টয়লেটের মাধ্যমে নাগরিক মর্যাদার নতুন সম্ভাবনা

ঢাকা এক জনবহুল শহর যেখানে প্রতিদিন কোটি মানুষ চলাফেরা করেন। কিন্তু শহরের এই ভিড়ে একটি পরিষ্কার ও নিরাপদ টয়লেট খুঁজে পাওয়া এখনো বিলাসিতার মতো। ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির তিন তরুণ নারী স্থাপতির কাছে এটি শুধু শহরের সমস্যা নয়, বরং তাদের প্রতিদিনের তিক্ত অভিজ্ঞতা।

এই অভিজ্ঞতাই জন্ম দিয়েছে ‘টিম শক্তিকন্যা’। ওয়াটারএইড বাংলাদেশের ‘BLUE’ প্ল্যাটফর্ম এবং সুইডেন দূতাবাসের সহযোগিতায় আয়োজিত ‘টয়লেটস অন দ্য গো’ প্রতিযোগিতায় তারা বিজয়ী হয়েছেন। তবে এই জয় কেবল পুরস্কার নয়; এটি নারীদের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে নাগরিক স্যানিটেশনকে আরও নিরাপদ ও মর্যাদা সম্পন্ন করার চেষ্টা।

অভিজ্ঞতা যখন অনুপ্রেরণা

“আমরা শুধু নারীদের নিয়ে দল গড়িনি; বরং নারী হিসেবে একই সমস্যার মুখোমুখি হয়ে একত্রিত হয়েছি,” বলেন শক্তিকন্যার সদস্যরা—জান্নাতুল ফেরদৌস, লামিয়া ফারিহা এবং মাহমুদা হক মুন। তারা সবাই স্থপতি ও ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষক।

সহকর্মী ও ছাত্রীদের সঙ্গে আড্ডায় বারবার উঠে আসত এক সমস্যা: ঢাকা শহরে পর্যাপ্ত নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট নেই, যার কারণে প্রতিদিনের চলাচল ভোগান্তিময়। বিশেষ করে কনস্ট্রাকশন সাইটে নারীরা নিরাপদ টয়লেট না থাকায় দ্বিধা বোধ করেন। পিরিয়ড চলাকালীন এই সমস্যা আরও গুরুতর হয়ে ওঠে।

এই বাস্তবতাই তাদের উৎসাহিত করে ভ্রাম্যমাণ টয়লেট ডিজাইন প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে।

প্রতিযোগিতা ও জয়

সারাদেশ থেকে ৪০টি আবেদন জমা পড়েছিল। কঠোর যাচাই-বাছাই শেষে ১২টি দল জুরি বোর্ডের সামনে তাদের উদ্ভাবনী কনসেপ্ট উপস্থাপন করেছিল। শক্তিকন্যা সেখানে বিজয়ী হয়।

পুরস্কার হিসেবে তারা পান এক লাখ টাকা এবং তাদের ডিজাইন ‘Loo.ext’ এর পূর্ণ অধিকার। তবে বিজয়ী হওয়ার পর তারা উল্লাসে নয়, বরং দায়িত্ববোধ অনুভব করেন, কারণ ডিজাইনটি বাস্তবায়ন করলে শহরের মানুষের দৈনন্দিন জীবন পরিবর্তিত হবে।

Loo.ext: সম্মান ও সমতার নতুন মডেল

‘Loo.ext’ কেবল একটি টয়লেট নয়; এটি নিরাপদ, পর্যাপ্ত বাতাস চলাচল এবং নারীদের মর্যাদা নিশ্চিত করা একটি আধুনিক মডিউল। অফিস এলাকা, বাজার বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বসানো হবে। রক্ষণাবেক্ষণ ও নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকবেন প্রশিক্ষিত নারী কর্মীরা।

এতে থাকবে ছোট খুচরা কাজ—যেমন নিউজপেপার স্ট্যান্ড বা ফুলের দোকান—যাতে মানুষ এটিকে শহরের অংশ হিসেবে গ্রহণ করে।

শক্তিকন্যার মতে, “স্যানিটেশন মানে শুধু টয়লেট নয়; এটি সমতা, স্বাধীনভাবে চলাফেরা ও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জনপরিসরে বিচরণ করার অধিকার।”

শক্তিকন্যা কেবল একটি দলের নাম নয়; এটি সাহসী নারীদের প্রতিচ্ছবি, যারা শহরের সবচেয়ে জরুরি কিন্তু অবহেলিত প্রয়োজনগুলো মিটিয়ে ঢাকাকে নতুনভাবে গড়তে চায়।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

মার্কিন সহকারী সচিবের ঢাকা সফর: মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি ও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা

শক্তিকন্যা: ভ্রাম্যমাণ টয়লেটের মাধ্যমে নাগরিক মর্যাদার নতুন সম্ভাবনা

আপডেট সময় : ০১:৫৭:৫৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ৪ মার্চ ২০২৬

ঢাকা এক জনবহুল শহর যেখানে প্রতিদিন কোটি মানুষ চলাফেরা করেন। কিন্তু শহরের এই ভিড়ে একটি পরিষ্কার ও নিরাপদ টয়লেট খুঁজে পাওয়া এখনো বিলাসিতার মতো। ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির তিন তরুণ নারী স্থাপতির কাছে এটি শুধু শহরের সমস্যা নয়, বরং তাদের প্রতিদিনের তিক্ত অভিজ্ঞতা।

এই অভিজ্ঞতাই জন্ম দিয়েছে ‘টিম শক্তিকন্যা’। ওয়াটারএইড বাংলাদেশের ‘BLUE’ প্ল্যাটফর্ম এবং সুইডেন দূতাবাসের সহযোগিতায় আয়োজিত ‘টয়লেটস অন দ্য গো’ প্রতিযোগিতায় তারা বিজয়ী হয়েছেন। তবে এই জয় কেবল পুরস্কার নয়; এটি নারীদের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে নাগরিক স্যানিটেশনকে আরও নিরাপদ ও মর্যাদা সম্পন্ন করার চেষ্টা।

অভিজ্ঞতা যখন অনুপ্রেরণা

“আমরা শুধু নারীদের নিয়ে দল গড়িনি; বরং নারী হিসেবে একই সমস্যার মুখোমুখি হয়ে একত্রিত হয়েছি,” বলেন শক্তিকন্যার সদস্যরা—জান্নাতুল ফেরদৌস, লামিয়া ফারিহা এবং মাহমুদা হক মুন। তারা সবাই স্থপতি ও ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষক।

সহকর্মী ও ছাত্রীদের সঙ্গে আড্ডায় বারবার উঠে আসত এক সমস্যা: ঢাকা শহরে পর্যাপ্ত নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট নেই, যার কারণে প্রতিদিনের চলাচল ভোগান্তিময়। বিশেষ করে কনস্ট্রাকশন সাইটে নারীরা নিরাপদ টয়লেট না থাকায় দ্বিধা বোধ করেন। পিরিয়ড চলাকালীন এই সমস্যা আরও গুরুতর হয়ে ওঠে।

এই বাস্তবতাই তাদের উৎসাহিত করে ভ্রাম্যমাণ টয়লেট ডিজাইন প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে।

প্রতিযোগিতা ও জয়

সারাদেশ থেকে ৪০টি আবেদন জমা পড়েছিল। কঠোর যাচাই-বাছাই শেষে ১২টি দল জুরি বোর্ডের সামনে তাদের উদ্ভাবনী কনসেপ্ট উপস্থাপন করেছিল। শক্তিকন্যা সেখানে বিজয়ী হয়।

পুরস্কার হিসেবে তারা পান এক লাখ টাকা এবং তাদের ডিজাইন ‘Loo.ext’ এর পূর্ণ অধিকার। তবে বিজয়ী হওয়ার পর তারা উল্লাসে নয়, বরং দায়িত্ববোধ অনুভব করেন, কারণ ডিজাইনটি বাস্তবায়ন করলে শহরের মানুষের দৈনন্দিন জীবন পরিবর্তিত হবে।

Loo.ext: সম্মান ও সমতার নতুন মডেল

‘Loo.ext’ কেবল একটি টয়লেট নয়; এটি নিরাপদ, পর্যাপ্ত বাতাস চলাচল এবং নারীদের মর্যাদা নিশ্চিত করা একটি আধুনিক মডিউল। অফিস এলাকা, বাজার বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বসানো হবে। রক্ষণাবেক্ষণ ও নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকবেন প্রশিক্ষিত নারী কর্মীরা।

এতে থাকবে ছোট খুচরা কাজ—যেমন নিউজপেপার স্ট্যান্ড বা ফুলের দোকান—যাতে মানুষ এটিকে শহরের অংশ হিসেবে গ্রহণ করে।

শক্তিকন্যার মতে, “স্যানিটেশন মানে শুধু টয়লেট নয়; এটি সমতা, স্বাধীনভাবে চলাফেরা ও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জনপরিসরে বিচরণ করার অধিকার।”

শক্তিকন্যা কেবল একটি দলের নাম নয়; এটি সাহসী নারীদের প্রতিচ্ছবি, যারা শহরের সবচেয়ে জরুরি কিন্তু অবহেলিত প্রয়োজনগুলো মিটিয়ে ঢাকাকে নতুনভাবে গড়তে চায়।