রাজধানীর লালমাটিয়ার ডি ব্লকে নীরবে গড়ে উঠেছে মানবিকতার অনন্য এক দৃষ্টান্ত। কোনো রাজনৈতিক সংগঠন বা বড় পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়াই একদল তরুণ-তরুণী স্বেচ্ছাশ্রমের মাধ্যমে প্রতিদিন দেড় থেকে দুই হাজার অসহায় মানুষের মুখে তুলে দিচ্ছেন ইফতার ও একবেলার খাবার। ‘মেহমানখানা’ নামে এ উদ্যোগ এখন রিকশাচালক, দিনমজুর, পথশিশু ও নিম্নআয়ের মানুষের নির্ভরতার জায়গা হয়ে উঠেছে।
কোনো রাজনৈতিক সংগঠন বা ব্যক্তিগত স্বার্থ নয়; কেবল মানবিক দায়বদ্ধতা থেকেই ‘মেহমানখানা’ রমজানজুড়ে প্রতিদিন ইফতার ও একবেলার খাবারের আয়োজন করে থাকে। রোদ ও ঝড়-বৃষ্টি যেকোনো পরিস্থিতিতে খাবার জোটে রিকশাচালক, সিএনজি ও অটোচালক, দিনমজুর, ছোট দোকানি আর ক্ষুধার্ত পথশিশুদের প্লেটে। দিন দিন এখানে বাড়ছে নতুন মুখের সংখ্যাও। নিজেরা খেয়ে পরিবারের বাকি সদস্যের জন্য খাবার নিয়ে যান তারা।
সরেজমিন দেখা যায়, লালমাটিয়ার ডি ব্লকের রাস্তার ফুটপাতের ওপর বিশাল ডেগে সবজি ও মুরগি দিয়ে রান্না করা হচ্ছে খিচুড়ি। মেহমানখানার স্বেচ্ছাসেবীদের কেউ রাস্তার ওপর থালা-প্লেট পরিষ্কার করছেন, কেউ সবজি কাটছেন, কেউ আবার খেজুর-কলা সাজাচ্ছেন। আরেক ডেগে ছোলা ও পাশে মুড়ির বস্তা। কেউবা বিশাল ড্রামে লেবু চিপে শরবত তৈরিতে ব্যস্ত। আবার কেউ ব্যস্ত প্লেট গুছানো আর সাজানোর কাজে। এ ধরনের কাজের বিরাট এক কর্মচাঞ্চল্য দেখা গেল সেখানে।
ইফতারির আগ মুহূর্তে সারিবদ্ধভাবে রিকশাচালকরা রিকশা নিয়ে হাজির হচ্ছেন সেখানে। আসছেন ফুটপাতে আশ্রয় নেওয়া অসহায় ভাসমান ছিন্নমূল মানুষ ও বাসাবাড়ির সিকিউরিটি গার্ডরাও। তারা জানেন লালমাটিয়ার ডি ব্লকের মেহমানখানায় গেলেই মিলবে খাবার। তাই তারা মেহমানখানার মেহমান হয়েছেন, এসেছেন ইফতার করতে। ইফতারের মেনুতে থাকে খিচুড়ি, শরবত, ছোলা-মুড়ি, জিলাপি, খেজুর, পেঁয়াজু, শসা ও মৌসুমি ফল।
স্বাস্থ্যবিধি মেনেই চলে পুরো আয়োজন। মাগরিবের আজানের পরও প্রায় আধা ঘণ্টা ধরে সুশৃঙ্খলভাবে ইফতার বিতরণ করা হয়। এসব প্রস্তুত করা ও মেহমানদারির জন্য স্বেচ্ছায় কাজ করছেন শতাধিক তরুণ-তরুণী। কোনো স্বার্থ নয়; কেবলই মনের প্রশান্তির অন্বেষণে মানুষের সেবায় যুক্ত রয়েছেন তারা।
রমজান মাসজুড়ে প্রতিদিন দেড় থেকে দুই হাজার মানুষ এখানে বিনামূল্যে ইফতার করেন। ইফতারের ঠিক আগে সেখানে গিয়ে দেখা যায়, সাজানো ইফতার সামনে রেখে রাস্তার দুপাশে সারিবদ্ধভাবে অপেক্ষা করছেন মেহমানরা। কোনো হইচই নেই, হুড়োহুড়ি নেই, স্বাস্থ্যবিধি মেনে অপেক্ষা। আর পুরো আয়োজন যত্ন নিয়ে সম্পাদন করছেন কিছু স্বপ্নবাজ তরুণ-তরুণী। নিজেদের প্রচেষ্টায় তারা অসামান্য এ কাজ করছেন। এখানে যারা স্বেচ্ছাশ্রম দিচ্ছেন তাদের কেউ কর্মচারী, কেউবা স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থী। প্রত্যেকেই স্বেচ্ছায় মেহমানখানায় মেহমানদারি করেন।
প্রতিদিন রান্নার কাজের অভিজ্ঞতার কথা জানতে চাইলে আমার দেশকে বাবুর্চি কুদ্দুস মিয়া বলেন, মানুষের জন্য কিছু করতে পারছি, এটা ভাবলেই ভালো লাগে। অসহায় মানুষগুলো যখন তৃপ্তি নিয়ে আমার রান্না করা খাবার খায়, সারা দিনের সব কষ্ট এক নিমিষেই ভুলে যাই।
যাদের জন্য এ আয়োজন, তারা আসেন ইফতারের আগ মুহূর্তে। এখানে খাবার খেতে আসাদের কেউ দিনমজুর, কেউ ফুটপাতের বিক্রেতা, কেউ গৃহকর্মী, বাসা বাড়ির দারোয়ান, দোকান কর্মচারী, পথচারী বা ভবঘুরে। কোনো বাসার সিকিউরিটি গার্ড আবার মাগরিবের আজানের আগে দৌড়ে এসে নিজের ভাগেরটা নিয়ে যান। মাগরিবের আজানের পরও প্রায় আধা ঘণ্টা ইফতার বিতরণ করা হয়।
মেহমানখানার নিয়মিত অতিথি রিকশাচালক রফিক মিয়া বলেন, ‘মুই অ্যাটি (এখানে) তিন বছর হলো ইফতার করি। কিনে খাইতে ৫০-৬০ টাকা লাগে, এখানে বিনামূল্যে ইফতার ও খিচুড়ি পাওয়া যায়।’
গৃহকর্মী আকলিমা খাতুন জানান, রোজার প্রতিদিন তারা মানুষের কাছ থেকে সহযোগিতা নিয়ে আমাদের মতো গরিবদের খাওয়ায়। রোজা ছাড়া সপ্তাহে দুদিন গরু বা খাসির মাংসও খাওয়ায়।
বিধবা রমিছা খাতুন বলেন, ওদের জন্য সব সময় আল্লাহর কাছে দোয়া করি—ওরা যেন আরো মানুষকে খাওয়াতে পারে।
ইফতারে উপস্থিত এক রিকশাচালক বলেন, ‘আমি টানা কয়দিন এখানেই ইফতার করেছি। ইফতারিতে থাকে শরবত, জিলাপি, খেজুর, পেঁয়াজু, তরমুজ, শসা ও মুড়ি। পরিমাণেও অনেক।’
যার হাত ধরে এতকিছুর আয়োজন, মেহমানখানার সেই প্রধান উদ্যোক্তা আসমা আখতার লিজার সঙ্গে আমার দেশের কথা হয়। তিনি জানালেন, বিবেকের তাড়নায়ই আসলে তার এই মানবিক আয়োজন। তিনি বলেন, করোনার সময় লকডাউনে নিম্নআয়ের মানুষের কথা চিন্তা করে এটা (মেহমানখানা) শুরু করি। যতদিন পারি খাওয়াব। মানবিকতা থেকে কেউ যদি এগিয়ে আসতে চায় আসবে। আমার যতটুকু সামর্থ্য আমি করে যাব। কেউ ছোলা দেয়, কেউ চাল-ডাল, কেউ তেল বা মুরগি দেয়। কেউ আবার বিকাশে একবেলার খাবারের টাকা পাঠায়। রান্না আমরা নিজেরাই করি।
শুরুর দিকে ৫০ থেকে ১০০ মানুষের জন্য রান্না হলেও এখন প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ এখানে খাবার পান। শুধু রমজান নয়, সারা বছরই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অসহায়দের মাঝে খাবার বিতরণ করা হয়। সপ্তাহে দুদিন গরু বা খাসির মাংস রান্নার ব্যবস্থা থাকে। স্কুলের কার্যক্রমও রয়েছে তাদের। স্কুলের নাম আনন্দ পাঠশালা।
মেহমানখানার উদ্যোক্তা লিজা বলেন, আমাকে পাগল উপাধি দেওয়া হয়েছে। আমি মনে করি ভালো কাজের জন্য এই পাগলটুকু আমি থাকতে চাই। আমার ভালো হওয়ার দরকার নেই।
এবারের রোজায় প্রতিদিন দেড় হাজারের বেশি মানুষ ইফতার করেছেন মেহমানখানায়। আয়োজকদের অন্যতম সৈয়দ সাইফুল আলম শোভনের সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলেন, অনেক জায়গা থেকে মানুষ আমাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। এটি সম্মিলিত উদ্যোগ। এককভাবে কারো নাম সামনে আনতে চাই না।
রিপোর্টারের নাম 
























