এই লেখা কোনো ব্যক্তির সাফাই নয়। এটি রাষ্ট্র, গণঅভ্যুত্থান ও সাংবাদিকতার মর্যাদা রক্ষার প্রশ্ন। অন্তর্বর্তী সরকার কোনো একক দলের সরকার ছিল না, এটি ছিল ফ্যাসিবাদবিরোধী সব রাজনৈতিক শক্তির সমঝোতার ফসল। প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসসহ উপদেষ্টাদের নিয়োগ হয়েছিল আলোচনা করেই। এ কথা সবাই জানে। এ নিয়ে তখন কোনো বড় আপত্তি ওঠেনি।
কিন্তু সময় গড়াতেই দৃশ্যপট বদলাতে শুরু করেছে। এখন দেখা যাচ্ছে চরিত্রহননের প্রতিযোগিতা; টার্গেট একটাই—অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। আর সরকারের গায়ে কালি লাগাতে পারলে জুলাই গণঅভ্যুত্থানও প্রশ্নবিদ্ধ হবে। এই হলো মূল কৌশল। এই কাজে নেমেছে একাধিক পক্ষ। সরকার-দলের কিছু লোক, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও ফ্যাসিবাদের দোসররা। আর যুক্ত হয়েছে কিছু নব্য বিএনপি। দুঃখজনকভাবে কথিত মূলধারার কিছু মিডিয়াও এই খেলায় শরিক।
এই মিডিয়াগুলো নতুন নয়। ৫ আগস্টের আগেও তারা বিএনপি ও দলটির নেতৃত্বের বিরুদ্ধে চরিত্রহনন করেছে। এখন তারা ভোল পাল্টেছে। ক্ষমতার সঙ্গে সখ্যই তাদের নীতি। সাংবাদিকতা নয়, তোষামোদই তাদের পাথেয়। এই অপচেষ্টার প্রধান শিকার জুলাইযোদ্ধারা, যারা রাজপথে দাঁড়িয়েছিল, যারা ঝুঁকি নিয়েছিল। আজ তাদের বিরুদ্ধে চলছে মিসইনফরমেশন, ডিসইনফরমেশন ও ভিউ-শিকারি শিরোনাম; উদ্দেশ্য একটাই—তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট করা।
এই প্রেক্ষাপটে আসে এক ‘সংবাদ’। সাবেক অন্তর্বর্তীকালীন সরকার উপদেষ্টা ও এনসিপি নেতা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। তাকে জড়িয়ে ছড়ানো হয় ‘১০ বিলিয়ন ডলার দুর্নীতি’র অভিযোগ। ভিডিও, হেডলাইন, হাস্যরস, ক্ষোভ—সব একসঙ্গে। একটি মিডিয়া শিরোনাম করল—‘১০ বিলিয়ন ডলার দুর্নীতির অভিযোগে ফেঁসে যাচ্ছেন আসিফ মাহমুদ।’ এই একটি লাইনের মধ্যেই সাংবাদিকতার মৃত্যু।
চলুন, অঙ্কটা দেখি—১৬ মাসে ১০ বিলিয়ন ডলার। মানে প্রতি মাসে প্রায় ৬২৫ মিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এই অঙ্ক কেবল অসম্ভব নয়, এটি বেসম্ভব। এই অঙ্ক বাস্তবায়ন করতে হলে রাষ্ট্রযন্ত্র উল্টে দিতে হয়, ব্যাংকিং ব্যবস্থা ভেঙে ফেলতে হয়, রিজার্ভ লুট করতে হয়। এমন কোনো ঘটনা কি ঘটেছে? কোনো তথ্য আছে? কোনো নথি? কোনো অনুসন্ধান? না। শুধু শিরোনাম। শুধু ‘ফেঁসে যাচ্ছেন’। এই ‘ফেঁসে যাচ্ছেন’ শব্দগুচ্ছই সবচেয়ে বিপজ্জনক। এটি অভিযোগ নয়, এটি রটনা। এটি গুজবকে সংবাদ বানানোর কৌশল।
যদি দুর্নীতি থাকে, তথ্য দিন। প্রমাণ দিন। ডকুমেন্ট দিন। অডিট দিন। তদন্ত দিন। নইলে এই ভাষা সাংবাদিকতা নয়, এটি পেশার প্রতি অবমাননা। এই অবাস্তব দাবির গাণিতিক অসংগতি তুলে ধরেছেন দেশের প্রথিতযশা ফ্যাক্টচেকাররা। এক সাংবাদিক বলেছেন, ‘১০ বিলিয়ন বা এক হাজার কোটি টাকা।’ এই একটি বাক্যেই সব ফাঁস; কারণ এক বিলিয়ন ডলার মানে এখন প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা। ১০ বিলিয়ন মানে ১ লাখ ২০ হাজার কোটির বেশি। অথচ বলা হচ্ছে, ১ হাজার কোটি। এটা ভুল নয়, এটা অজ্ঞতা নয়; এটা সচেতন বিভ্রান্তি।
আরেক প্রখ্যাত সাংবাদিক সহজ অঙ্কে দেখিয়েছেন অবাস্তবতা। ১৬ মাসে ১০ বিলিয়ন ডলার মানে প্রতি মাসে ৬২৫ মিলিয়ন। তিনি বলেছেন, এটি কেবল অসম্ভব নয়, বেসম্ভব। তিনি আরো বলেছেন, প্রমাণ ছাড়া ‘ফেঁসে যাচ্ছেন’ বলা মানে ফাতরামি। এটি সাংবাদিকতার জন্য অপমান। এই মন্তব্য কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, এটি পেশাগত সতর্কবার্তা। ফ্যাক্টচেকারদের মতে, এ ধরনের শিরোনামের উদ্দেশ্য একটাই—ভিউ বাড়ানো, এনগেজমেন্ট বাড়ানো, অর্থ উপার্জন।
সত্য এখানে অপ্রাসঙ্গিক। এ কারণেই একে বলা হচ্ছে ‘অপসাংবাদিকতা’। নিকৃষ্ট উদাহরণ। সোশ্যাল মিডিয়ায় সাধারণ মানুষও বিষয়টি বুঝছে। নেটিজেনরা প্রশ্ন তুলছে, ক্ষোভ প্রকাশ করছে; অনেকে বলছে, ডলার আর টাকার হিসাব না জানা লোকেরা সাংবাদিক সেজেছে। এতে ক্ষতি কার? একজন ব্যক্তির? না। ক্ষতি রাষ্ট্রের। ক্ষতি গণতন্ত্রের। ক্ষতি গণঅভ্যুত্থানের বিশ্বাসযোগ্যতার। কারণ আজ যদি ১০ বিলিয়ন ডলারের গুজব ছড়ানো যায়, কাল ২০ বিলিয়নও ছড়ানো যাবে, পরশু ৫০ বিলিয়ন। কেউ আর প্রশ্ন করবে না। কারণ মিথ্যা তখন স্বাভাবিক হয়ে যাবে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হানাহ আরেন্ট (Hannah Arendt) সতর্ক করেছিলেন, মিথ্যা যখন স্বাভাবিক হয়ে যায়, সত্য তার শক্তি হারায়। এই কথাটা আজ হাড়ে হাড়ে টের পাওয়ার সময়।
রিপোর্টারের নাম 

























