ইরানের ওপর আমেরিকা-ইসরাইলের আগ্রাসনে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশপথ যখন অনিশ্চয়তায় ঢেকে গেছে, তখন সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা। ফ্লাইট নেই, ফিরতে পারছেন না দেশে। কারও ভিসার মেয়াদ চলে যাচ্ছে, কিন্তু কর্মস্থলে যেতে পারছেন না। ফলে দিন–রাত বিমানবন্দরে আটকে থেকে অনিশ্চিত অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন এসব ভুক্তভোগী প্রবাসী। তাদের অভিযোগ- অনেক দেশ ইতোমধ্যে নিজেদের নাগরিকদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশিরা রয়ে গেছেন চরম ভোগান্তির মধ্যে। নিরাপত্তা শঙ্কা, অর্থকষ্ট আর অনিশ্চয়তার ত্রিমুখী চাপ এখন তাদের নিত্যসঙ্গী।
তবে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় বলছে, আটকে থাকা প্রবাসীদের সহায়তায় সব প্রস্তুতি রাখা হয়েছে। ইরানসহ মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে কোনো বাংলাদেশি অভিবাসী কর্মী সমস্যার সম্মুখীন হলে তা জানানোর জন্য চার সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। আটকেপড়া প্রবাসীদের ভিসা জটিলতা নিরসনে ‘বিশেষ সেল’ গঠন করা হয়েছে।
ভুক্তভোগী প্রবাসীরা জানান, আন্তর্জাতিক ফ্লাইট স্থগিতের কারণে ছুটিতে আসা অনেকের ভিসার মেয়াদ চলে যাচ্ছে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কর্মস্থলে না ফিরতে পারলে অনেক বড় ক্ষতি হয়ে যাবে। কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ নিয়ে তারা বলেন, সময়মতো না যাওয়ার দায় তো আমাদের নয়। সরকার যদি সংশ্লিষ্ট দেশের সঙ্গে আলাপ করে তাহলে আমরা চিন্তামুক্ত হব।
মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত বাংলাদেশি শ্রমিকরা বলেন, বিভিন্ন দেশ তাদের নাগরিকদের নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার নির্দেশ দিচ্ছে এবং সরিয়েও নিচ্ছে। অথচ আমরা আছি দিশাহারা অবস্থায়। তারা বলেন, না পারছি শঙ্কামুক্ত হয়ে কাজে বের হতে, না পারছি বাসায় থাকতে। পুরো আতঙ্কের মধ্যে আছি।
সূত্র জানায়, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে চারদিনে ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক এয়ারলাইনসের ১৪৭টি এবং চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ৩৫টি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার নির্ধারিত ফ্লাইটগুলোর মধ্যে ৩৮টি ফ্লাইট বাতিল করার তথ্য জানিয়েছে শাহজালাল বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ।
এদিকে কাতার-দুবাইসহ বিমানের ছয় রুটের সব ফ্লাইট ৫ মার্চ পর্যন্ত বাতিল করা হয়েছে। গতকাল বিমান সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, বাতিল হওয়া রুটগুলোর মধ্যে রয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই, আবুধাবি ও শারজা; সৌদি আরবের দাম্মাম; কাতারের দোহা এবং কুয়েত। বিমানের মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) বোসরা ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
রাশেদ আহমদ নামে সুনামগঞ্জের এক প্রবাসী বলেন, আজ (মঙ্গলবার) বিকাল ৪টায় আমার ফ্লাইট ছিল। হঠাৎ খবর পেলাম ফ্লাইট হবে না। এখন দুশ্চিন্তায় আছি, সময়মতো কর্মস্থলে না যাওয়ার জন্য পরে কোনো ঝামেলা হয় কি না! তিনি বলেন, এখানে দায় তো আমার নয়। আমি তো যেতে প্রস্তুত। তবুও বিদেশিরা তো আর এটা সহজে বুঝবে না, তারা নানান অজুহাত খুঁজবে, এজন্য ভয় কাটছে না।
রাশেদ নিয়াজি নামে ভুক্তভোগী এক প্রবাসী বলেন, সোমবার সৌদি আরবে আমার ফ্লাইট ছিল। কিন্তু এয়ারপোর্টে আসার পর জানলাম, তা বাতিল হয়েছে। এখন প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে আছি। তারা আবাসন ও খাওয়ার ব্যবস্থা করে দিয়েছে। তিনি বলেন, এখন আমাদের একটাই চাওয়া- যেন কাজে যোগদানের ক্ষেত্রে সময় কোনো সমস্যা না হয়।
দুবাই প্রবাসী ইমরান আহমদ বলেন, ইরান-আমেরিকা যুদ্ধ নিয়ে আমরা মহাবিপদে আছি। বাসা থেকে বের হতেও ভয় হয়। বাসায় অবস্থান করতেও ভয় কাজ করে। মানে সব সময় আতঙ্কের মধ্যে আছি আমরা। কিন্তু কাজ তো আর সব সময় বন্ধ রাখা যায় না। বিভিন্ন দেশ তাদের নাগরিকেদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিলেও আমরা আছি নিজেদের মতো করে।
তিনি বলেন, সব কিছু স্থবির হয়ে আছে। আশা করি, বাংলাদেশ সরকার আমাদের পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিবে।
তথ্যানুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ পরিস্থিতির জন্য কাতারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মেয়াদোত্তীর্ণ বা মেয়াদ শেষ হওয়ার পথে থাকা সব ধরনের ভিসার মেয়াদ এক মাসের জন্য বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে পরবর্তী ১ মাসের জন্য এটি কার্যকর হবে। পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে ওই সময়সীমা আরো বাড়ানো হতে পারে।
কাতারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিবৃতিতে জানায়, ভিসার মেয়াদ বাড়ানোর প্রক্রিয়া ইলেকট্রনিক সিস্টেমের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্পন্ন হবে। এজন্য কোনো ফি দিতে হবে না এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরে উপস্থিত হওয়া বা অতিরিক্ত আবেদন জমা দেওয়ারও প্রয়োজন নেই। এ ছাড়া ২৮ ফেব্রুয়ারির আগে যেসব ভিসার সময়সীমা লঙ্ঘিত হয়েছে, সে ক্ষেত্রে ভিসাধারীদের লঙ্ঘনের সময়কালের জন্য নির্ধারিত জরিমানা পরিশোধ করতে হবে। এরপর উল্লিখিত তারিখ থেকে তাদের ক্ষেত্রেও মেয়াদ বৃদ্ধি ও ফি মওকুফ প্রযোজ্য হবে।
মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, সংযুক্ত আরব আমিরাত প্রবাসীকর্মী যারা ছুটিতে দেশে এসে আটকা পড়েছেন এবং ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যাচ্ছে তারা ফ্লাইট চালু হলে বাংলাদেশে অবস্থিত সংযুক্ত আরব আমিরাতের দূতাবাস হতে ১৫-২০ দিনের ট্রাভেল পারমিট নিতে পারবেন। তবে যাদের পার্টনার ভিসা (ব্যবসায়ী) তাদের এধরনের ট্রাভেল পারমিটের কোনো প্রয়োজন নেই। এছাড়া রিয়াদ ও দাম্মামের স্পর্শকাতর এলাকার কমিউনিটির সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনির আমার দেশকে বলেন, যেকোনো সংকটে নিজ দেশের নাগরিকদের নিরাপদস্থানে সরাতে সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্র উদ্যোগ নিয়ে থাকে। সেক্ষেত্রে আশা করা যায়, বাংলাদেশ সরকারও সেই পদক্ষেপ নিয়েছে বা নিবে। মার্কিন স্থাপনা বা তেলের প্রতিষ্ঠান আছে, তার আশেপাশে বসবাসরত বাংলাদেশিদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে আনা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে দুতাবাসগুলো প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পারে। তাছাড়া, যেসব প্রবাসী দেশে আসতে চান, তাদের নিরাপদে ফেরত আনার ব্যাপারে সরকারের প্রস্তুতি নেয়া উচিত। সেক্ষেত্রে প্রথমে প্রচার বা মাইকিং করে জানাতে হবে। পরিস্থিতি বুঝে উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে।
প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে অনেক প্রবাসী বাংলাদেশি দেশে এসে আটকে পড়েছেন, অথচ তাদের ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পথে। প্রবাসীদের সংকট ও সমস্যার পুরো বিষয়টি আমাদের মনিটরিংয়ে আছে। এ সমস্যা সমাধানে বিশেষ সেল খোলা হয়েছে। তিনি বলেন, দূতাবাসগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করে তাদের ভিসা সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করব। আশা করি, বিষয়টি দ্রুত সমাধান করা সম্ভব হবে।
ইসরাইল ও আমেরিকা গত শনিবার ইরানে হামলা শুরু করলে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হয়। এর ফলে ইরাক, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, কাতার ও জর্ডান ২৮ ফেব্রুয়ারি তাদের আকাশসীমা বন্ধ করে দেয়। এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ থেকে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে উড়োজাহাজ চলাচলও বিঘ্নিত হয়।
রিপোর্টারের নাম 





















