বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরে নানা পরিবর্তন আসে – চুল পেকে যাওয়া বা চোখের দৃষ্টি ক্ষীণ হওয়াকে আমরা স্বাভাবিকভাবেই মেনে নিই। কিন্তু কানে কম শোনাকেও কি কেবলই বার্ধক্যের পরিণতি ভেবে এড়িয়ে যাওয়া উচিত? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই প্রবণতা কেবল বয়সের ছাপ নয়, এর পেছনে থাকতে পারে এমন কিছু কারণ যা সময়মতো শনাক্ত না হলে জীবনযাত্রায় ডেকে আনতে পারে গুরুতর জটিলতা।
চিকিৎসাবিজ্ঞানে বয়সজনিত শ্রবণশক্তি হ্রাসকে ‘প্রেসবাইকিউসিস’ বলা হয়। এটি এমন একটি অবস্থা যেখানে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভেতরের কানের সংবেদনশীল স্নায়ু ও হেয়ার সেলগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হতে শুরু করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, ৬০ বছরের বেশি বয়সী মানুষের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ কোনো না কোনো মাত্রায় শ্রবণশক্তি হ্রাসের শিকার। এটিকে স্বাভাবিক ভেবে অবহেলা করলে তা কেবল সামাজিক বিচ্ছিন্নতাই নয়, ডেকে আনতে পারে মানসিক অবসাদ ও অন্যান্য স্বাস্থ্যঝুঁকিও।
কেন বয়সের সঙ্গে কমে শ্রবণশক্তি?
মূলত, বয়স বাড়ার সঙ্গে কানের ভেতরের ককলিয়ার সূক্ষ্ম কোষগুলো ক্ষয় হতে থাকে, যা শব্দতরঙ্গ গ্রহণ ও মস্তিষ্কে পৌঁছানোর প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করে। তবে এর পেছনে আরও কিছু কারণ প্রভাব ফেলে। দীর্ঘকাল ধরে উচ্চ শব্দে কাজ করা বা বাস করা, অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, ধূমপান এবং কিছু নির্দিষ্ট ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এই ঝুঁকিকে আরও বাড়িয়ে তোলে। সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি) সতর্ক করেছে যে, দীর্ঘমেয়াদী শব্দদূষণ বয়সজনিত শ্রবণহ্রাসকে দ্রুততর করতে পারে।
কোন লক্ষণগুলো দেখলে সতর্ক হবেন?
শুধুমাত্র টেলিভিশনের ভলিউম বাড়ানোই একমাত্র লক্ষণ নয়। আরও কিছু সূক্ষ্ম ইঙ্গিত রয়েছে যা আপনাকে সতর্ক করতে পারে:
কথা স্পষ্ট শুনতে না পারা, বিশেষ করে ভিড় বা কোলাহলপূর্ণ পরিবেশে।
অন্যকে বারবার কথা পুনরাবৃত্তি করতে বলা।
মোবাইল ফোনে কথা বুঝতে অসুবিধা হওয়া।
কানে ভোঁ ভোঁ শব্দ হওয়া (টিনিটাস)।
এই লক্ষণগুলো ধীরে ধীরে প্রকাশ পায় বলে অনেকে প্রথমদিকে বুঝতে পারেন না। কিন্তু যখন একসঙ্গে একাধিক লক্ষণ দেখা যায়, তখন দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
এটি কি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক?
বয়সজনিত শারীরিক পরিবর্তন স্বাভাবিক হলেও, শ্রবণশক্তি কমে যাওয়াকে হেলাফেলা করা ঠিক নয়। কারণ, এটি কেবল কানে শোনার সমস্যা নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সামগ্রিক স্বাস্থ্য। শ্রবণশক্তি কমে গেলে সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, হতাশা, এমনকি স্মৃতিশক্তি হ্রাসের ঝুঁকিও বাড়তে পারে। সাম্প্রতিক গবেষণা ইঙ্গিত দেয় যে, অনিয়ন্ত্রিত শ্রবণহ্রাস ডিমেনশিয়ার (স্মৃতিভ্রম) ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। তাই এটি শুধু কানের সমস্যা নয়, মস্তিষ্কের সামগ্রিক সুস্থতার সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত।
করণীয় কী?
প্রথমত, ৫০ বছর বয়স পার হওয়ার পর নিয়মিত হিয়ারিং চেকআপ করানো আবশ্যক। যদি কোনো সমস্যা ধরা পড়ে, তবে দেরি না করে একজন ইএনটি বিশেষজ্ঞ বা অডিওলজিস্টের পরামর্শ নিন। প্রয়োজনে হিয়ারিং এইড বা শ্রবণযন্ত্র ব্যবহার করতে দ্বিধা করবেন না। আধুনিক হিয়ারিং এইডগুলো এখন ছোট, কার্যকর এবং জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে অত্যন্ত সহায়ক।
দ্বিতীয়ত, শব্দদূষণ থেকে নিজেকে সুরক্ষিত রাখুন। উচ্চ শব্দে দীর্ঘ সময় হেডফোন ব্যবহার পরিহার করুন। রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখুন এবং ধূমপান ত্যাগ করুন।
বয়স বাড়া একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া, কিন্তু জীবনের মান কমে যাওয়া স্বাভাবিক নয়। কানে কম শোনা শুরু হলে তাকে কেবল বয়সের দোষ বলে উড়িয়ে না দিয়ে সচেতন হোন। সময়মতো পরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিলে যেকোনো বয়সেই সুস্থ, সক্রিয় ও সংযুক্ত জীবনযাপন সম্ভব।
রিপোর্টারের নাম 


















