ঢাকা ১০:৩২ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৩ মার্চ ২০২৬

রাজনীতিতে সৌজন্যের সুবাতাস: সংঘাত ছাপিয়ে কি ঐক্যের নতুন দিগন্ত?

রাজনীতি এক বহুমাত্রিক ও গতিশীল প্রক্রিয়া, যেখানে শেষ কথা বলে কিছু নেই। সময়ের প্রয়োজনে এখানে চিরশত্রু যেমন মিত্র হয়, তেমনি আদর্শিক ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও বৃহত্তর স্বার্থে এক টেবিলে বসার নজির সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী সময়টি তেমনই এক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রাম আর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এই নতুন বাংলাদেশে রাজনীতি এখন আর কেবল ক্ষমতা দখলের লড়াই নয়, বরং রাষ্ট্র সংস্কার ও জনগণের ভাগ্য পরিবর্তনের এক কঠিন পরীক্ষায় অবতীর্ণ।

জুলাই বিপ্লবের চূড়ান্ত লক্ষ্য ছিল একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা পুনর্বহাল করা। সেই লক্ষ্য অর্জনে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বিদায়ের পর দেশে একটি প্রতিনিধিত্বশীল সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সাম্প্রতিক নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পর বিএনপি নেতা তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক বিভিন্ন পদক্ষেপ ও বক্তব্যে রাজনৈতিক শিষ্টাচারের এক নতুন ধারা পরিলক্ষিত হচ্ছে। বিশেষ করে, প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর ইফতার মাহফিলে প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণ দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক অভাবনীয় সৌজন্যের আবহ তৈরি করেছে। অতীতে দুই দলের মধ্যে যে তিক্ততা ও দূরত্ব ছিল, তা কাটিয়ে একই মঞ্চে দুই শীর্ষ নেতার অবস্থান সাধারণ মানুষের মনে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।

ইফতার মাহফিলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের অঙ্গীকার ব্যক্ত করে বলেন, এক দশকেরও বেশি সময় ধরে মানুষের আত্মত্যাগ ও লড়াইয়ের বিনিময়ে দেশে গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু হয়েছে। তিনি এই অর্জিত গণতন্ত্রকে সুসংহত করতে এবং জনগণের বাক-স্বাধীনতা ও অধিকার রক্ষায় সকল রাজনৈতিক দলকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান। জামায়াতে ইসলামীর মতো রাজনৈতিক শক্তির প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তিনি বর্তমান সময়কে দেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে অভিহিত করেন।

অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানও সরকারের প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, তারা গতানুগতিক বা ‘ডামি’ বিরোধী দল হতে চান না। বরং সংসদকে সচল রাখতে এবং জনগণের চাওয়া-পাওয়ার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করতে তারা গঠনমূলক ভূমিকা পালন করবেন। সরকারের সঠিক পদক্ষেপে সমর্থন এবং ভুল সিদ্ধান্তে পরামর্শ দেওয়ার যে অঙ্গীকার তিনি করেছেন, তা সংসদীয় গণতন্ত্রের জন্য একটি ইতিবাচক দিক। একইসঙ্গে তিনি ২০১৩ সালের রাজনৈতিক সহিংসতা এবং জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার বিপ্লবের শহীদদের স্মরণ করে একটি মর্যাদাবান ও ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের ওপর জোর দেন।

তবে এই সৌজন্য ও সৌহার্দ্যের আবহের সমান্তরালে কিছু সাংবিধানিক ও আইনি চ্যালেঞ্জও উঁকি দিচ্ছে। আগামী ১২ মার্চ জাতীয় সংসদের অধিবেশন আহ্বান করা হয়েছে, যেখানে ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়ন নিয়ে বড় ধরনের বিতর্কের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় প্রস্তাবিত এই সনদ এবং সংবিধান সংস্কার কমিশনের অধীনে সংসদ সদস্যদের অতিরিক্ত শপথ গ্রহণের বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক ও আইনি মহলে দ্বিমত রয়েছে। বিএনপির পক্ষ থেকে একে সংবিধান-বহির্ভূত বলা হলেও সংস্কারপন্থীরা একে জনসার্বভৌমত্বের প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ এখন ‘বিপ্লব-পরবর্তী সাংবিধানিক রূপান্তরের’ মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে যেমন সংসদীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষার দায় রয়েছে, অন্যদিকে তেমনি গণভোট বা জনমতের ভিত্তিতে আসা সংস্কারের দাবিকেও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। এই দুইয়ের মধ্যে সমন্বয় সাধনই হবে বর্তমান সরকার ও সংসদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। রাজনীতিতে বর্তমান যে সৌজন্যের পরিবেশ তৈরি হয়েছে, তা যদি জাতীয় সমস্যা সমাধানে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে, তবেই জুলাই বিপ্লবের প্রকৃত সুফল সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছাবে। সংঘাত আর চরিত্রহননের রাজনীতি পেছনে ফেলে দেশ কি সত্যিই এক নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির দিকে এগোবে—এখন এটাই দেখার অপেক্ষায় পুরো জাতি।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

সংযুক্ত আরব আমিরাতে অ্যামাজনের ডেটা সেন্টারে ড্রোন হামলা, বিশ্বব্যাপী সেবা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা

রাজনীতিতে সৌজন্যের সুবাতাস: সংঘাত ছাপিয়ে কি ঐক্যের নতুন দিগন্ত?

আপডেট সময় : ০৯:০৩:২৭ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩ মার্চ ২০২৬

রাজনীতি এক বহুমাত্রিক ও গতিশীল প্রক্রিয়া, যেখানে শেষ কথা বলে কিছু নেই। সময়ের প্রয়োজনে এখানে চিরশত্রু যেমন মিত্র হয়, তেমনি আদর্শিক ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও বৃহত্তর স্বার্থে এক টেবিলে বসার নজির সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী সময়টি তেমনই এক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রাম আর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এই নতুন বাংলাদেশে রাজনীতি এখন আর কেবল ক্ষমতা দখলের লড়াই নয়, বরং রাষ্ট্র সংস্কার ও জনগণের ভাগ্য পরিবর্তনের এক কঠিন পরীক্ষায় অবতীর্ণ।

জুলাই বিপ্লবের চূড়ান্ত লক্ষ্য ছিল একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা পুনর্বহাল করা। সেই লক্ষ্য অর্জনে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বিদায়ের পর দেশে একটি প্রতিনিধিত্বশীল সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সাম্প্রতিক নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পর বিএনপি নেতা তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক বিভিন্ন পদক্ষেপ ও বক্তব্যে রাজনৈতিক শিষ্টাচারের এক নতুন ধারা পরিলক্ষিত হচ্ছে। বিশেষ করে, প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর ইফতার মাহফিলে প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণ দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক অভাবনীয় সৌজন্যের আবহ তৈরি করেছে। অতীতে দুই দলের মধ্যে যে তিক্ততা ও দূরত্ব ছিল, তা কাটিয়ে একই মঞ্চে দুই শীর্ষ নেতার অবস্থান সাধারণ মানুষের মনে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।

ইফতার মাহফিলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের অঙ্গীকার ব্যক্ত করে বলেন, এক দশকেরও বেশি সময় ধরে মানুষের আত্মত্যাগ ও লড়াইয়ের বিনিময়ে দেশে গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু হয়েছে। তিনি এই অর্জিত গণতন্ত্রকে সুসংহত করতে এবং জনগণের বাক-স্বাধীনতা ও অধিকার রক্ষায় সকল রাজনৈতিক দলকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান। জামায়াতে ইসলামীর মতো রাজনৈতিক শক্তির প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তিনি বর্তমান সময়কে দেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে অভিহিত করেন।

অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানও সরকারের প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, তারা গতানুগতিক বা ‘ডামি’ বিরোধী দল হতে চান না। বরং সংসদকে সচল রাখতে এবং জনগণের চাওয়া-পাওয়ার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করতে তারা গঠনমূলক ভূমিকা পালন করবেন। সরকারের সঠিক পদক্ষেপে সমর্থন এবং ভুল সিদ্ধান্তে পরামর্শ দেওয়ার যে অঙ্গীকার তিনি করেছেন, তা সংসদীয় গণতন্ত্রের জন্য একটি ইতিবাচক দিক। একইসঙ্গে তিনি ২০১৩ সালের রাজনৈতিক সহিংসতা এবং জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার বিপ্লবের শহীদদের স্মরণ করে একটি মর্যাদাবান ও ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের ওপর জোর দেন।

তবে এই সৌজন্য ও সৌহার্দ্যের আবহের সমান্তরালে কিছু সাংবিধানিক ও আইনি চ্যালেঞ্জও উঁকি দিচ্ছে। আগামী ১২ মার্চ জাতীয় সংসদের অধিবেশন আহ্বান করা হয়েছে, যেখানে ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়ন নিয়ে বড় ধরনের বিতর্কের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় প্রস্তাবিত এই সনদ এবং সংবিধান সংস্কার কমিশনের অধীনে সংসদ সদস্যদের অতিরিক্ত শপথ গ্রহণের বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক ও আইনি মহলে দ্বিমত রয়েছে। বিএনপির পক্ষ থেকে একে সংবিধান-বহির্ভূত বলা হলেও সংস্কারপন্থীরা একে জনসার্বভৌমত্বের প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ এখন ‘বিপ্লব-পরবর্তী সাংবিধানিক রূপান্তরের’ মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে যেমন সংসদীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষার দায় রয়েছে, অন্যদিকে তেমনি গণভোট বা জনমতের ভিত্তিতে আসা সংস্কারের দাবিকেও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। এই দুইয়ের মধ্যে সমন্বয় সাধনই হবে বর্তমান সরকার ও সংসদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। রাজনীতিতে বর্তমান যে সৌজন্যের পরিবেশ তৈরি হয়েছে, তা যদি জাতীয় সমস্যা সমাধানে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে, তবেই জুলাই বিপ্লবের প্রকৃত সুফল সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছাবে। সংঘাত আর চরিত্রহননের রাজনীতি পেছনে ফেলে দেশ কি সত্যিই এক নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির দিকে এগোবে—এখন এটাই দেখার অপেক্ষায় পুরো জাতি।