মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি করেছে, যার ঢেউ এসে লেগেছে বাংলাদেশেও। জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা, আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি এবং সামগ্রিক ভূ-রাজনৈতিক সংকট দেশের অর্থনীতিকে এক কঠিন পরীক্ষার মুখে ঠেলে দিয়েছে। বিশেষ করে জ্বালানি নিরাপত্তা, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ব্যবস্থাপনা এবং সুদের হার নির্ধারণ – এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে সঠিক নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এখন অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি: সমাধান না দ্বৈত মুদ্রাস্ফীতি?
বাংলাদেশের অর্থনীতি বহুলাংশে আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার ওপর প্রতিষ্ঠিত। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও জ্বালানি সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কায় দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নতুন করে ঝুঁকিতে পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে জ্বালানির দাম বাড়ানো উচিত কিনা, তা নিয়ে দেখা দিয়েছে গভীর বিতর্ক। সাধারণত সরকার ভর্তুকি বৃদ্ধি অথবা মূল্যবৃদ্ধির মাধ্যমে এ ধরনের সংকট মোকাবিলা করে থাকে। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে সরাসরি মূল্যবৃদ্ধি ‘দ্বৈত মুদ্রাস্ফীতির ফাঁদ’ তৈরি করতে পারে। একদিকে, জ্বালানির দাম বাড়লে উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়, যা ‘কস্ট-পুশ ইনফ্লেশন’ বা উৎপাদন-ব্যয়জনিত মূল্যস্ফীতি ঘটায়। অন্যদিকে, জ্বালানি সরবরাহ ঘাটতি থাকলে চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় ‘সাপ্লাই শক ইনফ্লেশন’ বা সরবরাহ-ঘাটতিজনিত মূল্যস্ফীতি তৈরি হয়। অর্থাৎ, একই সময়ে মুদ্রাস্ফীতি দুই দিক থেকে আঘাত হানতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধির মাধ্যমে অর্থনীতিতে আকস্মিক ধাক্কা না দিয়ে বরং ‘লক্ষ্যভিত্তিক জ্বালানি মূল্য সংস্কার’ (Targeted Energy Pricing Reform) করা অধিক যুক্তিযুক্ত। এর আওতায় অর্থনীতির লাইফলাইন হিসেবে বিবেচিত অগ্রাধিকার ও গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতে জ্বালানি সরবরাহে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে, যা আপাতদৃষ্টিতে বৈষম্যমূলক মনে হলেও জাতীয় স্বার্থে জরুরি। কম গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু উচ্চ ব্যবহারকারী শিল্প ও বাণিজ্যিক গ্রাহকদের জন্য ধাপে ধাপে উচ্চ ট্যারিফ এবং নিম্ন ও মধ্যবিত্ত গৃহস্থালির জন্য তুলনামূলক কম ট্যারিফ নির্ধারণ করে ধীরে ধীরে দাম বাড়িয়ে জ্বালানি ব্যবহার কমানোর চেষ্টা করা যেতে পারে। একই সঙ্গে, পিক আওয়ারে বেশি দাম ও অফ-পিকে কম দাম নির্ধারণের মতো ‘টাইম-অব-ইউজ প্রাইসিং’ পদ্ধতি চালু এবং অপচয় রোধে জরিমানা আরোপ করা যেতে পারে। মূল লক্ষ্য হলো, অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা না দিয়ে মূল্য সংকেতের মাধ্যমে জ্বালানি সাশ্রয় ও দক্ষ উৎপাদনকে উৎসাহিত করা।
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ব্যবস্থাপনা: কৌশলগত পদক্ষেপ জরুরি
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ যেকোনো দেশের অর্থনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে নিট রিজার্ভ ১৩ বিলিয়ন ডলার থেকে ২৯ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হওয়া একটি উল্লেখযোগ্য সাফল্য ছিল। তবে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে রেমিট্যান্স প্রবাহ কমার আশঙ্কা এবং জ্বালানি আমদানির সম্ভাব্য বৃদ্ধি রিজার্ভের ওপর নতুন করে চাপ সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, রিজার্ভকে কেবল ‘বৈদেশিক মুদ্রা রক্ষার অস্ত্র’ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। সংকটকালে রিজার্ভ ব্যবস্থাপনার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা।
এক্ষেত্রে কয়েকটি কৌশলগত পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি। প্রথমত, ‘জ্বালানি আমদানি অগ্রাধিকার উইন্ডো’ তৈরি করে খাদ্য, কৃষি এবং দক্ষ বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর জন্য প্রাথমিক জ্বালানি আমদানিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, অপ্রয়োজনীয় ও বিলাসবহুল আমদানি সাময়িকভাবে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এক্ষেত্রে শুধু অগ্রাধিকার নয়, এলসি (Letter of Credit) খোলার ক্ষেত্রেও কঠোরতা অবলম্বন করতে হবে। আন্ডার ও ওভার ইনভয়েসিং নিয়ন্ত্রণ এবং এলসি’র গুণগত মান নির্ণয়ে বিভিন্ন ডোমেইনের বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি জাতীয় কমিটি গঠন করা প্রয়োজন। তৃতীয়ত, রেমিট্যান্স প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমতে থাকলে টাকার ধীর অবমূল্যায়ন বা ‘ব্যবস্থাপিত অবমূল্যায়ন’ (managed depreciation) এর জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। এতে রপ্তানি ও রেমিট্যান্স দেশে আনতে উৎসাহ যোগাবে। চতুর্থত, স্পট মার্কেট থেকে নগদ অর্থে জ্বালানি আমদানি কমানোর পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি পেমেন্ট শিডিউল সুবিধায় জ্বালানি কেনার উৎস খুঁজতে হবে, প্রয়োজনে কিছুটা বেশি মূল্য দিয়ে হলেও।
যুদ্ধঝুঁকিতে সুদের হার কমানো: বিনিয়োগ না অর্থ পাচার?
নতুন সরকারের সুদের হার কমানোর ঘোষণা রাজনৈতিক ও ব্যবসায়ী মহলে জনপ্রিয় হলেও অর্থনীতির বাস্তবতা ভিন্ন। সামষ্টিক অর্থনৈতিক তত্ত্ব অনুযায়ী, অনিশ্চয়তার সময়ে বিনিয়োগ সুদের হারের কারণে থমকে যায় না, বরং ঝুঁকির কারণেই তা ব্যাহত হয়। উপরন্তু, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ ঋণখেলাপি ব্যবসায়ীরা কম সুদের ঋণ প্রকৃত বিনিয়োগের জন্য নয়, বরং ‘সহজ অর্থ’ (easy money) পেয়ে লুটপাট ও পাচারের উদ্দেশ্যে চায়।
যুদ্ধকালীন বৈশ্বিক অস্থিরতায় প্রকৃত ব্যবসায়ীরা সাধারণত নতুন বিনিয়োগ স্থগিত করে, ভোগ কমিয়ে নগদ অর্থ সংরক্ষণ বাড়ায় এবং আমদানি ঝুঁকি কমায়। অন্যদিকে, মুদ্রাস্ফীতির হারের কাছাকাছি সুদে সহজ ঋণ পেলে অসৎ ব্যবসায়ীরা ভোগ বাড়ায়, সস্তায় সম্পদ কিনে রাখে এবং প্রয়োজনে বিভিন্ন উপায়ে বিদেশে অর্থ পাচার করে। অতএব, সুদের হার কমালেই বিনিয়োগ বাড়বে, এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়, বরং এতে বেশ কিছু ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এর ফলে অতিরিক্ত তারল্য ব্যাংকের বাইরে চলে যাওয়া, মুদ্রাস্ফীতি বৃদ্ধি, ভুয়া এলসি’র সংখ্যা বৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রা বহির্গমন, আন্ডার ও ওভার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে বৈধ পাচার বেড়ে যেতে পারে। এছাড়া, মন্দায় রাজস্ব সংগ্রহে চাপ সৃষ্টি হয়ে সরকারের ঋণ বাড়বে এবং টাকা ছাপানোর ওপর চাপ তৈরি হবে।
এই পরিস্থিতিতে যুক্তিযুক্ত নীতি হতে পারে সুদের হার দ্রুত না কমিয়ে বরং সতর্ক পদক্ষেপ গ্রহণ করা। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (SME) খাতে উচ্চ মনোযোগ দিতে হবে, তাদের মূলধন ও পরিচালনা ব্যয় কমাতে কাজ করতে হবে যাতে সুদের হার তাদের সক্ষমতার মধ্যে থাকে এবং কর্মসংস্থান বাড়ে। রপ্তানি খাতে সীমিত ও লক্ষ্যভিত্তিক প্রণোদনা অব্যাহত রাখতে হবে। উৎপাদন খাতে ‘টার্গেটেড ক্রেডিট গ্যারান্টি’ এবং প্রয়োজনীয় ব্যাংক এলসি সহজ করে অপ্রয়োজনীয় এলসি বন্ধ বা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন। সামগ্রিকভাবে, একটি সতর্ক মুদ্রানীতি (cautious monetary policy) অনুসরণ করা অত্যাবশ্যক।
নীতিগত সমন্বয়ের গুরুত্ব ও সংকট মোকাবিলায় প্রস্তুতি
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের বর্তমান সংকটটি কেবল এককভাবে জ্বালানি, রিজার্ভ কিংবা সুদের হারে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি নীতিগত সমন্বয়ের (policy relevance) অভাবেরই ফল। দেশ বর্তমানে জ্বালানি আমদানির অনিশ্চয়তা, উচ্চ মুদ্রাস্ফীতির ঝুঁকি এবং রেমিট্যান্স কমে যাওয়ায় সৃষ্ট মুদ্রা ও রিজার্ভ চাপের মতো তিনটি পরস্পর সংযুক্ত সমস্যার মুখোমুখি। এই সমস্যাগুলো বৈশ্বিক বা আঞ্চলিক সংকটে বারবার ফিরে আসবে। তাই জরুরি নীতিগত অগ্রাধিকার তালিকায় একটি টেকসই মডেলের আওতায় জাতীয় পর্যায়ে জ্বালানি চাহিদা কমানোর কর্মসূচি, লক্ষ্যভিত্তিক জ্বালানি মূল্য সংস্কার, রিজার্ভের কৌশলগত ব্যবহার, সতর্ক মুদ্রানীতি (আগেভাগে শিথিল না করে) এবং দ্রুত দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধি ও সবুজ জ্বালানিতে রূপান্তরকে গুরুত্ব দিতে হবে।
সর্বোপরি, বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি কেবল কয়েক বছর পরপর তৈরি হওয়া যুদ্ধ বা মহামারি নয়, বরং ‘অপ্রস্তুত নীতি’ এবং ‘যুদ্ধ ও আঞ্চলিক সংকটের প্রতি ভুল নীতিগত প্রতিক্রিয়া’। সংকটের সময়ে জনপ্রিয় সিদ্ধান্তের পরিবর্তে স্থিতিশীল সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা অপরিহার্য। জ্বালানি নিরাপত্তা, মুদ্রানীতি এবং রাজস্ব নীতি – এই তিনটি যদি সমন্বিতভাবে পরিচালিত হয়, তবে বৈশ্বিক অস্থিরতার মাঝেও অর্থনীতিকে স্থির রাখা সম্ভব। ভুল নীতি দেশকে দুর্বল করে তোলে। নতুন ও অনভিজ্ঞ সরকারের জন্য পরামর্শ হলো, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে প্রকৃত বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে বসে একটি জাতীয় সংকট ব্যবস্থাপনা দল (National Crisis Team) গঠন করা।
রিপোর্টারের নাম 

























