সকালে ঘুম থেকে উঠে ফোন হাতে নেওয়ার পর আপনি কী দেখেন? সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নিউজফিড। ভিডিও রিকমেন্ডেশন। খবরের লিংক। সবই যেন আপনার পছন্দ অনুযায়ী সাজানো। অবাক করার বিষয় হলো এগুলো আপনি বেছে নেননি। বেছে নিয়েছে অ্যালগরিদম। প্রশ্নটা তাই স্বাভাবিক এই অ্যালগরিদম কি শুধু কনটেন্ট সাজাচ্ছে। নাকি ধীরে ধীরে আমাদের চিন্তাভাবনাও প্রভাবিত করছে?
অ্যালগরিদম মূলত একটি গাণিতিক নির্দেশনা, যা ব্যবহারকারীর আচরণ বিশ্লেষণ করে তার সামনে নির্দিষ্ট কনটেন্ট তুলে ধরে। আপনি কী দেখলেন? কতক্ষণ দেখলেন? কোথায় লাইক দিলেন? কোন বিষয়ে কমেন্ট করলেন। এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে প্ল্যাটফর্মগুলো আপনার জন্য আলাদা একটি ডিজিটাল জগৎ তৈরি করে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, YouTube বা Facebook-এর রিকমেন্ডেশন সিস্টেম আপনার আগের আচরণের ওপর ভিত্তি করে ভিডিও ও পোস্ট সাজায়। যাতে আপনি দীর্ঘ সময় প্ল্যাটফর্মে থাকেন।
সমস্যা শুরু হয় যখন এই ব্যক্তিকেন্দ্রিক সাজানো ফিড একটি ‘ইকো চেম্বার’ তৈরি করে। আপনি যদি কোনো নির্দিষ্ট মত বা বিষয়ে আগ্রহ দেখান। অ্যালগরিদম আপনাকে একই ধরনের আরো কনটেন্ট দেখাতে থাকে। ফলে ভিন্নমত বা বিকল্প তথ্য আপনার সামনে কম আসে। ধীরে ধীরে আপনার ডিজিটাল জগৎ সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে একটি নির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গিতে। এতে করে আপনি হয়তো মনে করেন, ‘সবাই তো এভাবেই ভাবছে’ যদিও বাস্তবতা ভিন্ন হতে পারে।
আরো সূক্ষ্ম প্রভাব দেখা যায় আবেগের ক্ষেত্রে। কোন পোস্টে আপনি বেশি সময় থামেন। কোন ভিডিও আপনাকে উত্তেজিত বা ক্ষুব্ধ করে। অ্যালগরিদম সেটিও নোট করে। গবেষণায় দেখা গেছে, তীব্র আবেগ সৃষ্টি করে এমন কনটেন্ট বেশি শেয়ার ও এনগেজমেন্ট পায়। ফলে অ্যালগরিদম স্বাভাবিকভাবেই এমন কনটেন্টকে অগ্রাধিকার দেয়। এতে ধীরে ধীরে তথ্যের চেয়ে আবেগনির্ভর প্রতিক্রিয়াই বেশি গুরুত্ব পায়, যা জনমত গঠনে প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে এটাও সত্য, অ্যালগরিদম একতরফা নিয়ন্ত্রণকারী কোনো ‘অদৃশ্য শাসক’ নয়। এটি ব্যবহারকারীর আচরণের প্রতিফলন। আপনি যদি সচেতনভাবে বিভিন্ন উৎস থেকে তথ্য নেন। ভিন্নমত পড়েন এবং সমালোচনামূলকভাবে চিন্তা করেন। তাহলে অ্যালগরিদমের প্রভাব অনেকটাই কমে যায়। সমস্যা হয় তখনই, যখন ব্যবহারকারী নিজের পছন্দের গণ্ডি ভাঙতে চান না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডিজিটাল সাক্ষরতা এখন সময়ের দাবি। অ্যালগরিদম কীভাবে কাজ করে তা জানা। নিজের ফিড কাস্টমাইজ করা। অপ্রয়োজনীয় রিকমেন্ডেশন বন্ধ রাখা এবং ব্যবহারে সচেতন হওয়া। এই অভ্যাসগুলো গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে প্ল্যাটফর্মগুলোর স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিও জরুরি। যাতে ব্যবহারকারী বুঝতে পারেন, কোন যুক্তিতে তার সামনে কনটেন্ট আসছে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, অ্যালগরিদম আমাদের চিন্তাভাবনাকে সরাসরি নিয়ন্ত্রণ না করলেও প্রভাবিত করতে পারে। বিশেষ করে, যখন আমরা অচেতনভাবে তা গ্রহণ করি। তাই প্রযুক্তিকে দোষারোপের আগে প্রয়োজন নিজের সচেতনতা বাড়ানো। কারণ শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এখনো মানুষের হাতেই আছে, অ্যালগরিদমের নয়।
রিপোর্টারের নাম 




















