ঢাকা ১১:৩০ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ০২ মার্চ ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার মুখে সরকার: শ্রমিক নিরাপত্তা ও জ্বালানি মজুত নিশ্চিতকরণে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতি বাংলাদেশের জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনার পারদ চড়তে থাকায় আরব দেশগুলোসহ হরমুজ প্রণালীর মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যে বসবাসরত লক্ষ লক্ষ বাংলাদেশি নাগরিকের নিরাপত্তা এবং দেশের জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে জরুরি করণীয় নির্ধারণে সরকার উচ্চপর্যায়ের এক বৈঠক করেছে।

বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর মন্ত্রী এবং গুরুত্বপূর্ণ বিভাগগুলোর প্রধানদের সঙ্গে পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেন। তিনি সংকট ঘনীভূত হওয়ার আগেই পর্যাপ্ত প্রস্তুতি গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দেন। বিশেষ করে, দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা মধ্যপ্রাচ্যের প্রবাসী শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে, জ্বালানি নিরাপত্তা সুসংহত রাখা এবং যেকোনো সম্ভাব্য পরিস্থিতি মোকাবিলায় মন্ত্রণালয় ও দপ্তরগুলোকে সক্রিয় ভূমিকা পালনের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

জ্বালানি সরবরাহ ও মজুতের চিত্র:

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত যদি অল্প সময়ের মধ্যে প্রশমিত হয়, তবে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে তাৎক্ষণিক বড় কোনো সংকট দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা কম। তবে, যুদ্ধ দীর্ঘমেয়াদি রূপ নিলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির সরবরাহ ব্যাহত হতে পারে, যা বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য উদ্বেগের কারণ হবে। এই সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রী বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী এবং অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করেন।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী বলেছেন, “যুদ্ধ পরিস্থিতি সবসময়ই একটি দুশ্চিন্তার কারণ। আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করব আমাদের জ্বালানি খাতসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য খাতগুলোকে নিরাপদ রাখতে। প্রধানমন্ত্রী আমাদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য নিয়েছেন এবং করণীয় সম্পর্কে নির্দেশনাও দিয়েছেন। আমরা সম্মিলিতভাবে কাজ করছি এবং আশা করি পরিস্থিতি সামাল দিতে পারব।”

এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর একজন উপদেষ্টা সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, “বর্তমানে আমাদের কাছে যে পরিমাণ জ্বালানির মজুত রয়েছে, তাতে তাৎক্ষণিক কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়। অতীতেও জ্বালানি খাতে কিছু ওঠানামা দেখা গেছে, তবে সেগুলো মোকাবিলায় আমাদের প্রস্তুতি রয়েছে। আতঙ্কিত হওয়ার মতো কোনো কারণ নেই।”

হরমুজ প্রণালি বন্ধ হলে প্রভাব ও প্রস্তুতি:

জ্বালানি বিভাগের সূত্রমতে, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পর বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী পেট্রোবাংলা ও বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। বিপিসির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, দেশীয় উৎস থেকে গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় বর্তমানে আমদানি করা গ্যাসের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় এলএনজির একটি বড় অংশ হরমুজ প্রণালি হয়ে আসে, যা বিশ্বব্যাপী তেল ও গ্যাস পরিবহনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ।

তবে, কর্মকর্তাদের মতে, বাংলাদেশের জ্বালানি তেল আমদানির চুক্তিগুলো সাধারণত ছয় মাস মেয়াদি হয়ে থাকে। বর্তমান চুক্তি অনুযায়ী আগামী জুন মাস পর্যন্ত জ্বালানি তেলের সরবরাহ নিশ্চিত রয়েছে। চীন, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও ইন্দোনেশিয়া থেকে এই জ্বালানি আমদানি করা হবে। ফলে, হরমুজ প্রণালি বন্ধ হলেও বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তায় বড় ধরনের সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা কম।

বর্তমানে দেশে পরিশোধিত জ্বালানি তেলের প্রায় ৪৫ দিনের মজুত রয়েছে। এছাড়াও, কিছু জাহাজ বন্দরে খালাসের অপেক্ষায় রয়েছে এবং আরও কিছু জাহাজ পথে রয়েছে, যা আগামী ২৫ দিনের জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করবে। সব মিলিয়ে, দেশের জ্বালানি মজুত পরিস্থিতি আপাতত স্থিতিশীল রয়েছে।

তবে, যুদ্ধ দীর্ঘমেয়াদি হলে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে অপরিশোধিত (ক্রুড) তেল আমদানিতে প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন পেট্রোবাংলা ও বিপিসির কর্মকর্তারা। তারা জানান, পরিশোধিত জ্বালানি তেল যে দেশগুলো থেকে আমদানি করা হয়, সে অঞ্চলগুলো এখনো তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল। অপরিশোধিত তেল আমদানির ক্ষেত্রে সম্ভাব্য সমস্যা মোকাবিলায় বিকল্প উৎস অনুসন্ধানের বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা চলছে।

প্রবাসীদের নিরাপত্তা ও সার্বিক তদারকি:

মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে কর্মরত লক্ষ লক্ষ বাংলাদেশি নাগরিক দেশের অর্থনীতিতে রেমিট্যান্সের মাধ্যমে বড় অবদান রাখছেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়কে এই শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং তাদের সুবিধা-অসুবিধা তদারকির জন্য বিশেষ নির্দেশনা দিয়েছেন।

রবিবার সকালে সচিবালয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গে এক বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির জানান, প্রধানমন্ত্রী মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশিদের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে খোঁজখবর নিয়েছেন এবং প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়েছেন। এই সংঘাতের কারণে মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক ফ্লাইট বাতিলসহ বিভিন্ন বিষয় বৈঠকে আলোচিত হয়েছে।

উপদেষ্টা আরও বলেন, “বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হলে তার প্রভাব অন্যান্য দেশগুলোতেও পড়ে, আমরাও এর ব্যতিক্রম নই। আমরা কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে এই সংঘাতের সমাধান চাই।”

তিনি উল্লেখ করেন যে, ভৌগোলিক-রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অনেক নাগরিক মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত রয়েছেন এবং তাদের কর্মসংস্থান সেখানে নির্ভরশীল। “মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের নিরাপত্তাই আমাদের প্রধান অগ্রাধিকার। দেশের অভ্যন্তরে এবং বিদেশে অবস্থানরত নাগরিকদের যাতে কোনো দুর্ভোগে পড়তে না হয়, সে জন্য আমরা সমন্বিতভাবে কাজ করছি। প্রয়োজনে ভিসার মেয়াদ বৃদ্ধি এবং অন্যান্য সহায়তা প্রদানের জন্য আমরা সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর কূটনৈতিক প্রতিনিধিদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছি।”

এদিকে, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আটকে পড়া যাত্রীদের পরিস্থিতিও প্রধানমন্ত্রী সার্বক্ষণিক তদারকি করছেন বলে জানিয়েছেন অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন। বিমানমন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী বিমানবন্দরে উপস্থিত থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন এবং প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রীও এই কাজে সার্বক্ষণিক নিয়োজিত রয়েছেন।

রেমিট্যান্স ও অর্থনীতির ওপর প্রভাবের শঙ্কা:

মধ্যপ্রাচ্য বাংলাদেশের রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয়ের একটি প্রধান উৎস। দেশের মোট রেমিট্যান্সের প্রায় অর্ধেক এই অঞ্চল থেকে আসে। গত অর্থবছরে সাড়ে ১৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি রেমিট্যান্স এসেছিল, যেখানে মধ্যপ্রাচ্যে প্রায় ১০ লাখ বাংলাদেশি কর্মরত রয়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের হামলার পর ইরানের পাল্টা জবাব এবং এর প্রভাবে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে উদ্ভূত পরিস্থিতি প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, এই সংঘাতের ফলে দেশের রেমিট্যান্সে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক (এমটিবি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, “মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত অনেক বাংলাদেশি দৈনিক ভিত্তিতে কাজ করেন। সংঘাতের পর তাদের কাজের সুযোগ সীমিত হয়ে যেতে পারে, যা সরাসরি রেমিট্যান্সে প্রভাব ফেলবে। শুধু রেমিট্যান্স নয়, তেল আমদানির ক্ষেত্রেও বড় ধরনের প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে, কারণ হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে গেলে তেল আমদানি ব্যয় বাড়বে এবং তা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে।”

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

ইরান-ইসরাইল সংঘাত: ইসরাইলের দাবি, আকাশপথে ২০০০টির বেশি বোমা বর্ষণ

মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার মুখে সরকার: শ্রমিক নিরাপত্তা ও জ্বালানি মজুত নিশ্চিতকরণে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক

আপডেট সময় : ০৯:৪৫:৩৪ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২ মার্চ ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতি বাংলাদেশের জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনার পারদ চড়তে থাকায় আরব দেশগুলোসহ হরমুজ প্রণালীর মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যে বসবাসরত লক্ষ লক্ষ বাংলাদেশি নাগরিকের নিরাপত্তা এবং দেশের জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে জরুরি করণীয় নির্ধারণে সরকার উচ্চপর্যায়ের এক বৈঠক করেছে।

বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর মন্ত্রী এবং গুরুত্বপূর্ণ বিভাগগুলোর প্রধানদের সঙ্গে পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেন। তিনি সংকট ঘনীভূত হওয়ার আগেই পর্যাপ্ত প্রস্তুতি গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দেন। বিশেষ করে, দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা মধ্যপ্রাচ্যের প্রবাসী শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে, জ্বালানি নিরাপত্তা সুসংহত রাখা এবং যেকোনো সম্ভাব্য পরিস্থিতি মোকাবিলায় মন্ত্রণালয় ও দপ্তরগুলোকে সক্রিয় ভূমিকা পালনের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

জ্বালানি সরবরাহ ও মজুতের চিত্র:

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত যদি অল্প সময়ের মধ্যে প্রশমিত হয়, তবে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে তাৎক্ষণিক বড় কোনো সংকট দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা কম। তবে, যুদ্ধ দীর্ঘমেয়াদি রূপ নিলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির সরবরাহ ব্যাহত হতে পারে, যা বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য উদ্বেগের কারণ হবে। এই সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রী বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী এবং অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করেন।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী বলেছেন, “যুদ্ধ পরিস্থিতি সবসময়ই একটি দুশ্চিন্তার কারণ। আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করব আমাদের জ্বালানি খাতসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য খাতগুলোকে নিরাপদ রাখতে। প্রধানমন্ত্রী আমাদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য নিয়েছেন এবং করণীয় সম্পর্কে নির্দেশনাও দিয়েছেন। আমরা সম্মিলিতভাবে কাজ করছি এবং আশা করি পরিস্থিতি সামাল দিতে পারব।”

এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর একজন উপদেষ্টা সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, “বর্তমানে আমাদের কাছে যে পরিমাণ জ্বালানির মজুত রয়েছে, তাতে তাৎক্ষণিক কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়। অতীতেও জ্বালানি খাতে কিছু ওঠানামা দেখা গেছে, তবে সেগুলো মোকাবিলায় আমাদের প্রস্তুতি রয়েছে। আতঙ্কিত হওয়ার মতো কোনো কারণ নেই।”

হরমুজ প্রণালি বন্ধ হলে প্রভাব ও প্রস্তুতি:

জ্বালানি বিভাগের সূত্রমতে, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পর বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী পেট্রোবাংলা ও বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। বিপিসির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, দেশীয় উৎস থেকে গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় বর্তমানে আমদানি করা গ্যাসের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় এলএনজির একটি বড় অংশ হরমুজ প্রণালি হয়ে আসে, যা বিশ্বব্যাপী তেল ও গ্যাস পরিবহনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ।

তবে, কর্মকর্তাদের মতে, বাংলাদেশের জ্বালানি তেল আমদানির চুক্তিগুলো সাধারণত ছয় মাস মেয়াদি হয়ে থাকে। বর্তমান চুক্তি অনুযায়ী আগামী জুন মাস পর্যন্ত জ্বালানি তেলের সরবরাহ নিশ্চিত রয়েছে। চীন, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও ইন্দোনেশিয়া থেকে এই জ্বালানি আমদানি করা হবে। ফলে, হরমুজ প্রণালি বন্ধ হলেও বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তায় বড় ধরনের সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা কম।

বর্তমানে দেশে পরিশোধিত জ্বালানি তেলের প্রায় ৪৫ দিনের মজুত রয়েছে। এছাড়াও, কিছু জাহাজ বন্দরে খালাসের অপেক্ষায় রয়েছে এবং আরও কিছু জাহাজ পথে রয়েছে, যা আগামী ২৫ দিনের জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করবে। সব মিলিয়ে, দেশের জ্বালানি মজুত পরিস্থিতি আপাতত স্থিতিশীল রয়েছে।

তবে, যুদ্ধ দীর্ঘমেয়াদি হলে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে অপরিশোধিত (ক্রুড) তেল আমদানিতে প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন পেট্রোবাংলা ও বিপিসির কর্মকর্তারা। তারা জানান, পরিশোধিত জ্বালানি তেল যে দেশগুলো থেকে আমদানি করা হয়, সে অঞ্চলগুলো এখনো তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল। অপরিশোধিত তেল আমদানির ক্ষেত্রে সম্ভাব্য সমস্যা মোকাবিলায় বিকল্প উৎস অনুসন্ধানের বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা চলছে।

প্রবাসীদের নিরাপত্তা ও সার্বিক তদারকি:

মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে কর্মরত লক্ষ লক্ষ বাংলাদেশি নাগরিক দেশের অর্থনীতিতে রেমিট্যান্সের মাধ্যমে বড় অবদান রাখছেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়কে এই শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং তাদের সুবিধা-অসুবিধা তদারকির জন্য বিশেষ নির্দেশনা দিয়েছেন।

রবিবার সকালে সচিবালয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গে এক বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির জানান, প্রধানমন্ত্রী মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশিদের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে খোঁজখবর নিয়েছেন এবং প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়েছেন। এই সংঘাতের কারণে মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক ফ্লাইট বাতিলসহ বিভিন্ন বিষয় বৈঠকে আলোচিত হয়েছে।

উপদেষ্টা আরও বলেন, “বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হলে তার প্রভাব অন্যান্য দেশগুলোতেও পড়ে, আমরাও এর ব্যতিক্রম নই। আমরা কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে এই সংঘাতের সমাধান চাই।”

তিনি উল্লেখ করেন যে, ভৌগোলিক-রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অনেক নাগরিক মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত রয়েছেন এবং তাদের কর্মসংস্থান সেখানে নির্ভরশীল। “মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের নিরাপত্তাই আমাদের প্রধান অগ্রাধিকার। দেশের অভ্যন্তরে এবং বিদেশে অবস্থানরত নাগরিকদের যাতে কোনো দুর্ভোগে পড়তে না হয়, সে জন্য আমরা সমন্বিতভাবে কাজ করছি। প্রয়োজনে ভিসার মেয়াদ বৃদ্ধি এবং অন্যান্য সহায়তা প্রদানের জন্য আমরা সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর কূটনৈতিক প্রতিনিধিদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছি।”

এদিকে, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আটকে পড়া যাত্রীদের পরিস্থিতিও প্রধানমন্ত্রী সার্বক্ষণিক তদারকি করছেন বলে জানিয়েছেন অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন। বিমানমন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী বিমানবন্দরে উপস্থিত থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন এবং প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রীও এই কাজে সার্বক্ষণিক নিয়োজিত রয়েছেন।

রেমিট্যান্স ও অর্থনীতির ওপর প্রভাবের শঙ্কা:

মধ্যপ্রাচ্য বাংলাদেশের রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয়ের একটি প্রধান উৎস। দেশের মোট রেমিট্যান্সের প্রায় অর্ধেক এই অঞ্চল থেকে আসে। গত অর্থবছরে সাড়ে ১৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি রেমিট্যান্স এসেছিল, যেখানে মধ্যপ্রাচ্যে প্রায় ১০ লাখ বাংলাদেশি কর্মরত রয়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের হামলার পর ইরানের পাল্টা জবাব এবং এর প্রভাবে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে উদ্ভূত পরিস্থিতি প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, এই সংঘাতের ফলে দেশের রেমিট্যান্সে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক (এমটিবি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, “মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত অনেক বাংলাদেশি দৈনিক ভিত্তিতে কাজ করেন। সংঘাতের পর তাদের কাজের সুযোগ সীমিত হয়ে যেতে পারে, যা সরাসরি রেমিট্যান্সে প্রভাব ফেলবে। শুধু রেমিট্যান্স নয়, তেল আমদানির ক্ষেত্রেও বড় ধরনের প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে, কারণ হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে গেলে তেল আমদানি ব্যয় বাড়বে এবং তা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে।”