ঢাকা ১১:১২ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ০২ মার্চ ২০২৬

বিশ্বজুড়ে বিভেদ ও সংঘাতের নতুন অধ্যায়: ট্রাম্পের নীতি ও তার প্রভাব

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এক নতুন মেরুকরণের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, যেখানে শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো দুর্বল দেশগুলোর ওপর তাদের প্রভাব বিস্তারে বেপরোয়া হয়ে উঠছে। সম্প্রতি ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলা এবং দেশটির শীর্ষ নেতাদের হত্যাকাণ্ডের ঘটনা এই বিভেদকে আরও স্পষ্ট করেছে। এই ঘটনাগুলো ‘জোর যার মুল্লুক তার’ নীতিকেই চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠা করেছে বলে অনেকেই মনে করছেন। এই আগ্রাসনের ফলে বিশ্বের ছোট ও দুর্বল রাষ্ট্রগুলোর স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং নিরাপত্তা আরও বেশি হুমকির মুখে পড়েছে। এই ঘটনাগুলো বিশ্বকে যেন ষোড়শ শতাব্দীর ঔপনিবেশিক যুগে ফিরিয়ে নিয়ে গেছে, যখন শক্তিশালী ইউরোপীয় দেশগুলো কেবল সামরিক শক্তির ওপর নির্ভর করে এশিয়া, আফ্রিকা এবং লাতিন আমেরিকার মতো অঞ্চলগুলো দখল করে নিত।

ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয়বার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর নিজেকে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে একজন ব্যতিক্রমী এবং শান্তিপ্রিয় নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেছিলেন। তবে, শান্তির মুখোশের আড়ালে তিনি বিশ্বকে একের পর এক সংঘাত উপহার দিয়েছেন। ইরানের ওপর হামলাকেও তিনি শান্তি প্রতিষ্ঠা হিসেবে আখ্যায়িত করে বিশ্ববাসীর সামনে এক ধরনের পরিহাস করছেন। তার নির্বাচনী প্রচারণার সময় তিনি ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি আজও পূরণ হয়নি। বরং, তার শাসনামলে গাজায় ইসরাইলের আগ্রাসন ও গণহত্যা বিশ্ববাসী দেখেছে। যদিও গত বছর জুন মাসে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি ইরানে হামলা চালিয়েছিল, এবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যৌথভাবে এই হামলা চালিয়েছে। এর আগে, জানুয়ারি মাসে ডোনাল্ড ট্রাম্প ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে ক্ষমতাচ্যুত করার অভিযান চালান এবং কিউবাকেও একই পরিণতি বরণের হুমকি দেন। গ্রিনল্যান্ড দখলের ঘোষণাও তিনি দিয়েছিলেন। এসব ঘটনা তার নিজেকে শান্তিকামী হিসেবে উপস্থাপনের দাবির সম্পূর্ণ বিপরীত।

প্রকাশিত তথ্য অনুসারে, ইসরাইলের কাছে শতাধিক পারমাণবিক বোমা রয়েছে, যা তারা নিজেরাই তৈরি করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যৌথভাবে ঘোষণা করেছে যে তারা ইরানকে কোনো অবস্থাতেই পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী হতে দেবে না এবং প্রয়োজনে এর জন্য হামলা চালাবে। সর্বশেষ জুন মাসের হামলা এর প্রমাণ। এবার ইসরাইল আরও এক নতুন দাবি উত্থাপন করেছে: ইরানের কাছে এমন কোনো ক্ষেপণাস্ত্র থাকা চলবে না, যা ইসরাইলে হামলা চালাতে সক্ষম। বিশেষ করে, ইরানের ব্যালাস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করতে হবে। ইসরাইলের লক্ষ্য হলো, ইসরাইলের নিরাপত্তার জন্য হুমকি কোনো শক্তির অস্তিত্ব তাদের পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে না রাখা এবং সামরিকভাবে মধ্যপ্রাচ্যের অন্য কোনো দেশ যাতে ইসরাইলের চেয়ে শক্তিশালী না হয়।

এই দাবি আদায়ের জন্য ইসরাইল ট্রাম্প প্রশাসনে ব্যাপক লবিং শুরু করে। জুন মাসের হামলার পর ট্রাম্প প্রশাসন পুনরায় ইরানে হামলার ব্যাপারে দ্বিধাগ্রস্ত ছিল। কিন্তু নেতানিয়াহু প্রশাসন ক্রমাগত ট্রাম্প প্রশাসনকে বোঝাতে থাকে যে ইরানের ব্যালাস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি তাদের নিরাপত্তার জন্য একটি বড় হুমকি এবং এটি বন্ধ করতেই হবে।

হামাস-ইসরাইল যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে, হামাসের পাশাপাশি লেবাননে ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনের হুতি আর্মি এবং ইরাকভিত্তিক ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়া বাহিনীগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে। সিরিয়া থেকেও ইরানকে বিদায় নিতে হয়। এই পরিস্থিতিতে ইরান ঐতিহাসিক এক দুর্বল অবস্থানে এসে দাঁড়ায়। প্রকাশিত খবর অনুসারে, নেতানিয়াহু সরকার এই সুযোগটি কাজে লাগানোর পরিকল্পনা গ্রহণ করে। ইরানের শাসনব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা এবং একই সাথে দেশটির সমস্ত অস্ত্র সক্ষমতা ধ্বংস করার লক্ষ্যে ইসরাইল অগ্রসর হয়।

গত ডিসেম্বর মাসে নেতানিয়াহু যুক্তরাষ্ট্রে যান এবং ফ্লোরিডার মার-এ-লাগোতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে একান্ত বৈঠক করেন। সেখানে তিনি ট্রাম্পের কাছে তার ইরান বিষয়ক পরিকল্পনা তুলে ধরেন। ইরানের ব্যালাস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কীভাবে ইসরাইলের নিরাপত্তার জন্য হুমকি, তা বোঝানোর পাশাপাশি তিনি ট্রাম্পকে বোঝাতে সক্ষম হন যে ইরান এখনো পারমাণবিক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। জুন মাসের হামলায় ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও তা পুরোপুরি ধ্বংস হয়নি। তাই ইরানে অবিলম্বে পুনরায় হামলা চালানোর প্রয়োজনীয়তার কথা তিনি তুলে ধরেন। ২৯ ডিসেম্বর এই বৈঠকের পর ডোনাল্ড ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা জানতে পেরেছি ইরান এখনো পারমাণবিক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।’

ডিসেম্বরে মার-এ-লাগোতে বৈঠকের পর ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার ইরানকে পারমাণবিক কার্যক্রম বন্ধ করার এবং হামলার হুমকি দিতে থাকেন। একই সঙ্গে ইরানে হামলার লক্ষ্যে ব্যাপক সামরিক আয়োজন চলতে থাকে। হামলার আগে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি করে পারমাণবিক বোমা কার্যক্রম বন্ধ করার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তির জন্য। শেষ পর্যন্ত গত মাসে ওমানে আলোচনা শুরু হয়। তবে, যুক্তরাষ্ট্র আলোচনার টেবিলে ইরানের সামনে যেসব শর্ত হাজির করে, তা মূলত ইসরাইলের দাবিকেই প্রতিফলিত করে। এতে বলা হয়, ইরানের কাছে পারমাণবিক বোমা সহ ব্যালাস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র থাকতে পারবে না। ইরান জানায়, অবরোধ তুলে নিলে তারা ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সীমিত পর্যায়ে নামিয়ে আনতে রাজি; কিন্তু ব্যালাস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি কোনো অবস্থাতেই পরিত্যাগ করবে না। এই পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের দাবি ছিল স্পষ্ট: ইরানকে সম্পূর্ণরূপে আত্মসমর্পণ করে বলতে হবে যে তারা পারমাণবিক কার্যক্রম বন্ধ করবে। চুক্তি অথবা হামলা – যেকোনো একটি বেছে নিতে হবে ইরানকে। কিন্তু ইরান তা প্রত্যাখ্যান করায় শনিবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল হামলা শুরু করে। বস্তুত, এই আলোচনা ছিল কেবল সময়ক্ষেপণের একটি অজুহাত।

ইরানের পারমাণবিক ও ব্যালাস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ধ্বংস করার পাশাপাশি, এবারের হামলার আরেকটি লক্ষ্য হলো ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের ধারাবাহিক সরকারকে উৎখাত করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের অনুগত কাউকে ক্ষমতায় বসানো। ইরানে হামলা শুরুর পর ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের সমস্ত অস্ত্র ধ্বংস না হওয়া পর্যন্ত হামলা চলবে।

ইরান বারবার বলেছে যে তারা পারমাণবিক অস্ত্রের মতো ব্যাপক বিধ্বংসী মারণাস্ত্র নির্মাণ ও ব্যবহারের সম্পূর্ণ বিরোধী। তারা এ ধরনের কোনো অস্ত্র তৈরি বা মজুত রাখাকে সমর্থন করে না। এই বিষয়ে ইরানের বিপ্লবী নেতা ইমাম খোমেনির ফতোয়া রয়েছে। ইরান জানায়, তাদের পারমাণবিক গবেষণার একমাত্র লক্ষ্য হলো বেসামরিক বিদ্যুৎ উৎপাদন। ২০১৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রসহ ছয়টি দেশের সঙ্গে স্বাক্ষরিত ‘ইরান-ছয়জাতি চুক্তি’ এর প্রমাণ। এই চুক্তির মাধ্যমে ইরান তার পারমাণবিক গবেষণাগারে ২৪ ঘণ্টা ক্যামেরা চালু রাখা এবং জাতিসংঘের পর্যবেক্ষকদের পরিদর্শনের অনুমতি দেওয়ার বিনিময়ে নিষেধাজ্ঞা থেকে মুক্তি পেয়েছিল। কিন্তু এই চুক্তির পর ইসরাইল উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠে, কারণ তারা দেখতে পায় ইরান অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হচ্ছে। ইসরাইল মনে করে, অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী ইরান তাদের জন্য হুমকি। তাই তারা চুক্তিটি বাতিলের জন্য উঠেপড়ে লাগে। ২০১৬ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে ইসরাইল তাকে দিয়ে ২০১৮ সালে এই চুক্তি বাতিল করাতে সক্ষম হয় এবং ইরানের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। কিন্তু তারপরও ইসরাইল ইরানের কাছ থেকে নিরাপদ বোধ করেনি। কারণ, লেবানন ও সিরিয়াজুড়ে হিজবুল্লাহ, ইরাকের শিয়া মিলিশিয়া বাহিনী, ইয়েমেনে হুতি মিলিশিয়া বাহিনী এবং গাজার হামাস ইসরাইলের জন্য বড় ধরনের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অবশেষে, ইসরাইলে হামাসের হামলার সুযোগে ইসরাইল সর্বশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে হামাস, হিজবুল্লাহ, হুতি সহ ইরানের সমস্ত মিলিশিয়া বাহিনীকে চিরতরে ধ্বংস করার লক্ষ্যে। যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় তারা এটি করতে সক্ষম হয়েছে। হামাস, হিজবুল্লাহ সহ সমস্ত মিলিশিয়া বাহিনী ধ্বংসের পর, ইসরাইলের পরবর্তী লক্ষ্য হলো ইরানকে একটি অনুগত ও নামমাত্র রাষ্ট্রে পরিণত করে বৃহত্তর ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথে এগিয়ে যাওয়া। একই সাথে, ইরান হামলার মাধ্যমে আসন্ন নির্বাচনে জয়ী হওয়ার রাস্তাও পরিষ্কার করতে চান নেতানিয়াহু। ইমাম খামেনি সহ শীর্ষ জেনারেলদের হত্যার মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে অনেকখানি এগিয়ে গেলেন।

ডোনাল্ড ট্রাম্প চেয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে একজন অনন্যসাধারণ প্রেসিডেন্ট হিসেবে তার নাম লিখিত থাকুক। তিনি এমন কিছু করতে চেয়েছিলেন, যা ‘ট্রাম্প-পরবর্তী যুগ’ হিসেবে পরিচিত হবে। এই লক্ষ্যে তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বব্যাপী যুদ্ধ থেকে বের করে আনার এবং সারা বিশ্ব থেকে মার্কিন ঘাঁটি গুটিয়ে নেওয়ার কথা বারবার ঘোষণা করেন। নিজেকে তিনি যুদ্ধবিরোধী ও শান্তিপ্রিয় প্রেসিডেন্ট হিসেবে উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন, তিনি যা করবেন তা অতীতে যুক্তরাষ্ট্রের আর কোনো প্রেসিডেন্ট করেনি। তিনি ভারত-পাকিস্তান সহ আটটি যুদ্ধ বন্ধের কৃতিত্বের দাবি করেছেন এবং একটি নোবেল পুরস্কার পাওয়ার প্রবল আকাঙ্ক্ষা পোষণ করতেন।

ট্রাম্প শুরু থেকেই নিজেকে যুদ্ধবিরোধী হিসেবে প্রমাণের চেষ্টা করলেও, ক্ষমতার চেয়ারে বসার পরপরই তিনি বিশ্বব্যাপী যে শুল্কযুদ্ধ শুরু করেন, তা বিশ্বের অর্থনীতিকে তছনছ করে দিতে থাকে। তার এই বাণিজ্য যুদ্ধ চীনের সঙ্গে সরাসরি সংঘাত পরিস্থিতি সৃষ্টি করে এবং বিশ্ব অর্থনীতি ও বিশ্বব্যবস্থাকে ওলট-পালট করে দেয়।

এরপর ভেনিজুয়েলায় এবং সর্বশেষ ইরানে সরাসরি আগ্রাসনের ফলে জাতিসংঘের অধীনে নামেমাত্র যে রুলস-বেজড বিশ্বব্যবস্থা ছিল, তা সম্পূর্ণরূপে ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। যেকোনো অজুহাতে কোনো শক্তিশালী রাষ্ট্র যদি কোনো দুর্বল রাষ্ট্রের ওপর এভাবে হামলা ও আগ্রাসন চালায় এবং দখল করে নেয়, তবে তার প্রতিকার পাওয়ার আর কোনো আশ্রয় বিশ্বে নেই।

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি শাহাদাত বরণ করেছেন। ১৯৮১ থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত তিনি ইরানের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। ১৯৮৯ সালে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ আল খোমেনির ইন্তেকালের পর তিনি দেশটির সুপ্রিম নেতা নির্বাচিত হন এবং ইসলামি বিপ্লবের হাল ধরেন। শুধু ইরান নয়, পুরো মুসলিম বিশ্বে তার গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নাতীত ছিল। দেশের স্বার্থের বিরুদ্ধে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমাদের কোনো চাপ ও হুমকির মুখে তিনি কখনো নতিস্বীকার করেননি। তার মতো একজন নেতাকে হত্যার পর ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, তিনি ছিলেন এই শতাব্দীর অন্যতম শয়তান। ইরান আগ্রাসনের পর এখন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে ১৯৭৯ সালের ইরানের মহান ইসলামি বিপ্লবের ভবিষ্যৎ নিয়ে। ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের আগ্রাসন, ইরানের সর্বোচ্চ নেতাকে হত্যা এবং তার সম্পর্কে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মন্তব্য বিশ্বজুড়ে অগণিত মুসলমানদের হৃদয়ে কেবল রক্তক্ষরণ নয়, বরং তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের এই আগ্রাসন কোনো অবস্থাতেই মেনে নেওয়ার মতো নয়। শুধু মুসলিম বিশ্ব নয়, বরং বিশ্বকে আজ এর বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়ে সোচ্চার ভূমিকা পালন করা উচিত। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো, ব্রিটেন, জার্মানি ও ফ্রান্স একটি যৌথ বিবৃতিতে আক্রান্ত ইরানের নিন্দা করছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের নয়। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, কাতার, কুয়েত সহ আরও কয়েকটি আরব দেশ ইরানের নিন্দা ও প্রতিবাদ করেছে। তারা ইরানের নিন্দা করেছে বিভিন্ন আরব দেশে অবস্থিত সৌদি ঘাঁটিতে ইরানের হামলার জন্য। আমেরিকান ঘাঁটিতে হামলাকে তারা ওইসব দেশের বিরুদ্ধে ইরানের হামলা হিসেবে আখ্যায়িত করেছে, যা দুর্ভাগ্য ছাড়া আর কিছু নয়। অথচ এসব আরব দেশ সহ সভ্যতার দাবিদার পশ্চিমা দেশগুলো সঠিক ভূমিকা পালন করলে আজ গাজায় ইসরাইল এভাবে গণহত্যা পরিচালনা করতে পারত না এবং ইরানেরও এ ধরনের পরিণতির মুখোমুখি হওয়ার কথা নয়।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

ফুলবাড়ী মডেল প্রেসক্লাবের ২য় প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালিত: সত্যনিষ্ঠ সাংবাদিকতার অঙ্গীকার

বিশ্বজুড়ে বিভেদ ও সংঘাতের নতুন অধ্যায়: ট্রাম্পের নীতি ও তার প্রভাব

আপডেট সময় : ০৯:২৮:৫৭ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২ মার্চ ২০২৬

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এক নতুন মেরুকরণের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, যেখানে শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো দুর্বল দেশগুলোর ওপর তাদের প্রভাব বিস্তারে বেপরোয়া হয়ে উঠছে। সম্প্রতি ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলা এবং দেশটির শীর্ষ নেতাদের হত্যাকাণ্ডের ঘটনা এই বিভেদকে আরও স্পষ্ট করেছে। এই ঘটনাগুলো ‘জোর যার মুল্লুক তার’ নীতিকেই চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠা করেছে বলে অনেকেই মনে করছেন। এই আগ্রাসনের ফলে বিশ্বের ছোট ও দুর্বল রাষ্ট্রগুলোর স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং নিরাপত্তা আরও বেশি হুমকির মুখে পড়েছে। এই ঘটনাগুলো বিশ্বকে যেন ষোড়শ শতাব্দীর ঔপনিবেশিক যুগে ফিরিয়ে নিয়ে গেছে, যখন শক্তিশালী ইউরোপীয় দেশগুলো কেবল সামরিক শক্তির ওপর নির্ভর করে এশিয়া, আফ্রিকা এবং লাতিন আমেরিকার মতো অঞ্চলগুলো দখল করে নিত।

ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয়বার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর নিজেকে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে একজন ব্যতিক্রমী এবং শান্তিপ্রিয় নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেছিলেন। তবে, শান্তির মুখোশের আড়ালে তিনি বিশ্বকে একের পর এক সংঘাত উপহার দিয়েছেন। ইরানের ওপর হামলাকেও তিনি শান্তি প্রতিষ্ঠা হিসেবে আখ্যায়িত করে বিশ্ববাসীর সামনে এক ধরনের পরিহাস করছেন। তার নির্বাচনী প্রচারণার সময় তিনি ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি আজও পূরণ হয়নি। বরং, তার শাসনামলে গাজায় ইসরাইলের আগ্রাসন ও গণহত্যা বিশ্ববাসী দেখেছে। যদিও গত বছর জুন মাসে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি ইরানে হামলা চালিয়েছিল, এবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যৌথভাবে এই হামলা চালিয়েছে। এর আগে, জানুয়ারি মাসে ডোনাল্ড ট্রাম্প ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে ক্ষমতাচ্যুত করার অভিযান চালান এবং কিউবাকেও একই পরিণতি বরণের হুমকি দেন। গ্রিনল্যান্ড দখলের ঘোষণাও তিনি দিয়েছিলেন। এসব ঘটনা তার নিজেকে শান্তিকামী হিসেবে উপস্থাপনের দাবির সম্পূর্ণ বিপরীত।

প্রকাশিত তথ্য অনুসারে, ইসরাইলের কাছে শতাধিক পারমাণবিক বোমা রয়েছে, যা তারা নিজেরাই তৈরি করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যৌথভাবে ঘোষণা করেছে যে তারা ইরানকে কোনো অবস্থাতেই পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী হতে দেবে না এবং প্রয়োজনে এর জন্য হামলা চালাবে। সর্বশেষ জুন মাসের হামলা এর প্রমাণ। এবার ইসরাইল আরও এক নতুন দাবি উত্থাপন করেছে: ইরানের কাছে এমন কোনো ক্ষেপণাস্ত্র থাকা চলবে না, যা ইসরাইলে হামলা চালাতে সক্ষম। বিশেষ করে, ইরানের ব্যালাস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করতে হবে। ইসরাইলের লক্ষ্য হলো, ইসরাইলের নিরাপত্তার জন্য হুমকি কোনো শক্তির অস্তিত্ব তাদের পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে না রাখা এবং সামরিকভাবে মধ্যপ্রাচ্যের অন্য কোনো দেশ যাতে ইসরাইলের চেয়ে শক্তিশালী না হয়।

এই দাবি আদায়ের জন্য ইসরাইল ট্রাম্প প্রশাসনে ব্যাপক লবিং শুরু করে। জুন মাসের হামলার পর ট্রাম্প প্রশাসন পুনরায় ইরানে হামলার ব্যাপারে দ্বিধাগ্রস্ত ছিল। কিন্তু নেতানিয়াহু প্রশাসন ক্রমাগত ট্রাম্প প্রশাসনকে বোঝাতে থাকে যে ইরানের ব্যালাস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি তাদের নিরাপত্তার জন্য একটি বড় হুমকি এবং এটি বন্ধ করতেই হবে।

হামাস-ইসরাইল যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে, হামাসের পাশাপাশি লেবাননে ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনের হুতি আর্মি এবং ইরাকভিত্তিক ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়া বাহিনীগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে। সিরিয়া থেকেও ইরানকে বিদায় নিতে হয়। এই পরিস্থিতিতে ইরান ঐতিহাসিক এক দুর্বল অবস্থানে এসে দাঁড়ায়। প্রকাশিত খবর অনুসারে, নেতানিয়াহু সরকার এই সুযোগটি কাজে লাগানোর পরিকল্পনা গ্রহণ করে। ইরানের শাসনব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা এবং একই সাথে দেশটির সমস্ত অস্ত্র সক্ষমতা ধ্বংস করার লক্ষ্যে ইসরাইল অগ্রসর হয়।

গত ডিসেম্বর মাসে নেতানিয়াহু যুক্তরাষ্ট্রে যান এবং ফ্লোরিডার মার-এ-লাগোতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে একান্ত বৈঠক করেন। সেখানে তিনি ট্রাম্পের কাছে তার ইরান বিষয়ক পরিকল্পনা তুলে ধরেন। ইরানের ব্যালাস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কীভাবে ইসরাইলের নিরাপত্তার জন্য হুমকি, তা বোঝানোর পাশাপাশি তিনি ট্রাম্পকে বোঝাতে সক্ষম হন যে ইরান এখনো পারমাণবিক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। জুন মাসের হামলায় ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও তা পুরোপুরি ধ্বংস হয়নি। তাই ইরানে অবিলম্বে পুনরায় হামলা চালানোর প্রয়োজনীয়তার কথা তিনি তুলে ধরেন। ২৯ ডিসেম্বর এই বৈঠকের পর ডোনাল্ড ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা জানতে পেরেছি ইরান এখনো পারমাণবিক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।’

ডিসেম্বরে মার-এ-লাগোতে বৈঠকের পর ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার ইরানকে পারমাণবিক কার্যক্রম বন্ধ করার এবং হামলার হুমকি দিতে থাকেন। একই সঙ্গে ইরানে হামলার লক্ষ্যে ব্যাপক সামরিক আয়োজন চলতে থাকে। হামলার আগে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি করে পারমাণবিক বোমা কার্যক্রম বন্ধ করার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তির জন্য। শেষ পর্যন্ত গত মাসে ওমানে আলোচনা শুরু হয়। তবে, যুক্তরাষ্ট্র আলোচনার টেবিলে ইরানের সামনে যেসব শর্ত হাজির করে, তা মূলত ইসরাইলের দাবিকেই প্রতিফলিত করে। এতে বলা হয়, ইরানের কাছে পারমাণবিক বোমা সহ ব্যালাস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র থাকতে পারবে না। ইরান জানায়, অবরোধ তুলে নিলে তারা ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সীমিত পর্যায়ে নামিয়ে আনতে রাজি; কিন্তু ব্যালাস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি কোনো অবস্থাতেই পরিত্যাগ করবে না। এই পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের দাবি ছিল স্পষ্ট: ইরানকে সম্পূর্ণরূপে আত্মসমর্পণ করে বলতে হবে যে তারা পারমাণবিক কার্যক্রম বন্ধ করবে। চুক্তি অথবা হামলা – যেকোনো একটি বেছে নিতে হবে ইরানকে। কিন্তু ইরান তা প্রত্যাখ্যান করায় শনিবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল হামলা শুরু করে। বস্তুত, এই আলোচনা ছিল কেবল সময়ক্ষেপণের একটি অজুহাত।

ইরানের পারমাণবিক ও ব্যালাস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ধ্বংস করার পাশাপাশি, এবারের হামলার আরেকটি লক্ষ্য হলো ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের ধারাবাহিক সরকারকে উৎখাত করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের অনুগত কাউকে ক্ষমতায় বসানো। ইরানে হামলা শুরুর পর ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের সমস্ত অস্ত্র ধ্বংস না হওয়া পর্যন্ত হামলা চলবে।

ইরান বারবার বলেছে যে তারা পারমাণবিক অস্ত্রের মতো ব্যাপক বিধ্বংসী মারণাস্ত্র নির্মাণ ও ব্যবহারের সম্পূর্ণ বিরোধী। তারা এ ধরনের কোনো অস্ত্র তৈরি বা মজুত রাখাকে সমর্থন করে না। এই বিষয়ে ইরানের বিপ্লবী নেতা ইমাম খোমেনির ফতোয়া রয়েছে। ইরান জানায়, তাদের পারমাণবিক গবেষণার একমাত্র লক্ষ্য হলো বেসামরিক বিদ্যুৎ উৎপাদন। ২০১৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রসহ ছয়টি দেশের সঙ্গে স্বাক্ষরিত ‘ইরান-ছয়জাতি চুক্তি’ এর প্রমাণ। এই চুক্তির মাধ্যমে ইরান তার পারমাণবিক গবেষণাগারে ২৪ ঘণ্টা ক্যামেরা চালু রাখা এবং জাতিসংঘের পর্যবেক্ষকদের পরিদর্শনের অনুমতি দেওয়ার বিনিময়ে নিষেধাজ্ঞা থেকে মুক্তি পেয়েছিল। কিন্তু এই চুক্তির পর ইসরাইল উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠে, কারণ তারা দেখতে পায় ইরান অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হচ্ছে। ইসরাইল মনে করে, অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী ইরান তাদের জন্য হুমকি। তাই তারা চুক্তিটি বাতিলের জন্য উঠেপড়ে লাগে। ২০১৬ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে ইসরাইল তাকে দিয়ে ২০১৮ সালে এই চুক্তি বাতিল করাতে সক্ষম হয় এবং ইরানের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। কিন্তু তারপরও ইসরাইল ইরানের কাছ থেকে নিরাপদ বোধ করেনি। কারণ, লেবানন ও সিরিয়াজুড়ে হিজবুল্লাহ, ইরাকের শিয়া মিলিশিয়া বাহিনী, ইয়েমেনে হুতি মিলিশিয়া বাহিনী এবং গাজার হামাস ইসরাইলের জন্য বড় ধরনের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অবশেষে, ইসরাইলে হামাসের হামলার সুযোগে ইসরাইল সর্বশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে হামাস, হিজবুল্লাহ, হুতি সহ ইরানের সমস্ত মিলিশিয়া বাহিনীকে চিরতরে ধ্বংস করার লক্ষ্যে। যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় তারা এটি করতে সক্ষম হয়েছে। হামাস, হিজবুল্লাহ সহ সমস্ত মিলিশিয়া বাহিনী ধ্বংসের পর, ইসরাইলের পরবর্তী লক্ষ্য হলো ইরানকে একটি অনুগত ও নামমাত্র রাষ্ট্রে পরিণত করে বৃহত্তর ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথে এগিয়ে যাওয়া। একই সাথে, ইরান হামলার মাধ্যমে আসন্ন নির্বাচনে জয়ী হওয়ার রাস্তাও পরিষ্কার করতে চান নেতানিয়াহু। ইমাম খামেনি সহ শীর্ষ জেনারেলদের হত্যার মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে অনেকখানি এগিয়ে গেলেন।

ডোনাল্ড ট্রাম্প চেয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে একজন অনন্যসাধারণ প্রেসিডেন্ট হিসেবে তার নাম লিখিত থাকুক। তিনি এমন কিছু করতে চেয়েছিলেন, যা ‘ট্রাম্প-পরবর্তী যুগ’ হিসেবে পরিচিত হবে। এই লক্ষ্যে তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বব্যাপী যুদ্ধ থেকে বের করে আনার এবং সারা বিশ্ব থেকে মার্কিন ঘাঁটি গুটিয়ে নেওয়ার কথা বারবার ঘোষণা করেন। নিজেকে তিনি যুদ্ধবিরোধী ও শান্তিপ্রিয় প্রেসিডেন্ট হিসেবে উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন, তিনি যা করবেন তা অতীতে যুক্তরাষ্ট্রের আর কোনো প্রেসিডেন্ট করেনি। তিনি ভারত-পাকিস্তান সহ আটটি যুদ্ধ বন্ধের কৃতিত্বের দাবি করেছেন এবং একটি নোবেল পুরস্কার পাওয়ার প্রবল আকাঙ্ক্ষা পোষণ করতেন।

ট্রাম্প শুরু থেকেই নিজেকে যুদ্ধবিরোধী হিসেবে প্রমাণের চেষ্টা করলেও, ক্ষমতার চেয়ারে বসার পরপরই তিনি বিশ্বব্যাপী যে শুল্কযুদ্ধ শুরু করেন, তা বিশ্বের অর্থনীতিকে তছনছ করে দিতে থাকে। তার এই বাণিজ্য যুদ্ধ চীনের সঙ্গে সরাসরি সংঘাত পরিস্থিতি সৃষ্টি করে এবং বিশ্ব অর্থনীতি ও বিশ্বব্যবস্থাকে ওলট-পালট করে দেয়।

এরপর ভেনিজুয়েলায় এবং সর্বশেষ ইরানে সরাসরি আগ্রাসনের ফলে জাতিসংঘের অধীনে নামেমাত্র যে রুলস-বেজড বিশ্বব্যবস্থা ছিল, তা সম্পূর্ণরূপে ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। যেকোনো অজুহাতে কোনো শক্তিশালী রাষ্ট্র যদি কোনো দুর্বল রাষ্ট্রের ওপর এভাবে হামলা ও আগ্রাসন চালায় এবং দখল করে নেয়, তবে তার প্রতিকার পাওয়ার আর কোনো আশ্রয় বিশ্বে নেই।

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি শাহাদাত বরণ করেছেন। ১৯৮১ থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত তিনি ইরানের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। ১৯৮৯ সালে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ আল খোমেনির ইন্তেকালের পর তিনি দেশটির সুপ্রিম নেতা নির্বাচিত হন এবং ইসলামি বিপ্লবের হাল ধরেন। শুধু ইরান নয়, পুরো মুসলিম বিশ্বে তার গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নাতীত ছিল। দেশের স্বার্থের বিরুদ্ধে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমাদের কোনো চাপ ও হুমকির মুখে তিনি কখনো নতিস্বীকার করেননি। তার মতো একজন নেতাকে হত্যার পর ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, তিনি ছিলেন এই শতাব্দীর অন্যতম শয়তান। ইরান আগ্রাসনের পর এখন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে ১৯৭৯ সালের ইরানের মহান ইসলামি বিপ্লবের ভবিষ্যৎ নিয়ে। ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের আগ্রাসন, ইরানের সর্বোচ্চ নেতাকে হত্যা এবং তার সম্পর্কে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মন্তব্য বিশ্বজুড়ে অগণিত মুসলমানদের হৃদয়ে কেবল রক্তক্ষরণ নয়, বরং তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের এই আগ্রাসন কোনো অবস্থাতেই মেনে নেওয়ার মতো নয়। শুধু মুসলিম বিশ্ব নয়, বরং বিশ্বকে আজ এর বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়ে সোচ্চার ভূমিকা পালন করা উচিত। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো, ব্রিটেন, জার্মানি ও ফ্রান্স একটি যৌথ বিবৃতিতে আক্রান্ত ইরানের নিন্দা করছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের নয়। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, কাতার, কুয়েত সহ আরও কয়েকটি আরব দেশ ইরানের নিন্দা ও প্রতিবাদ করেছে। তারা ইরানের নিন্দা করেছে বিভিন্ন আরব দেশে অবস্থিত সৌদি ঘাঁটিতে ইরানের হামলার জন্য। আমেরিকান ঘাঁটিতে হামলাকে তারা ওইসব দেশের বিরুদ্ধে ইরানের হামলা হিসেবে আখ্যায়িত করেছে, যা দুর্ভাগ্য ছাড়া আর কিছু নয়। অথচ এসব আরব দেশ সহ সভ্যতার দাবিদার পশ্চিমা দেশগুলো সঠিক ভূমিকা পালন করলে আজ গাজায় ইসরাইল এভাবে গণহত্যা পরিচালনা করতে পারত না এবং ইরানেরও এ ধরনের পরিণতির মুখোমুখি হওয়ার কথা নয়।