ঢাকা ১১:১১ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ০২ মার্চ ২০২৬

‘সমাজে মাদক থাকবে না’: প্রধানমন্ত্রীর কঠোর নির্দেশনায় দেশজুড়ে মাদকবিরোধী সাঁড়াশি অভিযান শুরু

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সুদৃঢ় প্রত্যয়ে নতুন সরকার সারাদেশে মাদক নির্মূলে এক ঐতিহাসিক অভিযানে নেমেছে। নবনিযুক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) আলী হোসেন ফকিরকে প্রধানমন্ত্রীর সুস্পষ্ট নির্দেশনা, ‘সমাজে মাদক থাকবে না’—এই বার্তা বাস্তবায়নে ইতোমধ্যে দেশজুড়ে শুরু হয়েছে বিশেষ সাঁড়াশি অভিযান। মাদকের ভয়াল থাবায় যখন দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম শঙ্কিত, তখন সরকারের এই দৃঢ় পদক্ষেপ অভিভাবক মহলে স্বস্তি এনেছে এবং সর্বস্তরের মানুষের প্রত্যাশা জাগিয়েছে একটি মাদকমুক্ত বাংলাদেশের।

মাদকের করাল গ্রাস থেকে দেশকে মুক্ত করার প্রতিশ্রুতি নিয়ে ক্ষমতায় আসা নতুন সরকার শুরুতেই এ বিষয়ে তাদের কঠোর অবস্থান স্পষ্ট করেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই মাদক নির্মূলকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছেন। গত ২৫ ফেব্রুয়ারি আইজিপি আলী হোসেন ফকিরকে র‍্যাঙ্ক ব্যাজ পরিয়ে দেওয়ার সময় তিনি দেশব্যাপী মাদক ও জুয়া নির্মূলে সর্বোচ্চ কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন। প্রধানমন্ত্রীর এই নির্দেশনাকে ‘অ্যাসাইনমেন্ট’ হিসেবে উল্লেখ করে আইজিপি আলী হোসেন ফকির ঘোষণা দিয়েছেন, ‘সমাজে মাদক থাকবে না’—এই লক্ষ্য অর্জনে কোনো অপরাধীকেই ছাড় দেওয়া হবে না। তার নেতৃত্বে পুলিশ বাহিনী ইতোমধ্যে দেশজুড়ে বিশেষ অভিযান শুরু করেছে।

মাদকাসক্তি বর্তমানে বাংলাদেশের এক গভীর সামাজিক উদ্বেগ। শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত, সর্বত্র মাদকের বিষবাষ্প ছড়িয়ে পড়েছে, যা দেশের সামাজিক কাঠামোকে দুর্বল করে দিচ্ছে। আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে মাদকাসক্তের সংখ্যা, যার সিংহভাগই তরুণ প্রজন্ম। এই নীরব ঘাতক মাদকের সর্বগ্রাসী রূপ দেশব্যাপী এক ভয়াবহ সামাজিক সমস্যা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। দেশের অভিভাবক সমাজ তাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন ছিলেন, কারণ বিভিন্ন ধরনের মাদকদ্রব্যে আসক্ত হয়ে পড়ছিলেন অসংখ্য তরুণ-তরুণী।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সহযোগিতায় বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএমইউ) গত জানুয়ারিতে দেশব্যাপী মাদক পরিস্থিতি নিয়ে একটি জরিপ পরিচালনা করে। জরিপের ফলাফল অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এতে দেখা যায়, বাংলাদেশে বর্তমানে ৮২ লাখ মানুষ মাদকে আসক্ত, যা মোট জনসংখ্যার ৪.৮৮ শতাংশ। এর মধ্যে ৯২ শতাংশ মাদকসেবীর বয়স ৮ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে, যা তরুণ প্রজন্মের মধ্যে মাদকের ভয়াবহ বিস্তার নির্দেশ করে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মাদকাসক্ত পুরুষের সংখ্যা ৭৭.৬ লাখ এবং নারী ২.৮৫ লাখ। বর্তমানে বাংলাদেশে ২৭ ধরনের মাদকের ব্যবহার প্রচলিত রয়েছে, যার মধ্যে ১৮ ধরনের মাদক নিয়মিত সেবন করা হয়। বহুল প্রচলিত মাদকের মধ্যে রয়েছে গাঁজা, ইয়াবা (মেথামফেটামিন), ফেনসিডিল, আইস (ক্রিস্টাল মেথ), এলএসডি, ডিএমটি, ম্যাজিক মাশরুম এবং খাট। ইনজেকশন ও ট্যাবলেটের মধ্যে হেরোইন, বুপ্রেনরফিন ইনজেকশন, টাপেন্ডাডল ও বিভিন্ন ঘুমের ওষুধ উল্লেখযোগ্য। কোকেন ও এমডিএমবি’র মতো ব্যয়বহুল মাদক মূলত উচ্চবিত্তদের মধ্যে এবং ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

বিএমইউ’র জরিপে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, বেকার জনগোষ্ঠীর মধ্যে (প্রায় ২৯ শতাংশ) মাদকাসক্তি বেশি দেখা যায়। এর পরেই রয়েছে পরিবহন শ্রমিক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং দিনমজুর শ্রেণি। মাদকাসক্তদের একটি বড় অংশ মাধ্যমিক বা উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়া তরুণ। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ইংরেজি মাধ্যম ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে আইস বা এলএসডি’র মতো ব্যয়বহুল মাদকের ব্যবহার বাড়ছে। নিম্নবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণিতে গাঁজা ও ইয়াবার ব্যবহার বেশি, অন্যদিকে উচ্চবিত্তদের মধ্যে কোকেন, এলএসডি ও বিদেশি মদের প্রচলন দেখা যায়। প্রায় ৬০ শতাংশ তরুণ কৌতূহলবশত বন্ধুদের প্ররোচনায় মাদক গ্রহণ শুরু করে। কর্মজীবনের অনিশ্চয়তা এবং পারিবারিক কলহের কারণে সৃষ্ট হতাশাও মাদকাসক্তির অন্যতম কারণ। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, একজন আসক্ত ব্যক্তি বছরে গড়ে তার পরিবারের প্রায় ৭২ হাজার টাকা মাদকের পেছনে নষ্ট করে।

বাংলাদেশে কোনো মাদক উৎপাদন না হলেও, ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এটি মাদকের একটি বড় ট্রানজিট পয়েন্টে পরিণত হয়েছে। গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল (মিয়ানমার-লাওস-থাইল্যান্ড), গোল্ডেন ক্রিসেন্ট (আফগানিস্তান-পাকিস্তান-ইরান) এবং গোল্ডেন ওয়েজ (ভারত-নেপাল-ভুটান)—এই তিনটি ভৌগোলিক রুটের কেন্দ্রস্থলে অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ মাদকের ট্রানজিট ও বাজার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। দেশে ২৯টি সীমান্তবর্তী জেলায় ১৬২টি রুট এবং ১০৪ থেকে ১০৫টি পয়েন্টকে মাদকের প্রধান প্রবেশপথ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বিশেষ করে ভারত ও মিয়ানমার থেকেই সিংহভাগ মাদক দেশে প্রবেশ করে। মিয়ানমার সীমান্ত দিয়ে ইয়াবা ও ক্রিস্টাল মেথ (আইস) প্রধানত কক্সবাজারের টেকনাফ, উখিয়া ও বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্ত দিয়ে নাফ নদী ও পাহাড়ি পথে প্রবেশ করে। ভারত সীমান্ত হয়ে কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, সাতক্ষীরা, যশোর ও রাজশাহী সীমান্ত দিয়ে ফেনসিডিল, গাঁজা, হেরোইন এবং ইনজেকশনযোগ্য মাদক যেমন বুপ্রেনরফিন আসে। আকাশপথে ঢাকা-চট্টগ্রাম ও সিলেট বিমানবন্দরে কোকেন এবং এলএসডি প্রবেশ করে, যা মূলত দক্ষিণ আমেরিকার পেরু, কলম্বিয়া এবং আফ্রিকার নাইজেরিয়া ও মালাউই থেকে আসে। সমুদ্রপথে মাছ ধরার ট্রলারে করে কোস্টগার্ডের নজরদারি এড়িয়ে ইয়াবা ও আইস উপকূলে প্রবেশ করে। প্রতি বছর মাদক চোরাচালানের মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকার বেশি বিদেশে পাচার হয়। মাদকসেবীদের মধ্যে ৫২ শতাংশ গাঁজা এবং ২০ শতাংশ ইয়াবায় আসক্ত।

রাজধানী ঢাকার মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্প (বিহারি ক্যাম্প) এবং কারওয়ান বাজার রেললাইন বস্তি মাদকের সবচেয়ে বড় আখড়া হিসেবে পরিচিত। জেনেভা ক্যাম্পে ২২টি সক্রিয় মাদক ব্যবসায়ী গ্রুপ কাজ করে, যেখানে প্রতিদিন প্রায় ৫০ লাখ টাকার মাদক বেচাকেনা হয়। কারওয়ান বাজার রেললাইন এলাকায় শতাধিক ভাসমান মাদক বিক্রেতা সক্রিয়, যার বড় অংশই নারী ও শিশু। এছাড়া, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গাঁজা ও ইয়াবা, হাজারীবাগ ও কামরাঙ্গীরচরে হেরোইন ও ইয়াবা এবং বনানী-গুলশান এলাকায় আইস ও এলএসডি’র মতো দামি মাদকের বিক্রি বেশি হয়।
অন্যদিকে, ভারতের ত্রিপুরার সঙ্গে দীর্ঘ সীমান্ত থাকার কারণে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা মাদকের অন্যতম ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। বিশেষ করে কসবার সালদা নদী এবং আখাউড়া সীমান্ত দিয়ে ফেনসিডিল, গাঁজা, ইয়াবা ও এসকফ সিরাপের মতো মাদক বেশি প্রবেশ করে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অভিভাবকরা কিশোর গ্যাংয়ের মাধ্যমে স্কুল-কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থীদের হাতে মাদক সহজলভ্য হয়ে ওঠায় এক ধরনের সামাজিক আতঙ্ক বা ট্রমার মধ্যে রয়েছেন।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া ছাড়াও কক্সবাজার, টেকনাফ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, যশোর এবং সাতক্ষীরাসহ মোট ৩২টি সীমান্তবর্তী জেলা মাদকের জন্য উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো বড় শহরগুলোর বস্তি এবং ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা যেমন যাত্রাবাড়ীও মাদকের ভয়াবহ ছোবলে জর্জরিত। বিভাগীয় হিসাবে, ঢাকা বিভাগে সর্বোচ্চ ২৩ লাখ, চট্টগ্রামে ১৯ লাখ এবং রংপুরে ১১ লাখ মাদকসেবী বাস করে।

বাংলাদেশের তরুণ সমাজকে মাদকের ভয়াল ছোবল থেকে রক্ষা করতে হলে একদিকে যেমন দেশব্যাপী মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান অপরিহার্য, তেমনি তরুণদের জন্য শিক্ষা, বিনোদন ও কর্মসংস্থানের একটি সুদূরপ্রসারী কর্মসূচিও প্রয়োজন। মাদকের বিস্তার রোধে একটি সমন্বিত সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা জরুরি। সদ্য নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা নিজ নিজ এলাকায় মাদকমুক্ত করার কর্মসূচি হাতে নিতে পারেন। মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন কেবল একক প্রচেষ্টায় সম্ভব নয়, সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। প্রতিটি পাড়া বা মহল্লায় শিক্ষক, ইমাম, অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা এবং স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে শক্তিশালী কমিটি গঠন করতে হবে। মাদক কেনাবেচার স্পটগুলো চিহ্নিত করে পরিচয় গোপন রেখে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করা আবশ্যক। তরুণদের মাধ্যমে অন্য তরুণদের সচেতন করা সবচেয়ে বেশি কার্যকর। স্কুল-কলেজের ক্লাবগুলোকে মাদকবিরোধী প্রচারে কাজে লাগাতে হবে। প্রতিটি এলাকায় খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং পাঠাগার আন্দোলনের মাধ্যমে তরুণদের সৃজনশীল কাজে ব্যস্ত রাখতে হবে। ধর্মীয় উপাসনালয়গুলোতে নিয়মিত মাদকের ভয়াবহতা ও ধর্মীয় নিষেধাজ্ঞা নিয়ে আলোচনা করা উচিত। ‘মাদককে না বলুন’ স্লোগানটি প্রতিটি ঘরে পৌঁছে দিতে হবে। তথ্যপ্রযুক্তিসহ নানা কারিগরি শিক্ষায় তরুণদের উৎসাহিত করতে হবে এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে, তাহলেই তরুণরা মাদকের দিকে ঝুঁকবে না।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান লন্ডন থেকে দেশে প্রত্যাবর্তনের আগে বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষের সঙ্গে ‘দেশ গড়ার পরিকল্পনা’ নিয়ে ভার্চুয়ালি মতবিনিময় করেন। পেশাজীবীদের সঙ্গে এমনই এক অনুষ্ঠানে মাদকের ভয়াবহতা ও অভিভাবকদের উদ্বেগ তুলে ধরা হলে তিনি প্রতিশ্রুতি দেন যে, বিষয়টি বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারে থাকবে এবং দেশ পরিচালনার সুযোগ পেলে তিনি দেশকে মাদকমুক্ত করার সর্বাত্মক চেষ্টা করবেন। তিনি আরও বলেন, তরুণদের নানা ধরনের সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে জড়িত করা এবং কর্মসংস্থানের সৃষ্টি করা গেলে মাদকের আগ্রাসন কমে আসবে। নির্বাচনের পর বিপুল বিজয় লাভ করে তারেক রহমান এখন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেশ পরিচালনা করছেন এবং তার সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে প্রথম পদক্ষেপ হিসেবেই আইজিপিকে মাদক নির্মূলে কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন। আইজিপি আলী হোসেন ফকিরের নেতৃত্বে ইতোমধ্যে দেশজুড়ে পুলিশের বিশেষ অভিযান শুরু হয়েছে, যা প্রধানমন্ত্রীর ‘সমাজে মাদক থাকবে না’—এই অদম্য ইচ্ছারই প্রতিফলন।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

ফুলবাড়ী মডেল প্রেসক্লাবের ২য় প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালিত: সত্যনিষ্ঠ সাংবাদিকতার অঙ্গীকার

‘সমাজে মাদক থাকবে না’: প্রধানমন্ত্রীর কঠোর নির্দেশনায় দেশজুড়ে মাদকবিরোধী সাঁড়াশি অভিযান শুরু

আপডেট সময় : ০৯:২৭:৩৬ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২ মার্চ ২০২৬

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সুদৃঢ় প্রত্যয়ে নতুন সরকার সারাদেশে মাদক নির্মূলে এক ঐতিহাসিক অভিযানে নেমেছে। নবনিযুক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) আলী হোসেন ফকিরকে প্রধানমন্ত্রীর সুস্পষ্ট নির্দেশনা, ‘সমাজে মাদক থাকবে না’—এই বার্তা বাস্তবায়নে ইতোমধ্যে দেশজুড়ে শুরু হয়েছে বিশেষ সাঁড়াশি অভিযান। মাদকের ভয়াল থাবায় যখন দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম শঙ্কিত, তখন সরকারের এই দৃঢ় পদক্ষেপ অভিভাবক মহলে স্বস্তি এনেছে এবং সর্বস্তরের মানুষের প্রত্যাশা জাগিয়েছে একটি মাদকমুক্ত বাংলাদেশের।

মাদকের করাল গ্রাস থেকে দেশকে মুক্ত করার প্রতিশ্রুতি নিয়ে ক্ষমতায় আসা নতুন সরকার শুরুতেই এ বিষয়ে তাদের কঠোর অবস্থান স্পষ্ট করেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই মাদক নির্মূলকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছেন। গত ২৫ ফেব্রুয়ারি আইজিপি আলী হোসেন ফকিরকে র‍্যাঙ্ক ব্যাজ পরিয়ে দেওয়ার সময় তিনি দেশব্যাপী মাদক ও জুয়া নির্মূলে সর্বোচ্চ কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন। প্রধানমন্ত্রীর এই নির্দেশনাকে ‘অ্যাসাইনমেন্ট’ হিসেবে উল্লেখ করে আইজিপি আলী হোসেন ফকির ঘোষণা দিয়েছেন, ‘সমাজে মাদক থাকবে না’—এই লক্ষ্য অর্জনে কোনো অপরাধীকেই ছাড় দেওয়া হবে না। তার নেতৃত্বে পুলিশ বাহিনী ইতোমধ্যে দেশজুড়ে বিশেষ অভিযান শুরু করেছে।

মাদকাসক্তি বর্তমানে বাংলাদেশের এক গভীর সামাজিক উদ্বেগ। শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত, সর্বত্র মাদকের বিষবাষ্প ছড়িয়ে পড়েছে, যা দেশের সামাজিক কাঠামোকে দুর্বল করে দিচ্ছে। আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে মাদকাসক্তের সংখ্যা, যার সিংহভাগই তরুণ প্রজন্ম। এই নীরব ঘাতক মাদকের সর্বগ্রাসী রূপ দেশব্যাপী এক ভয়াবহ সামাজিক সমস্যা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। দেশের অভিভাবক সমাজ তাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন ছিলেন, কারণ বিভিন্ন ধরনের মাদকদ্রব্যে আসক্ত হয়ে পড়ছিলেন অসংখ্য তরুণ-তরুণী।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সহযোগিতায় বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএমইউ) গত জানুয়ারিতে দেশব্যাপী মাদক পরিস্থিতি নিয়ে একটি জরিপ পরিচালনা করে। জরিপের ফলাফল অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এতে দেখা যায়, বাংলাদেশে বর্তমানে ৮২ লাখ মানুষ মাদকে আসক্ত, যা মোট জনসংখ্যার ৪.৮৮ শতাংশ। এর মধ্যে ৯২ শতাংশ মাদকসেবীর বয়স ৮ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে, যা তরুণ প্রজন্মের মধ্যে মাদকের ভয়াবহ বিস্তার নির্দেশ করে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মাদকাসক্ত পুরুষের সংখ্যা ৭৭.৬ লাখ এবং নারী ২.৮৫ লাখ। বর্তমানে বাংলাদেশে ২৭ ধরনের মাদকের ব্যবহার প্রচলিত রয়েছে, যার মধ্যে ১৮ ধরনের মাদক নিয়মিত সেবন করা হয়। বহুল প্রচলিত মাদকের মধ্যে রয়েছে গাঁজা, ইয়াবা (মেথামফেটামিন), ফেনসিডিল, আইস (ক্রিস্টাল মেথ), এলএসডি, ডিএমটি, ম্যাজিক মাশরুম এবং খাট। ইনজেকশন ও ট্যাবলেটের মধ্যে হেরোইন, বুপ্রেনরফিন ইনজেকশন, টাপেন্ডাডল ও বিভিন্ন ঘুমের ওষুধ উল্লেখযোগ্য। কোকেন ও এমডিএমবি’র মতো ব্যয়বহুল মাদক মূলত উচ্চবিত্তদের মধ্যে এবং ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

বিএমইউ’র জরিপে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, বেকার জনগোষ্ঠীর মধ্যে (প্রায় ২৯ শতাংশ) মাদকাসক্তি বেশি দেখা যায়। এর পরেই রয়েছে পরিবহন শ্রমিক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং দিনমজুর শ্রেণি। মাদকাসক্তদের একটি বড় অংশ মাধ্যমিক বা উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়া তরুণ। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ইংরেজি মাধ্যম ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে আইস বা এলএসডি’র মতো ব্যয়বহুল মাদকের ব্যবহার বাড়ছে। নিম্নবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণিতে গাঁজা ও ইয়াবার ব্যবহার বেশি, অন্যদিকে উচ্চবিত্তদের মধ্যে কোকেন, এলএসডি ও বিদেশি মদের প্রচলন দেখা যায়। প্রায় ৬০ শতাংশ তরুণ কৌতূহলবশত বন্ধুদের প্ররোচনায় মাদক গ্রহণ শুরু করে। কর্মজীবনের অনিশ্চয়তা এবং পারিবারিক কলহের কারণে সৃষ্ট হতাশাও মাদকাসক্তির অন্যতম কারণ। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, একজন আসক্ত ব্যক্তি বছরে গড়ে তার পরিবারের প্রায় ৭২ হাজার টাকা মাদকের পেছনে নষ্ট করে।

বাংলাদেশে কোনো মাদক উৎপাদন না হলেও, ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এটি মাদকের একটি বড় ট্রানজিট পয়েন্টে পরিণত হয়েছে। গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল (মিয়ানমার-লাওস-থাইল্যান্ড), গোল্ডেন ক্রিসেন্ট (আফগানিস্তান-পাকিস্তান-ইরান) এবং গোল্ডেন ওয়েজ (ভারত-নেপাল-ভুটান)—এই তিনটি ভৌগোলিক রুটের কেন্দ্রস্থলে অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ মাদকের ট্রানজিট ও বাজার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। দেশে ২৯টি সীমান্তবর্তী জেলায় ১৬২টি রুট এবং ১০৪ থেকে ১০৫টি পয়েন্টকে মাদকের প্রধান প্রবেশপথ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বিশেষ করে ভারত ও মিয়ানমার থেকেই সিংহভাগ মাদক দেশে প্রবেশ করে। মিয়ানমার সীমান্ত দিয়ে ইয়াবা ও ক্রিস্টাল মেথ (আইস) প্রধানত কক্সবাজারের টেকনাফ, উখিয়া ও বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্ত দিয়ে নাফ নদী ও পাহাড়ি পথে প্রবেশ করে। ভারত সীমান্ত হয়ে কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, সাতক্ষীরা, যশোর ও রাজশাহী সীমান্ত দিয়ে ফেনসিডিল, গাঁজা, হেরোইন এবং ইনজেকশনযোগ্য মাদক যেমন বুপ্রেনরফিন আসে। আকাশপথে ঢাকা-চট্টগ্রাম ও সিলেট বিমানবন্দরে কোকেন এবং এলএসডি প্রবেশ করে, যা মূলত দক্ষিণ আমেরিকার পেরু, কলম্বিয়া এবং আফ্রিকার নাইজেরিয়া ও মালাউই থেকে আসে। সমুদ্রপথে মাছ ধরার ট্রলারে করে কোস্টগার্ডের নজরদারি এড়িয়ে ইয়াবা ও আইস উপকূলে প্রবেশ করে। প্রতি বছর মাদক চোরাচালানের মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকার বেশি বিদেশে পাচার হয়। মাদকসেবীদের মধ্যে ৫২ শতাংশ গাঁজা এবং ২০ শতাংশ ইয়াবায় আসক্ত।

রাজধানী ঢাকার মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্প (বিহারি ক্যাম্প) এবং কারওয়ান বাজার রেললাইন বস্তি মাদকের সবচেয়ে বড় আখড়া হিসেবে পরিচিত। জেনেভা ক্যাম্পে ২২টি সক্রিয় মাদক ব্যবসায়ী গ্রুপ কাজ করে, যেখানে প্রতিদিন প্রায় ৫০ লাখ টাকার মাদক বেচাকেনা হয়। কারওয়ান বাজার রেললাইন এলাকায় শতাধিক ভাসমান মাদক বিক্রেতা সক্রিয়, যার বড় অংশই নারী ও শিশু। এছাড়া, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গাঁজা ও ইয়াবা, হাজারীবাগ ও কামরাঙ্গীরচরে হেরোইন ও ইয়াবা এবং বনানী-গুলশান এলাকায় আইস ও এলএসডি’র মতো দামি মাদকের বিক্রি বেশি হয়।
অন্যদিকে, ভারতের ত্রিপুরার সঙ্গে দীর্ঘ সীমান্ত থাকার কারণে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা মাদকের অন্যতম ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। বিশেষ করে কসবার সালদা নদী এবং আখাউড়া সীমান্ত দিয়ে ফেনসিডিল, গাঁজা, ইয়াবা ও এসকফ সিরাপের মতো মাদক বেশি প্রবেশ করে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অভিভাবকরা কিশোর গ্যাংয়ের মাধ্যমে স্কুল-কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থীদের হাতে মাদক সহজলভ্য হয়ে ওঠায় এক ধরনের সামাজিক আতঙ্ক বা ট্রমার মধ্যে রয়েছেন।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া ছাড়াও কক্সবাজার, টেকনাফ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, যশোর এবং সাতক্ষীরাসহ মোট ৩২টি সীমান্তবর্তী জেলা মাদকের জন্য উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো বড় শহরগুলোর বস্তি এবং ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা যেমন যাত্রাবাড়ীও মাদকের ভয়াবহ ছোবলে জর্জরিত। বিভাগীয় হিসাবে, ঢাকা বিভাগে সর্বোচ্চ ২৩ লাখ, চট্টগ্রামে ১৯ লাখ এবং রংপুরে ১১ লাখ মাদকসেবী বাস করে।

বাংলাদেশের তরুণ সমাজকে মাদকের ভয়াল ছোবল থেকে রক্ষা করতে হলে একদিকে যেমন দেশব্যাপী মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান অপরিহার্য, তেমনি তরুণদের জন্য শিক্ষা, বিনোদন ও কর্মসংস্থানের একটি সুদূরপ্রসারী কর্মসূচিও প্রয়োজন। মাদকের বিস্তার রোধে একটি সমন্বিত সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা জরুরি। সদ্য নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা নিজ নিজ এলাকায় মাদকমুক্ত করার কর্মসূচি হাতে নিতে পারেন। মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন কেবল একক প্রচেষ্টায় সম্ভব নয়, সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। প্রতিটি পাড়া বা মহল্লায় শিক্ষক, ইমাম, অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা এবং স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে শক্তিশালী কমিটি গঠন করতে হবে। মাদক কেনাবেচার স্পটগুলো চিহ্নিত করে পরিচয় গোপন রেখে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করা আবশ্যক। তরুণদের মাধ্যমে অন্য তরুণদের সচেতন করা সবচেয়ে বেশি কার্যকর। স্কুল-কলেজের ক্লাবগুলোকে মাদকবিরোধী প্রচারে কাজে লাগাতে হবে। প্রতিটি এলাকায় খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং পাঠাগার আন্দোলনের মাধ্যমে তরুণদের সৃজনশীল কাজে ব্যস্ত রাখতে হবে। ধর্মীয় উপাসনালয়গুলোতে নিয়মিত মাদকের ভয়াবহতা ও ধর্মীয় নিষেধাজ্ঞা নিয়ে আলোচনা করা উচিত। ‘মাদককে না বলুন’ স্লোগানটি প্রতিটি ঘরে পৌঁছে দিতে হবে। তথ্যপ্রযুক্তিসহ নানা কারিগরি শিক্ষায় তরুণদের উৎসাহিত করতে হবে এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে, তাহলেই তরুণরা মাদকের দিকে ঝুঁকবে না।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান লন্ডন থেকে দেশে প্রত্যাবর্তনের আগে বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষের সঙ্গে ‘দেশ গড়ার পরিকল্পনা’ নিয়ে ভার্চুয়ালি মতবিনিময় করেন। পেশাজীবীদের সঙ্গে এমনই এক অনুষ্ঠানে মাদকের ভয়াবহতা ও অভিভাবকদের উদ্বেগ তুলে ধরা হলে তিনি প্রতিশ্রুতি দেন যে, বিষয়টি বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারে থাকবে এবং দেশ পরিচালনার সুযোগ পেলে তিনি দেশকে মাদকমুক্ত করার সর্বাত্মক চেষ্টা করবেন। তিনি আরও বলেন, তরুণদের নানা ধরনের সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে জড়িত করা এবং কর্মসংস্থানের সৃষ্টি করা গেলে মাদকের আগ্রাসন কমে আসবে। নির্বাচনের পর বিপুল বিজয় লাভ করে তারেক রহমান এখন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেশ পরিচালনা করছেন এবং তার সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে প্রথম পদক্ষেপ হিসেবেই আইজিপিকে মাদক নির্মূলে কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন। আইজিপি আলী হোসেন ফকিরের নেতৃত্বে ইতোমধ্যে দেশজুড়ে পুলিশের বিশেষ অভিযান শুরু হয়েছে, যা প্রধানমন্ত্রীর ‘সমাজে মাদক থাকবে না’—এই অদম্য ইচ্ছারই প্রতিফলন।