ঢাকা ০৯:৪৮ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ০১ মার্চ ২০২৬

ঐতিহ্য ও স্বাদে অনন্য: রমজানে দেশজুড়ে বাড়ছে নাটোরের হাতে ভাজা ‘বিষমুক্ত’ মুড়ির চাহিদা

রমজান মাসের ইফতারে মুড়ি এক অপরিহার্য অনুষঙ্গ। আর এই সময়ে ভোজনরসিকদের কাছে আলাদা কদর তৈরি করেছে নাটোরের হাতে ভাজা বিষমুক্ত মুড়ি। সদর উপজেলার কয়েকটি গ্রামের কারিগরদের নিপুণ হাতে তৈরি এই মুড়ি এখন স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে রাজধানীসহ সারা দেশে সমাদৃত হচ্ছে। কোনো ধরনের রাসায়নিক বা ক্ষতিকর উপাদান ব্যবহার না করায় সাধারণ মানুষের কাছে এটি ‘বিষমুক্ত মুড়ি’ হিসেবেই পরিচিতি পেয়েছে।

নাটোর সদর উপজেলার কৃষ্ণপুর, বাকসোর, গোয়ালদিঘী ও বারুইহাটিসহ ৪-৫টি গ্রামের প্রায় দুই শতাধিক পরিবার দীর্ঘ চার দশক ধরে এই পেশাকে আঁকড়ে ধরে জীবিকা নির্বাহ করছে। সরেজমিনে দেখা যায়, রমজান উপলক্ষে এসব গ্রামে ব্যস্ততা কয়েকগুণ বেড়েছে। গভীর রাত থেকে শুরু করে পরদিন দুপুর পর্যন্ত চলে মুড়ি ভাজার কর্মযজ্ঞ। কারিগররা জানান, প্রথমে ভালো মানের ধান বাছাই করে শুকানো হয়। এরপর নির্দিষ্ট নিয়মে সিদ্ধ ও পুনরায় শুকিয়ে চাল তৈরি করা হয়। সেই চাল গরম বালুর মধ্যে পরিমাণমতো লবণ মিশিয়ে নিপুণ হাতে তৈরি করা হয় মচমচে মুড়ি।

মুড়ি কারিগরদের মতে, আধুনিক যন্ত্রচালিত কারখানায় উৎপাদিত মুড়ির সঙ্গে অসম প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারিগর আরিফা বেগম ও আব্দুল মোমিন জানান, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং কাঁচামালের চড়া দামের কারণে এখন আর আগের মতো লাভ হয় না। বর্তমানে প্রতি মণ ধান ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকায় কিনতে হলেও উৎপাদিত মুড়ি পাইকারি বাজারে ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৪ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কঠোর পরিশ্রমের তুলনায় এই মুনাফা খুবই সামান্য। তবুও বাপ-দাদার এই ঐতিহ্যবাহী পেশাকে টিকিয়ে রাখতে তারা দিনরাত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন।

ব্যবসায়ীরা জানান, নাটোর-বগুড়া মহাসড়কের ডাল সড়ক এলাকায় গড়ে উঠেছে এই মুড়ির বিশাল পাইকারি বাজার। এখান থেকেই ট্রাকে করে মুড়ি চলে যায় ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। স্থানীয় আড়তদারদের তথ্যমতে, বছরের অন্য সময় প্রতিদিন গড়ে ৩৫ থেকে ৪০ মণ মুড়ি বাজারে এলেও রমজানে তা বেড়ে ৭০ থেকে ৮০ মণে দাঁড়ায়। তবে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা পেলে এই গ্রামীণ শিল্প আরও বিকশিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

নাটোর সদর উপজেলা প্রশাসন এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে ইতিবাচক পদক্ষেপের আশ্বাস দিয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আরিফ আদনান জানান, বিষমুক্ত এই মুড়ির ঐতিহ্য ধরে রাখতে কারিগরদের প্রশিক্ষণের পাশাপাশি বাজারজাতকরণ প্রক্রিয়া সহজ করার বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হবে।

স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, কৃষ্ণপুরের এই হাতে ভাজা মুড়ি কেবল একটি খাদ্যপণ্য নয়, বরং এটি একটি গ্রামীণ জনপদের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। আধুনিকতার ভিড়ে এই প্রাচীন ও স্বাস্থ্যসম্মত শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে সরকারি ও বেসরকারি সহযোগিতা এখন সময়ের দাবি।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

জমি বিরোধে পীরগাছায় বৃদ্ধ খুন, আহত ২

ঐতিহ্য ও স্বাদে অনন্য: রমজানে দেশজুড়ে বাড়ছে নাটোরের হাতে ভাজা ‘বিষমুক্ত’ মুড়ির চাহিদা

আপডেট সময় : ০৬:১৬:৫৯ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১ মার্চ ২০২৬

রমজান মাসের ইফতারে মুড়ি এক অপরিহার্য অনুষঙ্গ। আর এই সময়ে ভোজনরসিকদের কাছে আলাদা কদর তৈরি করেছে নাটোরের হাতে ভাজা বিষমুক্ত মুড়ি। সদর উপজেলার কয়েকটি গ্রামের কারিগরদের নিপুণ হাতে তৈরি এই মুড়ি এখন স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে রাজধানীসহ সারা দেশে সমাদৃত হচ্ছে। কোনো ধরনের রাসায়নিক বা ক্ষতিকর উপাদান ব্যবহার না করায় সাধারণ মানুষের কাছে এটি ‘বিষমুক্ত মুড়ি’ হিসেবেই পরিচিতি পেয়েছে।

নাটোর সদর উপজেলার কৃষ্ণপুর, বাকসোর, গোয়ালদিঘী ও বারুইহাটিসহ ৪-৫টি গ্রামের প্রায় দুই শতাধিক পরিবার দীর্ঘ চার দশক ধরে এই পেশাকে আঁকড়ে ধরে জীবিকা নির্বাহ করছে। সরেজমিনে দেখা যায়, রমজান উপলক্ষে এসব গ্রামে ব্যস্ততা কয়েকগুণ বেড়েছে। গভীর রাত থেকে শুরু করে পরদিন দুপুর পর্যন্ত চলে মুড়ি ভাজার কর্মযজ্ঞ। কারিগররা জানান, প্রথমে ভালো মানের ধান বাছাই করে শুকানো হয়। এরপর নির্দিষ্ট নিয়মে সিদ্ধ ও পুনরায় শুকিয়ে চাল তৈরি করা হয়। সেই চাল গরম বালুর মধ্যে পরিমাণমতো লবণ মিশিয়ে নিপুণ হাতে তৈরি করা হয় মচমচে মুড়ি।

মুড়ি কারিগরদের মতে, আধুনিক যন্ত্রচালিত কারখানায় উৎপাদিত মুড়ির সঙ্গে অসম প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারিগর আরিফা বেগম ও আব্দুল মোমিন জানান, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং কাঁচামালের চড়া দামের কারণে এখন আর আগের মতো লাভ হয় না। বর্তমানে প্রতি মণ ধান ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকায় কিনতে হলেও উৎপাদিত মুড়ি পাইকারি বাজারে ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৪ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কঠোর পরিশ্রমের তুলনায় এই মুনাফা খুবই সামান্য। তবুও বাপ-দাদার এই ঐতিহ্যবাহী পেশাকে টিকিয়ে রাখতে তারা দিনরাত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন।

ব্যবসায়ীরা জানান, নাটোর-বগুড়া মহাসড়কের ডাল সড়ক এলাকায় গড়ে উঠেছে এই মুড়ির বিশাল পাইকারি বাজার। এখান থেকেই ট্রাকে করে মুড়ি চলে যায় ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। স্থানীয় আড়তদারদের তথ্যমতে, বছরের অন্য সময় প্রতিদিন গড়ে ৩৫ থেকে ৪০ মণ মুড়ি বাজারে এলেও রমজানে তা বেড়ে ৭০ থেকে ৮০ মণে দাঁড়ায়। তবে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা পেলে এই গ্রামীণ শিল্প আরও বিকশিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

নাটোর সদর উপজেলা প্রশাসন এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে ইতিবাচক পদক্ষেপের আশ্বাস দিয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আরিফ আদনান জানান, বিষমুক্ত এই মুড়ির ঐতিহ্য ধরে রাখতে কারিগরদের প্রশিক্ষণের পাশাপাশি বাজারজাতকরণ প্রক্রিয়া সহজ করার বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হবে।

স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, কৃষ্ণপুরের এই হাতে ভাজা মুড়ি কেবল একটি খাদ্যপণ্য নয়, বরং এটি একটি গ্রামীণ জনপদের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। আধুনিকতার ভিড়ে এই প্রাচীন ও স্বাস্থ্যসম্মত শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে সরকারি ও বেসরকারি সহযোগিতা এখন সময়ের দাবি।