ঢাকা ১১:৩৭ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

ভারতের বাঁধ নির্মাণে বিপন্ন পঞ্চগড়ের ৩৪ নদনদী: শুকিয়ে যাচ্ছে জীবনধারা

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ১০:০১:১৩ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ১ বার পড়া হয়েছে

ভারতের একতরফা বাঁধ নির্মাণের ফলে বাংলাদেশের পঞ্চগড় জেলার ছোট-বড় ৩৪টি নদনদী তার স্বাভাবিক গতিপ্রকৃতি হারিয়ে প্রায় মরা খালে পরিণত হয়েছে। এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়েছে জেলার জীববৈচিত্র্যের ওপর, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে গেছে আশঙ্কাজনকভাবে এবং কৃষি ক্ষেত্রে দেখা দিয়েছে তীব্র বিপর্যয়।

পঞ্চগড় জেলা সদরের চাকলাহাট ইউনিয়নের বুক চিরে বয়ে গেছে ‘যমুনা’ নদী। তবে এটি ভারতের মূল যমুনা নয়, বরং একটি স্থানীয় ছোট নদী যার দৈর্ঘ্য মাত্র আট কিলোমিটার। এই নদীটি চাকলাহাট ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল থেকে উৎপন্ন হয়ে কহরহাট এলাকার পাশ দিয়ে কুরুম নদীতে পতিত হয়েছে। পঞ্চগড় পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, নদীটির প্রস্থ প্রায় ৪৮ মিটার। স্থানীয়দের মতে, শতাব্দী প্রাচীন এই যমুনা নদীটি একসময় বর্ষার পাশাপাশি শুষ্ক মৌসুমেও যথেষ্ট পানি ধারণ করত। উজান থেকে আসা পানির প্রবল স্রোতে এটি সারাবছরই প্রাণবন্ত থাকত এবং বর্ষায় এর পানি লোকালয়েও প্রবেশ করত। এই নদীর পানি ব্যবহার করে দু’পাশের কয়েকটি গ্রামের মানুষ জীবিকা নির্বাহ করত এবং কৃষকরা শুষ্ক মৌসুমে রবি শস্য আবাদে এর ওপর নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু বর্তমানে পানিপ্রবাহ আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ায় নদীটি প্রায় মরা খালে পরিণত হয়েছে। বর্ষা ছাড়া বাকি সময় এটি দেখলে সরু খালের মতো মনে হয়। দু’পাশের পাড় ভেঙে যাওয়ায় এবং শুষ্ক মৌসুমে জলশূন্যতায় ধু ধু বালুচর ছাড়া আর কিছুই দেখা যায় না।

শুষ্ক মৌসুমে নদীপাড়ের কৃষকরা নদীর মাঝখানে সরু একটি নালা রেখে বাকি জমিতে বোরো ধানের চাষ করেন। এই চাষের জন্য বাড়তি সেচের প্রয়োজন হয় না। গ্রামের হতদরিদ্র কৃষকরা মূলত এই পদ্ধতিতেই বোরো চাষ করে থাকেন। তবে ফসল ঘরে তোলা নিয়েও অনিশ্চয়তা থাকে। অনেক সময় অসময়ে বৃষ্টিতে নদীর পানি বেড়ে গেলে পুরো ধানই তলিয়ে যায়, যা কৃষকদের জন্য চরম হতাশার কারণ হয়। আবার বৃষ্টি কিছুটা দেরিতে হলে তারা পাকা ধান ঘরে তুলতে পারেন।

নারায়ণপুর দেউনিয়াপাড়া গ্রামের বাসিন্দা হাফেজ মো. ইয়াকুব আলী জানান, “ছোটবেলা থেকেই এই নদীতে হেসে-খেলে বড় হয়েছি। বর্ষা ছাড়া এখন আর তেমন পানি থাকে না। মাঝে মধ্যে গর্তে কিছু পানি জমে পুকুরের মতো হয়, সেখানে দেশি মাছ পাওয়া যায়। আগে আমিও এই সময়টায় বোরো চাষ করতাম, এখন আমার বড় ভাই ও ভাইপোরা করছে। নদীটি খনন করা হলে আগের মতো প্রশস্ত হবে এবং জমাকৃত পানি দিয়ে রবি মৌসুমে চাষাবাদ করা সহজ হবে।”

পঞ্চগড় পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আশুতোষ বর্মন বলেন, “যমুনা পঞ্চগড়ের একটি ছোট নদী। স্থানীয়ভাবে উৎপন্ন হওয়ায় বর্ষা মৌসুম ছাড়া বছরের বাকি সময় এটি প্রায় পানি শূন্য থাকে। নদীটি খনন করা গেলে এখানে জলাধার সৃষ্টি হবে এবং সেই পানি ব্যবহার করে শুষ্ক মৌসুমে কৃষকরা বিভিন্ন ফসল আবাদ করতে পারবে।”

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

পারমাণবিক চুক্তি নিয়ে ধীরগতিতে ট্রাম্প অসন্তুষ্ট, সামরিক পদক্ষেপের ইঙ্গিত

ভারতের বাঁধ নির্মাণে বিপন্ন পঞ্চগড়ের ৩৪ নদনদী: শুকিয়ে যাচ্ছে জীবনধারা

আপডেট সময় : ১০:০১:১৩ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

ভারতের একতরফা বাঁধ নির্মাণের ফলে বাংলাদেশের পঞ্চগড় জেলার ছোট-বড় ৩৪টি নদনদী তার স্বাভাবিক গতিপ্রকৃতি হারিয়ে প্রায় মরা খালে পরিণত হয়েছে। এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়েছে জেলার জীববৈচিত্র্যের ওপর, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে গেছে আশঙ্কাজনকভাবে এবং কৃষি ক্ষেত্রে দেখা দিয়েছে তীব্র বিপর্যয়।

পঞ্চগড় জেলা সদরের চাকলাহাট ইউনিয়নের বুক চিরে বয়ে গেছে ‘যমুনা’ নদী। তবে এটি ভারতের মূল যমুনা নয়, বরং একটি স্থানীয় ছোট নদী যার দৈর্ঘ্য মাত্র আট কিলোমিটার। এই নদীটি চাকলাহাট ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল থেকে উৎপন্ন হয়ে কহরহাট এলাকার পাশ দিয়ে কুরুম নদীতে পতিত হয়েছে। পঞ্চগড় পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, নদীটির প্রস্থ প্রায় ৪৮ মিটার। স্থানীয়দের মতে, শতাব্দী প্রাচীন এই যমুনা নদীটি একসময় বর্ষার পাশাপাশি শুষ্ক মৌসুমেও যথেষ্ট পানি ধারণ করত। উজান থেকে আসা পানির প্রবল স্রোতে এটি সারাবছরই প্রাণবন্ত থাকত এবং বর্ষায় এর পানি লোকালয়েও প্রবেশ করত। এই নদীর পানি ব্যবহার করে দু’পাশের কয়েকটি গ্রামের মানুষ জীবিকা নির্বাহ করত এবং কৃষকরা শুষ্ক মৌসুমে রবি শস্য আবাদে এর ওপর নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু বর্তমানে পানিপ্রবাহ আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ায় নদীটি প্রায় মরা খালে পরিণত হয়েছে। বর্ষা ছাড়া বাকি সময় এটি দেখলে সরু খালের মতো মনে হয়। দু’পাশের পাড় ভেঙে যাওয়ায় এবং শুষ্ক মৌসুমে জলশূন্যতায় ধু ধু বালুচর ছাড়া আর কিছুই দেখা যায় না।

শুষ্ক মৌসুমে নদীপাড়ের কৃষকরা নদীর মাঝখানে সরু একটি নালা রেখে বাকি জমিতে বোরো ধানের চাষ করেন। এই চাষের জন্য বাড়তি সেচের প্রয়োজন হয় না। গ্রামের হতদরিদ্র কৃষকরা মূলত এই পদ্ধতিতেই বোরো চাষ করে থাকেন। তবে ফসল ঘরে তোলা নিয়েও অনিশ্চয়তা থাকে। অনেক সময় অসময়ে বৃষ্টিতে নদীর পানি বেড়ে গেলে পুরো ধানই তলিয়ে যায়, যা কৃষকদের জন্য চরম হতাশার কারণ হয়। আবার বৃষ্টি কিছুটা দেরিতে হলে তারা পাকা ধান ঘরে তুলতে পারেন।

নারায়ণপুর দেউনিয়াপাড়া গ্রামের বাসিন্দা হাফেজ মো. ইয়াকুব আলী জানান, “ছোটবেলা থেকেই এই নদীতে হেসে-খেলে বড় হয়েছি। বর্ষা ছাড়া এখন আর তেমন পানি থাকে না। মাঝে মধ্যে গর্তে কিছু পানি জমে পুকুরের মতো হয়, সেখানে দেশি মাছ পাওয়া যায়। আগে আমিও এই সময়টায় বোরো চাষ করতাম, এখন আমার বড় ভাই ও ভাইপোরা করছে। নদীটি খনন করা হলে আগের মতো প্রশস্ত হবে এবং জমাকৃত পানি দিয়ে রবি মৌসুমে চাষাবাদ করা সহজ হবে।”

পঞ্চগড় পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আশুতোষ বর্মন বলেন, “যমুনা পঞ্চগড়ের একটি ছোট নদী। স্থানীয়ভাবে উৎপন্ন হওয়ায় বর্ষা মৌসুম ছাড়া বছরের বাকি সময় এটি প্রায় পানি শূন্য থাকে। নদীটি খনন করা গেলে এখানে জলাধার সৃষ্টি হবে এবং সেই পানি ব্যবহার করে শুষ্ক মৌসুমে কৃষকরা বিভিন্ন ফসল আবাদ করতে পারবে।”