ঢাকা ০১:১৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

ঘন ঘন ভূমিকম্পে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা: এক মাসে ১০ বার দেশ কাঁপল

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ১১:৩১:৩০ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ১ বার পড়া হয়েছে

রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে আবারও মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে, যা জনমনে নতুন করে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার জন্ম দিয়েছে। গতকাল শুক্রবার দুপুর ১টা ৫২ মিনিটের দিকে এই কম্পন অনুভূত হয়। আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র জানিয়েছে, রিখটার স্কেলে এই ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল ৫ দশমিক ৪। এর উৎপত্তিস্থল ছিল সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলা, যা ঢাকা থেকে প্রায় ১৮৮ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। তবে, তাৎক্ষণিকভাবে কোনো হতাহত বা ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি।

চলতি মাসেই এটি নিয়ে দশমবারের মতো দেশ ভূমিকম্পে কেঁপে উঠল। এই অনবরত কম্পন সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রাকৃতিক দুর্যোগের আশঙ্কাকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের সহকারী আবহাওয়াবিদ ফারজানা সুলতানা জানিয়েছেন, কম্পনটি কয়েক সেকেন্ড স্থায়ী ছিল।

ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রুবাইয়াৎ কবীর এই ভূমিকম্পকে মাঝারি মাত্রার উল্লেখ করে বলেন, সাতক্ষীরার আশাশুনি অঞ্চল তুলনামূলকভাবে কম ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত এবং অতীতেও এখানে কম্পন অনুভূত হয়েছে। তিনি জানান, ঘন ঘন এমন কম্পন স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার অংশ এবং এতে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। তবে, তিনি সবাইকে ভূমিকম্প সংক্রান্ত করণীয় সম্পর্কে সচেতন থাকার পরামর্শ দিয়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএস অবশ্য উৎপত্তিস্থলে কম্পনের মাত্রা ৫ দশমিক ৩ বলে উল্লেখ করেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের সাবেক অধ্যাপক হুমায়ূন আখতারও উৎপত্তিস্থল সাতক্ষীরা বলে নিশ্চিত করেছেন এবং জানিয়েছেন যে কম্পনটি পরপর দু’দফায় অনুভূত হয়।

সাতক্ষীরা অঞ্চলের বাসিন্দারা বেশ জোরে ঝাঁকুনি অনুভব করেন এবং অনেকেই আতঙ্কিত হয়ে দ্রুত বাড়িঘর ছেড়ে রাস্তায় নেমে আসেন। প্রতিবেশী দেশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের কলকাতা ও অন্যান্য জেলাতেও এই কম্পন অনুভূত হয়েছে বলে জানা গেছে, যেখানে এর মাত্রা রিখটার স্কেলে ৫ রেকর্ড করা হয়।

এর আগে গত বুধবার রাতেও ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে একটি মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছিল, যার মাত্রা ছিল রিখটার স্কেলে ৫ দশমিক ১। সেটির উৎপত্তিস্থল ছিল মিয়ানমার।

এই নিয়ে চলতি মাসের ২৭ দিনে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মোট ১০ বার ভূকম্পন অনুভূত হয়েছে। যদিও অধিকাংশ কম্পনের মাত্রা মৃদু থেকে মাঝারি ছিল, তবুও এই ধারাবাহিকতা জনমনে এক ধরনের আতঙ্ক তৈরি করেছে। ইউএসজিএস এবং ইউরোপীয়-ভূমধ্যসাগরীয় সিসমোলজিক্যাল সেন্টার (ইএমএসসি)-এর তথ্য অনুযায়ী, এই মাসে ভূমিকম্পের সংখ্যা ১০-এ পৌঁছেছে।

এর আগের দিন, অর্থাৎ ২৬ ফেব্রুয়ারি দুপুর ১২টা ৪ মিনিটের দিকে আরেকটি ভূমিকম্পে দেশ কেঁপে ওঠে। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর জানায়, এর মাত্রা ছিল ৪ দশমিক ৬ এবং উৎপত্তিস্থল ছিল ভারতের সিকিম অঞ্চল।

চলতি মাসের প্রথম দিনও একটি মৃদু ভূকম্পন অনুভূত হয়েছিল, যার মাত্রা ছিল রিখটার স্কেলে ৩। এর উৎপত্তিস্থল ছিল সিলেট শহর থেকে পূর্ব-দক্ষিণ-পূর্বে। ৩ ফেব্রুয়ারি রাতে পরপর দুটি ভূমিকম্পে দেশের বিভিন্ন এলাকা কেঁপে ওঠে, যার মাত্রা ছিল যথাক্রমে ৫ দশমিক ৯ এবং ৫ দশমিক ২; উভয়টিরই উৎপত্তিস্থল ছিল মিয়ানমার। একই দিন ভোরে সাতক্ষীরার কলারোয়ায় ৪ দশমিক ১ মাত্রার আরেকটি ভূমিকম্প হয়। এছাড়া, ৯ ও ১০ ফেব্রুয়ারি সিলেটের গোয়াইনঘাটে দুটি কম্পন (মাত্রা ৩ দশমিক ৩ ও ৪) এবং ১৯ ফেব্রুয়ারি সুনামগঞ্জের ছাতকে ৪ দশমিক ১ মাত্রার ভূমিকম্প রেকর্ড করা হয়।

ঘন ঘন ভূমিকম্পের এই প্রেক্ষাপটে বিশেষজ্ঞরা বড় ধরনের দুর্যোগের ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। ভূতত্ত্ববিদদের মতে, বাংলাদেশ একটি ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলে অবস্থিত হওয়ায় ভবন নির্মাণে বিধিমালা কঠোরভাবে মেনে চলা এবং দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতি জোরদার করা অত্যন্ত জরুরি। তারা আরও বলেছেন যে, যদিও মৃদু কম্পনগুলো বড় ভূমিকম্পের পূর্বাভাস কিনা তা নিশ্চিত নয়, তবে এই সময়ে সতর্কতা অবলম্বন ও জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা অপরিহার্য।

উল্লেখ্য, গত বছরের ২১ নভেম্বর সকালে রাজধানীসহ দেশের অনেক জেলা একটি শক্তিশালী ভূমিকম্পে কেঁপে উঠেছিল। ইউএসজিএস-এর তথ্যমতে, রিখটার স্কেলে এর তীব্রতা ছিল ৫ দশমিক ৭ এবং কেন্দ্রস্থল ছিল নরসিংদী। বিগত বছরগুলোতে অনুভূত হওয়া ভূমিকম্পগুলোর মধ্যে এটি ছিল অন্যতম তীব্র। ওইদিনের ভূমিকম্পে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী ও গাজীপুরে তিন শিশুসহ ১১ জন নিহত এবং শতাধিক আহত হওয়ার পাশাপাশি ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। সেই দুর্যোগের সময় বহুতল ভবন থেকে নামতে গিয়ে অনেকে আহত হন এবং বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলোতে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। অনেক প্রত্যক্ষদর্শী সেই সময়ের তীব্র কম্পন সম্পর্কে তাদের অভূতপূর্ব অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

ইরানে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলা: তেহরানজুড়ে ভয়াবহ বিস্ফোরণ

ঘন ঘন ভূমিকম্পে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা: এক মাসে ১০ বার দেশ কাঁপল

আপডেট সময় : ১১:৩১:৩০ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে আবারও মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে, যা জনমনে নতুন করে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার জন্ম দিয়েছে। গতকাল শুক্রবার দুপুর ১টা ৫২ মিনিটের দিকে এই কম্পন অনুভূত হয়। আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র জানিয়েছে, রিখটার স্কেলে এই ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল ৫ দশমিক ৪। এর উৎপত্তিস্থল ছিল সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলা, যা ঢাকা থেকে প্রায় ১৮৮ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। তবে, তাৎক্ষণিকভাবে কোনো হতাহত বা ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি।

চলতি মাসেই এটি নিয়ে দশমবারের মতো দেশ ভূমিকম্পে কেঁপে উঠল। এই অনবরত কম্পন সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রাকৃতিক দুর্যোগের আশঙ্কাকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের সহকারী আবহাওয়াবিদ ফারজানা সুলতানা জানিয়েছেন, কম্পনটি কয়েক সেকেন্ড স্থায়ী ছিল।

ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রুবাইয়াৎ কবীর এই ভূমিকম্পকে মাঝারি মাত্রার উল্লেখ করে বলেন, সাতক্ষীরার আশাশুনি অঞ্চল তুলনামূলকভাবে কম ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত এবং অতীতেও এখানে কম্পন অনুভূত হয়েছে। তিনি জানান, ঘন ঘন এমন কম্পন স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার অংশ এবং এতে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। তবে, তিনি সবাইকে ভূমিকম্প সংক্রান্ত করণীয় সম্পর্কে সচেতন থাকার পরামর্শ দিয়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএস অবশ্য উৎপত্তিস্থলে কম্পনের মাত্রা ৫ দশমিক ৩ বলে উল্লেখ করেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের সাবেক অধ্যাপক হুমায়ূন আখতারও উৎপত্তিস্থল সাতক্ষীরা বলে নিশ্চিত করেছেন এবং জানিয়েছেন যে কম্পনটি পরপর দু’দফায় অনুভূত হয়।

সাতক্ষীরা অঞ্চলের বাসিন্দারা বেশ জোরে ঝাঁকুনি অনুভব করেন এবং অনেকেই আতঙ্কিত হয়ে দ্রুত বাড়িঘর ছেড়ে রাস্তায় নেমে আসেন। প্রতিবেশী দেশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের কলকাতা ও অন্যান্য জেলাতেও এই কম্পন অনুভূত হয়েছে বলে জানা গেছে, যেখানে এর মাত্রা রিখটার স্কেলে ৫ রেকর্ড করা হয়।

এর আগে গত বুধবার রাতেও ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে একটি মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছিল, যার মাত্রা ছিল রিখটার স্কেলে ৫ দশমিক ১। সেটির উৎপত্তিস্থল ছিল মিয়ানমার।

এই নিয়ে চলতি মাসের ২৭ দিনে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মোট ১০ বার ভূকম্পন অনুভূত হয়েছে। যদিও অধিকাংশ কম্পনের মাত্রা মৃদু থেকে মাঝারি ছিল, তবুও এই ধারাবাহিকতা জনমনে এক ধরনের আতঙ্ক তৈরি করেছে। ইউএসজিএস এবং ইউরোপীয়-ভূমধ্যসাগরীয় সিসমোলজিক্যাল সেন্টার (ইএমএসসি)-এর তথ্য অনুযায়ী, এই মাসে ভূমিকম্পের সংখ্যা ১০-এ পৌঁছেছে।

এর আগের দিন, অর্থাৎ ২৬ ফেব্রুয়ারি দুপুর ১২টা ৪ মিনিটের দিকে আরেকটি ভূমিকম্পে দেশ কেঁপে ওঠে। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর জানায়, এর মাত্রা ছিল ৪ দশমিক ৬ এবং উৎপত্তিস্থল ছিল ভারতের সিকিম অঞ্চল।

চলতি মাসের প্রথম দিনও একটি মৃদু ভূকম্পন অনুভূত হয়েছিল, যার মাত্রা ছিল রিখটার স্কেলে ৩। এর উৎপত্তিস্থল ছিল সিলেট শহর থেকে পূর্ব-দক্ষিণ-পূর্বে। ৩ ফেব্রুয়ারি রাতে পরপর দুটি ভূমিকম্পে দেশের বিভিন্ন এলাকা কেঁপে ওঠে, যার মাত্রা ছিল যথাক্রমে ৫ দশমিক ৯ এবং ৫ দশমিক ২; উভয়টিরই উৎপত্তিস্থল ছিল মিয়ানমার। একই দিন ভোরে সাতক্ষীরার কলারোয়ায় ৪ দশমিক ১ মাত্রার আরেকটি ভূমিকম্প হয়। এছাড়া, ৯ ও ১০ ফেব্রুয়ারি সিলেটের গোয়াইনঘাটে দুটি কম্পন (মাত্রা ৩ দশমিক ৩ ও ৪) এবং ১৯ ফেব্রুয়ারি সুনামগঞ্জের ছাতকে ৪ দশমিক ১ মাত্রার ভূমিকম্প রেকর্ড করা হয়।

ঘন ঘন ভূমিকম্পের এই প্রেক্ষাপটে বিশেষজ্ঞরা বড় ধরনের দুর্যোগের ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। ভূতত্ত্ববিদদের মতে, বাংলাদেশ একটি ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলে অবস্থিত হওয়ায় ভবন নির্মাণে বিধিমালা কঠোরভাবে মেনে চলা এবং দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতি জোরদার করা অত্যন্ত জরুরি। তারা আরও বলেছেন যে, যদিও মৃদু কম্পনগুলো বড় ভূমিকম্পের পূর্বাভাস কিনা তা নিশ্চিত নয়, তবে এই সময়ে সতর্কতা অবলম্বন ও জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা অপরিহার্য।

উল্লেখ্য, গত বছরের ২১ নভেম্বর সকালে রাজধানীসহ দেশের অনেক জেলা একটি শক্তিশালী ভূমিকম্পে কেঁপে উঠেছিল। ইউএসজিএস-এর তথ্যমতে, রিখটার স্কেলে এর তীব্রতা ছিল ৫ দশমিক ৭ এবং কেন্দ্রস্থল ছিল নরসিংদী। বিগত বছরগুলোতে অনুভূত হওয়া ভূমিকম্পগুলোর মধ্যে এটি ছিল অন্যতম তীব্র। ওইদিনের ভূমিকম্পে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী ও গাজীপুরে তিন শিশুসহ ১১ জন নিহত এবং শতাধিক আহত হওয়ার পাশাপাশি ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। সেই দুর্যোগের সময় বহুতল ভবন থেকে নামতে গিয়ে অনেকে আহত হন এবং বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলোতে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। অনেক প্রত্যক্ষদর্শী সেই সময়ের তীব্র কম্পন সম্পর্কে তাদের অভূতপূর্ব অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন।