ঢাকা ১১:২০ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

ঐতিহাসিক ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিলাসবহুল অধ্যায়ের সমাপ্তি

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৯:৩৮:২৭ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ১ বার পড়া হয়েছে

ভারতবর্ষে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের ভিত্তি স্থাপনকারী এবং বিশ্ব বাণিজ্যে একসময়ে প্রভাবশালী ভূমিকা পালনকারী ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি আবারও বন্ধ হয়ে গেল। দেউলিয়া ঘোষণার পর দীর্ঘদিনের আর্থিক সংকট কাটিয়ে উঠতে না পেরে প্রতিষ্ঠানটি তাদের বিলাসবহুল পণ্য বিক্রির কার্যক্রম স্থায়ীভাবে গুটিয়ে নিয়েছে। লন্ডনে একটি আধুনিক খুচরা ব্র্যান্ড হিসেবে নতুনভাবে যাত্রা শুরু করলেও শেষ পর্যন্ত টিকে থাকতে পারেনি ঐতিহাসিক এই বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানটি।

একসময় বিশ্বজুড়ে নিজেদের বাণিজ্য সাম্রাজ্য বিস্তার করা এই কোম্পানিটি ভারত ও এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে শোষণ, লুটপাট এবং নিপীড়নের জন্য কুখ্যাত। ইতিহাসের পাতায় তাই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নাম আজও বিতর্কিতভাবে উচ্চারিত হয়।

প্রায় দেড়শ বছর আগে, ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের পর ব্রিটিশ সরকারের হাতে ভারতের শাসনভার অর্পিত হওয়ার পর কোম্পানিটির প্রাথমিক বিলুপ্তি ঘটে। এরপর ১৮৫৮ সালে ভারতে সরাসরি ব্রিটিশ রাজত্বের শাসন শুরু হয়। তবে, ২০১০ সালে ব্রিটিশ-ভারতীয় ব্যবসায়ী সঞ্জীব মেহতা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নামের স্বত্ব কিনে নিয়ে লন্ডনে এটিকে পুনরুজ্জীবিত করেন। তিনি এই ঐতিহাসিক নামটিকে একটি আধুনিক বিলাসবহুল পণ্যের খুচরা ব্র্যান্ড হিসেবে নতুন পরিচিতি দেন।

ব্যবসায়ী সঞ্জীব মেহতা একবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে এই কোম্পানির স্বত্ব কেনার ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করেন। অবশেষে ২০১০ সালে লন্ডনের মেফেয়ারে একটি দোকানে তিনি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে নতুনভাবে চালু করেন। সেখানে উচ্চমানের চা, চকোলেট, মিষ্টান্ন, মশলা এবং অন্যান্য অভিজাত পণ্য বিক্রি করা হতো।

তবে, সাম্প্রতিক সময়ে ব্যবসাটি আবার বন্ধ হয়ে যায়। ব্রিটিশ গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে কোম্পানিটি লিকুইডেটর নিয়োগ করে। ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডসে নিবন্ধিত মূল প্রতিষ্ঠানের কাছে প্রায় ছয় লক্ষ পাউন্ডের বেশি দেনা জমেছিল। এছাড়াও, কর এবং কর্মীদের বকেয়া পাওনা পরিশোধের ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ বাকি ছিল। ফলে, লন্ডনের মেফেয়ারের বিখ্যাত দোকানটি বন্ধ হয়ে যায় এবং তাদের অনলাইন ওয়েবসাইটও অচল হয়ে পড়ে।

ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের সময়কালে, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বিশ্ব বাণিজ্যের ধারাকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করেছিল। কিন্তু তাদের কঠোর নীতি এবং শোষণের ফলে ভারতীয় উপমহাদেশে, বিশেষ করে বাংলায়, ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়, যেখানে আনুমানিক তিন কোটি মানুষের প্রাণহানি ঘটে।

২০১০ সালে যখন একজন ভারতীয় উদ্যোক্তা এই কোম্পানির স্বত্ব কিনে নেন, তখন অনেকেই এটিকে ঔপনিবেশিক অপশাসনের বিরুদ্ধে এক ধরনের প্রতিশোধ হিসেবে দেখেছিলেন। যে কোম্পানি একসময় ভারত শাসন করেছিল, সেই কোম্পানির মালিকানা এখন একজন ভারতীয়ের হাতে – এই বিষয়টি সে সময় বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ‘দ্য সানডে টাইমস’ জানিয়েছে যে, অবসায়ন প্রক্রিয়া শুরু করার জন্য ২০২৫ সালের অক্টোবরে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি লিমিটেড লিকুইডেটর নিয়োগ করে। মূল গ্রুপের কাছে কোম্পানির প্রায় ছয় লক্ষ পাউন্ডের বেশি দেনা ছাড়াও, কর বাবদ এক লক্ষ ৯৩ হাজার ৭৮৯ পাউন্ড এবং কর্মীদের পাওনা বাবদ দেড় লক্ষ পাউন্ডের বেশি অর্থ বকেয়া ছিল।

২০১৭ সালে এক সাক্ষাৎকারে সঞ্জীব মেহতা বলেছিলেন, “একজন ভারতীয় এখন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মালিক – এটাই প্রমাণ করে যে, নেতিবাচক বিষয়টি এখন ইতিবাচক হয়ে গেছে। ঐতিহাসিক ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি আগ্রাসনের ওপর দাঁড়িয়েছিল, কিন্তু আজকের ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সহমর্মিতার কথা বলে।”

ইতিহাস অনুসারে, উনিশ শতকের শুরুতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তাদের সামরিক শক্তির শিখরে পৌঁছেছিল। তাদের প্রায় আড়াই লক্ষ সৈন্যের নিজস্ব বাহিনী ছিল এবং ভারতের বিশাল অঞ্চল তাদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। মশলা, তুলা, রেশম, চা, নীলসহ বিভিন্ন পণ্যের বাণিজ্যে তারা বিশ্ববাজারে নেতৃত্ব দিত। তবে, তাদের এই সাফল্য অর্জিত হয়েছিল মূলত শোষণ এবং বঞ্চনার মাধ্যমে।

১৬০০ সালের ৩১ ডিসেম্বর রানি প্রথম এলিজাবেথের জারিকৃত রাজকীয় সনদের মাধ্যমে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির যাত্রা শুরু হয়। তখন ভারত ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলকে সম্মিলিতভাবে ‘ইস্ট ইন্ডিজ’ নামে অভিহিত করা হতো। প্রাথমিকভাবে, এটি একটি জয়েন্ট স্টক ট্রেডিং কোম্পানি হিসেবে মশলা, রেশম, তুলা এবং অন্যান্য মূল্যবান পণ্যের বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। বিনিয়োগকারীরা শেয়ার ক্রয়ের মাধ্যমে লাভ-ক্ষতিতে অংশ নিতে পারতেন, যা সেই যুগে একটি অত্যন্ত আধুনিক ব্যবসায়িক কাঠামো ছিল।

১৬১২-১৩ সালে কোম্পানিটি ভারতের সুরাটে তাদের প্রথম বাণিজ্যকেন্দ্র স্থাপন করে। পরবর্তীকালে, কেপ অব গুড হোপের পূর্বাঞ্চলে ব্রিটিশ বাণিজ্যে একচেটিয়া অধিকার লাভের মাধ্যমে তাদের প্রভাব দ্রুত বিস্তৃত হয়। অষ্টাদশ শতাব্দীর শুরুতে, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কেবল একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানই ছিল না, বরং একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক ও সামরিক শক্তিতে পরিণত হয়েছিল। ভারতের বিভিন্ন স্থানে দুর্গ নির্মাণ, স্থানীয় শাসকদের সাথে জোট এবং ফরাসিদের মতো প্রতিদ্বন্দ্বী ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধের মাধ্যমে তারা নিজেদের আধিপত্য সুসংহত করে।

১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধ ছিল তাদের ক্ষমতা বিস্তারের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়। এরপর কোম্পানিটি বাংলাসহ বিস্তীর্ণ অঞ্চলে শাসন ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করে। তারা কর আদায়, বিচারব্যবস্থা পরিচালনা এবং প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা শুরু করে, যার ফলে একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের বদলে তারা একটি শাসক শক্তিতে রূপান্তরিত হয়। এক পর্যায়ে, বিশ্ব বাণিজ্যের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ, বিশেষ করে নির্দিষ্ট কিছু পণ্যে, প্রায় অর্ধেক নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে চলে যায়।

তবে, এই বিস্তারের পেছনে ছিল চরম শোষণ, কৃষকদের নীলসহ অর্থকরী ফসল চাষে বাধ্য করা এবং রপ্তানি-নির্ভর কঠোর নীতি। এর ফলে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ ও জনদুর্ভোগ দেখা দেয়। অবশেষে, ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের পর কোম্পানির শাসনের অবসান ঘটে এবং ভারতের শাসনভার সরাসরি ব্রিটিশ সরকারের হাতে ন্যস্ত হয়। পরবর্তীকালে, ১৮৭৪ সালে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট আনুষ্ঠানিকভাবে কোম্পানিটিকে বিলুপ্ত ঘোষণা করে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

আফগানিস্তানের পক্ষ থেকে পাকিস্তানের প্রতি শান্তি আলোচনার প্রস্তাব

ঐতিহাসিক ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিলাসবহুল অধ্যায়ের সমাপ্তি

আপডেট সময় : ০৯:৩৮:২৭ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

ভারতবর্ষে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের ভিত্তি স্থাপনকারী এবং বিশ্ব বাণিজ্যে একসময়ে প্রভাবশালী ভূমিকা পালনকারী ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি আবারও বন্ধ হয়ে গেল। দেউলিয়া ঘোষণার পর দীর্ঘদিনের আর্থিক সংকট কাটিয়ে উঠতে না পেরে প্রতিষ্ঠানটি তাদের বিলাসবহুল পণ্য বিক্রির কার্যক্রম স্থায়ীভাবে গুটিয়ে নিয়েছে। লন্ডনে একটি আধুনিক খুচরা ব্র্যান্ড হিসেবে নতুনভাবে যাত্রা শুরু করলেও শেষ পর্যন্ত টিকে থাকতে পারেনি ঐতিহাসিক এই বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানটি।

একসময় বিশ্বজুড়ে নিজেদের বাণিজ্য সাম্রাজ্য বিস্তার করা এই কোম্পানিটি ভারত ও এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে শোষণ, লুটপাট এবং নিপীড়নের জন্য কুখ্যাত। ইতিহাসের পাতায় তাই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নাম আজও বিতর্কিতভাবে উচ্চারিত হয়।

প্রায় দেড়শ বছর আগে, ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের পর ব্রিটিশ সরকারের হাতে ভারতের শাসনভার অর্পিত হওয়ার পর কোম্পানিটির প্রাথমিক বিলুপ্তি ঘটে। এরপর ১৮৫৮ সালে ভারতে সরাসরি ব্রিটিশ রাজত্বের শাসন শুরু হয়। তবে, ২০১০ সালে ব্রিটিশ-ভারতীয় ব্যবসায়ী সঞ্জীব মেহতা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নামের স্বত্ব কিনে নিয়ে লন্ডনে এটিকে পুনরুজ্জীবিত করেন। তিনি এই ঐতিহাসিক নামটিকে একটি আধুনিক বিলাসবহুল পণ্যের খুচরা ব্র্যান্ড হিসেবে নতুন পরিচিতি দেন।

ব্যবসায়ী সঞ্জীব মেহতা একবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে এই কোম্পানির স্বত্ব কেনার ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করেন। অবশেষে ২০১০ সালে লন্ডনের মেফেয়ারে একটি দোকানে তিনি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে নতুনভাবে চালু করেন। সেখানে উচ্চমানের চা, চকোলেট, মিষ্টান্ন, মশলা এবং অন্যান্য অভিজাত পণ্য বিক্রি করা হতো।

তবে, সাম্প্রতিক সময়ে ব্যবসাটি আবার বন্ধ হয়ে যায়। ব্রিটিশ গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে কোম্পানিটি লিকুইডেটর নিয়োগ করে। ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডসে নিবন্ধিত মূল প্রতিষ্ঠানের কাছে প্রায় ছয় লক্ষ পাউন্ডের বেশি দেনা জমেছিল। এছাড়াও, কর এবং কর্মীদের বকেয়া পাওনা পরিশোধের ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ বাকি ছিল। ফলে, লন্ডনের মেফেয়ারের বিখ্যাত দোকানটি বন্ধ হয়ে যায় এবং তাদের অনলাইন ওয়েবসাইটও অচল হয়ে পড়ে।

ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের সময়কালে, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বিশ্ব বাণিজ্যের ধারাকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করেছিল। কিন্তু তাদের কঠোর নীতি এবং শোষণের ফলে ভারতীয় উপমহাদেশে, বিশেষ করে বাংলায়, ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়, যেখানে আনুমানিক তিন কোটি মানুষের প্রাণহানি ঘটে।

২০১০ সালে যখন একজন ভারতীয় উদ্যোক্তা এই কোম্পানির স্বত্ব কিনে নেন, তখন অনেকেই এটিকে ঔপনিবেশিক অপশাসনের বিরুদ্ধে এক ধরনের প্রতিশোধ হিসেবে দেখেছিলেন। যে কোম্পানি একসময় ভারত শাসন করেছিল, সেই কোম্পানির মালিকানা এখন একজন ভারতীয়ের হাতে – এই বিষয়টি সে সময় বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ‘দ্য সানডে টাইমস’ জানিয়েছে যে, অবসায়ন প্রক্রিয়া শুরু করার জন্য ২০২৫ সালের অক্টোবরে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি লিমিটেড লিকুইডেটর নিয়োগ করে। মূল গ্রুপের কাছে কোম্পানির প্রায় ছয় লক্ষ পাউন্ডের বেশি দেনা ছাড়াও, কর বাবদ এক লক্ষ ৯৩ হাজার ৭৮৯ পাউন্ড এবং কর্মীদের পাওনা বাবদ দেড় লক্ষ পাউন্ডের বেশি অর্থ বকেয়া ছিল।

২০১৭ সালে এক সাক্ষাৎকারে সঞ্জীব মেহতা বলেছিলেন, “একজন ভারতীয় এখন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মালিক – এটাই প্রমাণ করে যে, নেতিবাচক বিষয়টি এখন ইতিবাচক হয়ে গেছে। ঐতিহাসিক ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি আগ্রাসনের ওপর দাঁড়িয়েছিল, কিন্তু আজকের ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সহমর্মিতার কথা বলে।”

ইতিহাস অনুসারে, উনিশ শতকের শুরুতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তাদের সামরিক শক্তির শিখরে পৌঁছেছিল। তাদের প্রায় আড়াই লক্ষ সৈন্যের নিজস্ব বাহিনী ছিল এবং ভারতের বিশাল অঞ্চল তাদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। মশলা, তুলা, রেশম, চা, নীলসহ বিভিন্ন পণ্যের বাণিজ্যে তারা বিশ্ববাজারে নেতৃত্ব দিত। তবে, তাদের এই সাফল্য অর্জিত হয়েছিল মূলত শোষণ এবং বঞ্চনার মাধ্যমে।

১৬০০ সালের ৩১ ডিসেম্বর রানি প্রথম এলিজাবেথের জারিকৃত রাজকীয় সনদের মাধ্যমে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির যাত্রা শুরু হয়। তখন ভারত ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলকে সম্মিলিতভাবে ‘ইস্ট ইন্ডিজ’ নামে অভিহিত করা হতো। প্রাথমিকভাবে, এটি একটি জয়েন্ট স্টক ট্রেডিং কোম্পানি হিসেবে মশলা, রেশম, তুলা এবং অন্যান্য মূল্যবান পণ্যের বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। বিনিয়োগকারীরা শেয়ার ক্রয়ের মাধ্যমে লাভ-ক্ষতিতে অংশ নিতে পারতেন, যা সেই যুগে একটি অত্যন্ত আধুনিক ব্যবসায়িক কাঠামো ছিল।

১৬১২-১৩ সালে কোম্পানিটি ভারতের সুরাটে তাদের প্রথম বাণিজ্যকেন্দ্র স্থাপন করে। পরবর্তীকালে, কেপ অব গুড হোপের পূর্বাঞ্চলে ব্রিটিশ বাণিজ্যে একচেটিয়া অধিকার লাভের মাধ্যমে তাদের প্রভাব দ্রুত বিস্তৃত হয়। অষ্টাদশ শতাব্দীর শুরুতে, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কেবল একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানই ছিল না, বরং একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক ও সামরিক শক্তিতে পরিণত হয়েছিল। ভারতের বিভিন্ন স্থানে দুর্গ নির্মাণ, স্থানীয় শাসকদের সাথে জোট এবং ফরাসিদের মতো প্রতিদ্বন্দ্বী ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধের মাধ্যমে তারা নিজেদের আধিপত্য সুসংহত করে।

১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধ ছিল তাদের ক্ষমতা বিস্তারের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়। এরপর কোম্পানিটি বাংলাসহ বিস্তীর্ণ অঞ্চলে শাসন ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করে। তারা কর আদায়, বিচারব্যবস্থা পরিচালনা এবং প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা শুরু করে, যার ফলে একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের বদলে তারা একটি শাসক শক্তিতে রূপান্তরিত হয়। এক পর্যায়ে, বিশ্ব বাণিজ্যের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ, বিশেষ করে নির্দিষ্ট কিছু পণ্যে, প্রায় অর্ধেক নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে চলে যায়।

তবে, এই বিস্তারের পেছনে ছিল চরম শোষণ, কৃষকদের নীলসহ অর্থকরী ফসল চাষে বাধ্য করা এবং রপ্তানি-নির্ভর কঠোর নীতি। এর ফলে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ ও জনদুর্ভোগ দেখা দেয়। অবশেষে, ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের পর কোম্পানির শাসনের অবসান ঘটে এবং ভারতের শাসনভার সরাসরি ব্রিটিশ সরকারের হাতে ন্যস্ত হয়। পরবর্তীকালে, ১৮৭৪ সালে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট আনুষ্ঠানিকভাবে কোম্পানিটিকে বিলুপ্ত ঘোষণা করে।