## ঢাকার ইতিহাস ও সংস্কৃতির নিবেদিত প্রাণ: হাকিম হাবিবুর রহমান
ঢাকা, [আজকের তারিখ]: হাজার বছরের ঐতিহ্যের ধারক ঢাকা শহর তার অলিগলিতে ধারণ করে রেখেছে অজস্র স্মৃতি ও ইতিহাস। বাংলার স্বাধীন সুলতানদের রাজধানী সোনারগাঁয়ের সহোদরা হিসেবে গড়ে ওঠা এই নগরী তার দীর্ঘ পরিক্রমায় দেখেছে অনেক উত্থান-পতন, সহ্য করেছে অনেক ঘাত-প্রতিঘাত। এমন এক ঐতিহাসিক নগরীর সমৃদ্ধ সংস্কৃতি ও সভ্যতার ইতিহাস রচনায় এক অবিস্মরণীয় নাম হাকিম হাবিবুর রহমান। যিনি ছিলেন ঢাকার বুকে ইতিহাস চর্চা, জ্ঞান বিতরণ এবং ঐতিহ্য সংরক্ষণে নিবেদিত এক প্রাণ।
জ্ঞানান্বেষীfrom the outset: শিক্ষাজীবন ও চিকিৎসাশাস্ত্র
হাকিম হাবিবুর রহমানের জন্ম ১৮৮১ সালে ঢাকার ছোট কাটরায়। তিনি ছিলেন বংশগতভাবে তৎকালীন সীমান্ত প্রদেশের ইয়াগিস্তানের ইউসুফজাই পরিবারের সদস্য। তার বাবা মাওলানা মুহাম্মদ শাহ আখুন্দজাদাহ জীবিকার সন্ধানে ঢাকায় এসে বসতি স্থাপন করেন। হাকিম হাবিবুর রহমানের শিক্ষাজীবন ছিল বৈচিত্র্যময়। তিনি যেমন ধর্মীয় শিক্ষায় পারদর্শী ছিলেন, তেমনি ইউনানি চিকিৎসা শাস্ত্রেও অর্জন করেছিলেন গভীর জ্ঞান ও দক্ষতা। মাত্র ১৩ বছর বয়সে তিনি ধর্মীয় শিক্ষার জন্য কানপুর যান। এরপর ইউনানি চিকিৎসাবিদ্যা অধ্যয়নের জন্য লখনৌ ও দিল্লি ভ্রমণ করেন। ১৮৯৯ সালে আগ্রায় গিয়ে তিনি ‘তিব্বে ইসলামি’র পাঠ সম্পন্ন করেন। প্রায় ১১ বছর কানপুর, লখনৌ, দিল্লি ও আগ্রায় ধর্ম ও চিকিৎসাবিদ্যায় জ্ঞান অর্জনের পর ১৯০৪ সালে তিনি ঢাকায় ফিরে আসেন।
চিকিৎসক থেকে সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব
ঢাকায় ফিরে এসে হাকিম হাবিবুর রহমান চিকিৎসাসেবা শুরু করেন এবং অল্প সময়েই হাকিমি চিকিৎসায় খ্যাতি অর্জন করেন। তৎকালীন ঢাকা নবাব পরিবারের সঙ্গে তার গভীর সখ্য ছিল এবং তিনি নবাব পরিবারের পারিবারিক চিকিৎসক হিসেবেও নিযুক্ত হন। নবাব স্যার সলিমুল্লাহর সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতার সুবাদে তিনি নবাব সাহেবের রাজনীতি ও শিক্ষা আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ হন। চিকিৎসা সেবার পাশাপাশি তিনি সাংবাদিকতা, রাজনীতি, শিক্ষা আন্দোলন এবং বিশেষ করে ইতিহাস চর্চায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।
ইতিহাসের প্রতি অদম্য অনুরাগ ও মূল্যবান অবদান
হাকিম হাবিবুর রহমান ছিলেন স্বভাবগতভাবেই একজন ইতিহাসানুরাগী। ছোটবেলা থেকেই ঐতিহাসিক তথ্য সংগ্রহের প্রতি তার ছিল প্রবল ঝোঁক। তিনি নিজেই উল্লেখ করেছেন যে, দশ বছর বয়সেই তিনি কয়েকটি মসজিদের ইতিহাস লিখে ফেলেছিলেন। তার রচিত প্রায় সব গ্রন্থই ইতিহাস বিষয়ক। ‘হায়াতে সুকরাত’, ‘আসুদেগানে ঢাকা’, ‘ঢাকা পচাস বরস পহলে’, ‘মাসাজিদে ঢাকা’, ‘কুছ পুরানী বাতে’, ‘ঢাকে কী তারিখি ইমারত’, ‘সালাসা গাসসালা’ সহ তার অসংখ্য রচনা ঢাকার ইতিহাস ও সংস্কৃতির অমূল্য দলিল।
বিশেষ করে, তার রচিত ‘আসুদেগানে ঢাকা’ গ্রন্থে তিনি শুধু ঢাকার মাজার, দরগাহ ও কবরসমূহের ইতিবৃত্তই তুলে ধরেননি, বরং ঢাকার ইসলাম প্রচারক পীর-দরবেশ, গাউস-কুতুব, আলেম-ফাজিল, কবি-সাহিত্যিক, শাসক-প্রশাসকদের জীবনও বিশদভাবে বর্ণনা করেছেন।
তার আরেকটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ ‘ঢাকা পচাস বরস পহলে’। উনিশ শতকের শেষভাগ এবং বিশ শতকের প্রথমার্ধে ঢাকার সাংস্কৃতিক ইতিহাস বিষয়ক এটিই একমাত্র গ্রন্থ। এই গ্রন্থে ঢাকার কৃষ্টি, সভ্যতা, গান-বাজনা, রঙ্গ-রসিকতা, নাট্যাভিনয়, কবিতার আসর, মেলা-প্রদর্শনী, উৎসব, ধর্মীয় জীবন, খেলাধুলা, পোশাক-পরিচ্ছদ, আতিথেয়তা, পানাহার, খাদ্যাভ্যাস, মিষ্টান্নের বৈচিত্র্যসহ নাগরিক জীবনের প্রায় সকল দিক হৃদয়গ্রাহী ও প্রাঞ্জল ভাষায় বিবৃত হয়েছে। প্রায় পৌনে এক শতাব্দীর (১৮৭৫-১৯৪৭) ঢাকার এমন একটি পূর্ণাঙ্গ সাংস্কৃতিক ও আংশিক সামাজিক ইতিহাস আজও বিরল।
প্রত্নতত্ত্ব সংগ্রহ ও জ্ঞান বিতরণে অসামান্য ভূমিকা
পুরোনো মুদ্রা ও শিলালিপি সংগ্রহের প্রতি হাকিম হাবিবুর রহমানের ছিল গভীর অনুরাগ। তার এই শখ কেবল ব্যক্তিগত আনন্দেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং এটি ছিল তার অন্তর্নিহিত ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক মনোভাবেরই এক উজ্জ্বল প্রকাশ। অত্যন্ত যত্ন ও নিষ্ঠার সঙ্গে তিনি দুশোরও অধিক দুষ্প্রাপ্য মুদ্রা সংগ্রহ করে সংরক্ষণ করেছিলেন। ১৯৩৩ সালে তিনি তার এই মূল্যবান সংগ্রহ ঢাকার জাদুঘরে দান করেন। তার এই দানের গুরুত্ব অনুধাবন করে জাদুঘর কর্তৃপক্ষ ১৯৩৬ সালে মুদ্রাগুলোর একটি ক্যাটালগ প্রকাশ করে।
শুধু তাই নয়, মরহুম হাকিম হাবিবুর রহমানের অসিয়ত অনুসারে তার সুবিশাল ব্যক্তিগত গ্রন্থাগারটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে দান করা হয়। যা বর্তমানে ‘হাবিবুর রহমান কালেকশন’ (H. R. C.) নামে পরিচিত। এই সংগ্রহে রয়েছে উর্দু ও ফারসি ভাষার ৩৩টি দুর্লভ পাণ্ডুলিপি, এক হাজারেরও অধিক উর্দু বই, চার শতাধিক ফারসি গ্রন্থ এবং প্রায় পাঁচশ আরবি কিতাব। দুই হাজারেরও বেশি ছোট-বড় গ্রন্থ তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে দান করে গেছেন। এই অমূল্য সংগ্রহ বাংলাদেশের আরবি, ফারসি ও উর্দু সাহিত্য নিয়ে গবেষণার জন্য এক অপরিহার্য সম্পদে পরিণত হয়েছে।
জ্ঞানচর্চা ও ঐতিহ্য সংরক্ষণে হাকিম হাবিবুর রহমানের এই অনন্য অবদান তাকে ইতিহাসের পাতায় চিরস্মরণীয় করে রেখেছে। তিনি শুধু একজন চিকিৎসকই ছিলেন না, ছিলেন ঢাকার ইতিহাস ও সংস্কৃতির এক নিবেদিতপ্রাণ সাধক, যার কর্ম ও লেখনী আগামী প্রজন্মের জন্য এক অমূল্য উত্তরাধিকার।
রিপোর্টারের নাম 





















