## বাণিজ্য ও সামরিক বিজয়: বাংলায় ইসলামের আগমনের প্রেক্ষাপট
ঢাকা: ৭১২ খ্রিস্টাব্দে উমাইয়া খলিফা ওয়ালিদের শাসনামলে মুহাম্মদ বিন কাসিমের সিন্ধু বিজয় স্থলপথে উপমহাদেশে ইসলামের আগমনের পথ উন্মুক্ত করে। বর্তমান পাকিস্তানের দেবল বন্দরের কাছে আরব জাহাজ লুণ্ঠনের জেরে এই অভিযান সংঘটিত হয়েছিল। যদিও বিন কাসিমের শাসনকাল দীর্ঘস্থায়ী হয়নি, তবে এটি এই অঞ্চলে নতুন ধর্ম ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয় এবং ভারতীয় উপমহাদেশে ইসলামের বিস্তারের ভিত্তি স্থাপন করে।
মুহাম্মদ বিন কাসিমের সিন্ধু বিজয় সরাসরি বাংলায় প্রভাব ফেলতে না পারলেও, ইসলামের প্রভাব উপমহাদেশের অন্যান্য অঞ্চলের মতো বাংলাকেও স্পর্শ করেছিল। এই অভিযানের মূলে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।
পরবর্তীতে, গজনীর সুলতান মাহমুদ গজনবী (৯৯৭-১০৩০ খ্রিস্টাব্দ) স্থলপথে ইসলামের প্রত্যক্ষ যোগাযোগ স্থাপনে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১০০০ থেকে ১০২৬ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে তিনি ১৭ বার এই অঞ্চলে অভিযান পরিচালনা করেন বলে ধারণা করা হয়। যদিও তিনি প্রতিটি অভিযানে বিজয় লাভ করেন, তবে জয়কৃত অঞ্চলে স্থায়ী শাসন প্রতিষ্ঠা করেননি। তার অভিযানের মূল উদ্দেশ্য ছিল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক। সদ্য প্রতিষ্ঠিত গজনি সাম্রাজ্যকে সুদৃঢ় করা, নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা, মুসলিম বিশ্বের অন্য শাসকদের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ, শিল্প ও সংস্কৃতির জন্য তহবিল সংগ্রহ এবং ভাড়াটে সৈন্যদের পারিশ্রমিক দেওয়া—এসব কারণেই তিনি ভারতে বারবার অভিযান পরিচালনা করেছিলেন। ভারত ছিল সে সময় সম্পদের এক বিশাল ভান্ডার, ফলে সুলতান মাহমুদ বিপুল ধনসম্পদ নিয়ে নিজ রাজ্যে প্রত্যাবর্তন করতেন, কিন্তু ভারতে স্থায়ী রাজ্য প্রতিষ্ঠার কোনো উদ্দেশ্য তার ছিল না।
রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ হাসিলের এই অভিযানের মাধ্যমে উপমহাদেশ, যার মধ্যে বাংলাও অন্তর্ভুক্ত ছিল, সরাসরি ইসলামের অনুসারী জনগোষ্ঠীর সংস্পর্শে আসে। এর ফলে উপমহাদেশের সমাজ জীবনে গভীর প্রভাব পড়ে এবং বহু হিন্দু ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে।
তৃতীয়ত, ১১৯২ খ্রিস্টাব্দে তরাইনের দ্বিতীয় যুদ্ধে রাজপুত নেতা পৃথ্বীরাজকে পরাজিত করার মাধ্যমে মুহাম্মদ ঘুরি উপমহাদেশে মুসলমানদের প্রত্যক্ষ শাসন প্রতিষ্ঠা করেন। এই যুদ্ধ ভারতের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয় এবং এটি উপমহাদেশে মুসলমানদের চূড়ান্ত বিজয় নিশ্চিত করে। এই বিজয়ের পর মুহাম্মদ ঘুরির প্রতিনিধি কুতুবউদ্দিন আইবেক ১১৯৩ খ্রিস্টাব্দে দিল্লিতে নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠা করেন এবং ধীরে ধীরে উপমহাদেশের অন্যান্য অঞ্চলে শাসন বিস্তার করতে থাকেন। ১২০৬ খ্রিস্টাব্দে তিনি স্বাধীনভাবে দিল্লিতে মুসলিম সালতানাত প্রতিষ্ঠা করেন।
একই সময়ে, মুহাম্মদ ঘুরির সঙ্গে ভারতে আগত তরুণ সেনানায়ক ইখতিয়ারউদ্দিন মুহাম্মদ বখতিয়ার খলজি ১২০২-০৩ খ্রিস্টাব্দে বৌদ্ধদের দুর্গবদ্ধ বিহার (তৎকালীন মগধ) দখল করেন। বৌদ্ধ ভিক্ষুদের পরাজিত করার পর বখতিয়ার খলজির সামনে বাংলা জয়ের দ্বার উন্মুক্ত হয়ে যায়। সে সময় বাংলার শাসক ছিলেন সেন বংশের রাজা লক্ষ্মণ সেন। পরবর্তী বছর, অর্থাৎ ১২০৪ খ্রিস্টাব্দে বখতিয়ার খলজি নদীয়ায় অগ্রসর হয়ে রাজা লক্ষ্মণ সেনকে পরাজিত করে বাংলার একাংশ দখল করেন।
বখতিয়ার খলজি ছিলেন মূলত একজন ভাগ্যান্বেষী ব্যক্তি। কুতুবউদ্দিন আইবেকের সেনাবাহিনীতে যোগদানের সুযোগ না পেয়ে তিনি অযোধ্যায় চলে আসেন এবং মালিক হুসামউদ্দিনের অধীনে দুটি পরগনা জায়গির হিসেবে লাভ করেন। তার উদ্দেশ্য ছিল প্রতিবেশী রাজ্যগুলো আক্রমণ করে ধনসম্পদ আহরণ করা এবং উন্নত ভাগ্যের সন্ধানে ভারতে আগত খলজি আমিরদের নিয়ে একটি শক্তিশালী বাহিনী গড়ে তোলা। অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি তুর্কি বীরদের একটি দল সংগঠিত করে শক্তি সঞ্চয় করেন এবং পার্শ্ববর্তী অঞ্চলগুলো জয় করে শেষ পর্যন্ত বাংলা অধিকার করেন। অতএব, বখতিয়ার খলজির অভিযানের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির লক্ষ্যে একটি স্বাধীন রাজ্য প্রতিষ্ঠা করা।
অন্যদিকে, বাংলা ও আরবের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত গভীর। বখতিয়ার মাত্র ১৮ জন অশ্বারোহী নিয়ে নদীয়ায় রাজপ্রাসাদের ফটকে উপস্থিত হলে প্রহরীরা তাদের মুসলমান ঘোড়া ব্যবসায়ী মনে করে কোনো প্রতিরোধ করেনি। এতে স্পষ্ট হয় যে, বখতিয়ারের অভিযানের বহু আগেই আরব ও অন্যান্য মুসলিম দেশ থেকে আগত বণিকরা বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে বাংলার অভ্যন্তরীণ নগরগুলোতে নিয়মিত যাতায়াত করতেন। এভাবে বাণিজ্যিক যোগাযোগই বাংলায় মুসলমানদের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক বিজয়ের পথ সুগম করেছিল।
এই বাণিজ্যিক যোগাযোগ ও রাজনৈতিক অগ্রগতির ধারাবাহিকতায় বহু সুফি-সাধক ও ধর্মপ্রচারক বাংলায় আসেন এবং এখানকার অধিবাসীদের মধ্যে ইসলামের আদর্শ প্রচার করেন। বাবা আদম শহীদ, শাহ মোহাম্মদ সুলতান রুমি, শাহ সুলতান মাহিসাওয়ার এবং মখদুম শাহ দৌলা শহীদের মতো সাধকেরা বাংলায় আগমনের সুনির্দিষ্ট সময়কাল নির্ধারণ করা কঠিন হলেও, সামরিক অভিযানের আগেই তাদের বাংলায় আগমন ঘটেছিল বলে আধুনিক গবেষকরা মনে করেন।
ইসলামের আবির্ভাবের বহু আগে থেকেই আরব বিশ্বের সঙ্গে বাংলা-ভারত উপমহাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলগুলোর সুদৃঢ় বাণিজ্য-সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। এই সম্পর্ক শুধু পণ্য বিনিময়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং এর মাধ্যমে দুই অঞ্চলের মানুষের মধ্যে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগও প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ইসলামের আবির্ভাবের পর আরব মুসলমানরা সমুদ্রপথে তাদের বাণিজ্যিক এবং রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করেন, যা তাদের বাণিজ্যিক যোগাযোগ আরও সম্প্রসারিত করে বাংলার অভ্যন্তর পর্যন্ত পৌঁছে দেয়। বাণিজ্যের নিরাপত্তা ও ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করার জন্য এবং স্থানীয় সমাজের সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় করার লক্ষ্যে তারা স্থানীয় নারীদের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে এখানেই স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন।
তৎকালীন আরব মুসলমানদের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল, তারা যেখানে যেতেন, সেখানেই ইসলামের বার্তা ও আদর্শ বহন করে নিয়ে যেতেন। ফলে শুধু ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে নয়, ইসলামের ধর্মীয় বাণী প্রচারও তাদের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল। সে সময় বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশ নতুন ধর্মের বিস্তারের জন্য যথেষ্ট অনুকূল ছিল। মুসলমান ব্যবসায়ীদের মধ্যে বিদ্যমান সামাজিক সাম্য, ন্যায়বিচার ও মানবিক মূল্যবোধের আদর্শে প্রভাবিত হয়ে বহু হিন্দু ও বৌদ্ধ জনগোষ্ঠী ইসলাম ধর্মগ্রহণ করেছিল।
মুসলমান সেনাবাহিনীর সামরিক অভিযান ও স্থলপথে জয় মূলত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের পাশাপাশি বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক কারণ দ্বারা পরিচালিত হয়েছিল। যদিও বহু ধর্মপ্রচারক ও সুফি-সাধক উপমহাদেশে এসে ইসলামের বাণী প্রচার করেন এবং তাদের মাধ্যমেই অধিকসংখ্যক মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেন, তবুও স্বীকার করতে হয় যে, বাংলায় ইসলামের আগমন ও বিস্তারে বাণিজ্য এবং অর্থনৈতিক যোগাযোগই সর্বাধিক কার্যকর ভূমিকা পালন করেছে।
সার্বিকভাবে বলা যায়, বাংলায় ইসলামের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠার ভিত্তি মূলত অর্থনৈতিক স্বার্থ, বাণিজ্যিক সম্পর্ক এবং তার মাধ্যমে গড়ে ওঠা সামাজিক যোগাযোগের ওপর গড়ে উঠেছিল। অর্থাৎ, অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিই বাংলায় ইসলামের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক আবির্ভাবের প্রধান প্রেরক শক্তি হিসেবে কাজ করেছে।
রিপোর্টারের নাম 





















