আগামী ২৬ মার্চ মহান স্বাধীনতা দিবসকে কেন্দ্র করে রাজনীতির মাঠে নতুন করে নিজেদের অস্তিত্ব জানান দেওয়ার গোপন পরিকল্পনা করছে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত ও বর্তমানে নিষিদ্ধ ঘোষিত দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। জাতীয় চেতনার আবেগ ও দিবসটির গুরুত্বকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে দলটি পুনরায় সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে বলে বিভিন্ন দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, নিষিদ্ধ কোনো সংগঠনের প্রকাশ্যে কোনো ধরনের কর্মসূচি পালনের সুযোগ নেই।
সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকরা ভারত এবং দেশের বিভিন্ন গোপন আস্তানা থেকে মাঝারি ও তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সক্রিয় করার চেষ্টা করছেন। তাদের মূল লক্ষ্য হলো ২৬ মার্চের প্রাক্কালে সাভার জাতীয় স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা নিবেদনের আড়ালে বড় ধরনের জমায়েত করে রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের ঘোষণা দেওয়া। তবে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে ইতোমধ্যে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে যে, আইনিভাবে নিষিদ্ধ থাকায় দলটির কোনো ধরনের সাংগঠনিক তৎপরতা বরদাশত করা হবে না। জুলাই বিপ্লবের পক্ষের রাজনৈতিক শক্তিগুলোও এ বিষয়ে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ঘোষণা করেছে।
মাঠপর্যায়ে কার্যালয় খোলার ‘গোপন মহড়া’
অনুসন্ধানে জানা গেছে, দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় আওয়ামী লীগের পরিত্যক্ত বা সিলগালা হওয়া কার্যালয়গুলো পুনরায় সচল করার একটি গোপন তৎপরতা চলছে। এখন পর্যন্ত দেশের প্রায় ৩৯টি স্থানে প্রতীকীভাবে কার্যালয় খুলে নিজেদের উপস্থিতির জানান দেওয়ার চেষ্টা করেছে তারা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিও চিত্রে দেখা গেছে, রাজশাহী, যশোর, পটুয়াখালী, কক্সবাজার ও গাইবান্ধাসহ অন্তত ১৫টি জেলায় ঝটিকা মিছিল ও দলীয় কার্যালয়ে পতাকা উত্তোলনের চেষ্টা করা হয়েছে। সম্প্রতি রাজধানীর ধানমন্ডিতেও মহিলা লীগের কয়েকজন সদস্য ঝটিকা ভিডিও করে জনমনে বিভ্রান্তি তৈরির চেষ্টা চালায়। গোয়েন্দা তথ্যানুযায়ী, ২৬ মার্চের আগে প্রতিটি জেলা-উপজেলায় অন্তত একবারের জন্য হলেও কার্যালয় খুলে কর্মীদের চাঙ্গা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
দিল্লির বার্তা ও ‘মজলুম’ ইমেজ তৈরির কৌশল
দলীয় সূত্রগুলো বলছে, ভারতে অবস্থানরত আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ২৬ মার্চের কর্মসূচি ঘোষণা করতে পারেন। এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে পলাতক নেতাদের দেশে ফিরে আত্মসমর্পণ বা গ্রেপ্তার হওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তাদের কৌশল হলো—জেলখানাকে কেন্দ্র করে নেতাকর্মীদের আবেগ জাগিয়ে তোলা এবং আদালতের বারান্দায় হাজির হওয়ার সময় পরিকল্পিতভাবে ‘মজলুম’ বা নির্যাতিত ইমেজ তৈরি করা। এছাড়া বিদেশের লবিস্ট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে বর্তমান সরকারকে আন্তর্জাতিক মহলে ‘অগণতান্ত্রিক’ হিসেবে প্রমাণের চেষ্টা চলছে। বিশেষ করে ভারতের আশীর্বাদপুষ্ট কিছু ব্যক্তি ও নির্দিষ্ট কিছু মাধ্যমকে ব্যবহার করে জনমত গঠনের কাজ চলছে বলে জানা গেছে।
সাদ্দাম ইস্যু ও মিডিয়া ট্রায়াল
সম্প্রতি বাগেরহাটের এক ছাত্রলীগ নেতার মৃত্যুকে কেন্দ্র করে জনমনে সহানুভূতি তৈরির একটি চেষ্টা গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর নজরে এসেছে। ওই নেতার উগ্রতা ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড আড়াল করে তাকে ‘ভিকটিম’ হিসেবে উপস্থাপনের মাধ্যমে সরকারকে বিব্রত করার অপচেষ্টা চালানো হয়। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এটি আওয়ামী লীগের একটি সুপরিকল্পিত প্রোপাগান্ডা কৌশলের অংশ, যা তারা আগামী দিনগুলোতে আরও ব্যাপকভাবে প্রয়োগ করতে চায়।
কূটনৈতিক তৎপরতা ও সরকারের অবস্থান
বিদেশে পলাতক আওয়ামী লীগের হাইপ্রোফাইল নেতারা ভারত ও রাশিয়ার মতো বন্ধুপ্রতিম দেশগুলোর কূটনীতিকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন। তাদের দাবি, একটি রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করা গণতান্ত্রিক রীতির পরিপন্থী। এই যুক্তি ব্যবহার করে তারা আন্তর্জাতিক চাপ তৈরির চেষ্টা করছেন।
এদিকে সরকারের উচ্চপর্যায়ের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, আওয়ামী লীগের এই গোপন পরিকল্পনার বিষয়ে তারা অবগত। তবে দলটির বিষয়ে চূড়ান্ত কৌশল কী হবে, তা নিয়ে এখনো নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আলোচনা চলছে। সদ্য বিদায়ী পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) স্পষ্ট করেছেন যে, নিষিদ্ধ সংগঠনের কোনো কর্মসূচি পালনের সুযোগ নেই। অন্যদিকে বিএনপি ও অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোও আওয়ামী লীগের এই তৎপরতাকে কঠোরভাবে মোকাবিলার হুঁশিয়ারি দিয়েছে।
আইনজ্ঞদের মতে, নিবন্ধন বাতিল ও নিষিদ্ধ হওয়ার পর আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া মাঠে নামার চেষ্টা দলটির জন্য হিতে বিপরীত হতে পারে। ২০২৫ সালে এসে আন্তর্জাতিক ও দেশীয় আইনের আওতায় দলটির কার্যক্রম বন্ধ থাকায় ২৬ মার্চের মতো জাতীয় দিবসকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করার চেষ্টা বড় ধরনের সংঘাতের জন্ম দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
রিপোর্টারের নাম 
























