দেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক শিল্পে অস্থিরতা ও মন্দার প্রভাব পড়েছে বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামে। গত দেড় বছরে বন্দরনগরীর ছোট-বড় মিলিয়ে মোট ১৮৬টি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এর মধ্যে ১১১টি প্রতিষ্ঠান স্থায়ীভাবে তালাবদ্ধ হয়েছে এবং ৭৫টি কারখানা সাময়িকভাবে উৎপাদন বন্ধ রেখেছে। ব্যবসায়িক সংগঠনগুলো বৈশ্বিক মন্দা ও ক্রয়াদেশ কমে যাওয়ার কথা বললেও অনুসন্ধানে উঠে এসেছে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, মালিকদের পলায়ন এবং ব্যাংকিং খাতের চরম অব্যবস্থাপনার চিত্র।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বন্ধ হওয়া কারখানাগুলোর মধ্যে ১৯টি বড় আকারের এবং তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএ-র সদস্য। বাকি ১৬৭টি মূলত ক্ষুদ্র ও মাঝারি মানের কারখানা, যেগুলো বড় প্রতিষ্ঠানের সাবকন্ট্রাক্টে কাজ করত। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বিজিএমইএ-র সদস্যভুক্ত বন্ধ হওয়া ১৯টি কারখানার মধ্যে ৮টির মালিক ছিলেন বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের প্রভাবশালী নেতা ও ব্যবসায়ী। জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী পরিস্থিতিতে এসব মালিক আত্মগোপনে চলে যাওয়ায় বা দেশ ছাড়ায় প্রতিষ্ঠানগুলো অভিভাবকহীন হয়ে পড়ে। বাকি ১১টি কারখানা বন্ধ হয়েছে মূলত ব্যাংক একীভূতকরণ ও আর্থিক সংকটের কারণে। দুর্বল ব্যাংকের সঙ্গে একক লেনদেন থাকায় এসব প্রতিষ্ঠান সময়মতো ঋণ সুবিধা বা এলসি সুবিধা না পাওয়ায় কার্যক্রম সচল রাখতে ব্যর্থ হয়েছে।
শিল্প পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামে বর্তমানে চালু থাকা কারখানাগুলোর মধ্যে আরও ৫৫টি প্রতিষ্ঠান চরম ঝুঁকির মুখে রয়েছে। আসন্ন ঈদুল ফিতরের আগে এসব কারখানার শ্রমিকদের বেতন-ভাতা ও বোনাস পরিশোধ নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি পর্যালোচনায় ঝুঁকিপূর্ণ কারখানাগুলোকে তিনটি ক্যাটাগরিতে ভাগ করে সরকারের কাছে প্রতিবেদন দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।
বিজিএমইএ-র তালিকায় থাকা বন্ধ হওয়া উল্লেখযোগ্য প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে—ওয়েল গ্রুপের ছয়টি কারখানা (আরকেএম অ্যাপারেলস, আল-আমিন গার্মেন্টস, ফিগো ফ্যাশন, ওয়েল ফ্যাশন ইউনিট-২, ওয়েল ড্রেস ও ওয়েল মার্ট), প্রগ্রেসিভ অ্যাপারেলস, জেএমএস গার্মেন্টস, এমএন কিটওয়্যার এবং এমএনসি অ্যাপারেলসসহ আরও বেশ কিছু নামী প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে ওয়েল গ্রুপের মালিক ও সাবেক এমপি আব্দুচ ছালাম এবং তার ভাই নজরুল ইসলাম পলাতক থাকায় কারখানাগুলো বন্ধ হয়ে যায়। এসব বড় কারখানায় কর্মরত প্রায় ৭ হাজার ৭২৭ জন শ্রমিক-কর্মচারী বর্তমানে বেকার জীবনযাপন করছেন।
শিল্প বিশ্লেষকদের মতে, বড় কারখানাগুলো সরাসরি বিদেশি ক্রেতাদের ক্রয়াদেশ (বায়ার ডিল) হারানোয় তারা এখন সাবকন্ট্রাক্টের দিকে ঝুঁকছে। ফলে ছোট কারখানাগুলো কাজ পাচ্ছে না এবং অস্তিত্ব সংকটে পড়ছে। শিল্প পুলিশের হিসাবমতে, সব মিলিয়ে প্রায় ২৭ হাজার ৭৬৬ জন শ্রমিক কর্মসংস্থান হারিয়েছেন। তবে ইতিবাচক দিক হলো, এর মধ্যে প্রায় ১৮ হাজার শ্রমিক অন্য কারখানায় নতুন করে কাজের সুযোগ পেয়েছেন।
বিজিএমইএ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে যারা এই খাতে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ নিয়েছিলেন, পটপরিবর্তনের পর তাদের প্রতিষ্ঠানগুলোই বেশি হোঁচট খেয়েছে। তবে যারা সৎভাবে ব্যবসা করছেন, তারা ব্যাংকিং জটিলতার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। বিশেষ করে ৫-৬টি দুর্বল ব্যাংক অকার্যকর হয়ে পড়ায় ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা চরম বিপাকে পড়েছেন।
ব্যবসায়ী নেতারা মনে করছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়োপযোগী কিছু নীতিসহায়তা এবং ব্যাংকিং লেনদেন সচল হলে এই সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। বিশেষ করে নতুন সরকারের অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রীর দায়িত্ব চট্টগ্রাম থেকে আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী পাওয়ায় ব্যবসায়ীরা নতুন করে আশার আলো দেখছেন। তারা আশা করছেন, দ্রুততম সময়ের মধ্যে ব্যাংকগুলোর লেনদেন স্বাভাবিক করা এবং ব্যবসাবান্ধব নীতি গ্রহণ করলে চট্টগ্রামের পোশাক খাত আবারও ঘুরে দাঁড়াবে।
রিপোর্টারের নাম 






















