মধ্যপ্রাচ্যের জনগণের মতামত প্রকাশের সুযোগ পেলে ইসরাইল ও পশ্চিমা বিশ্বের প্রতি তাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে আমূল পরিবর্তন দেখা যাবে। সাম্প্রতিককালে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ বা আমেরিকার একটি শান্তি পরিকল্পনার অংশ হওয়াকে তারা ক্ষোভ ও অপমানের ওপর প্রলেপ হিসেবেই দেখছে। বিশেষ করে, ইসরাইলের আগ্রাসন ও নিপীড়ন কোনো শাস্তি ছাড়াই অব্যাহত থাকায় এই অসন্তোষ আরও তীব্র হচ্ছে।
সম্প্রতি সৌদি আরবের প্রখ্যাত একাডেমিশিয়ান ও লেখক ড. আহমদ আল-তুওয়াইজরি এক নিবন্ধে ইসরাইল এবং তাদের আরব মিত্র সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) সম্পর্ক নিয়ে এক গভীর বিশ্লেষণ তুলে ধরেছেন। তিনি অভিযোগ করেন, আবুধাবির শাসকরা ইসরাইলের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে পুরো অঞ্চলের জন্য “ট্রয়ের ঘোড়া” হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা বৃহত্তর ইসরাইল প্রকল্প বাস্তবায়নের পথ সুগম করছে। ইউএই-এর শাসকদের বিরুদ্ধে এমন তীব্র সমালোচনা সৌদি আরবে বিরল। উল্লেখ্য, আরব বসন্তের পর থেকে ইয়েমেন, মিশর, লিবিয়া, তিউনিসিয়া ও সিরিয়ার মতো দেশগুলোতে গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে দমন করতে এই দুই দেশ দীর্ঘ এক দশক ধরে একসঙ্গে কাজ করেছে।
আল-তুওয়াইজরি’র নিবন্ধটি সৌদি কর্তৃপক্ষের ঘনিষ্ঠ একটি সংবাদপত্রে প্রকাশিত হওয়ার পর এটি আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। মিডল ইস্ট আইয়ের জিজ্ঞাসায় তিনি জানান, নিবন্ধটি লেখার আগে তিনি সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কোনো অনুমতি নেননি বা তাদের সাথে পরামর্শও করেননি। এটি ছিল তার ব্যক্তিগত দায়িত্ববোধের প্রকাশ, বিশেষ করে জাতীয় সংকটের এই মুহূর্তে সত্য উচ্চারণ করা তার কর্তব্য বলে তিনি মনে করেন।
তবে, নিবন্ধটি প্রকাশের পরপরই তেল আবিব ও ওয়াশিংটনের প্রতিবাদের মুখে এটি সরিয়ে নেওয়া হয়। ইউএই কর্তৃপক্ষ আমেরিকায় তাদের ইসরাইল-পন্থী নেটওয়ার্ককে ব্যবহার করে সৌদি লেখককে “ইহুদিবিদ্বেষী” হিসেবে অভিযুক্ত করে। নিবন্ধটি একটি আন্তর্জাতিক ঘটনায় পরিণত হয়। ইসরাইল-পন্থী একটি সংস্থা তাদের প্রচারণার ফলেই নিবন্ধটি সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে বিজয় দাবি করে। কিন্তু পরবর্তীতে এক ভিন্ন পরিস্থিতিতে নিবন্ধটি আবার প্রকাশিত হয়, যেখানে দাবি করা হয় এটি কখনোই সরানো হয়নি। এই ঘটনাটি দুই সহযোগী দেশের মধ্যে মতপার্থক্য নাকি কৌশলগত বিরোধ, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
আল-তুওয়াইজরি’র মতে, গাজায় গণহত্যা ও ইয়েমেনের সাম্প্রতিক ঘটনাবলীকে কেন্দ্র করে একটি গভীর আঞ্চলিক বিরোধের সূত্রপাত হয়েছে, যা আরও সময় নেবে। গাজায় ইসরাইলি আগ্রাসন দিয়ে শুরু হলেও এই বিরোধের বিস্তার অনেক বেশি। যুদ্ধের কারণে জনগণের ক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে রাখার প্রচেষ্টা প্রত্যক্ষ করলে যে কেউ এতে বিস্মিত হবেন। গাজায় ইসরাইলি আগ্রাসন চলাকালীন সৌদি আরবে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক উৎসবের আয়োজন অব্যাহত ছিল, ফিলিস্তিনিদের পক্ষে কোনো বিক্ষোভের অনুমোদন দেওয়া হয়নি, এমনকি গাজা নিয়ে টুইট করাও ছিল প্রায় বেআইনি।
কিন্তু এর আড়ালে সৌদি আরব ইসরাইলের আচরণে অপমানিত বোধ করছে। রিয়াদের উদ্যোগে শান্তি প্রতিষ্ঠার দুটি বড় প্রচেষ্টা ইসরাইলের বাধার মুখে ব্যর্থ হয়েছে। আল-তুওয়াইজরি বলেন, “অনিষ্ট ও গণহত্যার মাত্রা বিবেচনায় সৌদি আরব উপলব্ধি করেছে যে, ইসরাইল যে মানসিকতায় চলছে তাতে শান্তির কোনো সম্ভাবনা নেই। তারা কখনোই সহযোগিতা করবে না। এ কারণে এখন সৌদি বয়ান ও ভাষার বাঁক বদলে গেছে। ইসলামি বিশ্বের কেন্দ্রবিন্দু ও বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে সম্মানিত আরব রাষ্ট্র হিসেবে, সৌদি আরব কোনো অবস্থান না নিয়ে চুপ করে বসে থাকতে পারে না।”
তার মতে, ট্রাম্পের কথিত শান্তি পরিকল্পনায় সৌদি আরবের অংশগ্রহণ ছিল ক্ষতি সীমিত করার একটি প্রচেষ্টা মাত্র। গাজাকে ধ্বংসের মাধ্যমে ইসরাইল নিজেকে এই অঞ্চলের সামরিক আধিপত্যের অধিকারী শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাচ্ছে, যা আল-তুওয়াইজরি’র কাছে নতুন কিছু নয়। সিরিয়া, লেবানন ও বর্তমানে ইরান নিয়ে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু’র যে পরিকল্পনা, তা ৪৪ বছর আগেই সাবেক ইসরাইলি নেতা অ্যারিয়েল শ্যারন’এর উপদেষ্টা ওদেদ ইননের পরিকল্পনায় প্রকাশিত হয়েছিল। “১৯৮০-তে ইসরাইলের জন্য কৌশল” শীর্ষক ওই পরিকল্পনায় তিনি মুসলিম আরব দেশগুলোকে “বিদেশিদের জুড়ে দেওয়া অস্থায়ী তাসের ঘর” হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন এবং পুরো অঞ্চলকে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো নির্বিচারে ভাগ করে রেখেছে বলে মন্তব্য করেছিলেন। এই অবস্থাকে জাতিগত বিরোধে রূপ দেওয়ার মাধ্যমে ইসরাইলের কাজে লাগানো উচিত বলে তিনি মনে করতেন।
একই ধরনের মন্তব্য বর্তমান ইসরাইলি পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদন সারের। তিনি প্রতিবেশী সিরিয়ায় কুর্দি ও অন্য সংখ্যালঘুদের সহযোগিতা করাকে তেল আবিবের দায়িত্ব বলে মন্তব্য করেছেন। এছাড়াও সিরিয়া ও লেবাননে দ্রুজদের সহযোগিতার ঘোষণা দেয় তেল আবিব। বর্তমানে সিরিয়াকে খণ্ডবিখণ্ড করাই ইসরাইলের আনুষ্ঠানিক নীতি। তবে, এটি ইসরাইলের জন্য হিতে বিপরীত হচ্ছে। দামেস্কের কেন্দ্রীয় সরকার কুর্দিশাসিত অঞ্চল ও তেলখনির নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে, অন্যদিকে ট্রাম্পের দূত টম ব্যারাক সিরিয়ার অখণ্ডতার প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন।
মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে বিরোধ ছড়িয়ে দিতে ইসরাইল এখন সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে জোটবদ্ধ। এই জোট তাদের মিত্র সৌদি আরবের জাতীয় স্বার্থের জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। আল-তুওয়াইজরি’র মতে, ছোট দেশ হওয়া সত্ত্বেও ইউএই’র উচ্চাকাঙ্ক্ষায় সৌদি আরব ধৈর্য হারিয়েছে। ইয়েমেনে রিয়াদ আবুধাবিকে আমন্ত্রণ জানালেও, নিজের স্বার্থে দেশটি ইউএই’কে খণ্ডবিখণ্ড করতে চাইছে। একইভাবে, সুদানে বিরোধী আরএসএফকে সমর্থন এবং সোমালিয়া থেকে সোমালিল্যান্ডের বিচ্ছিন্নতার চেষ্টাকে সমর্থন করে ইউএই পুরো অঞ্চলে বিরোধ উসকে দিচ্ছে।
তিউনিসিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট মুনসেফ মারজুকির সঙ্গে এক আলোচনার কথা উল্লেখ করে আল-তুওয়াইজরি জানান, ইউএই তিউনিসিয়ার তৎকালীন সরকারকে উপেক্ষা করে বিরোধী দলের জন্য সাঁজোয়া যান পাঠানোর চেষ্টা করেছিল। মারজুকি তখন প্রশ্ন তুলেছিলেন, কীভাবে এক আরব দেশ আরেক আরব দেশের সরকারকে কিছু না জানিয়েই বিরোধীদের সাঁজোয়া যান পাঠাতে পারে। সৌদি আরবের চোখে আবুধাবি রিয়াদের তুলনায় ছোট একটি জেলা ছাড়া আর কিছুই নয়। দুই দেশের মধ্যে আকার, জনসংখ্যা বা অর্থনৈতিক সক্ষমতার কোনো তুলনা হয় না।
বর্তমানে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে সৌদি আরব তুরস্কের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হচ্ছে। একইসঙ্গে ইরানের সঙ্গেও বিরোধ মিটমাটের চেষ্টা করছে দেশটি। ইরানে ট্রাম্পের হামলার তোড়জোড়ের মধ্যেই নয়টি আরব দেশের নেতা ট্রাম্পকে রাজি করানোর চেষ্টা করেন তেহরানের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনা শুরুর জন্য। যার পরিপ্রেক্ষিতে ওমানের মাস্কাটে আলোচনা শুরু হয়।
রিপোর্টারের নাম 























