ঢাকা ০৬:৫২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

স্বকীয়তার সংকট: সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের মরণ ছোবল

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ১০:৫৩:৩৮ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ২ বার পড়া হয়েছে

সংস্কৃতি কেবল কিছু আচার-অনুষ্ঠান বা উৎসবের সমষ্টি নয়, বরং এটি একটি জাতির প্রাণশক্তি, তার আত্মপরিচয়ের প্রতিচ্ছবি এবং জীবনযাপনের নির্যাস। সমাজবিজ্ঞানী ম্যাকাইভারের ভাষায়, ‘Culture is what we are.’ অর্থাৎ, আমাদের বিশ্বাস, মূল্যবোধ এবং যাপিত জীবনের প্রতিফলনই হলো সংস্কৃতি। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, যখন কোনো জাতির এই আত্মিক শক্তিকে আঘাত করা হয়, তখন সেই জাতি মানচিত্রের অংশ হয়েও আত্মিকভাবে মৃত হয়ে পড়ে। বর্তমানে আমরা যে ‘সাংস্কৃতিক আগ্রাসন’-এর মুখোমুখি, তা কোনো আকস্মিক ঝড় নয়; বরং এটি সুদূরপ্রসারী ঔপনিবেশিক ষড়যন্ত্র এবং সাম্রাজ্যবাদী চিন্তার বিষাক্ত ফসল।

উসমানীয় খিলাফতের পতনের পর মুসলিম উম্মাহ যখন নেতৃত্বহীন হয়ে পড়ে, তখন ঔপনিবেশিক শক্তিগুলো শুধু আমাদের ভূখণ্ড দখলই করেনি, বরং আমাদের মনোজগতে এক দীর্ঘস্থায়ী দাসত্বের বীজ বপন করে দেয়। আজ সেই বীজ থেকে জন্ম নেওয়া বিষবৃক্ষ আমাদের যুবসমাজকে গ্রাস করছে। এর মূলে রয়েছে ঔপনিবেশিক শাসকদের চাপিয়ে দেওয়া হীনম্মন্যতা এবং প্রতিবেশী অঞ্চলের সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক আধিপত্য। ‘কোনো জাতিকে ধ্বংস করতে চাইলে তার শিক্ষা ও সংস্কৃতিকে ধ্বংস করে দাও’—এই নির্মম বাস্তবতার এক জীবন্ত উদাহরণ যেন আজকের বাংলাদেশ।

উসমানীয় পতন ও মুসলিম সংস্কৃতির বিশ্বজনীন সংকট

বিংশ শতাব্দীর শুরুতে ১৯২৪ সালে উসমানীয় খিলাফতের আনুষ্ঠানিক পতনের পর মুসলিম বিশ্ব কেবল রাজনৈতিকভাবে এতিম হয়নি, বরং আত্মিক ও সাংস্কৃতিক দিক থেকেও এক চরম সংকটের মুখে পড়ে। খিলাফত ছিল মুসলিম উম্মাহর সাংস্কৃতিক রক্ষাকবচ। এই রক্ষাকবচ সরে যাওয়ার পর পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদীরা মুসলিম দেশগুলোকে নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয়।

খিলাফতের পতনের ফলে মুসলিম দেশগুলো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতিরাষ্ট্রে বিভক্ত হয়ে পড়ে এবং প্রতিটি জনপদে পশ্চিমা আধুনিকতার নামে বিজাতীয় সংস্কৃতিকে ‘সভ্যতা’র মাপকাঠি হিসেবে প্রচার করা শুরু হয়। উসমানীয় পতনের পর থেকেই ইউরোপীয় শক্তিগুলো মুসলিম যুবসমাজের মনস্তত্ত্ব থেকে ‘ইসলামি খিলাফত’ ও ‘উম্মাহ’র ধারণা মুছে দিয়ে সেখানে ভোগবাদ ও সেক্যুলার জীবনদর্শন প্রতিষ্ঠা করতে শুরু করে। এটিই ছিল সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদের প্রথম বিশ্বজনীন বিজয়।

শিক্ষানীতি ও মানসিকতায় ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার

১৭৫৭ সালের পলাশীর প্রান্তরে বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হওয়ার পর ব্রিটিশ শাসনের মূল লক্ষ্য কেবল সম্পদ লুণ্ঠন ছিল না। লর্ড মেকলে ১৮৩৫ সালে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে পেশ করা কুখ্যাত শিক্ষা প্রস্তাবে স্পষ্ট বলেছিলেন— ‘We must at present do our best to form a class… Indian in blood and colour, but English in taste, in opinion, in moral and in intellect.’ ব্রিটিশরা জানত, তলোয়ার দিয়ে একটি জাতিকে কয়েক দশক শাসন করা গেলেও, সংস্কৃতি দিয়ে তা শতাব্দীকাল ধরে করা সম্ভব। তারা আমাদের সমৃদ্ধ ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাব্যবস্থাকে ধ্বংস করে এক ‘কেরানি তৈরির কারখানা’ গড়ে তোলে। আমাদের বিশ্বাস, ভাষা ও পোশাককে ‘অনগ্রসর’ হিসেবে চিহ্নিত করে ইংরেজি আদব-কেতাকে ‘আধুনিকতা’র সমার্থক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। এই ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার আজও আমাদের হীনম্মন্যতায় ভোগাচ্ছে। আজও আমাদের শিক্ষিত সমাজের একটি বড় অংশ ইংরেজিতে কথা বলা বা পশ্চিমা পোশাক পরাকে শ্রেষ্ঠত্বের প্রতীক মনে করে, যা মূলত লর্ড মেকলের সেই দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পেরই সাফল্য।

কলকাতার সাহিত্যিক প্রভাব ও স্বকীয়তা

বাংলার প্রেক্ষাপটে সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের একটি সূক্ষ্ম ও ভয়াবহ রূপ হলো কলকাতার সাহিত্যিক আধিপত্য। ব্রিটিশ শাসনামলে কলকাতাকে কেন্দ্র করে যে ‘নবজাগরণ’ বা ‘রেনেসাঁ’-এর কথা বলা হয়, তা ছিল মূলত একপাক্ষিক এবং মুসলিম ঐতিহ্যের প্রতি বিদ্বেষপূর্ণ। তৎকালীন অনেক সাহিত্যিক তাদের লেখনিতে মুসলিম শাসনকালকে ‘অন্ধকার যুগ’ এবং মুসলমানদের ‘যবন’ বা ‘ম্লেচ্ছ’ হিসেবে চিত্রিত করেছেন।

এই সাহিত্যিক আগ্রাসন দেশভাগের পরেও স্তিমিত হয়নি। বাংলাদেশের জন্মের পরেও একটি বিশেষ বুদ্ধিজীবী শ্রেণি সচেতনভাবে আমাদের জাতীয় স্বকীয়তাকে ভুলিয়ে দিয়ে কলকাতার অনুগামী করার অপচেষ্টা চালিয়েছে। ভাষার ক্ষেত্রে তারা এমন এক ‘শুদ্ধীকরণ’ প্রক্রিয়া শুরু করে, যেখানে শতাব্দীকাল ধরে ব্যবহৃত এবং বাংলা ভাষার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে যাওয়া আরবি-ফারসি শব্দগুলোকে ‘অস্পৃশ্য’ ঘোষণা করা হয়।

আজকের বাংলাদেশের গণমাধ্যমে তাকালে দেখা যায়, ‘ইন্তেকাল’ হয়ে গেছে ‘প্রয়াত’, ‘লাশ’ হয়ে গেছে ‘মরদেহ’, ‘দাফন’ হয়েছে ‘শেষকৃত্য’, ‘মুনাজাত’ হয়েছে ‘প্রার্থনা’ আর ‘রোজা’ হয়েছে ‘উপবাস’। এই শব্দতাত্ত্বিক পরিবর্তন কেবল ব্যাকরণগত নয়, বরং এটি একটি জাতির ধর্মীয় বিশ্বাস ও হাজার বছরের ঐতিহ্যকে মন থেকে মুছে ফেলার এক গভীর ষড়যন্ত্র। কলকাতার সাহিত্যিক প্রভাব আমাদের নিজস্ব মুসলিম পরিচয়ের চেয়ে একটি কৃত্রিম ‘বাঙালি পরিচয়’ চাপিয়ে দিতে চেয়েছে, যা মূলত আমাদের শেকড় থেকে বিচ্ছিন্ন করার নামান্তর।

মিডিয়ার প্রভাব ও পারিবারিক কাঠামো

বর্তমান বাংলাদেশে সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের সবচেয়ে দৃশ্যমান ও ক্ষতিকর রূপ হলো ভারতীয় স্যাটেলাইট চ্যানেলগুলোর অবাধ বিচরণ। তথাকথিত ‘সিরিয়াল’ বা নাটকের মাধ্যমে আমাদের ঘরে ঘরে এমন এক জীবনবোধ ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, যা আমাদের ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক।

এই নাটকগুলোতে পরকীয়া, পারিবারিক ষড়যন্ত্র, জাঁকজমকপূর্ণ অহেতুক উৎসব এবং অবাধ যৌনাচারকে স্বাভাবিক ও আধুনিক হিসেবে দেখানো হয়। দেশীয় পারিবারিক শান্তি আজ বিপর্যস্ত। ১৯৯৩ সালে আমেরিকান কংগ্রেসের জন্য প্রণীত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল—মুসলিম বিশ্বের দেশগুলোয় পশ্চিমের ব্যর্থতার প্রধান কারণ হচ্ছে ‘ইসলামের পরিবার প্রথা’। তাই আজ সেই পরিবার প্রথার ওপরই সরাসরি আঘাত হানা হচ্ছে।

সিরিয়ালগুলোর প্রভাবে নারীদের মধ্যে আদর্শ মা বা বোন হওয়ার আকাঙ্ক্ষার চেয়ে কেবল বাহ্যিক সৌন্দর্য ও পরকীয়া প্রেমিকা হওয়ার প্রতিযোগিতা বাড়ছে। এর ফলে দেশে আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে বিবাহবিচ্ছেদ এবং আত্মহত্যার ঘটনা। আমাদের নিজস্ব চলচ্চিত্র ও নাটক আজ পুরোপুরি অনুকরণে লিপ্ত, যেখানে অশ্লীলতা ও যৌন সুড়সুড়িই যেন সাফল্যের প্রধান শর্ত।

যুবসমাজ: সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের প্রধান শিকার

যেকোনো জাতির মেরুদণ্ড হলো তার যুবসমাজ। কিন্তু আজ আমাদের যুবসমাজকে নৈতিকতাহীন এবং আদর্শহীন করে পঙ্গু করে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। সাম্রাজ্যবাদীরা জানে, যদি যুবসমাজকে নৈতিকতাহীন এবং আদর্শহীন করা যায়, তবে সেই জাতি আর কোনোদিন মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে না।

বর্তমানে আমাদের যুবকদের ফ্যাশন, পোশাকের ধরন এবং এমনকি ভাষার ভঙ্গিতেও বিজাতীয় সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণ স্পষ্ট। তারা আজ মহাবীরদের বীরত্বগাথা পড়ার বদলে কাল্পনিক চরিত্রের অনুকরণ করতে বেশি আগ্রহী। বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠে আজ যে ধরনের ঘটনা ঘটছে, তার বিপরীতে কার্যকর কোনো সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে না ওঠা—এটি সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের চরম অবনতির প্রমাণ।

যুবসমাজকে আজ রাজনীতিহীন এবং শেকড়হীন করে তোলা হচ্ছে। প্রযুক্তির অপব্যবহার বা ইন্টারনেটের কিছু জগৎ তাদের সৃজনশীলতাকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। তারা এখন ‘ফ্রি-উইল’ ও ‘ফ্রি-মিক্সিং’-এর নামে একধরনের পশুবৃত্তিতে লিপ্ত হচ্ছে, যা সমাজকে এক গভীর অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

ভাষা ও মনস্তাত্ত্বিক পরাধীনতা

ভাষা একটি জাতির সংস্কৃতির প্রধান বাহন। কিন্তু আজ আমরা আমাদের মাতৃভাষাকে বিকৃত করতে গর্ববোধ করি। ইংরেজি আজ কেবল যোগাযোগমাধ্যম নয়, বরং এটি আভিজাত্য ও আধুনিকতার প্রতীকে পরিণত হয়েছে। আমাদের শিক্ষিত সমাজ মনে করে, বাংলার চেয়ে ইংরেজিতে কথা বলাই বেশি স্মার্টনেসের পরিচয়।

অন্যদিকে শৈশব থেকেই আমাদের শিশুরা অন্য দেশের কার্টুন দেখে বড় হচ্ছে। এর ফলে তারা মাতৃভাষার চেয়ে অন্য ভাষার প্রতি বেশি আসক্ত হয়ে পড়ছে। বাংলা ভাষার রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম করে পাওয়া মর্যাদা আজ হুমকির মুখে। যখন একটি জাতির শিশুরা অন্য দেশের ভাষায় কথা বলতে শেখে বা অন্য দেশের বীরদের নায়ক মনে করে, তখন সেই জাতির সার্বভৌমত্ব কেবল মানচিত্রেই সীমাবদ্ধ থাকে, মগজে থাকে পরাধীনতা।

বিভিন্ন মাধ্যম এবং সোশ্যাল মিডিয়ার ইনফ্লুয়েন্সারদের মাধ্যমে একধরনের ‘লাক্সারি লাইফস্টাইল’ প্রচার করা হচ্ছে, যা আমাদের যুবকদের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি করছে। তারা সেই রঙিন জীবনের নেশায় জড়িয়ে পড়ছে নানা অপরাধে।

সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের সুদূরপ্রসারী ফলাফল

সাংস্কৃতিক আগ্রাসন কোনো স্বল্পমেয়াদি সমস্যা নয়। এর ফলাফল অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী ও ভয়াবহ। এর ফলে—

১. সার্বভৌমত্ব হুমকির মুখে: যখন একটি জাতির জনগণ মানসিকভাবে অন্য দেশের অনুগামী হয়, তখন সেই দেশ স্বাধীন হয়েও পরাধীন।

২. নৈতিক ধস: সমাজে খুন, ধর্ষণ, লিভ-টুগেদার এবং বিকৃত যৌনাচারের মতো পাপাচার বৃদ্ধি পায়। মানুষের মধ্য থেকে নৈতিক মূল্যবোধ হারিয়ে যায়।

৩. সৃজনশীলতার বিনাশ: পরনির্ভরশীল জাতি কখনো নতুন কিছু সৃষ্টি করতে পারে না। তারা কেবল বিদেশি ফ্যাশন আর প্রযুক্তির ভোক্তা হয়েই দিন কাটায়।

৪. দেশপ্রেমের অভাব: সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের শিকার যুবকদের মধ্যে দেশের প্রতি কোনো মমতা থাকে না। তারা সুযোগ পেলেই দেশ ছেড়ে বিদেশে পাড়ি জমাতে চায় এবং দেশের সংকটে তারা নীরব দর্শক হয়ে থাকে।

মুক্তির পথ কোন দিকে?

এই সর্বগ্রাসী তিমির থেকে মুক্তি পেতে হলে আমাদের সম্মিলিত ও আদর্শিক প্রতিরোধের বিকল্প নেই। কেবল আলোচনার টেবিলে বসে সমাধান সম্ভব নয়; আমাদের সংস্কৃতির প্রতিটি ক্ষেত্রে পাল্টা বিপ্লব ঘটাতে হবে।

১. শিক্ষাব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন: আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে ঔপনিবেশিক প্রভাবমুক্ত করতে হবে। পাঠ্যপুস্তকে আমাদের নিজস্ব ইতিহাস, বীরত্বগাথা এবং ধর্মীয় মূল্যবোধকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

২. নিজস্ব মিডিয়া ও বিনোদন তৈরি: অপসংস্কৃতির জবাব দিতে হবে সুস্থ সংস্কৃতি দিয়ে। নাটক, সিনেমা এবং সংগীতের ক্ষেত্রে আমাদের নিজস্ব বিশ্বাস ও ঐতিহ্যের প্রতিফলন ঘটাতে হবে। বিদেশি বিনোদন মাধ্যমের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে হবে এবং দেশীয় মানসম্মত অনুষ্ঠানের পৃষ্ঠপোষকতা করতে হবে।

৩. পারিবারিক সচেতনতা: সন্তানদের পাশ্চাত্য ও বিদেশি সংস্কৃতির মরণছোবল থেকে বাঁচাতে বাবা-মাকে সচেতন হতে হবে। শৈশব থেকেই তাদের মধ্যে আদর্শিক ভিত্তি গড়ে তুলতে হবে। বাড়িতে নৈতিক শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।

৪. জাতীয় গৌরববোধ জাগ্রত করা: আমাদের পূর্বসূরিদের জ্ঞান-বিজ্ঞান এবং বীরত্বের ইতিহাস যুবসমাজের সামনে তুলে ধরতে হবে। তাদের বোঝাতে হবে, আমরা কোনো ‘রিজেক্টেড প্রোডাক্ট’ বা অনুকরণকারী জাতি নই; আমরা একসময় বিশ্বকে জ্ঞান ও সভ্যতার আলো দিয়েছি।

৫. সাহিত্য ও ভাষার সুরক্ষা: বাংলা ভাষায় অনুপ্রবেশ করানো বিজাতীয় শব্দগুলো বর্জন করে আমাদের নিজস্ব ঐতিহ্যবাহী শব্দমালা ফিরিয়ে আনতে হবে। সাহিত্যচর্চায় লেখকদের দেশীয় ও নিজস্ব ভাবধারার প্রতি উদ্বুদ্ধ করতে হবে।

৬. সামাজিক আন্দোলন: প্রতিটি এলাকায় যুবকদের নিয়ে সুস্থ সংস্কৃতির ক্লাব ও পাঠাগার গড়ে তুলতে হবে। খেলাধুলা ও সৃজনশীল কাজে তাদের ব্যস্ত রাখতে হবে, যাতে তারা অপসংস্কৃতির নেশায় ডুবে না যায়।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

উজিরপুরে অগ্নিকাণ্ডে ৫ পরিবারের স্বপ্ন ভস্ম, লক্ষাধিক টাকার ক্ষতি

স্বকীয়তার সংকট: সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের মরণ ছোবল

আপডেট সময় : ১০:৫৩:৩৮ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

সংস্কৃতি কেবল কিছু আচার-অনুষ্ঠান বা উৎসবের সমষ্টি নয়, বরং এটি একটি জাতির প্রাণশক্তি, তার আত্মপরিচয়ের প্রতিচ্ছবি এবং জীবনযাপনের নির্যাস। সমাজবিজ্ঞানী ম্যাকাইভারের ভাষায়, ‘Culture is what we are.’ অর্থাৎ, আমাদের বিশ্বাস, মূল্যবোধ এবং যাপিত জীবনের প্রতিফলনই হলো সংস্কৃতি। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, যখন কোনো জাতির এই আত্মিক শক্তিকে আঘাত করা হয়, তখন সেই জাতি মানচিত্রের অংশ হয়েও আত্মিকভাবে মৃত হয়ে পড়ে। বর্তমানে আমরা যে ‘সাংস্কৃতিক আগ্রাসন’-এর মুখোমুখি, তা কোনো আকস্মিক ঝড় নয়; বরং এটি সুদূরপ্রসারী ঔপনিবেশিক ষড়যন্ত্র এবং সাম্রাজ্যবাদী চিন্তার বিষাক্ত ফসল।

উসমানীয় খিলাফতের পতনের পর মুসলিম উম্মাহ যখন নেতৃত্বহীন হয়ে পড়ে, তখন ঔপনিবেশিক শক্তিগুলো শুধু আমাদের ভূখণ্ড দখলই করেনি, বরং আমাদের মনোজগতে এক দীর্ঘস্থায়ী দাসত্বের বীজ বপন করে দেয়। আজ সেই বীজ থেকে জন্ম নেওয়া বিষবৃক্ষ আমাদের যুবসমাজকে গ্রাস করছে। এর মূলে রয়েছে ঔপনিবেশিক শাসকদের চাপিয়ে দেওয়া হীনম্মন্যতা এবং প্রতিবেশী অঞ্চলের সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক আধিপত্য। ‘কোনো জাতিকে ধ্বংস করতে চাইলে তার শিক্ষা ও সংস্কৃতিকে ধ্বংস করে দাও’—এই নির্মম বাস্তবতার এক জীবন্ত উদাহরণ যেন আজকের বাংলাদেশ।

উসমানীয় পতন ও মুসলিম সংস্কৃতির বিশ্বজনীন সংকট

বিংশ শতাব্দীর শুরুতে ১৯২৪ সালে উসমানীয় খিলাফতের আনুষ্ঠানিক পতনের পর মুসলিম বিশ্ব কেবল রাজনৈতিকভাবে এতিম হয়নি, বরং আত্মিক ও সাংস্কৃতিক দিক থেকেও এক চরম সংকটের মুখে পড়ে। খিলাফত ছিল মুসলিম উম্মাহর সাংস্কৃতিক রক্ষাকবচ। এই রক্ষাকবচ সরে যাওয়ার পর পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদীরা মুসলিম দেশগুলোকে নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয়।

খিলাফতের পতনের ফলে মুসলিম দেশগুলো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতিরাষ্ট্রে বিভক্ত হয়ে পড়ে এবং প্রতিটি জনপদে পশ্চিমা আধুনিকতার নামে বিজাতীয় সংস্কৃতিকে ‘সভ্যতা’র মাপকাঠি হিসেবে প্রচার করা শুরু হয়। উসমানীয় পতনের পর থেকেই ইউরোপীয় শক্তিগুলো মুসলিম যুবসমাজের মনস্তত্ত্ব থেকে ‘ইসলামি খিলাফত’ ও ‘উম্মাহ’র ধারণা মুছে দিয়ে সেখানে ভোগবাদ ও সেক্যুলার জীবনদর্শন প্রতিষ্ঠা করতে শুরু করে। এটিই ছিল সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদের প্রথম বিশ্বজনীন বিজয়।

শিক্ষানীতি ও মানসিকতায় ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার

১৭৫৭ সালের পলাশীর প্রান্তরে বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হওয়ার পর ব্রিটিশ শাসনের মূল লক্ষ্য কেবল সম্পদ লুণ্ঠন ছিল না। লর্ড মেকলে ১৮৩৫ সালে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে পেশ করা কুখ্যাত শিক্ষা প্রস্তাবে স্পষ্ট বলেছিলেন— ‘We must at present do our best to form a class… Indian in blood and colour, but English in taste, in opinion, in moral and in intellect.’ ব্রিটিশরা জানত, তলোয়ার দিয়ে একটি জাতিকে কয়েক দশক শাসন করা গেলেও, সংস্কৃতি দিয়ে তা শতাব্দীকাল ধরে করা সম্ভব। তারা আমাদের সমৃদ্ধ ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাব্যবস্থাকে ধ্বংস করে এক ‘কেরানি তৈরির কারখানা’ গড়ে তোলে। আমাদের বিশ্বাস, ভাষা ও পোশাককে ‘অনগ্রসর’ হিসেবে চিহ্নিত করে ইংরেজি আদব-কেতাকে ‘আধুনিকতা’র সমার্থক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। এই ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার আজও আমাদের হীনম্মন্যতায় ভোগাচ্ছে। আজও আমাদের শিক্ষিত সমাজের একটি বড় অংশ ইংরেজিতে কথা বলা বা পশ্চিমা পোশাক পরাকে শ্রেষ্ঠত্বের প্রতীক মনে করে, যা মূলত লর্ড মেকলের সেই দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পেরই সাফল্য।

কলকাতার সাহিত্যিক প্রভাব ও স্বকীয়তা

বাংলার প্রেক্ষাপটে সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের একটি সূক্ষ্ম ও ভয়াবহ রূপ হলো কলকাতার সাহিত্যিক আধিপত্য। ব্রিটিশ শাসনামলে কলকাতাকে কেন্দ্র করে যে ‘নবজাগরণ’ বা ‘রেনেসাঁ’-এর কথা বলা হয়, তা ছিল মূলত একপাক্ষিক এবং মুসলিম ঐতিহ্যের প্রতি বিদ্বেষপূর্ণ। তৎকালীন অনেক সাহিত্যিক তাদের লেখনিতে মুসলিম শাসনকালকে ‘অন্ধকার যুগ’ এবং মুসলমানদের ‘যবন’ বা ‘ম্লেচ্ছ’ হিসেবে চিত্রিত করেছেন।

এই সাহিত্যিক আগ্রাসন দেশভাগের পরেও স্তিমিত হয়নি। বাংলাদেশের জন্মের পরেও একটি বিশেষ বুদ্ধিজীবী শ্রেণি সচেতনভাবে আমাদের জাতীয় স্বকীয়তাকে ভুলিয়ে দিয়ে কলকাতার অনুগামী করার অপচেষ্টা চালিয়েছে। ভাষার ক্ষেত্রে তারা এমন এক ‘শুদ্ধীকরণ’ প্রক্রিয়া শুরু করে, যেখানে শতাব্দীকাল ধরে ব্যবহৃত এবং বাংলা ভাষার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে যাওয়া আরবি-ফারসি শব্দগুলোকে ‘অস্পৃশ্য’ ঘোষণা করা হয়।

আজকের বাংলাদেশের গণমাধ্যমে তাকালে দেখা যায়, ‘ইন্তেকাল’ হয়ে গেছে ‘প্রয়াত’, ‘লাশ’ হয়ে গেছে ‘মরদেহ’, ‘দাফন’ হয়েছে ‘শেষকৃত্য’, ‘মুনাজাত’ হয়েছে ‘প্রার্থনা’ আর ‘রোজা’ হয়েছে ‘উপবাস’। এই শব্দতাত্ত্বিক পরিবর্তন কেবল ব্যাকরণগত নয়, বরং এটি একটি জাতির ধর্মীয় বিশ্বাস ও হাজার বছরের ঐতিহ্যকে মন থেকে মুছে ফেলার এক গভীর ষড়যন্ত্র। কলকাতার সাহিত্যিক প্রভাব আমাদের নিজস্ব মুসলিম পরিচয়ের চেয়ে একটি কৃত্রিম ‘বাঙালি পরিচয়’ চাপিয়ে দিতে চেয়েছে, যা মূলত আমাদের শেকড় থেকে বিচ্ছিন্ন করার নামান্তর।

মিডিয়ার প্রভাব ও পারিবারিক কাঠামো

বর্তমান বাংলাদেশে সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের সবচেয়ে দৃশ্যমান ও ক্ষতিকর রূপ হলো ভারতীয় স্যাটেলাইট চ্যানেলগুলোর অবাধ বিচরণ। তথাকথিত ‘সিরিয়াল’ বা নাটকের মাধ্যমে আমাদের ঘরে ঘরে এমন এক জীবনবোধ ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, যা আমাদের ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক।

এই নাটকগুলোতে পরকীয়া, পারিবারিক ষড়যন্ত্র, জাঁকজমকপূর্ণ অহেতুক উৎসব এবং অবাধ যৌনাচারকে স্বাভাবিক ও আধুনিক হিসেবে দেখানো হয়। দেশীয় পারিবারিক শান্তি আজ বিপর্যস্ত। ১৯৯৩ সালে আমেরিকান কংগ্রেসের জন্য প্রণীত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল—মুসলিম বিশ্বের দেশগুলোয় পশ্চিমের ব্যর্থতার প্রধান কারণ হচ্ছে ‘ইসলামের পরিবার প্রথা’। তাই আজ সেই পরিবার প্রথার ওপরই সরাসরি আঘাত হানা হচ্ছে।

সিরিয়ালগুলোর প্রভাবে নারীদের মধ্যে আদর্শ মা বা বোন হওয়ার আকাঙ্ক্ষার চেয়ে কেবল বাহ্যিক সৌন্দর্য ও পরকীয়া প্রেমিকা হওয়ার প্রতিযোগিতা বাড়ছে। এর ফলে দেশে আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে বিবাহবিচ্ছেদ এবং আত্মহত্যার ঘটনা। আমাদের নিজস্ব চলচ্চিত্র ও নাটক আজ পুরোপুরি অনুকরণে লিপ্ত, যেখানে অশ্লীলতা ও যৌন সুড়সুড়িই যেন সাফল্যের প্রধান শর্ত।

যুবসমাজ: সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের প্রধান শিকার

যেকোনো জাতির মেরুদণ্ড হলো তার যুবসমাজ। কিন্তু আজ আমাদের যুবসমাজকে নৈতিকতাহীন এবং আদর্শহীন করে পঙ্গু করে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। সাম্রাজ্যবাদীরা জানে, যদি যুবসমাজকে নৈতিকতাহীন এবং আদর্শহীন করা যায়, তবে সেই জাতি আর কোনোদিন মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে না।

বর্তমানে আমাদের যুবকদের ফ্যাশন, পোশাকের ধরন এবং এমনকি ভাষার ভঙ্গিতেও বিজাতীয় সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণ স্পষ্ট। তারা আজ মহাবীরদের বীরত্বগাথা পড়ার বদলে কাল্পনিক চরিত্রের অনুকরণ করতে বেশি আগ্রহী। বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠে আজ যে ধরনের ঘটনা ঘটছে, তার বিপরীতে কার্যকর কোনো সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে না ওঠা—এটি সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের চরম অবনতির প্রমাণ।

যুবসমাজকে আজ রাজনীতিহীন এবং শেকড়হীন করে তোলা হচ্ছে। প্রযুক্তির অপব্যবহার বা ইন্টারনেটের কিছু জগৎ তাদের সৃজনশীলতাকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। তারা এখন ‘ফ্রি-উইল’ ও ‘ফ্রি-মিক্সিং’-এর নামে একধরনের পশুবৃত্তিতে লিপ্ত হচ্ছে, যা সমাজকে এক গভীর অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

ভাষা ও মনস্তাত্ত্বিক পরাধীনতা

ভাষা একটি জাতির সংস্কৃতির প্রধান বাহন। কিন্তু আজ আমরা আমাদের মাতৃভাষাকে বিকৃত করতে গর্ববোধ করি। ইংরেজি আজ কেবল যোগাযোগমাধ্যম নয়, বরং এটি আভিজাত্য ও আধুনিকতার প্রতীকে পরিণত হয়েছে। আমাদের শিক্ষিত সমাজ মনে করে, বাংলার চেয়ে ইংরেজিতে কথা বলাই বেশি স্মার্টনেসের পরিচয়।

অন্যদিকে শৈশব থেকেই আমাদের শিশুরা অন্য দেশের কার্টুন দেখে বড় হচ্ছে। এর ফলে তারা মাতৃভাষার চেয়ে অন্য ভাষার প্রতি বেশি আসক্ত হয়ে পড়ছে। বাংলা ভাষার রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম করে পাওয়া মর্যাদা আজ হুমকির মুখে। যখন একটি জাতির শিশুরা অন্য দেশের ভাষায় কথা বলতে শেখে বা অন্য দেশের বীরদের নায়ক মনে করে, তখন সেই জাতির সার্বভৌমত্ব কেবল মানচিত্রেই সীমাবদ্ধ থাকে, মগজে থাকে পরাধীনতা।

বিভিন্ন মাধ্যম এবং সোশ্যাল মিডিয়ার ইনফ্লুয়েন্সারদের মাধ্যমে একধরনের ‘লাক্সারি লাইফস্টাইল’ প্রচার করা হচ্ছে, যা আমাদের যুবকদের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি করছে। তারা সেই রঙিন জীবনের নেশায় জড়িয়ে পড়ছে নানা অপরাধে।

সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের সুদূরপ্রসারী ফলাফল

সাংস্কৃতিক আগ্রাসন কোনো স্বল্পমেয়াদি সমস্যা নয়। এর ফলাফল অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী ও ভয়াবহ। এর ফলে—

১. সার্বভৌমত্ব হুমকির মুখে: যখন একটি জাতির জনগণ মানসিকভাবে অন্য দেশের অনুগামী হয়, তখন সেই দেশ স্বাধীন হয়েও পরাধীন।

২. নৈতিক ধস: সমাজে খুন, ধর্ষণ, লিভ-টুগেদার এবং বিকৃত যৌনাচারের মতো পাপাচার বৃদ্ধি পায়। মানুষের মধ্য থেকে নৈতিক মূল্যবোধ হারিয়ে যায়।

৩. সৃজনশীলতার বিনাশ: পরনির্ভরশীল জাতি কখনো নতুন কিছু সৃষ্টি করতে পারে না। তারা কেবল বিদেশি ফ্যাশন আর প্রযুক্তির ভোক্তা হয়েই দিন কাটায়।

৪. দেশপ্রেমের অভাব: সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের শিকার যুবকদের মধ্যে দেশের প্রতি কোনো মমতা থাকে না। তারা সুযোগ পেলেই দেশ ছেড়ে বিদেশে পাড়ি জমাতে চায় এবং দেশের সংকটে তারা নীরব দর্শক হয়ে থাকে।

মুক্তির পথ কোন দিকে?

এই সর্বগ্রাসী তিমির থেকে মুক্তি পেতে হলে আমাদের সম্মিলিত ও আদর্শিক প্রতিরোধের বিকল্প নেই। কেবল আলোচনার টেবিলে বসে সমাধান সম্ভব নয়; আমাদের সংস্কৃতির প্রতিটি ক্ষেত্রে পাল্টা বিপ্লব ঘটাতে হবে।

১. শিক্ষাব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন: আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে ঔপনিবেশিক প্রভাবমুক্ত করতে হবে। পাঠ্যপুস্তকে আমাদের নিজস্ব ইতিহাস, বীরত্বগাথা এবং ধর্মীয় মূল্যবোধকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

২. নিজস্ব মিডিয়া ও বিনোদন তৈরি: অপসংস্কৃতির জবাব দিতে হবে সুস্থ সংস্কৃতি দিয়ে। নাটক, সিনেমা এবং সংগীতের ক্ষেত্রে আমাদের নিজস্ব বিশ্বাস ও ঐতিহ্যের প্রতিফলন ঘটাতে হবে। বিদেশি বিনোদন মাধ্যমের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে হবে এবং দেশীয় মানসম্মত অনুষ্ঠানের পৃষ্ঠপোষকতা করতে হবে।

৩. পারিবারিক সচেতনতা: সন্তানদের পাশ্চাত্য ও বিদেশি সংস্কৃতির মরণছোবল থেকে বাঁচাতে বাবা-মাকে সচেতন হতে হবে। শৈশব থেকেই তাদের মধ্যে আদর্শিক ভিত্তি গড়ে তুলতে হবে। বাড়িতে নৈতিক শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।

৪. জাতীয় গৌরববোধ জাগ্রত করা: আমাদের পূর্বসূরিদের জ্ঞান-বিজ্ঞান এবং বীরত্বের ইতিহাস যুবসমাজের সামনে তুলে ধরতে হবে। তাদের বোঝাতে হবে, আমরা কোনো ‘রিজেক্টেড প্রোডাক্ট’ বা অনুকরণকারী জাতি নই; আমরা একসময় বিশ্বকে জ্ঞান ও সভ্যতার আলো দিয়েছি।

৫. সাহিত্য ও ভাষার সুরক্ষা: বাংলা ভাষায় অনুপ্রবেশ করানো বিজাতীয় শব্দগুলো বর্জন করে আমাদের নিজস্ব ঐতিহ্যবাহী শব্দমালা ফিরিয়ে আনতে হবে। সাহিত্যচর্চায় লেখকদের দেশীয় ও নিজস্ব ভাবধারার প্রতি উদ্বুদ্ধ করতে হবে।

৬. সামাজিক আন্দোলন: প্রতিটি এলাকায় যুবকদের নিয়ে সুস্থ সংস্কৃতির ক্লাব ও পাঠাগার গড়ে তুলতে হবে। খেলাধুলা ও সৃজনশীল কাজে তাদের ব্যস্ত রাখতে হবে, যাতে তারা অপসংস্কৃতির নেশায় ডুবে না যায়।