ঢাকা ০৯:১৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ০১ মার্চ ২০২৬

কুমিল্লায় টিসিবি পণ্যে ভয়াবহ অনিয়ম: ওজনে কম, স্বজনপ্রীতি ও লাখ টাকার দুর্নীতি

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৪:৪০:৪৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ২ বার পড়া হয়েছে

পবিত্র রমজান মাস উপলক্ষে সরকারের ভর্তুকি মূল্যে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) পণ্য বিতরণে কুমিল্লায় ভয়াবহ অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য স্বল্পমূল্যে সরবরাহ করা এসব নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যে ওজনে কারচুপি, স্বজনপ্রীতি ও দীর্ঘ লাইন উপেক্ষা করে পরিচিতদের পণ্য দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটছে অহরহ। প্রতিদিন কেবল ওজনে কম দেওয়ার মাধ্যমেই লক্ষাধিক টাকার বেশি পণ্য আত্মসাৎ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।

বৃহস্পতিবার দুপুর ১টায় নগরীর রেইসকোর্স এলাকায় ফারুক স্টোরের স্বত্বাধিকারী পারভীন আক্তারের তত্ত্বাবধানে টিসিবি পণ্য বিতরণের ট্রাকে এমন ভয়াবহ চিত্র দেখা যায়। ডিজিটাল স্কেলে ওজন করা হলেও প্রতিটি পণ্যে নির্দিষ্ট পরিমাণ কম দেওয়া হচ্ছিল। যেমন, প্রতি কেজি পণ্যে ১০০ গ্রাম, দুই কেজিতে ২০০ গ্রাম এবং ৫০০ গ্রামের পণ্যে ৫০ গ্রাম করে কম দেওয়া হচ্ছিল।

রমজান উপলক্ষে টিসিবি চিনি (১ কেজি), মসুর ডাল (২ কেজি), বুট (১ কেজি), সয়াবিন তেল (২ কেজি) ও খেজুর (৫০০ গ্রাম) এই পাঁচটি পণ্য স্বল্পমূল্যে বিক্রি করছে। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রতিটি পণ্যের ক্ষেত্রেই এমন ওজনে কারচুপির শিকার হচ্ছেন ক্রেতারা।

পণ্য নিতে আসা রোকসানা আক্তার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “প্রায় এক ঘণ্টা ধরে লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে কিছু টাকা কমে পণ্য নিতে আসি। অথচ তারা এখানে আমাদের ওজনে কম দেয়। পরিচিত মানুষকে আগে দিয়ে দেয়, লাইনের কোনো নিয়ম মানে না। এতে ভোগান্তি আরও বাড়ে। একজন বারবার পণ্য নিচ্ছে, আরেকজন পাচ্ছেই না।” একই অভিযোগ করেন বাগিচাগাঁও এলাকার গৃহবধূ তাসলিমা আক্তার। তিনি বলেন, “তারা চেহারা দেখে দেখে মাল দেয়। আমরা লাইনে দাঁড়িয়ে আছি, কিন্তু ডিলারের লোকজন লাইনের বাইরের লোক ডেকে এনে পণ্য দিয়ে দিচ্ছে। বাজার থেকে কিনতে পারি না বলেই তো লাইনে দাঁড়িয়ে আছি। এখানে কেন অনিয়ম দুর্নীতি হবে? এগুলো কেউ দেখছে না কেন?” রেইসকোর্স এলাকার ব্যবসায়ী মো. হানিফ জানান, “যারা খুব কষ্টে দিনযাপন করছে, তারাই টিসিবির পণ্য সংগ্রহ করতে আসে। কিন্তু তাদের সঙ্গেই প্রতারণা করছে ডিলাররা। সরকার ভর্তুকি দিচ্ছে, অথচ ডিলাররা মাপে কম দিয়ে গরিবের টাকা মেরে খাচ্ছে। আমরা কয়েকজন গ্রাহকের পণ্য মেপে দেখেছি, প্রতি কেজিতে ১০০ গ্রাম এবং দুই কেজির ডালে ২০০ গ্রাম কম দেওয়া হচ্ছে।”

এ বিষয়ে টিসিবির ডিলার পারভীন আক্তার বলেন, “আমরা ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো পণ্যে মাপ কম দেইনি। মাপের সময় হয়তো ভুলে কম হয়ে গেছে। আমি এই কাজে নিয়োজিত সকলকে বলে দিয়েছি, আর কোনো মাপে যেন ভুল না হয়।”

কুমিল্লায় প্রতিদিন পাঁচটি ট্রাকে টিসিবির পণ্য বিক্রি করা হয়, যেখানে প্রতিটি ট্রাকে ৪০০ জনের জন্য বরাদ্দ থাকে। সে হিসেবে প্রতিদিন মোট ২০০০ পরিবারকে এই সহায়তা দেওয়া হয়। জনপ্রতি মোট ৬ কেজি নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য পাওয়ার কথা থাকলেও, বাস্তবে ৬০০ গ্রাম কম অর্থাৎ ৫.৪ কেজি পণ্য দেওয়া হচ্ছে। এই হিসাবে, প্রতিটি গাড়িতে ৪০০ জনকে ২৪০ কেজি পণ্য কম দেওয়া হচ্ছে, যার বাজারমূল্য কমপক্ষে প্রায় চব্বিশ হাজার টাকা। এভাবে কুমিল্লায় প্রতিদিন পাঁচটি ট্রাকসেলে প্রায় লক্ষাধিক টাকার অনিয়ম হচ্ছে।

অনিয়মের খবর পেয়ে কুমিল্লা জেলা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ কর্তৃপক্ষ টিম নিয়ে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়। ওজনের কারচুপি দেখতে পেয়ে ফারুক স্টোরের স্বত্বাধিকারীকে নামমাত্র দশ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। কুমিল্লা জেলা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক কাউছার মিয়া বলেন, “এসব টিসিবি পণ্য সরকারের পক্ষ থেকে গরিব মানুষদের দেওয়া হয়। কিন্তু কিছু অসাধু ব্যবসায়ী এখানে ওজনে কম দিয়ে নিজেদের পকেট ভারি করে। আমরা এমন একটি তথ্য পেয়ে ঘটনাস্থলে আসি এবং দেখতে পাই ফারুক স্টোর কর্তৃপক্ষ প্রতিটি পণ্যের ওজনে কম দিচ্ছে। আমরা তাদেরকে দশ হাজার টাকা জরিমানা করি এবং ভবিষ্যতে এমন কাজ যেন না করে সে বিষয়ে হুঁশিয়ারি করে দেই।”

কুমিল্লা টিসিবির উপ-পরিচালক মামুনুর রশীদ গাজী বলেন, “আমাদের পাঁচটি ট্রাক প্রতিদিন ৪০০ করে ২০০০ মানুষকে পণ্য দিয়ে থাকে। অনুমোদিত ডিলারের মাধ্যমে এসব পণ্য সরবরাহ করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে যদি কোনো স্বজনপ্রীতি কিংবা দুর্নীতির অভিযোগ থাকে, তদন্ত সাপেক্ষে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থে কঠোর হামলার হুঁশিয়ারি ইরানের প্রেসিডেন্টের

কুমিল্লায় টিসিবি পণ্যে ভয়াবহ অনিয়ম: ওজনে কম, স্বজনপ্রীতি ও লাখ টাকার দুর্নীতি

আপডেট সময় : ০৪:৪০:৪৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

পবিত্র রমজান মাস উপলক্ষে সরকারের ভর্তুকি মূল্যে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) পণ্য বিতরণে কুমিল্লায় ভয়াবহ অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য স্বল্পমূল্যে সরবরাহ করা এসব নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যে ওজনে কারচুপি, স্বজনপ্রীতি ও দীর্ঘ লাইন উপেক্ষা করে পরিচিতদের পণ্য দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটছে অহরহ। প্রতিদিন কেবল ওজনে কম দেওয়ার মাধ্যমেই লক্ষাধিক টাকার বেশি পণ্য আত্মসাৎ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।

বৃহস্পতিবার দুপুর ১টায় নগরীর রেইসকোর্স এলাকায় ফারুক স্টোরের স্বত্বাধিকারী পারভীন আক্তারের তত্ত্বাবধানে টিসিবি পণ্য বিতরণের ট্রাকে এমন ভয়াবহ চিত্র দেখা যায়। ডিজিটাল স্কেলে ওজন করা হলেও প্রতিটি পণ্যে নির্দিষ্ট পরিমাণ কম দেওয়া হচ্ছিল। যেমন, প্রতি কেজি পণ্যে ১০০ গ্রাম, দুই কেজিতে ২০০ গ্রাম এবং ৫০০ গ্রামের পণ্যে ৫০ গ্রাম করে কম দেওয়া হচ্ছিল।

রমজান উপলক্ষে টিসিবি চিনি (১ কেজি), মসুর ডাল (২ কেজি), বুট (১ কেজি), সয়াবিন তেল (২ কেজি) ও খেজুর (৫০০ গ্রাম) এই পাঁচটি পণ্য স্বল্পমূল্যে বিক্রি করছে। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রতিটি পণ্যের ক্ষেত্রেই এমন ওজনে কারচুপির শিকার হচ্ছেন ক্রেতারা।

পণ্য নিতে আসা রোকসানা আক্তার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “প্রায় এক ঘণ্টা ধরে লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে কিছু টাকা কমে পণ্য নিতে আসি। অথচ তারা এখানে আমাদের ওজনে কম দেয়। পরিচিত মানুষকে আগে দিয়ে দেয়, লাইনের কোনো নিয়ম মানে না। এতে ভোগান্তি আরও বাড়ে। একজন বারবার পণ্য নিচ্ছে, আরেকজন পাচ্ছেই না।” একই অভিযোগ করেন বাগিচাগাঁও এলাকার গৃহবধূ তাসলিমা আক্তার। তিনি বলেন, “তারা চেহারা দেখে দেখে মাল দেয়। আমরা লাইনে দাঁড়িয়ে আছি, কিন্তু ডিলারের লোকজন লাইনের বাইরের লোক ডেকে এনে পণ্য দিয়ে দিচ্ছে। বাজার থেকে কিনতে পারি না বলেই তো লাইনে দাঁড়িয়ে আছি। এখানে কেন অনিয়ম দুর্নীতি হবে? এগুলো কেউ দেখছে না কেন?” রেইসকোর্স এলাকার ব্যবসায়ী মো. হানিফ জানান, “যারা খুব কষ্টে দিনযাপন করছে, তারাই টিসিবির পণ্য সংগ্রহ করতে আসে। কিন্তু তাদের সঙ্গেই প্রতারণা করছে ডিলাররা। সরকার ভর্তুকি দিচ্ছে, অথচ ডিলাররা মাপে কম দিয়ে গরিবের টাকা মেরে খাচ্ছে। আমরা কয়েকজন গ্রাহকের পণ্য মেপে দেখেছি, প্রতি কেজিতে ১০০ গ্রাম এবং দুই কেজির ডালে ২০০ গ্রাম কম দেওয়া হচ্ছে।”

এ বিষয়ে টিসিবির ডিলার পারভীন আক্তার বলেন, “আমরা ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো পণ্যে মাপ কম দেইনি। মাপের সময় হয়তো ভুলে কম হয়ে গেছে। আমি এই কাজে নিয়োজিত সকলকে বলে দিয়েছি, আর কোনো মাপে যেন ভুল না হয়।”

কুমিল্লায় প্রতিদিন পাঁচটি ট্রাকে টিসিবির পণ্য বিক্রি করা হয়, যেখানে প্রতিটি ট্রাকে ৪০০ জনের জন্য বরাদ্দ থাকে। সে হিসেবে প্রতিদিন মোট ২০০০ পরিবারকে এই সহায়তা দেওয়া হয়। জনপ্রতি মোট ৬ কেজি নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য পাওয়ার কথা থাকলেও, বাস্তবে ৬০০ গ্রাম কম অর্থাৎ ৫.৪ কেজি পণ্য দেওয়া হচ্ছে। এই হিসাবে, প্রতিটি গাড়িতে ৪০০ জনকে ২৪০ কেজি পণ্য কম দেওয়া হচ্ছে, যার বাজারমূল্য কমপক্ষে প্রায় চব্বিশ হাজার টাকা। এভাবে কুমিল্লায় প্রতিদিন পাঁচটি ট্রাকসেলে প্রায় লক্ষাধিক টাকার অনিয়ম হচ্ছে।

অনিয়মের খবর পেয়ে কুমিল্লা জেলা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ কর্তৃপক্ষ টিম নিয়ে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়। ওজনের কারচুপি দেখতে পেয়ে ফারুক স্টোরের স্বত্বাধিকারীকে নামমাত্র দশ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। কুমিল্লা জেলা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক কাউছার মিয়া বলেন, “এসব টিসিবি পণ্য সরকারের পক্ষ থেকে গরিব মানুষদের দেওয়া হয়। কিন্তু কিছু অসাধু ব্যবসায়ী এখানে ওজনে কম দিয়ে নিজেদের পকেট ভারি করে। আমরা এমন একটি তথ্য পেয়ে ঘটনাস্থলে আসি এবং দেখতে পাই ফারুক স্টোর কর্তৃপক্ষ প্রতিটি পণ্যের ওজনে কম দিচ্ছে। আমরা তাদেরকে দশ হাজার টাকা জরিমানা করি এবং ভবিষ্যতে এমন কাজ যেন না করে সে বিষয়ে হুঁশিয়ারি করে দেই।”

কুমিল্লা টিসিবির উপ-পরিচালক মামুনুর রশীদ গাজী বলেন, “আমাদের পাঁচটি ট্রাক প্রতিদিন ৪০০ করে ২০০০ মানুষকে পণ্য দিয়ে থাকে। অনুমোদিত ডিলারের মাধ্যমে এসব পণ্য সরবরাহ করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে যদি কোনো স্বজনপ্রীতি কিংবা দুর্নীতির অভিযোগ থাকে, তদন্ত সাপেক্ষে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”