ঢাকা ০৯:১৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ০১ মার্চ ২০২৬

লেবুর রাজধানী শ্রীমঙ্গলেও আকাশচুম্বী দাম: ইফতারে লেবুর শরবত এখন ‘সোনার হরিণ’

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০২:৪৭:১৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ৩ বার পড়া হয়েছে

পবিত্র রমজান মাস এলেই ইফতারে লেবুর শরবতের চাহিদা বাড়ে বহুগুণ। সারা দিনের ক্লান্তি দূর করতে এক গ্লাস লেবুর শরবত যেন অপরিহার্য। কিন্তু এবার এই ‘অপরিহার্য’ লেবু সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে। লেবু ও আনারসের জন্য দেশজুড়ে সমাদৃত মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলেই প্রতি হালি লেবু বিক্রি হচ্ছে ২০০ টাকায়, যা গত এক মাস আগের দামের চেয়ে পাঁচ থেকে আট গুণ বেশি। অপ্রত্যাশিত এই মূল্যবৃদ্ধিতে চরম বিপাকে পড়েছেন সাধারণ ক্রেতারা।

চায়ের রাজধানী হিসেবে পরিচিত শ্রীমঙ্গল লেবু চাষেও দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। এখানকার কাগজি, জারা ও চায়না জাতের লেবু স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন পাইকারি আড়তে সরবরাহ করা হয়। কিন্তু চলতি মৌসুমে লেবুর অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ক্রেতাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।

মাত্র এক মাস আগেও যেখানে প্রতি হালি লেবু ২৫ থেকে ৪০ টাকায় বিক্রি হতো, বর্তমানে খুচরা বাজারে আকারভেদে তার দাম ৮০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত হাঁকা হচ্ছে। বড় আকারের লেবু ২০০ টাকা, মাঝারি আকারের ১৫০-১৭৫ টাকা এবং ছোট আকারের লেবু ৮০-১০০ টাকা দরে বিক্রি হতে দেখা গেছে।

গত বৃহস্পতিবার (১৮ ফেব্রুয়ারি) শহরের বিভিন্ন বাজার ও আড়ত ঘুরে দেখা যায়, বাজারে লেবুর সরবরাহ তুলনামূলকভাবে কম। অনেক বিক্রেতাকে সীমিত পরিমাণে লেবু নিয়ে ক্রেতার অপেক্ষায় বসে থাকতে দেখা গেলেও উচ্চ দামের কারণে বিক্রি তলানিতে ঠেকেছে।

খুচরা বিক্রেতারা জানান, আড়ত থেকে তাদের প্রতিটি লেবু ২০ থেকে ৫০ টাকায় কিনতে হচ্ছে। এর সঙ্গে শ্রমিক মজুরি, পরিবহন ও বাজার খরচ যোগ করে ন্যূনতম লাভে বিক্রি করতে গিয়েই প্রতি হালির দাম ১০০ থেকে ২০০ টাকায় উঠেছে। বিক্রেতা মুসাব্বির মিয়া বলেন, “চাহিদার তুলনায় বাজারে লেবুর সরবরাহ এক-চতুর্থাংশ। আড়তে গিয়েও পর্যাপ্ত লেবু পাওয়া যাচ্ছে না। বেশি দামে কিনে কম লাভে বিক্রি করতে হচ্ছে।” অপর বিক্রেতা রিপন মিয়া জানান, আগে প্রতিদিন যেখানে পাঁচ থেকে ছয়শো পিস লেবু বিক্রি হতো, এখন তা কমে ১০০-১৫০ পিসে নেমে এসেছে। দাম শুনে অনেক ক্রেতাই লেবু না কিনে ফিরে যাচ্ছেন।

ক্রেতাদের অভিযোগ, রমজানে ইফতারে লেবুর শরবতের কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু আকাশছোঁয়া দামের কারণে অনেকেই লেবু কিনতে পারছেন না। ক্রেতা মাসুম আহমদ আক্ষেপ করে বলেন, “শ্রীমঙ্গল লেবুর জন্য বিখ্যাত, অথচ এখানকার মানুষই চাহিদামতো লেবু কিনতে পারছেন না।”

লেবু ব্যবসায়ী বারিক মিয়া জানান, দীর্ঘদিন বৃষ্টিপাত না হওয়ায় পাহাড়ি বাগানগুলোতে পানির তীব্র অভাব দেখা দিয়েছে। এর ফলে ফলন স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক কম। ভরা মৌসুমে যেখানে প্রতিটি গাছে ২৫০-৩০০টি লেবু হয়, সেখানে এখন অনেক বাগানে ১০-১৫টির বেশি ফলন নেই।

শ্রীমঙ্গল উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. আলাউদ্দিন বলেন, “উপজেলার ১ হাজার ২৩৫ হেক্টর জমিতে লেবু চাষাবাদ হয়। কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে লেবু চাষিদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহযোগিতা প্রদান করা হচ্ছে। তবে চলতি মৌসুমে বৃষ্টিপাত কম হওয়ায় লেবুর ফলন কিছুটা কমেছে।”

শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ইসলাম উদ্দিন জানান, উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর মৌলভীবাজারের উপপরিচালক, পুলিশ, উপজেলা ও পৌর প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ এবং পুলিশের সমন্বয়ে গত বুধবার সকালে বাজার মনিটরিং করা হয়েছে। এই মনিটরিংয়ে খুচরা ও পাইকারি বিক্রেতাদের সতর্ক করা হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থে কঠোর হামলার হুঁশিয়ারি ইরানের প্রেসিডেন্টের

লেবুর রাজধানী শ্রীমঙ্গলেও আকাশচুম্বী দাম: ইফতারে লেবুর শরবত এখন ‘সোনার হরিণ’

আপডেট সময় : ০২:৪৭:১৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

পবিত্র রমজান মাস এলেই ইফতারে লেবুর শরবতের চাহিদা বাড়ে বহুগুণ। সারা দিনের ক্লান্তি দূর করতে এক গ্লাস লেবুর শরবত যেন অপরিহার্য। কিন্তু এবার এই ‘অপরিহার্য’ লেবু সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে। লেবু ও আনারসের জন্য দেশজুড়ে সমাদৃত মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলেই প্রতি হালি লেবু বিক্রি হচ্ছে ২০০ টাকায়, যা গত এক মাস আগের দামের চেয়ে পাঁচ থেকে আট গুণ বেশি। অপ্রত্যাশিত এই মূল্যবৃদ্ধিতে চরম বিপাকে পড়েছেন সাধারণ ক্রেতারা।

চায়ের রাজধানী হিসেবে পরিচিত শ্রীমঙ্গল লেবু চাষেও দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। এখানকার কাগজি, জারা ও চায়না জাতের লেবু স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন পাইকারি আড়তে সরবরাহ করা হয়। কিন্তু চলতি মৌসুমে লেবুর অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ক্রেতাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।

মাত্র এক মাস আগেও যেখানে প্রতি হালি লেবু ২৫ থেকে ৪০ টাকায় বিক্রি হতো, বর্তমানে খুচরা বাজারে আকারভেদে তার দাম ৮০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত হাঁকা হচ্ছে। বড় আকারের লেবু ২০০ টাকা, মাঝারি আকারের ১৫০-১৭৫ টাকা এবং ছোট আকারের লেবু ৮০-১০০ টাকা দরে বিক্রি হতে দেখা গেছে।

গত বৃহস্পতিবার (১৮ ফেব্রুয়ারি) শহরের বিভিন্ন বাজার ও আড়ত ঘুরে দেখা যায়, বাজারে লেবুর সরবরাহ তুলনামূলকভাবে কম। অনেক বিক্রেতাকে সীমিত পরিমাণে লেবু নিয়ে ক্রেতার অপেক্ষায় বসে থাকতে দেখা গেলেও উচ্চ দামের কারণে বিক্রি তলানিতে ঠেকেছে।

খুচরা বিক্রেতারা জানান, আড়ত থেকে তাদের প্রতিটি লেবু ২০ থেকে ৫০ টাকায় কিনতে হচ্ছে। এর সঙ্গে শ্রমিক মজুরি, পরিবহন ও বাজার খরচ যোগ করে ন্যূনতম লাভে বিক্রি করতে গিয়েই প্রতি হালির দাম ১০০ থেকে ২০০ টাকায় উঠেছে। বিক্রেতা মুসাব্বির মিয়া বলেন, “চাহিদার তুলনায় বাজারে লেবুর সরবরাহ এক-চতুর্থাংশ। আড়তে গিয়েও পর্যাপ্ত লেবু পাওয়া যাচ্ছে না। বেশি দামে কিনে কম লাভে বিক্রি করতে হচ্ছে।” অপর বিক্রেতা রিপন মিয়া জানান, আগে প্রতিদিন যেখানে পাঁচ থেকে ছয়শো পিস লেবু বিক্রি হতো, এখন তা কমে ১০০-১৫০ পিসে নেমে এসেছে। দাম শুনে অনেক ক্রেতাই লেবু না কিনে ফিরে যাচ্ছেন।

ক্রেতাদের অভিযোগ, রমজানে ইফতারে লেবুর শরবতের কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু আকাশছোঁয়া দামের কারণে অনেকেই লেবু কিনতে পারছেন না। ক্রেতা মাসুম আহমদ আক্ষেপ করে বলেন, “শ্রীমঙ্গল লেবুর জন্য বিখ্যাত, অথচ এখানকার মানুষই চাহিদামতো লেবু কিনতে পারছেন না।”

লেবু ব্যবসায়ী বারিক মিয়া জানান, দীর্ঘদিন বৃষ্টিপাত না হওয়ায় পাহাড়ি বাগানগুলোতে পানির তীব্র অভাব দেখা দিয়েছে। এর ফলে ফলন স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক কম। ভরা মৌসুমে যেখানে প্রতিটি গাছে ২৫০-৩০০টি লেবু হয়, সেখানে এখন অনেক বাগানে ১০-১৫টির বেশি ফলন নেই।

শ্রীমঙ্গল উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. আলাউদ্দিন বলেন, “উপজেলার ১ হাজার ২৩৫ হেক্টর জমিতে লেবু চাষাবাদ হয়। কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে লেবু চাষিদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহযোগিতা প্রদান করা হচ্ছে। তবে চলতি মৌসুমে বৃষ্টিপাত কম হওয়ায় লেবুর ফলন কিছুটা কমেছে।”

শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ইসলাম উদ্দিন জানান, উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর মৌলভীবাজারের উপপরিচালক, পুলিশ, উপজেলা ও পৌর প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ এবং পুলিশের সমন্বয়ে গত বুধবার সকালে বাজার মনিটরিং করা হয়েছে। এই মনিটরিংয়ে খুচরা ও পাইকারি বিক্রেতাদের সতর্ক করা হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।