ঢাকা ০৩:১৪ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ০২ মার্চ ২০২৬

হিমপ্রহরী

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৪:২২:৩১ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ০ বার পড়া হয়েছে

তিন

পর্বতারোহণের ক্ষেত্রে শেরপা সরদারই আসল নেতা। দলে একজন আনুষ্ঠানিক নেতা থাকলেও পর্বতের পথে চলার সময় শেষ সিদ্ধান্ত দেন শেরপাই। কারণ পর্বতের প্রতিটি ফাটল কিংবা ধেয়ে আসা তুষারঝড়ের তাণ্ডব সম্পর্কে শেরপারা অবগত আছে। তাদের দীর্ঘ দিনের অভিজ্ঞতায় পর্বতের মেজাজ মর্জি ভালোভাবে বুঝতে সক্ষম হয়। শেরপারা জানে কোন পথে এগোতে হবে, আর কখন না ফিরলে বিপদে পড়তে হবে। তাদের সিদ্ধান্ত ছাড়া অভিযাত্রীদের প্রতিটি পদক্ষেপই ঝুঁকিপূর্ণ। একটা অভিযান সম্পন্ন করতে হলে শুধু শক্তি বা সাহসই যথেষ্ট নয়, তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তের ওপর গুরুত্ব দিতে হয়। তাই শেরপার নির্দেশ অমান্য করা মানে নিজের জীবনকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেওয়া। পর্বতের পথ ধরে নিরাপদে এগোতে হলে শেরপার কথা শুনতে হয়, তাদের সিদ্ধান্ত মানতে হয়। এক কথায়, শেরপা ছাড়া কোনো অভিযানই সফল হয় না।

মাছাপুচ্ছ্রে অভিযানে শেরপাদের নেতা তিলক লিম্বু। সে অল্প কথার মানুষ। বেশিরভাগই সময় চুপচাপ থাকে, প্রয়োজনে কেবল হাতের ইশারায় নির্দেশ দেয়। তার চোখের চাহনিতেই তরুণ শেরপারা সঙ্গে সঙ্গে বুঝে ফেলে কি করতে হবে বা কি করণীয় আছে।

তিলকের প্রতি রয়েছে দলের শেরপাদের ভীষণ শ্রদ্ধা। সেই শ্রদ্ধাবোধ থেকেই তারা বিনা প্রশ্নে তার সিদ্ধান্ত মেনে নেয়। তিলক যা বলে, তা-ই তাদের জন্য আইন। কিছুক্ষণ আগেই সে বলেছিল নিচে নেমে যেতে হবে। দলের সব শেরপারা এক মুহূর্তও দ্বিধা না করেই সেই নির্দেশ মেনে নিয়েছে।

তিলক চলে যেতেই চারজন অভিযাত্রী নিজেদের তাঁবুর ভেতর গুটিসুটি মেরে বসে রইলেন। ঠান্ডায় হাত-পা জমে আসছে তাদের। সবাই কম্বল আর জ্যাকেট জড়িয়ে শরীর গরম রাখার চেষ্টা করছে। বাইরে হিমেল হাওয়া বইছে, তুষারঝড়ের তাণ্ডব পর্বত কাঁপিয়ে দিচ্ছে। তাঁবুর কাপড় থরথর করে কেঁপে উঠছে; যেকোনো মুহূর্তে ছিঁড়ে যেতে পারে।

তাঁবুর ভেতরে চার্জ লাইট জ্বলছে। লাইটের ক্ষীণ আলোয় অভিযাত্রীদের মুখগুলো অস্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। আলো-ছায়ার খেলায় প্রত্যেকের চোখে-মুখের অস্থিরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। উত্তেজনা আর দুশ্চিন্তা মিলেমিশে পরিবেশটাকে আরও প্রতিকূল করে তুলছে। অভিযাত্রীরা এখন শেরপাদের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছেন।

তাদের দীর্ঘ দিনের পরিশ্রম আর স্বপ্ন এখন তিলক লিম্বুর উপর নির্ভর করছে। মাছাপুচ্ছ্রে চূড়ায় ওঠার জন্য তারা এত দূর এসেছেন; শেষ ধাপটা এখনো বাকি। সেই শেষ ধাপের দরজা খুলে দেওয়ার চাবি তিলকের হাতে। তার একটি মাত্র সিদ্ধান্তই ঠিক করে দেবে তারা স্বপ্নের চূড়ায় পৌঁছাবে, নাকি নিচে ফিরে যাবে।

তিলক যদি আর চূড়ার দিকে এগোতে রাজি না হয়, তবে অভিযান এখানেই থেমে যাবে। আর থেমে যাওয়া মানে শুধু ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়, এটা হবে তাদের সম্মানের জন্য হানিকর। নেপাল সরকারের কাছে তাদের দুর্নাম হবে। কারণ এই অভিযানকে সরকারও গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। এছাড়া আন্তর্জাতিক মহলেও এই অভিযান ব্যর্থ হিসেবে চিহ্নিত হবে। সবকিছু চিন্তা করেই তাঁবুর ভেতরে বসে তারা তিলকের বিকল্প নিয়ে ভাবছে। অবশ্য অন্য শেরপারাও যদি তিলকের সঙ্গে যোগ দেয়, তাহলে আর ভাবানারও সুযোগ থাকবে না।

চার্জ লাইটের মৃদু আলোয় তাঁবুর ভেতরে এক ভৌতিক পরিবেশ তৈরি করেছে। তার ওপর তিলক লিম্বুর সতর্কবার্তায় সবাই আরও বেশি আতঙ্কিত হয়ে পড়ছেন। বিশেষ করে নেপালি অভিযাত্রীদের বুক ধড়ফড় করতে লাগল তিলকের কথা শুনেই। কারণ বিষয়টার সঙ্গে জড়িয়ে আছে তাদের ধর্মীয় অনুভূতি। তাই তারা দুজন সতর্ক অবস্থানে থেকে কথা বলার চেষ্টা করছেন। নানান আলোচনার পর ইখতিয়ার হামিম বললেন, ‘তিলক আমাদের পথপ্রদর্শক, অভিযানের নিরাপত্তার ভার অনেকটাই তার ওপর নির্ভর করছে। তার সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করার মানে নিজেদেরকে বিপদে ফেলে দেওয়া। এদিকে আমরা যদি এতদূর এসে ফিরে যাই, তবে এই অভিযানটা অর্থহীন হয়ে পড়বে। কাজেই এখনই আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে কীভাবে সামনে এগুনো যায়।’

রিনজো খড়কা ভেবেচিন্তে বললেন, ‘আমার মনে হয় তিলককে শান্তভাবে বোঝানো দরকার। যদি আমরা তার সঙ্গে ঠান্ডা মাথায় কথা বলি, তাহলে হয়তো রাজি করানো সম্ভব হতে পারে। তিলক একবার যদি বুঝতে পারে যে, আমরা তাকে বিশ্বাস করি, তাহলে সে হয়তো নিজের নেওয়া সিদ্ধান্তটা বদলাতেও পারে।’

রিনজোর পরামর্শ শুনে অন্য তিনজন অভিযাত্রীও মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন। তারা জানেন, শেরপারা একরোখা, তাদের মন বদলানো কঠিন। জোর করে কিছু চাপিয়ে দিলে ফলাফল উল্টো হরে। তাই সবাই মিলে ঠিক করলেন, তিলকের সঙ্গে মাথা ঠান্ডা রেখে ধৈর্য ধরে কথা বলতে হবে। বিশ্বাস আর আন্তরিকতার মাধ্যমে তাকে বোঝাতে হবে। যাতে সে তার সিদ্ধান্তটা বদলাতে বাধ্য হয়।

রিনজো খড়কার পরামর্শ ইখতিয়ার হামিমের মনে ধরেছে। তিনি বুকভরা আশা নিয়ে বললেন, ‘দায়িত্বটা তোমাকেই নিতে হবে রিনজো। তিলকের সঙ্গে কথা বলে আমার সঙ্গে মধ্যস্থতা করে দাও। শৈলজিত রায়ের পক্ষে এটা সম্ভব নয়, তুমি তার দেশি ভাই। আমার বিশ্বাস, তোমাকে সে অগাহ্য করবে না। তোমার কথায় হয়তো তার মন নরম হবে।’

রিনজো খড়কা শান্ত গলায় বললেন, ‘চেষ্টা করে দেখি। ভালো হয় যদি তাকে ডেকে আনা যায়। তোমরা অপেক্ষা করো, আমি তাঁবুতে যাচ্ছি, তাকে সঙ্গে করে নিয়ে আসছি।’

রিনজো উঠে দাঁড়ালেন তিলককে নিয়ে আসতে। তাঁবুর ভেতর থেকে বেরোনোর সময় তার মুখে চিন্তার ছাপ স্পষ্ট হয়ে উঠল। ভেতরে চাপা ভয় কাজ করছে, সেটা তার চোখে-মুখে ফুটে উঠেছে।

চারপাশে সতর্ক দৃষ্টিতে তাকালেন রিনজো খড়কা। তিনি নিশ্চিত হতে চাইছেন, তিলককে সতর্কবার্তা পাঠানো সেই অদৃশ্য শক্তি তাকে দেখছে কি না। আশেপাশে কাউকে না দেখে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলেন তিলকের তাঁবুর দিকে। ভেতরে তখনও তিলক শেরপাদের সঙ্গে আলোচনায় ব্যস্ত, মনে হচ্ছে তারা কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর চেষ্টা করছে।

রিনজোর আগমনে মুহূর্তেই সেই আলোচনা থেমে গেল। শেরপারা চুপ হয়ে গেল, আর তিলক বিস্মিত দৃষ্টিতে তার দিকে তাকাল। রিনজো তিলকের পাশে বসে নরম গলায় বললেন, ‘তিলক, তোমার সঙ্গে জরুরি কথা আছে। বড় তাঁবুটাতে এসো।’

তিলক কিছুক্ষণ রিনজোর দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর অনিচ্ছা সত্ত্বেও সে উঠে দাঁড়াল। তাঁবু থেকে বেরিয়ে আসার সময় তার পা যেন শক্ত হয়ে গেছে। অনেক কষ্টে পা টেনে টেনে হেঁটে রিনজোর সঙ্গে তাঁবুতে প্রবেশ করল তিলক।

ইখতিয়ার হামিম তাকে দেখেই পাশে বসতে ইঙ্গিত করলেন। তিলক বসে পড়ল। ইখতিয়ার হামিম ঠান্ডা মাথায় বললেন, ‘তিলক, আমাদের নিরাশ করো না। সরকারি প্রকল্পের দায়িত্ব নিয়ে সবাই এই অভিযানে এসেছি। যদি বড় কোনো বিপদ না ঘটে, তাহলে মাঝপথে ফিরে গেলে সমস্ত ব্যয়ভার আমাদেরকেই বহন করতে হবে। শুধু তাই নয়, অন্যান্য অভিযাত্রীদের কাছে বদনাম ছড়িয়ে পড়বে। এটা শুধু সম্মানের প্রশ্ন নয়, পুরো দলের ভবিষ্যৎও জড়িয়ে আছে এখানে। তুমি আমাদের দলের একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। তোমার সিদ্ধান্তে শুধু আমাদের নয়, পুরো প্রকল্পের সাফল্য নির্ভর করছে। যদি তুমি পিছিয়ে যাও, তাহলে আমরা সবাই বিপদে পড়ব। এই মুহূর্তে তোমার সাহস আর বিশ্বাসই আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি।’

তিলক চুপচাপ বসে রইল। তার দুচোখ অদৃশ্য কিছু একটাকে খুঁজছে। এদিক সেদিক তাকিয়ে সে ফোঁস করে উঠল, ‘যদি বেঁচেই না থাক, তাহলে সম্মান দিয়ে কি হবে? মৃত্যুর পর কী সম্মান কাজে আসবে দাই?’

তার প্রশ্ন শুনে অভিযাত্রীরা বিস্মিত হলেন। কেউ মুখে কিছু বললেন না। নিজের ভেতরে তিলকের প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন সবাই।

বাইরে তখন প্রাকৃতিক দুর্যোগ ভয়ংকর রূপ নিয়েছে। তুষার ঝড়ের তাণ্ডবে তাঁবুর কাপড় থরথর করে কাঁপছে। এমন পরিবেশ পরিস্থিতির মুখোমুখি পর্বতারোহীদের প্রায়ই হতে হয়, তাই বিষয়টাকে তেমন গুরুত্ব দেয়নি অভিযাত্রীরা।

তিলক লিম্বুর মনে হলো, আজকের ঝড় অস্বাভাবিক কিছু। সাধারণত দিনের বেলা পর্বতের উপরে ঝড় ওঠে, সন্ধ্যা কিংবা রাতের বেলায় এমন তাণ্ডব সচরাচর দেখা যায় না। তাই আজকের এই অদ্ভুত পরিস্থিতি তাকে গভীরভাবে ভাবিয়ে তুলল।

তিলক ধীরে ধীরে তাঁবুর ফাঁক দিয়ে বাইরে মুখ বাড়াল। ঝড়ের গর্জন, আর বাতাসের উন্মত্ত নৃত্য দেখে সে ঘাবড়ে গেল। আর মুহূর্তেই তিলক চমকে উঠল। বিস্মিত কণ্ঠে বলল, ‘ধূপের গন্ধ পাচ্ছি… তোমরা টের পাচ্ছ?’

তার কথায় অন্যরা থমকে গেলেন। কেউ কিছু বললেন না, বিস্ময়ের চোখে তার দিকে তাকালেন। কেউ বিশ্বাসই করতে পারছেন না, এত উচ্চতায় ঝড়ের মধ্যে ধূপের গন্ধ আসবে কীভাবে!

পবন থাপা নিজকে সামলে নিয়ে বাইরে মুখ বাড়িয়ে নাক পেতে শুঁকে অবাক হয়ে বললেন, ‘তিলক ঠিকই বলেছে, ধূপ-ধূনোর গন্ধ এলো কোথা থেকে! আচ্ছা, কারো তাঁবুতে কি কেউ ধূপ জ্বালিয়েছে?’

তিলক মাথা নেড়ে বলল, ‘না না, সেরকম কিছু হলে তো আগেই বলতাম। আমাদের কারোর সঙ্গেই ধূপ-ধূনো নেই।’

তিলকের কথা শুনে সবাই চুপ হয়ে গেলেন। এত উঁচুতে যেখানে চারপাশে শুধু বরফ আর বরফ, সেখানে ধূপের গন্ধ ভেসে আসা সত্যিই বিস্ময়কর। কারো কারো মনে সন্দেহ জাগল, হয়তো এটা কোনো অলৌকিক ইঙ্গিত। আবার কারো মনে হলো, অতিরিক্ত ক্লান্তি আর ভাবনার কারণে মনের ভেতরেই এমন অনুভূতি তৈরি হচ্ছে।

এই অস্বাভাবিক পরিস্থিতি সামাল দিতে রিনজো খড়কা দ্রুত কথা ঘুরিয়ে দিলেন। তিনি বললেন, ‘নিজেদের তাঁবুতে ধূপ জ্বালাতে হবে এমন কথা নয়। হয়তো বেসক্যাম্পে কেউ ধূপ জ্বালিয়েছে, সেই গন্ধ বাতাসে ভেসে ভেসে এখানে চলে এসেছে। যতটা জেনেছি, ধোঁয়া অনেক সময় বায়ুমণ্ডলের ৩০ থেকে ৪০ হাজার ফুট পর্যন্ত ভেসে যেতে পারে। সেই হিসাবে বলা যায়, এই গন্ধ এখানে আসা অস্বাভাবিক কিছু নয়। অযথা ভয় পাওয়ার কিছু নেই। এটা কোনো রহস্য নয়; স্বাভাবিক ব্যাপার।’

রিনজো খড়কার কথায় যুক্তি আছে। দলের সদস্যরা রিনজোর যুক্তিকে গ্রহণযোগ্য মনে করল, তাতে তাদের মনে স্বস্তি ফিরে এলো। তাদের কাছে গন্ধের রহস্যের সমাধান না হলেও অন্তত আতঙ্কটা কমেছে। সবাই আবার মনোযোগ দিলো সামিটের কথায়, কারণ তাদের লক্ষ্য এখন একটাই, উপরে ওঠা।

তিলক লিম্বুর মনোযোগ সামিটের দিকে নেই বরং সে রিনজো খড়কার যুক্তিকে খণ্ডানোর চেষ্টা করল, ‘এই ধোঁয়া নিচ থেকে আসেনি, আসার কথাও নয়। এর উৎপত্তি হয়েছে পর্বতের উপরেই। তোমার যুক্তিটা আমার মনে ধরেনি রিনজো দাই। কারণ ধূপের গন্ধ এত উপরে ওঠে আসার কথা নয়।’

পবন থাপা শুকনো কাশি দিয়ে বললেন, ‘এখানে যুক্তি মনে ধরার বিষয় নয়। আসল বিষয় হলো ধোঁয়া কতটা উঁচুতে উঠতে পারে, সেই যুক্তিটাই রিনজো দেখিয়েছে। তবে আমারও মনে হচ্ছে, নিচে কোথাও ধূপ জ্বালানো হয়েছিল, সেই গন্ধ বাতাসে ভেসে এসে পর্বতের গায়ে লেগে আছে। চারপাশে উঁচু উঁচু শৃঙ্গ থাকায় গন্ধটা ছড়িয়ে পড়তে পারেনি, বরং আটকে গেছে এই উচ্চতায়।’

পবনের যুক্তি জোরালো হলেও কণ্ঠে ছিল ভয়ের ছাপ। কারণ তিনি নিজেও পুরোপুরি নিশ্চিত নন।

ইখতিয়ার হামিম উপলব্ধি করলেন, নেপালি অভিযাত্রীদের যুক্তিতর্কে তিলক লিম্বুর মন গলবে না। যতই তারা চেষ্টা করুক, তিলকের দৃঢ় সংকল্প অটল থাকবে। বাঙালি অভিযাত্রী শৈলজিত রায়ের ওপরও ভরসা রাখতে পারলেন না তিনি। কারণ শৈলজিত সহজ-সরল মানুষ, জটিল পরিস্থিতি সামলানোর দক্ষতা তার নেই। তাই তাকে দিয়ে তিলককে বোঝানো সম্ভব নয়।

ইখতিয়ার হামিম ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নিলেন, যা বলার তাকেই বলতে হবে। তিনি নিজের সঙ্গে বোঝাপড়া করে গম্ভীর কণ্ঠে বললেন, ‘তিলক, পর্বত থেকে নেমে যাওয়া অতটা সহজ নয়। ইচ্ছে করলেই নিচে নামতে পারব না আমরা।’

‘নামতে সমস্যা কোথায়!’ অবাক হয়ে জানতে চাইল তিলক লিম্বু।

‘শোনো, আমরা দুজন বাংলাদেশি মাছাপুচ্ছ্রে সামিটে এসেছি। যদি আজই পর্বত থেকে নেমে যাই, নেপাল সরকারের কাছে পুরো ঘটনার বিবরণ লিখে জমা দিয়ে নিজের দেশে ফিরে যেতে পারব। এতে আমাদের তেমন কোনো সমস্যা হবে না। আমরা দেশে ফিরে গিয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপনও করতে পারব। তোমাদের কথা একবার ভেবে দেখো। তোমরা এই দেশের নাগরিক। তোমাদের জীবিকা, রুটি-রুজি সবই এই পর্বতারোহণের ওপর নির্ভরশীল। যদি সরকারের কাছে প্রমাণিত হয় তোমাদের কারণে এই অভিযান ব্যর্থ হয়েছে, তাহলে নেপালে বসবাস করাই কঠিন হয়ে পড়বে।’

এইটুকু বলতেই সবাই নড়েচড়ে বসল। ইখতিয়ার হামিম সুযোগে সবার মুখের দিকে তাকিয়ে তাদের মনস্তাত্ত্বিক বিষয়টা বুঝার চেষ্টা করলেন। যখন বুঝতে পারলেন তার কথায় কাজে দিচ্ছে, তখন আবার বলতে শুরু করলেন, ‘সরকারের নির্দেশ না মানার কারণে সরকার চাইলে তোমার পর্বতারোহণের পারমিটও বাতিল করে দিতে পারে। তখন আর কোনো অভিযানে অংশ নেওয়ার সুযোগ থাকবে না। তরুণ শেরপারা আজীবন তোমার দায়িত্বহীনতা নিয়ে সমালোচনা করবে। এমনকি তোমার নাম উচ্চারণ করবে ব্যর্থতার উদাহরণ দিতে গিয়ে। এই পর্যন্তই আমার কথা, আর বলার কিছু নেই। এখন তোমাদেরই ভাবতে হবে কি করবে, কোন পথে যাবে।’

ইখতিয়ার হামিম এক ঢিলে দুই পাখি মারলেন। তার যুক্তি এতটাই শক্তিশালী ছিল যে, শুধু তিলক লিম্বুই নয়, সঙ্গে থাকা নেপালি দুই অভিযাত্রীও একেবারে চুপ হয়ে গেলেন। মুহূর্তেই তাদের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। সবাই বুঝতে পারলেন, দলনেতা আসলে সরাসরি তিলককে উদ্দেশ করে কথা বললেও তার ইঙ্গিত ছিল পুরো দলের দিকে। তিনি ইঙ্গিতে বাকিদেরও সতর্ক করলেন, যদি দায়িত্বহীনতা দেখায় বা নিয়ম ভঙ্গ করে, তবে তার ফল ভোগ করতে হবে সবাইকে। তাই তিলকসহ অন্যরা কোনো প্রতিবাদ করল না। নীরবতা নেমে এলো দলের মধ্যে, আর সেই নীরবতার ভেতরেই সবাই অনুভব করল, ইখতিয়ারের নেতৃত্ব অবহেলা করা যাবে না।

ইখতিয়ারের যুক্তি তিলক লিম্বুর ভেতরে গভীরভাবে নাড়া দিলো। মুহূর্তেই তার মুখের ভাষা হারিয়ে গেল। সে আর কোনো কথা বলল না, চুপচাপ বসে নিজের মনে কিছু একটা ভাবতে লাগল। রুটি-রুজির প্রসঙ্গটা সামনে আসতেই তার চোয়ালটা শক্ত হয়ে গেল।

কয়েক মিনিট আগেও তার চোখে-মুখে যে রাগ আর ক্ষোভ ছিল, তা এখন একেবারে মিলিয়ে গেছে। সেই তীব্র প্রতিবাদের জায়গায় নেমে এসেছে নীরবতা। তিলকের চেহারা দেখে সহজেই বোঝা যাচ্ছিল, সে আসলে অবাধ্য নয়, বরং বাধ্য শেরপাদের একজন।

পরিস্থিতি তাকে এতটাই নতজানু করে ফেলেছে যে নিজের বিশ্বাস আঁকড়ে ধরলেও বাস্তবতার কাছে মাথা নত করা ছাড়া তার আর কোনো উপায় নেই।

শৈলজিত রায় এবার তিলকের দিকে গভীর দৃষ্টিতে তাকালেন। তিলক কোনো কথা বলল না। শুধু চোয়াল শক্ত করে চেপে রেখেছে, বুঝাই যাচ্ছে ভেতরে ভেতরে লড়াই করছে সে। তার চোখে-মুখেও যুক্তি মেনে নেওয়ার চাপ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। নীরবতা ভেঙে শৈলজিত প্রশ্ন করলেন, ‘ইখতিয়ারের যুক্তিতে তুমি কি একমত তিলক?’

সরাসরি উত্তর না দিয়ে তিলক বলল, ‘আমি তাঁবুতে ফিরে যাচ্ছি। দলের অন্য শেরপাদের কাছে সবকিছু খুলে বলব। তাদের মতামত জেনে সকালে সিদ্ধান্ত জানাব।’

ইখতিয়ার হামিম বললেন, ‘ঠিক আছে, তুমি তাঁবুতে ফিরে যাও। বিশ্রাম নাও। তবে অযথা ভয় পেয়ো না। শেরপাদেরও বলবে শান্ত থাকতে। বাকি কথা সকালে হবে, তোমার সিদ্ধান্ত জানার পর।’

তিলক আর কোনো উত্তর দিলো না, নিজের তাঁবুর দিকে চলে গেল। আর দলের অভিযাত্রীরা অপেক্ষা করতে লাগলেন আগামী সকালের জন্য।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থে কঠোর হামলার হুঁশিয়ারি ইরানের প্রেসিডেন্টের

হিমপ্রহরী

আপডেট সময় : ০৪:২২:৩১ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

তিন

পর্বতারোহণের ক্ষেত্রে শেরপা সরদারই আসল নেতা। দলে একজন আনুষ্ঠানিক নেতা থাকলেও পর্বতের পথে চলার সময় শেষ সিদ্ধান্ত দেন শেরপাই। কারণ পর্বতের প্রতিটি ফাটল কিংবা ধেয়ে আসা তুষারঝড়ের তাণ্ডব সম্পর্কে শেরপারা অবগত আছে। তাদের দীর্ঘ দিনের অভিজ্ঞতায় পর্বতের মেজাজ মর্জি ভালোভাবে বুঝতে সক্ষম হয়। শেরপারা জানে কোন পথে এগোতে হবে, আর কখন না ফিরলে বিপদে পড়তে হবে। তাদের সিদ্ধান্ত ছাড়া অভিযাত্রীদের প্রতিটি পদক্ষেপই ঝুঁকিপূর্ণ। একটা অভিযান সম্পন্ন করতে হলে শুধু শক্তি বা সাহসই যথেষ্ট নয়, তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তের ওপর গুরুত্ব দিতে হয়। তাই শেরপার নির্দেশ অমান্য করা মানে নিজের জীবনকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেওয়া। পর্বতের পথ ধরে নিরাপদে এগোতে হলে শেরপার কথা শুনতে হয়, তাদের সিদ্ধান্ত মানতে হয়। এক কথায়, শেরপা ছাড়া কোনো অভিযানই সফল হয় না।

মাছাপুচ্ছ্রে অভিযানে শেরপাদের নেতা তিলক লিম্বু। সে অল্প কথার মানুষ। বেশিরভাগই সময় চুপচাপ থাকে, প্রয়োজনে কেবল হাতের ইশারায় নির্দেশ দেয়। তার চোখের চাহনিতেই তরুণ শেরপারা সঙ্গে সঙ্গে বুঝে ফেলে কি করতে হবে বা কি করণীয় আছে।

তিলকের প্রতি রয়েছে দলের শেরপাদের ভীষণ শ্রদ্ধা। সেই শ্রদ্ধাবোধ থেকেই তারা বিনা প্রশ্নে তার সিদ্ধান্ত মেনে নেয়। তিলক যা বলে, তা-ই তাদের জন্য আইন। কিছুক্ষণ আগেই সে বলেছিল নিচে নেমে যেতে হবে। দলের সব শেরপারা এক মুহূর্তও দ্বিধা না করেই সেই নির্দেশ মেনে নিয়েছে।

তিলক চলে যেতেই চারজন অভিযাত্রী নিজেদের তাঁবুর ভেতর গুটিসুটি মেরে বসে রইলেন। ঠান্ডায় হাত-পা জমে আসছে তাদের। সবাই কম্বল আর জ্যাকেট জড়িয়ে শরীর গরম রাখার চেষ্টা করছে। বাইরে হিমেল হাওয়া বইছে, তুষারঝড়ের তাণ্ডব পর্বত কাঁপিয়ে দিচ্ছে। তাঁবুর কাপড় থরথর করে কেঁপে উঠছে; যেকোনো মুহূর্তে ছিঁড়ে যেতে পারে।

তাঁবুর ভেতরে চার্জ লাইট জ্বলছে। লাইটের ক্ষীণ আলোয় অভিযাত্রীদের মুখগুলো অস্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। আলো-ছায়ার খেলায় প্রত্যেকের চোখে-মুখের অস্থিরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। উত্তেজনা আর দুশ্চিন্তা মিলেমিশে পরিবেশটাকে আরও প্রতিকূল করে তুলছে। অভিযাত্রীরা এখন শেরপাদের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছেন।

তাদের দীর্ঘ দিনের পরিশ্রম আর স্বপ্ন এখন তিলক লিম্বুর উপর নির্ভর করছে। মাছাপুচ্ছ্রে চূড়ায় ওঠার জন্য তারা এত দূর এসেছেন; শেষ ধাপটা এখনো বাকি। সেই শেষ ধাপের দরজা খুলে দেওয়ার চাবি তিলকের হাতে। তার একটি মাত্র সিদ্ধান্তই ঠিক করে দেবে তারা স্বপ্নের চূড়ায় পৌঁছাবে, নাকি নিচে ফিরে যাবে।

তিলক যদি আর চূড়ার দিকে এগোতে রাজি না হয়, তবে অভিযান এখানেই থেমে যাবে। আর থেমে যাওয়া মানে শুধু ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়, এটা হবে তাদের সম্মানের জন্য হানিকর। নেপাল সরকারের কাছে তাদের দুর্নাম হবে। কারণ এই অভিযানকে সরকারও গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। এছাড়া আন্তর্জাতিক মহলেও এই অভিযান ব্যর্থ হিসেবে চিহ্নিত হবে। সবকিছু চিন্তা করেই তাঁবুর ভেতরে বসে তারা তিলকের বিকল্প নিয়ে ভাবছে। অবশ্য অন্য শেরপারাও যদি তিলকের সঙ্গে যোগ দেয়, তাহলে আর ভাবানারও সুযোগ থাকবে না।

চার্জ লাইটের মৃদু আলোয় তাঁবুর ভেতরে এক ভৌতিক পরিবেশ তৈরি করেছে। তার ওপর তিলক লিম্বুর সতর্কবার্তায় সবাই আরও বেশি আতঙ্কিত হয়ে পড়ছেন। বিশেষ করে নেপালি অভিযাত্রীদের বুক ধড়ফড় করতে লাগল তিলকের কথা শুনেই। কারণ বিষয়টার সঙ্গে জড়িয়ে আছে তাদের ধর্মীয় অনুভূতি। তাই তারা দুজন সতর্ক অবস্থানে থেকে কথা বলার চেষ্টা করছেন। নানান আলোচনার পর ইখতিয়ার হামিম বললেন, ‘তিলক আমাদের পথপ্রদর্শক, অভিযানের নিরাপত্তার ভার অনেকটাই তার ওপর নির্ভর করছে। তার সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করার মানে নিজেদেরকে বিপদে ফেলে দেওয়া। এদিকে আমরা যদি এতদূর এসে ফিরে যাই, তবে এই অভিযানটা অর্থহীন হয়ে পড়বে। কাজেই এখনই আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে কীভাবে সামনে এগুনো যায়।’

রিনজো খড়কা ভেবেচিন্তে বললেন, ‘আমার মনে হয় তিলককে শান্তভাবে বোঝানো দরকার। যদি আমরা তার সঙ্গে ঠান্ডা মাথায় কথা বলি, তাহলে হয়তো রাজি করানো সম্ভব হতে পারে। তিলক একবার যদি বুঝতে পারে যে, আমরা তাকে বিশ্বাস করি, তাহলে সে হয়তো নিজের নেওয়া সিদ্ধান্তটা বদলাতেও পারে।’

রিনজোর পরামর্শ শুনে অন্য তিনজন অভিযাত্রীও মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন। তারা জানেন, শেরপারা একরোখা, তাদের মন বদলানো কঠিন। জোর করে কিছু চাপিয়ে দিলে ফলাফল উল্টো হরে। তাই সবাই মিলে ঠিক করলেন, তিলকের সঙ্গে মাথা ঠান্ডা রেখে ধৈর্য ধরে কথা বলতে হবে। বিশ্বাস আর আন্তরিকতার মাধ্যমে তাকে বোঝাতে হবে। যাতে সে তার সিদ্ধান্তটা বদলাতে বাধ্য হয়।

রিনজো খড়কার পরামর্শ ইখতিয়ার হামিমের মনে ধরেছে। তিনি বুকভরা আশা নিয়ে বললেন, ‘দায়িত্বটা তোমাকেই নিতে হবে রিনজো। তিলকের সঙ্গে কথা বলে আমার সঙ্গে মধ্যস্থতা করে দাও। শৈলজিত রায়ের পক্ষে এটা সম্ভব নয়, তুমি তার দেশি ভাই। আমার বিশ্বাস, তোমাকে সে অগাহ্য করবে না। তোমার কথায় হয়তো তার মন নরম হবে।’

রিনজো খড়কা শান্ত গলায় বললেন, ‘চেষ্টা করে দেখি। ভালো হয় যদি তাকে ডেকে আনা যায়। তোমরা অপেক্ষা করো, আমি তাঁবুতে যাচ্ছি, তাকে সঙ্গে করে নিয়ে আসছি।’

রিনজো উঠে দাঁড়ালেন তিলককে নিয়ে আসতে। তাঁবুর ভেতর থেকে বেরোনোর সময় তার মুখে চিন্তার ছাপ স্পষ্ট হয়ে উঠল। ভেতরে চাপা ভয় কাজ করছে, সেটা তার চোখে-মুখে ফুটে উঠেছে।

চারপাশে সতর্ক দৃষ্টিতে তাকালেন রিনজো খড়কা। তিনি নিশ্চিত হতে চাইছেন, তিলককে সতর্কবার্তা পাঠানো সেই অদৃশ্য শক্তি তাকে দেখছে কি না। আশেপাশে কাউকে না দেখে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলেন তিলকের তাঁবুর দিকে। ভেতরে তখনও তিলক শেরপাদের সঙ্গে আলোচনায় ব্যস্ত, মনে হচ্ছে তারা কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর চেষ্টা করছে।

রিনজোর আগমনে মুহূর্তেই সেই আলোচনা থেমে গেল। শেরপারা চুপ হয়ে গেল, আর তিলক বিস্মিত দৃষ্টিতে তার দিকে তাকাল। রিনজো তিলকের পাশে বসে নরম গলায় বললেন, ‘তিলক, তোমার সঙ্গে জরুরি কথা আছে। বড় তাঁবুটাতে এসো।’

তিলক কিছুক্ষণ রিনজোর দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর অনিচ্ছা সত্ত্বেও সে উঠে দাঁড়াল। তাঁবু থেকে বেরিয়ে আসার সময় তার পা যেন শক্ত হয়ে গেছে। অনেক কষ্টে পা টেনে টেনে হেঁটে রিনজোর সঙ্গে তাঁবুতে প্রবেশ করল তিলক।

ইখতিয়ার হামিম তাকে দেখেই পাশে বসতে ইঙ্গিত করলেন। তিলক বসে পড়ল। ইখতিয়ার হামিম ঠান্ডা মাথায় বললেন, ‘তিলক, আমাদের নিরাশ করো না। সরকারি প্রকল্পের দায়িত্ব নিয়ে সবাই এই অভিযানে এসেছি। যদি বড় কোনো বিপদ না ঘটে, তাহলে মাঝপথে ফিরে গেলে সমস্ত ব্যয়ভার আমাদেরকেই বহন করতে হবে। শুধু তাই নয়, অন্যান্য অভিযাত্রীদের কাছে বদনাম ছড়িয়ে পড়বে। এটা শুধু সম্মানের প্রশ্ন নয়, পুরো দলের ভবিষ্যৎও জড়িয়ে আছে এখানে। তুমি আমাদের দলের একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। তোমার সিদ্ধান্তে শুধু আমাদের নয়, পুরো প্রকল্পের সাফল্য নির্ভর করছে। যদি তুমি পিছিয়ে যাও, তাহলে আমরা সবাই বিপদে পড়ব। এই মুহূর্তে তোমার সাহস আর বিশ্বাসই আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি।’

তিলক চুপচাপ বসে রইল। তার দুচোখ অদৃশ্য কিছু একটাকে খুঁজছে। এদিক সেদিক তাকিয়ে সে ফোঁস করে উঠল, ‘যদি বেঁচেই না থাক, তাহলে সম্মান দিয়ে কি হবে? মৃত্যুর পর কী সম্মান কাজে আসবে দাই?’

তার প্রশ্ন শুনে অভিযাত্রীরা বিস্মিত হলেন। কেউ মুখে কিছু বললেন না। নিজের ভেতরে তিলকের প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন সবাই।

বাইরে তখন প্রাকৃতিক দুর্যোগ ভয়ংকর রূপ নিয়েছে। তুষার ঝড়ের তাণ্ডবে তাঁবুর কাপড় থরথর করে কাঁপছে। এমন পরিবেশ পরিস্থিতির মুখোমুখি পর্বতারোহীদের প্রায়ই হতে হয়, তাই বিষয়টাকে তেমন গুরুত্ব দেয়নি অভিযাত্রীরা।

তিলক লিম্বুর মনে হলো, আজকের ঝড় অস্বাভাবিক কিছু। সাধারণত দিনের বেলা পর্বতের উপরে ঝড় ওঠে, সন্ধ্যা কিংবা রাতের বেলায় এমন তাণ্ডব সচরাচর দেখা যায় না। তাই আজকের এই অদ্ভুত পরিস্থিতি তাকে গভীরভাবে ভাবিয়ে তুলল।

তিলক ধীরে ধীরে তাঁবুর ফাঁক দিয়ে বাইরে মুখ বাড়াল। ঝড়ের গর্জন, আর বাতাসের উন্মত্ত নৃত্য দেখে সে ঘাবড়ে গেল। আর মুহূর্তেই তিলক চমকে উঠল। বিস্মিত কণ্ঠে বলল, ‘ধূপের গন্ধ পাচ্ছি… তোমরা টের পাচ্ছ?’

তার কথায় অন্যরা থমকে গেলেন। কেউ কিছু বললেন না, বিস্ময়ের চোখে তার দিকে তাকালেন। কেউ বিশ্বাসই করতে পারছেন না, এত উচ্চতায় ঝড়ের মধ্যে ধূপের গন্ধ আসবে কীভাবে!

পবন থাপা নিজকে সামলে নিয়ে বাইরে মুখ বাড়িয়ে নাক পেতে শুঁকে অবাক হয়ে বললেন, ‘তিলক ঠিকই বলেছে, ধূপ-ধূনোর গন্ধ এলো কোথা থেকে! আচ্ছা, কারো তাঁবুতে কি কেউ ধূপ জ্বালিয়েছে?’

তিলক মাথা নেড়ে বলল, ‘না না, সেরকম কিছু হলে তো আগেই বলতাম। আমাদের কারোর সঙ্গেই ধূপ-ধূনো নেই।’

তিলকের কথা শুনে সবাই চুপ হয়ে গেলেন। এত উঁচুতে যেখানে চারপাশে শুধু বরফ আর বরফ, সেখানে ধূপের গন্ধ ভেসে আসা সত্যিই বিস্ময়কর। কারো কারো মনে সন্দেহ জাগল, হয়তো এটা কোনো অলৌকিক ইঙ্গিত। আবার কারো মনে হলো, অতিরিক্ত ক্লান্তি আর ভাবনার কারণে মনের ভেতরেই এমন অনুভূতি তৈরি হচ্ছে।

এই অস্বাভাবিক পরিস্থিতি সামাল দিতে রিনজো খড়কা দ্রুত কথা ঘুরিয়ে দিলেন। তিনি বললেন, ‘নিজেদের তাঁবুতে ধূপ জ্বালাতে হবে এমন কথা নয়। হয়তো বেসক্যাম্পে কেউ ধূপ জ্বালিয়েছে, সেই গন্ধ বাতাসে ভেসে ভেসে এখানে চলে এসেছে। যতটা জেনেছি, ধোঁয়া অনেক সময় বায়ুমণ্ডলের ৩০ থেকে ৪০ হাজার ফুট পর্যন্ত ভেসে যেতে পারে। সেই হিসাবে বলা যায়, এই গন্ধ এখানে আসা অস্বাভাবিক কিছু নয়। অযথা ভয় পাওয়ার কিছু নেই। এটা কোনো রহস্য নয়; স্বাভাবিক ব্যাপার।’

রিনজো খড়কার কথায় যুক্তি আছে। দলের সদস্যরা রিনজোর যুক্তিকে গ্রহণযোগ্য মনে করল, তাতে তাদের মনে স্বস্তি ফিরে এলো। তাদের কাছে গন্ধের রহস্যের সমাধান না হলেও অন্তত আতঙ্কটা কমেছে। সবাই আবার মনোযোগ দিলো সামিটের কথায়, কারণ তাদের লক্ষ্য এখন একটাই, উপরে ওঠা।

তিলক লিম্বুর মনোযোগ সামিটের দিকে নেই বরং সে রিনজো খড়কার যুক্তিকে খণ্ডানোর চেষ্টা করল, ‘এই ধোঁয়া নিচ থেকে আসেনি, আসার কথাও নয়। এর উৎপত্তি হয়েছে পর্বতের উপরেই। তোমার যুক্তিটা আমার মনে ধরেনি রিনজো দাই। কারণ ধূপের গন্ধ এত উপরে ওঠে আসার কথা নয়।’

পবন থাপা শুকনো কাশি দিয়ে বললেন, ‘এখানে যুক্তি মনে ধরার বিষয় নয়। আসল বিষয় হলো ধোঁয়া কতটা উঁচুতে উঠতে পারে, সেই যুক্তিটাই রিনজো দেখিয়েছে। তবে আমারও মনে হচ্ছে, নিচে কোথাও ধূপ জ্বালানো হয়েছিল, সেই গন্ধ বাতাসে ভেসে এসে পর্বতের গায়ে লেগে আছে। চারপাশে উঁচু উঁচু শৃঙ্গ থাকায় গন্ধটা ছড়িয়ে পড়তে পারেনি, বরং আটকে গেছে এই উচ্চতায়।’

পবনের যুক্তি জোরালো হলেও কণ্ঠে ছিল ভয়ের ছাপ। কারণ তিনি নিজেও পুরোপুরি নিশ্চিত নন।

ইখতিয়ার হামিম উপলব্ধি করলেন, নেপালি অভিযাত্রীদের যুক্তিতর্কে তিলক লিম্বুর মন গলবে না। যতই তারা চেষ্টা করুক, তিলকের দৃঢ় সংকল্প অটল থাকবে। বাঙালি অভিযাত্রী শৈলজিত রায়ের ওপরও ভরসা রাখতে পারলেন না তিনি। কারণ শৈলজিত সহজ-সরল মানুষ, জটিল পরিস্থিতি সামলানোর দক্ষতা তার নেই। তাই তাকে দিয়ে তিলককে বোঝানো সম্ভব নয়।

ইখতিয়ার হামিম ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নিলেন, যা বলার তাকেই বলতে হবে। তিনি নিজের সঙ্গে বোঝাপড়া করে গম্ভীর কণ্ঠে বললেন, ‘তিলক, পর্বত থেকে নেমে যাওয়া অতটা সহজ নয়। ইচ্ছে করলেই নিচে নামতে পারব না আমরা।’

‘নামতে সমস্যা কোথায়!’ অবাক হয়ে জানতে চাইল তিলক লিম্বু।

‘শোনো, আমরা দুজন বাংলাদেশি মাছাপুচ্ছ্রে সামিটে এসেছি। যদি আজই পর্বত থেকে নেমে যাই, নেপাল সরকারের কাছে পুরো ঘটনার বিবরণ লিখে জমা দিয়ে নিজের দেশে ফিরে যেতে পারব। এতে আমাদের তেমন কোনো সমস্যা হবে না। আমরা দেশে ফিরে গিয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপনও করতে পারব। তোমাদের কথা একবার ভেবে দেখো। তোমরা এই দেশের নাগরিক। তোমাদের জীবিকা, রুটি-রুজি সবই এই পর্বতারোহণের ওপর নির্ভরশীল। যদি সরকারের কাছে প্রমাণিত হয় তোমাদের কারণে এই অভিযান ব্যর্থ হয়েছে, তাহলে নেপালে বসবাস করাই কঠিন হয়ে পড়বে।’

এইটুকু বলতেই সবাই নড়েচড়ে বসল। ইখতিয়ার হামিম সুযোগে সবার মুখের দিকে তাকিয়ে তাদের মনস্তাত্ত্বিক বিষয়টা বুঝার চেষ্টা করলেন। যখন বুঝতে পারলেন তার কথায় কাজে দিচ্ছে, তখন আবার বলতে শুরু করলেন, ‘সরকারের নির্দেশ না মানার কারণে সরকার চাইলে তোমার পর্বতারোহণের পারমিটও বাতিল করে দিতে পারে। তখন আর কোনো অভিযানে অংশ নেওয়ার সুযোগ থাকবে না। তরুণ শেরপারা আজীবন তোমার দায়িত্বহীনতা নিয়ে সমালোচনা করবে। এমনকি তোমার নাম উচ্চারণ করবে ব্যর্থতার উদাহরণ দিতে গিয়ে। এই পর্যন্তই আমার কথা, আর বলার কিছু নেই। এখন তোমাদেরই ভাবতে হবে কি করবে, কোন পথে যাবে।’

ইখতিয়ার হামিম এক ঢিলে দুই পাখি মারলেন। তার যুক্তি এতটাই শক্তিশালী ছিল যে, শুধু তিলক লিম্বুই নয়, সঙ্গে থাকা নেপালি দুই অভিযাত্রীও একেবারে চুপ হয়ে গেলেন। মুহূর্তেই তাদের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। সবাই বুঝতে পারলেন, দলনেতা আসলে সরাসরি তিলককে উদ্দেশ করে কথা বললেও তার ইঙ্গিত ছিল পুরো দলের দিকে। তিনি ইঙ্গিতে বাকিদেরও সতর্ক করলেন, যদি দায়িত্বহীনতা দেখায় বা নিয়ম ভঙ্গ করে, তবে তার ফল ভোগ করতে হবে সবাইকে। তাই তিলকসহ অন্যরা কোনো প্রতিবাদ করল না। নীরবতা নেমে এলো দলের মধ্যে, আর সেই নীরবতার ভেতরেই সবাই অনুভব করল, ইখতিয়ারের নেতৃত্ব অবহেলা করা যাবে না।

ইখতিয়ারের যুক্তি তিলক লিম্বুর ভেতরে গভীরভাবে নাড়া দিলো। মুহূর্তেই তার মুখের ভাষা হারিয়ে গেল। সে আর কোনো কথা বলল না, চুপচাপ বসে নিজের মনে কিছু একটা ভাবতে লাগল। রুটি-রুজির প্রসঙ্গটা সামনে আসতেই তার চোয়ালটা শক্ত হয়ে গেল।

কয়েক মিনিট আগেও তার চোখে-মুখে যে রাগ আর ক্ষোভ ছিল, তা এখন একেবারে মিলিয়ে গেছে। সেই তীব্র প্রতিবাদের জায়গায় নেমে এসেছে নীরবতা। তিলকের চেহারা দেখে সহজেই বোঝা যাচ্ছিল, সে আসলে অবাধ্য নয়, বরং বাধ্য শেরপাদের একজন।

পরিস্থিতি তাকে এতটাই নতজানু করে ফেলেছে যে নিজের বিশ্বাস আঁকড়ে ধরলেও বাস্তবতার কাছে মাথা নত করা ছাড়া তার আর কোনো উপায় নেই।

শৈলজিত রায় এবার তিলকের দিকে গভীর দৃষ্টিতে তাকালেন। তিলক কোনো কথা বলল না। শুধু চোয়াল শক্ত করে চেপে রেখেছে, বুঝাই যাচ্ছে ভেতরে ভেতরে লড়াই করছে সে। তার চোখে-মুখেও যুক্তি মেনে নেওয়ার চাপ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। নীরবতা ভেঙে শৈলজিত প্রশ্ন করলেন, ‘ইখতিয়ারের যুক্তিতে তুমি কি একমত তিলক?’

সরাসরি উত্তর না দিয়ে তিলক বলল, ‘আমি তাঁবুতে ফিরে যাচ্ছি। দলের অন্য শেরপাদের কাছে সবকিছু খুলে বলব। তাদের মতামত জেনে সকালে সিদ্ধান্ত জানাব।’

ইখতিয়ার হামিম বললেন, ‘ঠিক আছে, তুমি তাঁবুতে ফিরে যাও। বিশ্রাম নাও। তবে অযথা ভয় পেয়ো না। শেরপাদেরও বলবে শান্ত থাকতে। বাকি কথা সকালে হবে, তোমার সিদ্ধান্ত জানার পর।’

তিলক আর কোনো উত্তর দিলো না, নিজের তাঁবুর দিকে চলে গেল। আর দলের অভিযাত্রীরা অপেক্ষা করতে লাগলেন আগামী সকালের জন্য।