ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) জানিয়েছে, সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীদের দাখিলকৃত হলফনামায় দেওয়া তথ্য সঠিকভাবে যাচাই-বাছাই করেনি নির্বাচন কমিশন (ইসি)। সংস্থাটি আরও উল্লেখ করেছে যে, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও অনেক প্রার্থী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ পেয়েছেন। সোমবার রাজধানীর ধানমন্ডির মাইডাস সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে টিআইবি এই পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে, যেখানে নির্বাচন ঘিরে অর্থ, পেশিশক্তি, ধর্ম ও পুরুষতান্ত্রিকতার অপব্যবহারসহ বিভিন্ন অনিয়মের চিত্র তুলে ধরা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান জানান, নির্বাচনকে সামগ্রিকভাবে সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ বলা হলেও এর পেছনে অর্থ, পেশিশক্তি, ধর্ম এবং পুরুষতান্ত্রিকতার অপব্যবহার ছিল লক্ষণীয়। তিনি আরও যোগ করেন, নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের জন্য উভয় প্রধান রাজনৈতিক দলই নির্বাচন কমিশনে অভিযোগ দায়ের করেছে। এবারের সংসদে নারী প্রতিনিধির সংখ্যা কম হওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, আটটি রাজনৈতিক দলের কোনো নারী প্রতিনিধি সংসদে নেই। তবে তিনি স্বীকার করেন, ভোট অন্তর্ভুক্তিমূলক ছিল এবং কোনো ধরনের কারচুপির (ইঞ্জিনিয়ারিং) ঘটনা ঘটেনি।
টিআইবির পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে, ক্ষমতার রাজনীতিতে নির্বাচনী সমঝোতা, জোট গঠন, কোন্দল ও রাজনৈতিক বিভাজন ছিল প্রকট। প্রার্থীদের যোগ্যতা ও জনপ্রিয়তা বিচার না করে মনোনয়ন দেওয়ার অভিযোগও ছিল। সক্রিয় ও দলের প্রতি নিবেদিত অনেক প্রার্থীকে মনোনয়ন থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে, যা আন্দোলন, অন্তর্দ্বন্দ্ব ও সহিংসতার জন্ম দিয়েছে।
সংস্থাটি আরও জানায়, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে মিথ্যা সহিংসতার তথ্য প্রচার, অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি, ভোটারদের বিভ্রান্ত করা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে তৈরি করা ফটোকার্ড ও ভিডিও দিয়ে অপপ্রচার চালানো হয়েছে। নির্বাচনী প্রচারণায় ধর্মের ব্যবহার, নারীকে অবমাননা করে সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট এবং নারী প্রার্থীদের প্রচারে বাধা, অশালীন ও নারীবিদ্বেষী মন্তব্যও লক্ষ্য করা গেছে।
নির্বাচনের আগের দিন দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের বিপুল পরিমাণ অর্থসহ গ্রেপ্তার এবং ভোটারদের প্রভাবিত করতে নগদ অর্থ বিতরণের সময় নেতা-কর্মীদের আটকের ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া, ভোটারদের হুমকি দেওয়া, অস্ত্রসহ নেতা-কর্মী গ্রেপ্তার, প্রতিপক্ষের নির্বাচনী কার্যালয় ও ভোটকেন্দ্রে হামলা, কেন্দ্রে অবৈধ অনুপ্রবেশ ও প্রভাব বিস্তারের চেষ্টার মতো ঘটনাও টিআইবি পর্যবেক্ষণ করেছে।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ১১ দলীয় জোট ভোট গণনায় অনিয়মসহ ১০ শতাংশ পর্যন্ত কারচুপির অভিযোগ তুলেছে। কেন্দ্র দখল ও প্রশাসনকে ব্যবহার করে ভোট গণনার ফল পাল্টে দেওয়ার অভিযোগও ছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে ৩০টি আসনে ভোট পুনরায় গণনার দাবি উঠেছে।
নির্বাচনকালীন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করে টিআইবি জানায়, এক সময়ে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কর্তৃক নিবন্ধন স্থগিতসহ আওয়ামী লীগের কার্যক্রম ও ছাত্রলীগ নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। একইসাথে, আওয়ামী লীগ প্রাতিষ্ঠানিকভাবে এই নির্বাচনকে অবৈধ ও প্রতিহত করার ঘোষণা দেয় এবং নির্বাচনী পরিবেশে দলটির নেতিবাচক ভূমিকা দেখা যায়। তবে, প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নির্বাচন প্রতিহত করার অবস্থান সত্ত্বেও মাঠপর্যায়ে দলটির কর্মী-সমর্থকরা ভোটার হিসেবে অংশ নিয়েছেন। টিআইবি আরও জানায়, মাঠে আওয়ামী লীগের ভোট টানার জন্য বিএনপি, জামায়াত জোট এবং জাতীয় পার্টিসহ প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা ছিল। এতে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরাও সাড়া দিয়েছেন এবং অনেকক্ষেত্রে সরাসরি অংশগ্রহণকারী কোনো কোনো দলে যোগদান ও প্রচারণায় সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছেন। এর ফলে, একদিকে দল হিসেবে আওয়ামী লীগ আনুষ্ঠানিকভাবে নেতিবাচক অবস্থান নিলেও, অন্যদিকে অনানুষ্ঠানিকভাবে দলটির নেতা-কর্মী-সমর্থকরা ভোটসহ রাজনৈতিক অধিকার প্রয়োগ করেছেন। উভয় ভূমিকার ক্ষেত্রেই দলটির প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভূমিকা ছিল।
সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন টিআইবির পরিচালক (আউটরিচ ও কমিউনিকেশন) মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম এবং পরিচালক (গবেষণা) মো. বদিউজ্জামান।
রিপোর্টারের নাম 



















