সদ্য সমাপ্ত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয়ের পর সরকার গঠনের প্রস্তুতি নিচ্ছে বিএনপি। এদিকে রাজনীতির নতুন মেরুকরণ হিসেবে সামনে এসেছে ‘ছায়া মন্ত্রিসভা’গঠনের ঘোষণা। এ নিয়ে দেশজুড়ে চলছে আলোচনা।
এর আগে শনিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) রাতে সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ও সংসদ নির্বাচনে সুনামগঞ্জ-২ আসনে দাঁড়িপাল্লার পরাজিত প্রার্থী শিশির মনির নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে এ নিয়ে একটি পোস্ট করেন। পোস্টে তিনি লিখেছেন, ‘‘আমরা ছায়া মন্ত্রিপরিষদ গঠন করবো, ইনশাআল্লাহ।’’এরপর রবিবার (১৫ ফেব্রুয়ারি) সকালে এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ঘোষণা দেন, ‘‘ছায়া মন্ত্রিসভা স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করবে। সরকারের কার্যক্রমে ওয়াচডগ হিসেবে কাজ করবে।’’
মূলত ছায়া মন্ত্রিসভা হলো সংসদীয় গণতন্ত্রের একটি বিশেষ কাঠামো, যা ওয়েস্টমিনস্টার পদ্ধতিতে জনপ্রিয়। এতে প্রধান বিরোধী দল বা অন্য রাজনৈতিক দলগুলো সরকারের প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের বিপরীতে একজন করে ‘ছায়া মন্ত্রী’ নিয়োগ দেয়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে আইনজীবী শিশির মনির বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘গঠনমূলক গণতান্ত্রিক রাজনীতি আছে যেসব দেশে, সেসব দেশে সরকার যে মন্ত্রিসভা গঠন করে, তার বিপরীতে বিরোধীদলও এমন একটি প্যারালাল বা ছায়া মন্ত্রিপরিষদ গঠন করে।’’
তিনি আরও বলেন, ‘‘ছায়া মন্ত্রিপরিষদের কাজই হয়— সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে সহযোগিতা করা ও গঠনমূলক সমালোচনা করা। যা ভালো তা ভালো বলবে, যা সমালোচনার তার সমালোচনা করবে। সঠিক কোনটা সেটা আমরা তুলে ধরবো। এজন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে সংশ্লিষ্ট যে মন্ত্রিদের দায়িত্ব দেওয়া হয়— কোথাও কোথাও আমরা টিম গঠন করে দিতে দেখেছি। যেমন- আইনমন্ত্রী একটি মন্ত্রণালয়ে আছেন, তিনি একটি মন্ত্রণালয়ে কাজ করেন। তাকে ও তার কর্মাকাণ্ডকে পর্যবেক্ষণ করা, সঠিক পদক্ষেপকে উৎসাহ দেওয়া, কাজ সঠিক না হলে সংসদ নেতাদের মাধ্যমে সংসদে বা বাইরে আলোচনায় আনা। যেসব দেশে ম্যাচিউরড গণতন্ত্র আছে, সেসব দেশে এই পদ্ধতি চালু আছে।’’
শিশির মনির বলেন, ‘‘আমি সেটিই বলেছি, এখানে যদি ছায়া মন্ত্রিসভা গঠন করা হয়— তাহলে বিরোধীদল যে পরিমাণ আসন পেয়েছে, তারা যদি দেশ গঠনের জন্য গঠনমূলক কাজ করতে চান, তাহলে তাদেরও উচিত সহযোগিতা করা। ইতোমধ্যে সিদ্ধান্ত হয়েছে, তারাও করবে। বিশেষ করে বড় বড় মন্ত্রণালয় যেগুলো আছে—স্বরাষ্ট্র, পররাষ্ট্র, জনপ্রশাসন, আইন প্রতিরক্ষা, স্থানীয় প্রশাসন, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়— এসব মন্ত্রণালয় রাষ্ট্রের গতিবিধি নির্ণয় করে। এখানে শুধু যে সরকারই সব করবে, তা নয়।’’ বিরোধী দলে যদি অভিজ্ঞ লোক থাকেন, তাহলে গণতন্ত্র অনেক শক্তিশালী হয় বলেও জানান শিশির মনির।
জানা যায়, বিশ্বের উন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে ছায়া মন্ত্রিসভার গুরুত্ব অপরিসীম। এদের প্রধান কাজগুলো হলো— জবাবদিহি নিশ্চিত করা, সরকারের প্রতিটি সিদ্ধান্তের চুলচেরা বিশ্লেষণ করা, বিকল্প বাজেট প্রস্তাব, সরকারের বাজেটের বিপরীতে জনবান্ধব বিকল্প বাজেট তুলে ধরা, প্রশাসনিক পর্যবেক্ষণ, মন্ত্রণালয়ের দুর্নীতি বা অসঙ্গতি জনগণের সামনে আনা, ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের প্রস্তুতি, বিরোধী দলের নেতাদের প্রশাসনিকভাবে দক্ষ করে তোলা প্রভৃতি। যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়ায় এই প্রক্রিয়া নিয়মিত ব্যবহৃত হয়।
শিশির মনির বলেন, ‘‘এখনকার নির্বাচনের পর যদি এটা আমরা না করতে পারি— তাহলে সেটি হবে জাতির জন্য লজ্জাজনক। ম্যাচিউরড পলিটিকস করে জাতিকে অগ্রসর করতে হবে। এখানে শুধু মানি না, মানি না, আর মানবো, মানবো— এসব আলেচনা করে গণতন্ত্র শক্তিশালী হয় না। ফলে পাঁচ বছর পর যখন আবার নির্বাচন হবে তখন কী হবে? এখন যারা বিরোধী দল আছেন, তারা যদি সরকার গঠনের ম্যান্ডেট পান, তাহলে তারা মন্ত্রিপরিষদ গঠনের ক্ষেত্রে ছায়া মন্ত্রিপরিষদের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাতে পারবেন। এগুলোকে উৎসাহিত করা উচিত। এটা নিয়ে আলোচনা চলছে। এর ফলে দেশের মানুষ উপকৃত হবে এবং এটি ১১ দলীয় জোট সরকার মেনে নেবে বলেও আমার বিশ্বাস।’’
এদিকে বিএনপির আইনবিষয়ক সম্পাদক, নেত্রকোনা-১ আসন থেকে ধানের শীষের বিজয়ী প্রার্থী ও সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেন, ‘‘ছায়া মন্ত্রিসভার পরিকল্পনাকে স্বাগত জানাই।’’ এটি করলে জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে বলেও মনে করেন তিনি।
রিপোর্টারের নাম 



















