ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন ছিল প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হয়ে দেশ ও মানুষের সেবা করার। তবে উচ্চ মাধ্যমিকের পর কাঙ্ক্ষিত বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ না পাওয়া সেই স্বপ্নে কিছুটা ধাক্কা দিয়েছিল। কিন্তু দমে যাননি অনন্যা বসাক; বরং সেই না পাওয়ার বেদনাকেই তিনি রূপান্তর করেছিলেন জেদে। সেই দৃঢ় প্রত্যয় আর কঠোর পরিশ্রমের ফল হিসেবে অনন্যা আজ ৪৫তম বিসিএসে কর ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন।
ঠাকুরগাঁওয়ের মেয়ে অনন্যা বসাকের বেড়ে ওঠা ও প্রাথমিক শিক্ষা নিজ জেলাতেই। ঠাকুরগাঁও সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন তিনি। এরপর দিনাজপুর হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইলেকট্রনিকস অ্যান্ড কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক সম্পন্ন করেন। প্রকৌশলবিদ্যার শিক্ষার্থী হয়েও কেন সিভিল সার্ভিসের প্রতি আগ্রহী হলেন—এমন প্রশ্নে অনন্যা জানান, সিভিল সার্ভিস দেশের মানুষের জন্য সরাসরি কাজ করার এক বিশাল প্ল্যাটফর্ম। বিশেষ করে বর্তমান ডিজিটাল যুগে নিজের প্রকৌশল জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে সরকারি সেবাকে আরও আধুনিক ও জনবান্ধব করার স্বপ্ন দেখেন তিনি।
সাফল্যের পেছনের গল্প বলতে গিয়ে অনন্যা স্মরণ করেন তার বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার সেই দিনগুলোর কথা। পছন্দের প্রতিষ্ঠানে সুযোগ না পাওয়াটা ছিল তার জীবনের বড় এক আক্ষেপ। তবে সেই আক্ষেপ থেকেই তিনি শিক্ষা নিয়েছিলেন যে, কর্মজীবনে এর পুনরাবৃত্তি হতে দেওয়া যাবে না। স্নাতক শেষ করার পর নিজ শহর ঠাকুরগাঁওয়ে বসেই শুরু করেন বিসিএসের প্রস্তুতি। বাজারের গতানুগতিক বইয়ের বাইরেও নিয়মিত জাতীয় পত্রিকা এবং ইন্টারনেট থেকে তথ্য সংগ্রহ করে নিজের মতো করে নোট তৈরি করতেন তিনি। উত্তরপত্রে বৈচিত্র্য আনতে নীল কালির ব্যবহার, প্রয়োজনীয় চিত্র ও ছক যুক্ত করা ছিল তার প্রস্তুতির বিশেষ কৌশল।
নারীদের জন্য কর্মক্ষেত্রের পথটি মসৃণ না হলেও অনন্যার ক্ষেত্রে তার পরিবার ও জীবনসঙ্গী ছিলেন বড় অনুপ্রেরণা। তাদের অকুণ্ঠ সমর্থনে পড়াশোনার দীর্ঘ পথচলায় তিনি কখনও একঘেয়েমি অনুভব করেননি। অনন্যার মতে, বিসিএস একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া, যেখানে ধৈর্য হারানো মানেই পিছিয়ে পড়া। তাই প্রতিদিনের পড়ার একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য বা টার্গেট সেট করে নিতেন তিনি এবং তা পূরণ না হওয়া পর্যন্ত টেবিল ছাড়তেন না।
ভবিষ্যৎ বিসিএস পরীক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে অনন্যা পরামর্শ দেন, লক্ষ্য হতে হবে অটুট। একাডেমিক পড়াশোনায় ভালো ফলাফল ভাইভা বোর্ডে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে, তাই বিশ্ববিদ্যালয় জীবনেও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি শুধু বিসিএসকে একমাত্র লক্ষ্য না বানিয়ে অন্যান্য চাকরির পরীক্ষার জন্যও প্রস্তুতি নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি, যাতে দীর্ঘসূত্রিতার কারণে হতাশা গ্রাস না করে।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে অনন্যা বসাক জানান, দেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করতে রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে তিনি সক্রিয় ভূমিকা রাখতে চান। নিজের মেধা ও দক্ষতা দিয়ে প্রজাতন্ত্রের একজন সৎ ও নিষ্ঠাবান সেবক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করাই এখন তার মূল লক্ষ্য। অনন্যার এই সাফল্য কেবল তার একার নয়, বরং এটি অদম্য ইচ্ছাশক্তি আর সঠিক লক্ষ্য নির্ধারণের এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
রিপোর্টারের নাম 























