কুষ্টিয়ার আলো-বাতাসে বেড়ে ওঠা সেলিমা আক্তার শর্মি আজ একজন সফল নারী উদ্যোক্তার প্রতিচ্ছবি। ছোটবেলার শখ আর শিল্পকলার প্রতি গভীর ভালোবাসাকে পুঁজি করে তিনি গড়ে তুলেছেন তার স্বপ্নের প্রতিষ্ঠান ‘শর্মি’স আর্ট অ্যান্ড ক্রাফট’। শুধু নিজের ভাগ্য পরিবর্তন নয়, বরং পরিত্যক্ত পণ্যকে নান্দনিক শিল্পে রূপান্তর করে পরিবেশ রক্ষা এবং নারীদের কর্মসংস্থানের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছেন তিনি।
শর্মির শিক্ষার ভিত্তি গড়ে উঠেছিল শিল্প ও সৃজনশীল শিক্ষা বিভাগে। গভর্নমেন্ট কলেজ অব অ্যাপ্লাইড হিউম্যান সায়েন্স থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করার পর গতানুগতিক চাকরির পেছনে না ছুটে তিনি নিজের সৃজনশীলতাকে পেশা হিসেবে বেছে নেন। ২০১৯ সালে শুরু হয় তার উদ্যোক্তা জীবনের আনুষ্ঠানিক যাত্রা। মূলত ফেলে দেওয়া প্রাকৃতিক উপাদান এবং দেশীয় কাঁচামাল ব্যবহার করে ঘর সাজানোর নানা সরঞ্জাম ও কোলাজ পেইন্টিংয়ের মাধ্যমেই তিনি নজর কাড়েন সবার।
কেন উদ্যোক্তা হওয়া? শর্মির ভাষায়, “নিজের স্বাধীনতা বজায় রাখা এবং কর্মহীন নারীদের জন্য আয়ের পথ তৈরি করাই ছিল আমার প্রধান লক্ষ্য।” তিনি মনে করেন, শিল্প ও কারুশিল্পের কাজে সৃজনশীলতাকে পূর্ণাঙ্গভাবে ব্যবহার করা যায়, যা একজন মানুষকে কেবল অর্থনৈতিকভাবেই স্বাবলম্বী করে না, বরং শারীরিক ও মানসিকভাবেও সুস্থ রাখতে সহায়তা করে।
তবে এই পথচলা খুব একটা মসৃণ ছিল না। শুরুতে পরিবারের পক্ষ থেকে ব্যবসার ঝুঁকি নিয়ে কিছুটা সংশয় থাকলেও, শর্মির একাগ্রতা এবং গ্রাহকদের ইতিবাচক সাড়া দেখে তারা পরে পূর্ণ সমর্থন দেন। এছাড়া বাজারে নতুন ব্র্যান্ড হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা, কাঁচামাল সংগ্রহ এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের খুঁটিনাটি রপ্ত করা ছিল তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
শর্মির কাজের সার্থকতা কেবল ব্যবসায়িক মুনাফায় নয়, বরং গ্রাহকদের আবেগের সঙ্গে মিশে থাকায়। একবার এক গ্রাহক তার মায়ের জন্য বিশেষ একটি উপহার তৈরি করিয়ে নিয়ে এতটাই আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছিলেন যে, তার পাঠানো সেই ধন্যবাদবার্তাটি শর্মির জীবনের অন্যতম বড় অনুপ্রেরণা হয়ে আছে। তিনি বিশ্বাস করেন, তার এই কাজ শুধু পণ্য বিক্রয় নয়, বরং মানুষের অনুভূতির সঙ্গে এক নিবিড় যোগসূত্র স্থাপন করা।
বর্তমানে অনলাইন মার্কেটপ্লেস ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রসারের ফলে দেশের উদ্যোক্তাদের সামনে অবারিত সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে মনে করেন শর্মি। তবে বিনিয়োগ সুবিধা ও সঠিক গাইডলাইনের অভাব এখনো বড় বাধা। শর্মির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা হলো তার ব্র্যান্ডকে আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছে দেওয়া এবং স্থানীয় হস্তশিল্পীদের জন্য একটি বড় প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা।
নতুন যারা উদ্যোক্তা হিসেবে ক্যারিয়ার গড়তে চান, তাদের উদ্দেশ্যে শর্মি বলেন, “নিজের স্বপ্ন ও লক্ষ্যের ওপর অটুট বিশ্বাস রাখতে হবে। ডিজিটাল মার্কেটিং ও আধুনিক ট্রেন্ড সম্পর্কে সবসময় নিজেকে আপডেট রাখা জরুরি। তবে সবকিছুর ঊর্ধ্বে নিজের কাজকে ভালোবাসতে হবে; ভালোবাসা আর ধৈর্য থাকলেই সাফল্য সুনিশ্চিত।”
রিপোর্টারের নাম 























