ঢাকা ০১:৩৫ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৩ মার্চ ২০২৬

৭৩-এর নির্বাচন: স্বাধীন বাংলাদেশে ভোট জালিয়াতি ও গণতন্ত্র হত্যার কলঙ্কিত সূচনা

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৭:০৯:২১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ১ বার পড়া হয়েছে

১৯৭৩ সালের ৭ মার্চ। সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে এই নির্বাচনকে ঘিরে মানুষের মনে যে গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা ছিল, তা শেষ পর্যন্ত এক চরম হতাশায় রূপ নেয়। শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার ও তাদের অনুসারীদের বিরুদ্ধে ব্যাপক ভোট জালিয়াতি, কেন্দ্র দখল এবং প্রশাসনিক প্রভাব খাটানোর অভিযোগের মধ্য দিয়ে এ দেশের নির্বাচনী ইতিহাসে এক কলঙ্কিত অধ্যায় রচিত হয়।

নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকেই মাঠ পর্যায়ে বিরোধী দলগুলোর ওপর চড়াও হয় ক্ষমতাসীন দলের ক্যাডাররা। মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বাধীন ন্যাপসহ অন্যান্য বিরোধী দল যখন সরকারের দুর্নীতি ও দুঃশাসনের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তুলছিল, তখন তাদের কণ্ঠরোধে রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করা হয়। বিশেষ করে মওলানা ভাসানীকে নির্বাচনী প্রচার থেকে দূরে রাখতে আওয়ামী লীগের পাশাপাশি তাদের অনুগত দলগুলোও অপপ্রচারে লিপ্ত হয়। তৎকালীন সময়ে সাপ্তাহিক ‘হককথা’র ডিক্লারেশন বাতিল এবং বিরোধী নেতা-কর্মীদের ওপর দমন-পীড়ন ছিল নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা।

১৯৭৩ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিনে গণতন্ত্রের টুঁটি চেপে ধরার এক নজিরবিহীন দৃশ্য দেখা যায়। কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকার অজুহাতে শেখ মুজিবুর রহমানসহ আওয়ামী লীগের ১১ জন প্রার্থীকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ ছিল, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও প্রশাসনিক কারসাজির মাধ্যমে তাদের প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র জমা দিতে দেওয়া হয়নি অথবা প্রত্যাহারে বাধ্য করা হয়েছে। জাসদ ও ন্যাপের মতো দলগুলো এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে পুনরায় মনোনয়নের দাবি তুললেও তা আমলে নেওয়া হয়নি।

নির্বাচনী প্রচারণায় রাষ্ট্রীয় সম্পদের নজিরবিহীন অপব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। তৎকালীন সরকারের মন্ত্রীরা ত্রাণকাজে ব্যবহৃত হেলিকপ্টার নিয়ে নির্বাচনী জনসভা করে বেড়াতেন। অন্যদিকে, বিরোধী দলগুলোর জনসভায় সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ দেখে ক্ষমতাসীনরা ক্রমেই সহিংস হয়ে ওঠে। ১৯৭৩ সালের ২০ জানুয়ারি নবগঠিত যুবলীগের সভায় ‘বিরোধীদের নির্মূল করার’ প্রকাশ্য ঘোষণা দেওয়া হয়, যা নির্বাচনী পরিবেশকে আরও বিষিয়ে তোলে।

ভোটের দিন অর্থাৎ ৭ মার্চ যা ঘটেছিল, তা ছিল আধুনিক গণতন্ত্রের জন্য এক চরম লজ্জা। বিভিন্ন কেন্দ্র থেকে ব্যালট বাক্স ছিনতাই, পোলিং এজেন্টদের বের করে দেওয়া এবং জাল ভোটের উৎসব চলে সারা দেশে। বিশেষ করে প্রভাবশালী বিরোধী নেতাদের পরাজিত করতে কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে ফলাফল পাল্টে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের স্মৃতিচারণমূলক গ্রন্থেও উল্লেখ রয়েছে যে, অনেক আসনে বিরোধী প্রার্থীরা বিজয়ী হওয়ার পথে থাকলেও শেষ মুহূর্তে রক্ষীবাহিনী ও প্রশাসনের সরাসরি হস্তক্ষেপে ফলাফল আওয়ামী লীগের পক্ষে ঘোষণা করা হয়। এমনকি ফলাফল ঘোষণার মাঝপথে রেডিও-টেলিভিশনের সম্প্রচার বন্ধ রেখে গভীর রাতে মনগড়া ফলাফল প্রচারের অভিযোগও রয়েছে।

নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফলে দেখা যায়, ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯৩টিই আওয়ামী লীগের দখলে। এই বিশাল ‘বিজয়’ আসলে ছিল এক সাজানো নাটকের ফসল। মওলানা ভাসানী ও মেজর জলিলের মতো নেতারা এই নির্বাচনকে হিটলার ও মুসোলিনির ফ্যাসিবাদী আচরণের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠনগুলো আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। ‘লাল বাহিনী’র নামে শ্রমিক সংগঠনগুলোর ওপর হামলা এবং শিল্পাঞ্চলগুলোতে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করা হয়।

সব মিলিয়ে, ১৯৭৩ সালের সেই প্রথম নির্বাচনটি বাংলাদেশের মানুষের ভোটাধিকার হরণের প্রথম আনুষ্ঠানিক মহড়ায় পরিণত হয়েছিল। গণতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু করার পরিবর্তে দেশ একদলীয় শাসনের দিকে ধাবিত হয়, যার নেতিবাচক প্রভাব পরবর্তী কয়েক দশক ধরে এ দেশের রাজনীতিতে বয়ে বেড়াতে হয়েছে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

কাতারের আকাশসীমায় ইরানের আগ্রাসন প্রতিহত: দুটি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত

৭৩-এর নির্বাচন: স্বাধীন বাংলাদেশে ভোট জালিয়াতি ও গণতন্ত্র হত্যার কলঙ্কিত সূচনা

আপডেট সময় : ০৭:০৯:২১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

১৯৭৩ সালের ৭ মার্চ। সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে এই নির্বাচনকে ঘিরে মানুষের মনে যে গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা ছিল, তা শেষ পর্যন্ত এক চরম হতাশায় রূপ নেয়। শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার ও তাদের অনুসারীদের বিরুদ্ধে ব্যাপক ভোট জালিয়াতি, কেন্দ্র দখল এবং প্রশাসনিক প্রভাব খাটানোর অভিযোগের মধ্য দিয়ে এ দেশের নির্বাচনী ইতিহাসে এক কলঙ্কিত অধ্যায় রচিত হয়।

নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকেই মাঠ পর্যায়ে বিরোধী দলগুলোর ওপর চড়াও হয় ক্ষমতাসীন দলের ক্যাডাররা। মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বাধীন ন্যাপসহ অন্যান্য বিরোধী দল যখন সরকারের দুর্নীতি ও দুঃশাসনের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তুলছিল, তখন তাদের কণ্ঠরোধে রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করা হয়। বিশেষ করে মওলানা ভাসানীকে নির্বাচনী প্রচার থেকে দূরে রাখতে আওয়ামী লীগের পাশাপাশি তাদের অনুগত দলগুলোও অপপ্রচারে লিপ্ত হয়। তৎকালীন সময়ে সাপ্তাহিক ‘হককথা’র ডিক্লারেশন বাতিল এবং বিরোধী নেতা-কর্মীদের ওপর দমন-পীড়ন ছিল নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা।

১৯৭৩ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিনে গণতন্ত্রের টুঁটি চেপে ধরার এক নজিরবিহীন দৃশ্য দেখা যায়। কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকার অজুহাতে শেখ মুজিবুর রহমানসহ আওয়ামী লীগের ১১ জন প্রার্থীকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ ছিল, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও প্রশাসনিক কারসাজির মাধ্যমে তাদের প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র জমা দিতে দেওয়া হয়নি অথবা প্রত্যাহারে বাধ্য করা হয়েছে। জাসদ ও ন্যাপের মতো দলগুলো এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে পুনরায় মনোনয়নের দাবি তুললেও তা আমলে নেওয়া হয়নি।

নির্বাচনী প্রচারণায় রাষ্ট্রীয় সম্পদের নজিরবিহীন অপব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। তৎকালীন সরকারের মন্ত্রীরা ত্রাণকাজে ব্যবহৃত হেলিকপ্টার নিয়ে নির্বাচনী জনসভা করে বেড়াতেন। অন্যদিকে, বিরোধী দলগুলোর জনসভায় সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ দেখে ক্ষমতাসীনরা ক্রমেই সহিংস হয়ে ওঠে। ১৯৭৩ সালের ২০ জানুয়ারি নবগঠিত যুবলীগের সভায় ‘বিরোধীদের নির্মূল করার’ প্রকাশ্য ঘোষণা দেওয়া হয়, যা নির্বাচনী পরিবেশকে আরও বিষিয়ে তোলে।

ভোটের দিন অর্থাৎ ৭ মার্চ যা ঘটেছিল, তা ছিল আধুনিক গণতন্ত্রের জন্য এক চরম লজ্জা। বিভিন্ন কেন্দ্র থেকে ব্যালট বাক্স ছিনতাই, পোলিং এজেন্টদের বের করে দেওয়া এবং জাল ভোটের উৎসব চলে সারা দেশে। বিশেষ করে প্রভাবশালী বিরোধী নেতাদের পরাজিত করতে কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে ফলাফল পাল্টে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের স্মৃতিচারণমূলক গ্রন্থেও উল্লেখ রয়েছে যে, অনেক আসনে বিরোধী প্রার্থীরা বিজয়ী হওয়ার পথে থাকলেও শেষ মুহূর্তে রক্ষীবাহিনী ও প্রশাসনের সরাসরি হস্তক্ষেপে ফলাফল আওয়ামী লীগের পক্ষে ঘোষণা করা হয়। এমনকি ফলাফল ঘোষণার মাঝপথে রেডিও-টেলিভিশনের সম্প্রচার বন্ধ রেখে গভীর রাতে মনগড়া ফলাফল প্রচারের অভিযোগও রয়েছে।

নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফলে দেখা যায়, ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯৩টিই আওয়ামী লীগের দখলে। এই বিশাল ‘বিজয়’ আসলে ছিল এক সাজানো নাটকের ফসল। মওলানা ভাসানী ও মেজর জলিলের মতো নেতারা এই নির্বাচনকে হিটলার ও মুসোলিনির ফ্যাসিবাদী আচরণের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠনগুলো আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। ‘লাল বাহিনী’র নামে শ্রমিক সংগঠনগুলোর ওপর হামলা এবং শিল্পাঞ্চলগুলোতে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করা হয়।

সব মিলিয়ে, ১৯৭৩ সালের সেই প্রথম নির্বাচনটি বাংলাদেশের মানুষের ভোটাধিকার হরণের প্রথম আনুষ্ঠানিক মহড়ায় পরিণত হয়েছিল। গণতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু করার পরিবর্তে দেশ একদলীয় শাসনের দিকে ধাবিত হয়, যার নেতিবাচক প্রভাব পরবর্তী কয়েক দশক ধরে এ দেশের রাজনীতিতে বয়ে বেড়াতে হয়েছে।