বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের পাতায় অনেক প্রভাবশালী ও অভিজাত ব্যক্তির নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকলেও, কিছু মানুষ নিজের বর্ণাঢ্য ও বিচিত্র জীবন দিয়ে তৈরি করেছেন এক অনন্য উপাখ্যান। তেমনি এক বিস্ময়কর চরিত্রের নাম ছয়ফুর রহমান। সিলেটের সালুটিকর গ্রামের অতি সাধারণ এক মানুষ, যিনি পেশায় ছিলেন গ্রামীণ বাজারের একজন বাবুর্চি। অভাবের তাড়নায় অবসরে ঠেলাগাড়িও চালাতেন। কিন্তু এই সাধারণ পরিচয় ছাপিয়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন অদম্য সাহস আর হার না মানা এক প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর।
ছয়ফুর রহমানের রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায়টি সূচিত হয় ১৯৮১ সালে। সে বছর তিনি সরাসরি দেশের সর্বোচ্চ পদ অর্থাৎ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রার্থী হয়ে সবাইকে তাক লাগিয়ে দেন। তার প্রচারণার কৌশল ছিল যেমন অভিনব, তেমনি কৌতুকপূর্ণ। তিনি ছন্দে ছন্দে ছড়া কেটে বক্তৃতা করতেন, যা শুনতে ভিড় জমাতেন হাজারো মানুষ। জনসভা শেষে উপস্থিত জনতার কাছ থেকে টাকা তুলে তিনি মেটাতেন মাইক ভাড়ার খরচ। তার নির্বাচনী ইশতেহারেও ছিল চমকপ্রদ সব প্রতিশ্রুতি; তিনি বলতেন রাস্তাঘাট তুলে খাল খনন করার কথা। নিজের গঠিত ‘ইসলামি সমাজতান্ত্রিক দল’-এর তিনি ছিলেন একমাত্র সদস্য।
সেই নির্বাচনে প্রায় ৬৫ জন প্রার্থীর মধ্যে তিনি অষ্টম স্থান অধিকার করেছিলেন। ভোটের ফল নিয়ে তার বিখ্যাত এক মন্তব্য আজও মানুষের মুখে মুখে ফেরে। তিনি বলেছিলেন, “আমি দেশের ৮ নম্বর রাষ্ট্রপতি হওয়ার যোগ্য। নির্বাচনের দিন যদি বাকি সাতজন মারা যেতেন, তবে আমিই হতাম রাষ্ট্রপ্রধান।”
রাজনীতিতে তার সাফল্যের মুকুটে আরেকটি পালক যুক্ত হয় ১৯৯০ সালে। হেভিওয়েট সব প্রার্থীদের পরাজিত করে তিনি সিলেট সদর উপজেলার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। বিপুল ভোটে জেতার পর তার নাম হয়ে যায় ‘ছক্কা ছয়ফুল’। জনপ্রতিনিধি হিসেবে তিনি ছিলেন আপসহীন। প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে তিনি হুটহাট স্কুলে ঢুকে পড়তেন এবং ফাঁকিবাজ শিক্ষকদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতেন। দুর্নীতির বিরুদ্ধে তার কঠোর অবস্থানের কারণে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানরা একজোট হয়ে অনাস্থা প্রস্তাব আনলে তিনি পদ হারান, কিন্তু নীতি থেকে বিচ্যুত হননি।
ছয়ফুর রহমানের লেখক সত্তাও ছিল বৈচিত্র্যময়। তার লেখা ‘বাবুর্চি প্রেসিডেন্ট হতে চায়’ বইটির প্রচ্ছদে দুর্নীতিবাজদের প্রতি ঘৃণা প্রকাশের একটি ছবি ছিল ব্যতিক্রমী। এছাড়া ‘পড়, বুঝো, বল’ নামেও তার একটি বই বেশ আলোচিত হয়েছিল।
জীবনের শেষ দিনগুলোতেও এই সাহসী মানুষটিকে লড়তে হয়েছে চরম দারিদ্র্যের সঙ্গে। এমনকি সুচিকিৎসার দাবিতে তাকে সিলেটের জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের বারান্দায় অনশনে বসতে হয়েছিল। আজীবন সাধারণ মানুষের অধিকার আর দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকা এই কালজয়ী চরিত্রটি চিরকালীন অভাবকে সঙ্গী করেই পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন, তবে রেখে গেছেন এক হার না মানা সাহসের ইতিহাস।
রিপোর্টারের নাম 























