ঢাকা ০১:৩৬ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৩ মার্চ ২০২৬

বিশ্ববাণিজ্যের সেতুবন্ধ: আরব বণিকদের বর্ণনায় প্রাচীন বাংলার নৌ-গৌরব

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৬:৫৯:৩৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ১ বার পড়া হয়েছে

দশম শতাব্দীতে বিশ্বজুড়ে সমুদ্রবাণিজ্যের মানচিত্রে আরব বণিকদের একচেটিয়া আধিপত্য ছিল এক অনস্বীকার্য সত্য। ভারত মহাসাগর থেকে শুরু করে দক্ষিণ চীন সাগর পর্যন্ত বিস্তৃত এই বিশাল জলপথে তাদের নিয়ন্ত্রণ এতটাই শক্তিশালী ছিল যে, ইউরোপীয় শক্তিগুলো তখন বিকল্প পথ খুঁজে পেতে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছিল। ইতিহাসবিদদের মতে, আরব ও উপমহাদেশের এই বাণিজ্যিক সম্পর্ক ইসলামের আবির্ভাবের বহু আগে থেকেই বিদ্যমান ছিল। প্রাচীনকালে আরবরাই ছিল ভারত ও বাংলার পণ্য ইউরোপীয় বাজারে পৌঁছে দেওয়ার প্রধান কারিগর।

ঐতিহাসিক পর্যালোচনায় দেখা যায়, এই বাণিজ্যিক সম্পর্ক কেবল পণ্য আদান-প্রদানে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং তা এক গভীর সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন তৈরি করেছিল। ভারতের উপকূলীয় অঞ্চলগুলোতে আরবদের বসতি গড়ে ওঠার বিপরীতে আরব ভূখণ্ডেও ভারতীয়দের সরব উপস্থিতি ছিল। ভারতের তৎকালীন রাজারা মুসলিম বণিকদের প্রতি এতটাই উদার ছিলেন যে, তাদের বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ‘হুনুরমান’ নামক বিশেষ বিচারক নিয়োগ দিতেন। এই দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্কের প্রভাব পড়েছিল ভাষার ওপরও। ভাষাতাত্ত্বিকদের মতে, পবিত্র কোরআনে ব্যবহৃত ‘মেশক’ (কস্তুরী), ‘জানবিল’ (আদা) এবং ‘কাফুর’ (কর্পূর)—এই তিনটি শব্দ মূলত সংস্কৃতমূল থেকে আসা, যা প্রাচীন বাণিজ্যিক যোগাযোগের এক অনন্য প্রমাণ।

প্রাচীন বাংলার ভৌগোলিক অবস্থান ছিল প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের বাণিজ্যের সংযোগস্থল। দূরপ্রাচ্যে যাত্রার পথে আরব নাবিকরা বিশ্রামের জন্য বাংলার বন্দরগুলোকে বেছে নিতেন। অষ্টম ও নবম শতাব্দীর আরব ভূগোলবিদদের লেখনীতে বাংলার সমৃদ্ধির চমৎকার বিবরণ পাওয়া যায়। বিখ্যাত পর্যটক সুলাইমান তার ‘সিলসিলাতুত তাওয়ারিখ’ গ্রন্থে ‘রুহমি’ নামক এক শক্তিশালী রাজ্যের বর্ণনা দিয়েছেন, যাকে আধুনিক গবেষকরা পাল সম্রাট ধর্মপালের শাসিত বাংলা হিসেবে শনাক্ত করেছেন। সুলাইমানের বর্ণনায় উঠে এসেছে বাংলার সেই কিংবদন্তি মসলিনের কথা; তিনি লিখেছেন, এখানকার সুতি বস্ত্র এতই সূক্ষ্ম ও মোলায়েম ছিল যে, একটি আস্ত পোশাক অনায়াসেই আংটির ছিদ্র দিয়ে পার করে দেওয়া যেত। এছাড়া লেনদেনের মাধ্যম হিসেবে কড়ির ব্যবহার এবং যুদ্ধের ময়দানে বিশাল হস্তী বাহিনীর উপস্থিতিও বাংলার সমৃদ্ধির সাক্ষ্য দেয়।

আরব লেখকদের বর্ণনায় উঠে আসা ‘রামি’ বা ‘রাহমা’ অঞ্চলটি মূলত বর্তমান বাংলাদেশের কক্সবাজার জেলার রামু অঞ্চলকে নির্দেশ করে। ১৫৮৫ সালে ইংরেজ পর্যটক রালফ ফিচও এই ‘রামে’ রাজ্যের অস্তিত্বের কথা উল্লেখ করেছিলেন। তৎকালীন সময়ে চট্টগ্রাম ও এর আশপাশের উপকূলীয় এলাকাগুলো আন্তর্জাতিক নৌ-রুটের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল।

বাণিজ্যিক গুরুত্বের দিক থেকে ‘সামান্দার’ নামক একটি বন্দরের নাম আরব ভূগোলে বিশেষভাবে উচ্চারিত হয়েছে। আল-ইদ্রিসির বর্ণনা অনুযায়ী, সামান্দার ছিল এক প্রাচুর্যময় নগরী। এখান থেকে কামরূপের সুগন্ধি আগর কাঠ এবং উন্নত মানের চাল ও গম রপ্তানি হতো। নদীপথে কামরূপ থেকে আগর কাঠ এই বন্দরে আসত এবং সেখান থেকে তা চলে যেত দূর-দূরান্তের বিভিন্ন দেশে।

৭১২ খ্রিস্টাব্দে মুহাম্মদ বিন কাসিমের সিন্ধু অভিযানের পর সমুদ্রপথে আরবদের চলাচল আরও নিরাপদ ও গতিশীল হয়। এর ফলে বাংলার বন্দরগুলোর গুরুত্ব বহুগুণ বেড়ে যায়। আরব ভূগোলবিদ ও পর্যটকদের এই ঐতিহাসিক বিবরণগুলো প্রমাণ করে যে, মধ্যযুগের বিশ্ব অর্থনীতিতে বাংলা কেবল একটি ভূখণ্ড ছিল না, বরং তা ছিল বিশ্ববাণিজ্যের এক অপরিহার্য ও সমৃদ্ধ কেন্দ্র। প্রাচীন এই নৌ-ঐতিহ্য আজও বাংলার ইতিহাসের এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় হয়ে আছে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

কাতারের আকাশসীমায় ইরানের আগ্রাসন প্রতিহত: দুটি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত

বিশ্ববাণিজ্যের সেতুবন্ধ: আরব বণিকদের বর্ণনায় প্রাচীন বাংলার নৌ-গৌরব

আপডেট সময় : ০৬:৫৯:৩৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

দশম শতাব্দীতে বিশ্বজুড়ে সমুদ্রবাণিজ্যের মানচিত্রে আরব বণিকদের একচেটিয়া আধিপত্য ছিল এক অনস্বীকার্য সত্য। ভারত মহাসাগর থেকে শুরু করে দক্ষিণ চীন সাগর পর্যন্ত বিস্তৃত এই বিশাল জলপথে তাদের নিয়ন্ত্রণ এতটাই শক্তিশালী ছিল যে, ইউরোপীয় শক্তিগুলো তখন বিকল্প পথ খুঁজে পেতে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছিল। ইতিহাসবিদদের মতে, আরব ও উপমহাদেশের এই বাণিজ্যিক সম্পর্ক ইসলামের আবির্ভাবের বহু আগে থেকেই বিদ্যমান ছিল। প্রাচীনকালে আরবরাই ছিল ভারত ও বাংলার পণ্য ইউরোপীয় বাজারে পৌঁছে দেওয়ার প্রধান কারিগর।

ঐতিহাসিক পর্যালোচনায় দেখা যায়, এই বাণিজ্যিক সম্পর্ক কেবল পণ্য আদান-প্রদানে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং তা এক গভীর সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন তৈরি করেছিল। ভারতের উপকূলীয় অঞ্চলগুলোতে আরবদের বসতি গড়ে ওঠার বিপরীতে আরব ভূখণ্ডেও ভারতীয়দের সরব উপস্থিতি ছিল। ভারতের তৎকালীন রাজারা মুসলিম বণিকদের প্রতি এতটাই উদার ছিলেন যে, তাদের বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ‘হুনুরমান’ নামক বিশেষ বিচারক নিয়োগ দিতেন। এই দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্কের প্রভাব পড়েছিল ভাষার ওপরও। ভাষাতাত্ত্বিকদের মতে, পবিত্র কোরআনে ব্যবহৃত ‘মেশক’ (কস্তুরী), ‘জানবিল’ (আদা) এবং ‘কাফুর’ (কর্পূর)—এই তিনটি শব্দ মূলত সংস্কৃতমূল থেকে আসা, যা প্রাচীন বাণিজ্যিক যোগাযোগের এক অনন্য প্রমাণ।

প্রাচীন বাংলার ভৌগোলিক অবস্থান ছিল প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের বাণিজ্যের সংযোগস্থল। দূরপ্রাচ্যে যাত্রার পথে আরব নাবিকরা বিশ্রামের জন্য বাংলার বন্দরগুলোকে বেছে নিতেন। অষ্টম ও নবম শতাব্দীর আরব ভূগোলবিদদের লেখনীতে বাংলার সমৃদ্ধির চমৎকার বিবরণ পাওয়া যায়। বিখ্যাত পর্যটক সুলাইমান তার ‘সিলসিলাতুত তাওয়ারিখ’ গ্রন্থে ‘রুহমি’ নামক এক শক্তিশালী রাজ্যের বর্ণনা দিয়েছেন, যাকে আধুনিক গবেষকরা পাল সম্রাট ধর্মপালের শাসিত বাংলা হিসেবে শনাক্ত করেছেন। সুলাইমানের বর্ণনায় উঠে এসেছে বাংলার সেই কিংবদন্তি মসলিনের কথা; তিনি লিখেছেন, এখানকার সুতি বস্ত্র এতই সূক্ষ্ম ও মোলায়েম ছিল যে, একটি আস্ত পোশাক অনায়াসেই আংটির ছিদ্র দিয়ে পার করে দেওয়া যেত। এছাড়া লেনদেনের মাধ্যম হিসেবে কড়ির ব্যবহার এবং যুদ্ধের ময়দানে বিশাল হস্তী বাহিনীর উপস্থিতিও বাংলার সমৃদ্ধির সাক্ষ্য দেয়।

আরব লেখকদের বর্ণনায় উঠে আসা ‘রামি’ বা ‘রাহমা’ অঞ্চলটি মূলত বর্তমান বাংলাদেশের কক্সবাজার জেলার রামু অঞ্চলকে নির্দেশ করে। ১৫৮৫ সালে ইংরেজ পর্যটক রালফ ফিচও এই ‘রামে’ রাজ্যের অস্তিত্বের কথা উল্লেখ করেছিলেন। তৎকালীন সময়ে চট্টগ্রাম ও এর আশপাশের উপকূলীয় এলাকাগুলো আন্তর্জাতিক নৌ-রুটের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল।

বাণিজ্যিক গুরুত্বের দিক থেকে ‘সামান্দার’ নামক একটি বন্দরের নাম আরব ভূগোলে বিশেষভাবে উচ্চারিত হয়েছে। আল-ইদ্রিসির বর্ণনা অনুযায়ী, সামান্দার ছিল এক প্রাচুর্যময় নগরী। এখান থেকে কামরূপের সুগন্ধি আগর কাঠ এবং উন্নত মানের চাল ও গম রপ্তানি হতো। নদীপথে কামরূপ থেকে আগর কাঠ এই বন্দরে আসত এবং সেখান থেকে তা চলে যেত দূর-দূরান্তের বিভিন্ন দেশে।

৭১২ খ্রিস্টাব্দে মুহাম্মদ বিন কাসিমের সিন্ধু অভিযানের পর সমুদ্রপথে আরবদের চলাচল আরও নিরাপদ ও গতিশীল হয়। এর ফলে বাংলার বন্দরগুলোর গুরুত্ব বহুগুণ বেড়ে যায়। আরব ভূগোলবিদ ও পর্যটকদের এই ঐতিহাসিক বিবরণগুলো প্রমাণ করে যে, মধ্যযুগের বিশ্ব অর্থনীতিতে বাংলা কেবল একটি ভূখণ্ড ছিল না, বরং তা ছিল বিশ্ববাণিজ্যের এক অপরিহার্য ও সমৃদ্ধ কেন্দ্র। প্রাচীন এই নৌ-ঐতিহ্য আজও বাংলার ইতিহাসের এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় হয়ে আছে।