আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পিরোজপুর-২ আসনে ভোটের সমীকরণ পাল্টে দিয়েছে বিএনপির এক বিদ্রোহী প্রার্থীর উপস্থিতি। তফসিল ঘোষণার বহু আগে থেকেই সাধারণ ভোটারদের ধারণা ছিল, এ আসনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে একসময়ের জোটসঙ্গী বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থীর মধ্যে। তবে বিদ্রোহী প্রার্থী মাঠে থাকায় এখন ত্রিমুখী লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে, যেখানে মূল আলোচনায় রয়েছেন জামায়াত মনোনীত প্রার্থী শামীম সাঈদী।
ভান্ডারিয়া, কাউখালী ও নেছারাবাদ উপজেলা নিয়ে গঠিত পিরোজপুর-২ আসনটিতে মোট ভোটার ৪ লাখ ৩ হাজার ৫৮৫ জন, যার মধ্যে পুরুষ ২ লাখ ১ হাজার ১৩০ জন এবং নারী ২ লাখ ২ হাজার ৪৫৫ জন। এছাড়া ৪ জন হিজড়া ভোটারও রয়েছেন।
এ আসনে জামায়াতের হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন সাবেক এমপি মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ছেলে শামীম সাঈদী। অন্যদিকে, বিএনপির টিকিটে লড়ছেন মুক্তিযুদ্ধে ৯ নং সেক্টরের বেসামরিক প্রধান ও সাবেক মন্ত্রী নুরুল ইসলাম মঞ্জুর পুত্র এবং ভান্ডারিয়া উপজেলা বিএনপি সভাপতি আহমেদ সোহেল মঞ্জুর সুমন। এই দুই প্রার্থীই নিজ নিজ অবস্থানে বেশ শক্তিশালী। তবে আলোচনার কেন্দ্রে এসেছেন আরেক হেভিওয়েট প্রার্থী মাহমুদ হোসেন, যিনি জেপি (মঞ্জু) থেকে ২০২৩ সালে বিএনপিতে যোগ দেন। বিএনপির মনোনয়ন না পেয়ে বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে স্বতন্ত্রভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন তিনি। প্রখ্যাত সাংবাদিক তোফাজ্জেল হোসেন মানিক মিয়ার ভাইয়ের ছেলে এবং জেপি চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর চাচাতো ভাই মাহমুদ হোসেন পারিবারিক ঐতিহ্য ও আর্থিক সক্ষমতার কারণে এ আসনে বেশ প্রভাবশালী।
প্রার্থীতা প্রত্যাহারের শেষ দিনে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বার্তা নিয়ে পিরোজপুর জেলা বিএনপির শীর্ষ নেতারা মাহমুদের কাছে গিয়েও তাকে নির্বাচন থেকে সরাতে পারেননি। দলীয় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে গিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী (ঘোড়া প্রতীক) হিসেবে মাঠে থাকার সিদ্ধান্তে অনড় থাকেন তিনি। পারিবারিক ঐতিহ্য ও বিএনপির একটি অংশের সমর্থন থাকায় তাকেও একজন শক্তিশালী প্রার্থী হিসেবে দেখছেন অনেকে। বিশ্লেষকদের ধারণা, এই বিদ্রোহী প্রার্থীর কারণে ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থীর ভোটে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে, যা আসনটিতে লড়াইকে ত্রিমুখী করে তুলবে।
ভান্ডারিয়ার সমাজকর্মী লিমন সিকদার মনে করেন, মাহমুদ হোসেন ঐতিহ্যবাহী মানিক মিয়া পরিবারের সদস্য এবং জেপি চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর চাচাতো ভাই হওয়ায় ভান্ডারিয়ায় তার একটি শক্তিশালী অবস্থান রয়েছে, যা লড়াইকে ত্রিমুখী করতে পারে। কাউখালীর অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষিকা ও নারী নেত্রী সুলতানা নীলার মতে, ১৭ বছর পর মানুষ উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট দিতে যাবে এবং বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থীর মধ্যেই মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে। তবে স্বতন্ত্র প্রার্থী মাহমুদ হোসেনও পিছিয়ে নেই এবং তার কারণে বিএনপি প্রার্থীর ভোটে প্রভাব পড়তে পারে বলে তিনি মনে করেন। পিরোজপুর-২ আসনের ভোটার, বীর মুক্তিযোদ্ধা কৃষ্ণকান্ত নাথ বলেন, নির্বাচন নিয়ে জনগণের মধ্যে কৌতূহল রয়েছে এবং ভোটের পরিবেশ ভালো। তিনি বিশ্বাস করেন, মুক্তিযুদ্ধ, গণতন্ত্র, বাক স্বাধীনতা এবং ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলের অধিকার যারা নিশ্চিত করবে, এ আসনের মানুষ তাদেরকেই বেছে নেবে।
নিজের প্রতিদ্বন্দ্বিতা প্রসঙ্গে স্বতন্ত্র প্রার্থী মাহমুদ হোসেন বলেন, ‘এ আসনে আমার প্রতিদ্বন্দ্বী সবাই। তবে মূল প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে জামায়াতের শামীম সাঈদীকেই দেখছি।’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘আমি কাউকে ক্ষতি করতে নির্বাচন করি না। আমাদের পারিবারিক ঐতিহ্য রয়েছে, আমরা গণমানুষের জন্য রাজনীতি করি।’ জয়ের ব্যাপারে তিনি আশাবাদী।
অপরদিকে, জামায়াত প্রার্থী শামীম সাঈদী বলেন, ‘নির্বাচনে সবাই আমার প্রতিদ্বন্দ্বী। আমরা পরিবর্তনের পক্ষে, ভোটাররাও পরিবর্তনের পক্ষে। সুতরাং ভোটে আমরাই জিতব ইনশাআল্লাহ।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমি মনে করি না আমার কোনো হার আছে। যদি মাহমুদ হোসেন নির্বাচিত হন, তিনি আমার ভাই; আর যদি সোহেল মঞ্জুর নির্বাচিত হন, তিনি আমার বন্ধু।’ তার এই মন্তব্য রাজনৈতিক মহলে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
বিএনপি প্রার্থী আহমেদ সোহেল মঞ্জুর সুমন স্বতন্ত্র প্রার্থী মাহমুদ হোসেন সম্পর্কে কঠোর মন্তব্য করে বলেন, ‘তিনি ছিলেন স্বৈরাচারের দোসর, পিঠ বাঁচাতে বিএনপিতে এসেছিলেন। তার তো বিএনপির রাজনীতির কোনো ব্যাকগ্রাউন্ড নেই। সে তো বিএনপির অবাধ্য হয়ে বহিষ্কৃত হয়েছে।’ তিনি মাহমুদকে তার প্রতিদ্বন্দ্বী মনে না করে জামায়াতের শামীম সাঈদীকেই মূল প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে উল্লেখ করেন।
উল্লেখ্য, এই আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী মাহমুদের ছোট ভাই মাহিবুল হোসেন মাহিম জাতীয় পার্টি (জেপি)-এর ভান্ডারিয়া উপজেলা সভাপতি হিসেবে সাইকেল প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
রিপোর্টারের নাম 
























