পাহাড়, টিলা, হাওর আর বনবৈচিত্র্যে ভরা হবিগঞ্জ জেলা এবার জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে এক ভিন্ন সমীকরণের মুখোমুখি। জেলার মোট ১৮ লক্ষাধিক ভোটারের প্রায় অর্ধেকই নারী, যা তাদের ভোটের মাঠে এক অপরিহার্য চালিকাশক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে, বিশেষ করে জেলার বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোতে নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ থাকলেও, সুযোগ-সুবিধা ও স্বীকৃতির অভাবে তারা প্রায়শই পিছিয়ে থাকেন। আসন্ন নির্বাচনে তাই নারী ভোটারদের বহুমুখী প্রত্যাশা, যেমন সামাজিক নিরাপত্তা, কর্মক্ষেত্রে সুষ্ঠু পরিবেশ, উদ্যোক্তা-বান্ধব কর্মসূচি এবং জনপরিবহনে হয়রানি মুক্ত পরিবেশের দাবিগুলো জোরালোভাবে উঠে আসছে।
নির্বাচনী মাঠে হবিগঞ্জের নারী ভোটারদের এই ক্রমবর্ধমান গুরুত্বের পেছনে রয়েছে তাদের বিশাল সংখ্যা। জেলার মোট ভোটার সংখ্যার প্রায় ৪৯.৬ শতাংশ নারী, যা যেকোনো নির্বাচনের ফলাফল নির্ধারণে তাদের ভূমিকা অনস্বীকার্য করে তুলেছে।
দেউন্দি চা বাগানের শ্রমিক বাসন্তি বাকতির মতো অনেক নারী চা শ্রমিক চান এমন একজন জনপ্রতিনিধি, যিনি তাদের অবহেলিত জীবনমান উন্নয়নে কাজ করবেন। তাদের প্রত্যাশা, সরকার তাদের প্রতি সদয় দৃষ্টি দেবে এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা করবে। একই ধরনের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন অন্যান্য চা শ্রমিক নারীরাও, যারা বলেন, ভোট দিয়ে সরকার নির্বাচন করার উদ্দেশ্যই হলো তাদের জীবনমানের উন্নয়ন।
শায়েস্তাগঞ্জের অলিপুরে অবস্থিত প্রাণ-আরএফএল ফ্যাক্টরির মতো বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত নারী শ্রমিকরা বলছেন, তারা এমন সরকার ও জনপ্রতিনিধি চান, যারা কর্মক্ষেত্রে নারী-বান্ধব পরিবেশ তৈরিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।
নারী উদ্যোক্তা নাজমা আক্তার এবং তার সহকর্মীরা উদ্যোক্তা-বান্ধব কর্মসূচির দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, নতুন সরকার নারী উদ্যোক্তাদের জন্য আরও সুযোগ-সুবিধা তৈরি করবে, বিশেষ করে যারা ঘরে বসে কাজ করতে আগ্রহী, তাদের জন্য পর্যাপ্ত সহায়তা প্রয়োজন। হবিগঞ্জে আরও বেশি নারী উদ্যোক্তা তৈরি হোক—এই প্রত্যাশাও তাদের।
অনার্স পড়ুয়া শিক্ষার্থী সানজিদা আক্তার নির্বাচনের নিরপেক্ষতা নিয়ে আশাবাদী হলেও, জনপরিবহনে নারীদের দৈনন্দিন হয়রানি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি নতুন সরকারের কাছে এই সামাজিক ব্যাধি থেকে পরিত্রাণের জন্য অগ্রিম দাবি জানিয়েছেন, কারণ এটি নারীদের মানসিকভাবে প্রচণ্ড প্রভাবিত করে।
অনেক নারী ভোটার সামাজিক নিরাপত্তার পাশাপাশি কর্মসংস্থানমূলক নতুন প্রতিষ্ঠান তৈরি এবং উদ্যোক্তাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টিতে নতুন সরকারের ভূমিকা প্রত্যাশা করছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন স্কুল শিক্ষিকা নারী সমাজের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, নির্বাচন নারীর ভবিষ্যৎকে কতটা মসৃণ বা চ্যালেঞ্জিং করবে, সেটাই এখন দেখার বিষয়। তিনি অবশ্যই একটি নারীবান্ধব সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রত্যাশা করেন।
হবিগঞ্জের চারটি সংসদীয় আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ১৮ লক্ষ ১৮ হাজার ৬১৭ জন। এর মধ্যে নারী ভোটার ৯ লক্ষ ২ হাজার ৮৫৩ জন, পুরুষ ভোটার ৯ লক্ষ ১৫ হাজার ৭৪০ জন এবং হিজড়া ভোটার ২৪ জন। এই পরিসংখ্যান নারী ভোটারদের গুরুত্বকে আরও স্পষ্ট করে তোলে এবং তাদের দাবিগুলোকে রাজনৈতিক মহলে এক নতুন মাত্রা যোগ করে।
রিপোর্টারের নাম 
























