জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে মানিকগঞ্জের রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন উৎসবের আমেজ। গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত প্রার্থীরা ভোটারদের মন জয় করতে দিনরাত ছুটেছেন, শেষ হয়েছে প্রচারণার ডামাডোল। উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যতের স্বপ্ন— নানা প্রতিশ্রুতির পসরা সাজিয়ে প্রার্থীরা ভোটারদের সামনে নিজেদের তুলে ধরেছেন। একসময় ‘বিএনপির দুর্গ’ হিসেবে পরিচিত মানিকগঞ্জে, দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকার পর এবার দলটির নেতাকর্মীরা সেই পুরোনো অবস্থান পুনরুদ্ধারের স্বপ্ন দেখছেন।
তবে এবারের নির্বাচনের দৃশ্যপট কিছুটা ভিন্ন। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এই নির্বাচনে অংশ না নেওয়ায় বিএনপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মাঠে সক্রিয় হয়ে উঠেছে ইসলামিক ঘরানার রাজনৈতিক দলগুলো। ফলে মানিকগঞ্জের তিনটি সংসদীয় আসনেই ভোটের লড়াই ভিন্ন ভিন্ন সমীকরণে মোড় নিয়েছে, যা স্থানীয় রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
মানিকগঞ্জ-১ আসনে ত্রিমুখী লড়াইয়ের আভাস
ঘিওর, দৌলতপুর ও শিবালয় উপজেলা নিয়ে গঠিত মানিকগঞ্জ-১ আসনে এবার সাতজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও মূল লড়াইয়ে রয়েছেন তিনজন। এখানে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী এস এ জিন্নাহ কবীর ‘ধানের শীষ’ প্রতীক ও সাংগঠনিক শক্তিকে পুঁজি করে জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী। তবে তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মাঠে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী আবু বকর সিদ্দিক। এছাড়া, বিএনপির বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী তোজাম্মেল হক তোজাও এই আসনে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন।
দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল এই আসনে বিএনপির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। জানা গেছে, বিএনপির একাংশ নেতাকর্মীরা স্বতন্ত্র প্রার্থী তোজাকে সমর্থন দেওয়ায় দল থেকে ইতোমধ্যে প্রায় অর্ধশত নেতাকর্মীকে বহিষ্কার করা হয়েছে। এই বিভেদকে কাজে লাগিয়ে ভোটের ফল নিজেদের অনুকূলে আনার সর্বাত্মক চেষ্টা চালাচ্ছেন জামায়াত প্রার্থী আবু বকর সিদ্দিক। জেলার অন্য দুটি আসনে জামায়াতের কোনো প্রার্থী না থাকায় জেলা পর্যায়ের সকল নেতাকর্মী এই আসনে সর্বশক্তি নিয়োগ করেছেন। ফলে এই আসনে একটি ত্রিমুখী ও হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাচ্ছেন সাধারণ ভোটাররা।
মানিকগঞ্জ-২: বিএনপির ‘ফাঁকা মাঠে গোল’ দেওয়ার সুযোগ?
সিংগাইর, হরিরামপুর ও সদর উপজেলার দুটি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত মানিকগঞ্জ-২ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন চারজন প্রার্থী। এখানে বিএনপির প্রার্থী সাবেক সংসদ সদস্য মইনুল ইসলাম খান শান্ত। তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মাঠে রয়েছেন জামায়াত জোট মনোনীত খেলাফত মজলিসের প্রার্থী শেখ মোহাম্মদ সালাউদ্দিন। এছাড়া, ২০০৮ সালের মহাজোট সমর্থিত জাতীয় পার্টির সাবেক সংসদ সদস্য এস এম আব্দুল মান্নান ‘লাঙ্গল’ প্রতীক নিয়ে এতদিন প্রচারণা চালিয়েছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই আসনে বিএনপির দলীয় ঐক্য এবং শক্তিশালী কোনো প্রতিদ্বন্দ্বীর অভাব শান্তকে অনেকটাই এগিয়ে রেখেছে। স্থানীয় বিএনপি কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে এক ধরনের আত্মবিশ্বাস লক্ষ্য করা যাচ্ছে, তাদের ভাষায় এটি যেন ‘ফাঁকা মাঠে গোল দেওয়ার’ মতো পরিস্থিতি। প্রচারণার শেষ দিনেও নেতাকর্মীদের মধ্যে একই রকম চাঙ্গা ভাব দেখা গেছে।
মানিকগঞ্জ-৩: আফরোজা খানম রিতার গণজোয়ার
সদর ও সাটুরিয়া উপজেলা নিয়ে গঠিত মানিকগঞ্জ-৩ আসনটি জেলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আসন হিসেবে বিবেচিত। এখানে নয়জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও নির্বাচনী আমেজ তুলনামূলকভাবে কিছুটা কম। এর প্রধান কারণ হিসেবে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী আফরোজা খানম রিতার পক্ষে তৈরি হওয়া ‘গণজোয়ার’কে চিহ্নিত করা হচ্ছে। তার ব্যাপক জনসমর্থনের ঢেউয়ে অন্য প্রার্থীরা অনেকটাই ম্লান হয়ে পড়েছেন।
এই আসনে বিএনপির বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থীও ভোটের মাঠে তেমন একটা প্রভাব ফেলতে পারেননি, যার ফলে তার কর্মীদের মধ্যেও হতাশা দেখা যাচ্ছে। জামায়াতে ইসলামীর কোনো প্রার্থী এই আসনে না থাকলেও ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের সাইদ নূর ‘রিক্সা’ প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করছেন। তবে স্থানীয়ভাবে অপরিচিত হওয়ায় জামায়াত সমর্থকদের মধ্যেও তাকে নিয়ে আগ্রহ কম বলে জানিয়েছেন ভোটাররা।
বিশ্লেষকদের মতে, এই আসনে নারী ভোটারের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি হওয়ায় আফরোজা খানম রিতা বাড়তি সুবিধা পাচ্ছেন। নারী ও তরুণ ভোটারদের প্রাধান্য দিয়ে তিনি উন্নয়ন, কর্মসংস্থান ও নিরাপদ সমাজ গঠনের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। বিএনপির সিনিয়র নেতারাও এখন একাট্টা হয়ে ‘ধানের শীষের’ পক্ষে মাঠে নামায় এই আসনে বিএনপির জয় প্রায় নিশ্চিত বলেই মত রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের।
সব মিলিয়ে মানিকগঞ্জের তিনটি সংসদীয় আসনেই ভিন্ন ভিন্ন চিত্র পরিলক্ষিত হচ্ছে। কোথাও ত্রিমুখী হাড্ডাহাড্ডি লড়াই, কোথাও একচেটিয়া আধিপত্যের আভাস, আবার কোথাও প্রায় একতরফা সমীকরণ। তবে শেষ পর্যন্ত কে হবেন মানিকগঞ্জের উন্নয়নের কাণ্ডারী, তার চূড়ান্ত রায় মিলবে কেবল ভোটের বাক্স খুললেই।
রিপোর্টারের নাম 
























