নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার দুর্গম চরাঞ্চল সায়েদাবাদ দীর্ঘকাল ধরে দেশীয় ও আধুনিক অস্ত্র তৈরি, প্রশিক্ষণ এবং গোষ্ঠীগত সংঘাতের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। এই অঞ্চলে নিয়মিতভাবে সাধারণ মানুষের প্রাণহানি এবং বাড়িঘরে হামলার ঘটনা ঘটছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক বড় অভিযানে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র উদ্ধার ও বেশ কয়েকজন দুর্বৃত্ত গ্রেপ্তার হলেও, এই চরাঞ্চলের সহিংসতা পুরোপুরি থামানো সম্ভব হচ্ছে না। স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় দীর্ঘ সময় ধরে তেমন কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
নরসিংদীর প্রশাসনিক কর্মকর্তা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জেলার সর্ববৃহৎ রায়পুরা উপজেলা ২৪টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত, যার মধ্যে প্রায় সাতটিই চরাঞ্চলীয় ইউনিয়ন। প্রশাসনের ভাষ্য অনুযায়ী, চরাঞ্চলে বিপর্যস্ত যোগাযোগ ব্যবস্থা, যানবাহন চলাচলে বিঘ্ন এবং জনবলের স্বল্পতার কারণে কাঙ্ক্ষিত সেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। রাজনৈতিক নেতারা মনে করেন, এই অঞ্চলে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিনের গোষ্ঠীগত দ্বন্দ্ব বিদ্যমান। অতীতে এই দ্বন্দ্বে টেঁটা প্রধান হাতিয়ার থাকলেও, বর্তমানে দেশি-বিদেশি আধুনিক অস্ত্রের ব্যবহার ব্যাপক হারে বেড়েছে।
সচেতন মহল মনে করছে, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই নরসিংদী জেলখানা ভেঙে পালিয়ে যাওয়া চিহ্নিত ২০-২২ জন আসামি এবং বাইরে থাকা ২৭টি অস্ত্রই এসব সহিংসতায় ব্যবহৃত হচ্ছে। এসব আসামি ও অস্ত্র উদ্ধারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উল্লেখযোগ্য কোনো ভূমিকা দেখা যায়নি বলে তাদের অভিযোগ।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, কথিত শেখ হাসিনার নিরাপত্তা প্রধান এসএসএফ-এর ডিজি জেনারেল মুজিবুর রহমানের চাচাতো ভাই আবিদ হাসান রুবেল চরাঞ্চলের নিয়ন্ত্রণভার গ্রহণ করেন। পূর্ববর্তী উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে ভাইস চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সময় তার বাহিনীর হাতে যুবলীগ নেতা সুমন নিহত হওয়ার পর রুবেলের একচ্ছত্র আধিপত্যের বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। সূত্র আরও জানায়, রুবেলের নেতৃত্বে কক্সবাজারের মহেশখালী থেকে অস্ত্র তৈরির কারিগরদের এনে সায়েদাবাদের বিভিন্ন বাড়িতে রেখে অস্ত্র তৈরি করানো হয়। এসব অস্ত্রের ক্রেতা স্থানীয়রাই। পরে রাতের অন্ধকারে বিভিন্ন চর ও প্রতিষ্ঠানের মাঠে এসব অস্ত্র ক্রেতাদের অস্ত্র চালনার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এই প্রশিক্ষণে স্থানীয় অবসরপ্রাপ্ত বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যরা জড়িত বলে জানা গেছে।
রায়পুরার চরাঞ্চলে একের পর এক সংঘর্ষ, হত্যা ও বাড়িঘরে লুটের ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে গত ১০ ডিসেম্বর নরসিংদীতে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধূরী জানান, রায়পুরা উপজেলার চরাঞ্চলে সন্ত্রাস দমনে চিরুনি অভিযান চালানো হবে। তিনি বলেন, চরাঞ্চলে সন্ত্রাসীদের আড্ডা ও অসংখ্য হাতিয়ারের উপস্থিতি একটি বড় সমস্যা। সেনাবাহিনী, পুলিশ ও র্যাবকে নিয়ে একটি সমন্বিত অভিযান পরিচালনা করা হবে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, অপরাধীরা এখন টেঁটা থেকে আধুনিক হাতিয়ারে চলে গেছে, তাই যত দ্রুত সম্ভব কম্বিং অপারেশন চালিয়ে সন্ত্রাসীদের আইনের আওতায় আনা হবে। এই বক্তব্যের পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সর্বোচ্চ কর্তাব্যক্তিরা নড়েচড়ে বসেন।
এই প্রেক্ষাপটে গত ১১ অক্টোবর র্যাব-১১ এর একটি দল রায়পুরার সায়েদাবাদে বিশেষ অভিযান চালিয়ে দেশি-বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদসহ ৮ জনকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন মো. বাচ্চু মিয়া, মো. মোস্তফা মিয়া, মো. শফিকুল ইসলাম, মো. আইনুল হক, মো. জাহিদ, মহিউদ্দিন হৃদয়, মোহাম্মদ কালু মিয়া ও মোহাম্মদ বাসেত। র্যাব-১১ এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল এইচ এম সাজ্জাদ হোসেন এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, গ্রেপ্তারকৃতরা এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষের জন্য অস্ত্র সরবরাহ ও বিক্রি করত।
চলতি বছরের ৭ জানুয়ারি রায়পুরা আর্মি ক্যাম্পের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. আবু বকর সিদ্দীক-এর নেতৃত্বে একই এলাকায় সেনাবাহিনী ও পুলিশের যৌথ অভিযান চালানো হয়। এই অভিযানে দুই শীর্ষ সন্ত্রাসী বাবা ও ছেলেকে গ্রেপ্তারসহ বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার করা হয়। অভিযানে রায়পুরা আর্মি ক্যাম্প, রায়পুরা থানা পুলিশ এবং রায়পুরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাসুদ রানা অংশ নেন। সায়দাবাদ গ্রামের মৃত তোতা মিয়ার ছেলে মো. জালাল উদ্দিন (৬৫) ও তার ছেলে শুটার ইকবাল ওরফে আকরাম হোসেন (৩৫) কে গ্রেপ্তার করা হয়। অভিযানে উদ্ধার করা হয় ২টি একনলা বন্দুক, ১টি দেশীয় ওয়ান শুটার গান, ২টি রামদা, ২টি ডেগার, ৪টি ছুরি, ২টি চাপাতি, ৮টি কার্তুজ, ৫ রাউন্ড গুলি, ৩টি দেশীয় বল্লম, ২২টি পটকা, ১টি বুলেট প্রুফ জ্যাকেট, ১টি ছোট ব্যাগ, ২টি বন্দুকের কভার, ১৫টি বাটন ফোন, ৫টি অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল, ১টি আইফোন এবং ১টি মানিব্যাগসহ একটি জাতীয় পরিচয়পত্র। অভিযানের পর লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. আবু বকর সিদ্দীক জানান, গ্রেপ্তারকৃত জালালের বিরুদ্ধে দুটি খুনসহ ৪টি এবং আকরামের বিরুদ্ধে একটি খুন, অস্ত্র মামলাসহ মোট ১১টি মামলা রয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, সায়দাবাদ এলাকায় আধিপত্য বিস্তার ও গোষ্ঠীগত দ্বন্দ্ব নিয়ে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সহসভাপতি শাহ আলম চৌধুরী ও হানিফ মাস্টারের সঙ্গে যুবলীগ নেতা এরশাদ বাহিনীর দীর্ঘদিন ধরে সংঘর্ষ চলে আসছে। এই সংঘর্ষের জেরে গত বছর একই দিনে এক নারী ও একজন স্কুলছাত্রসহ ছয়জনের প্রাণহানি ঘটে। সর্বশেষ গত ৪ জানুয়ারি বুধবার সকালে এই দুই পক্ষের সংঘর্ষে স্থানীয় সায়েদাবাদ উচ্চ বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র মুস্তাকিম (১৪) গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হয়। নিহত মুস্তাকিম মিয়া (১৪) ছিলেন সায়েদাবাদ এলাকার সৌদি আরব প্রবাসী মাসুদ রানার ছেলে। ঘটনার পর এলাকায় পুলিশ, সেনাবাহিনী ও বিজিবি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। এই দুই গ্রুপের সংঘর্ষে ছয়জন নিহতের পরও একাধিক পৃথক সংঘর্ষে একজন নারী ও তাজুল ইসলাম নামে একজন ব্যবসায়ী নিহত হয়েছেন।
পুলিশ জানায়, উপজেলার চরাঞ্চল সায়দাবাদ এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে দুটি পক্ষের মধ্যে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে গোষ্ঠীগত দ্বন্দ্ব চলছিল। এলাকায় এক পক্ষের নেতৃত্বে রয়েছেন শাহ আলম চৌধুরী ও হানিফ মাস্টার এবং অপর পক্ষের নেতৃত্বে রয়েছেন এরশাদ মিয়া। তাদের বিরোধের জেরে বুধবার সকালে বাড়িতে হামলা চালিয়ে মুস্তাকিমকে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় উভয় পক্ষের অন্তত ৬ জন আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে সায়দাবাদ এলাকার রফিকুল ইসলাম (৩৭), সোহান (২৬) ও রোজিনা বেগম (৩৫) গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। মুস্তাকিমের মা শাহানা বেগম বলেছেন, তাঁরা কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত নন এবং তাঁর সন্তানের হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার চেয়েছেন।
রায়পুরা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মুজিবুর রহমান জানান, রায়পুরার সায়েদাবাদ এলাকাটি চরাঞ্চল হওয়ায় সেখানে যেতে মেঘনা নদী পাড় হতে হয়। নদী পার হয়ে অভিযান চালাতে গেলে অপরাধীরা আগাম খবর পেয়ে যায়, ফলে তাদের গ্রেপ্তার করা কঠিন হয়ে পড়ে। কেন এই এলাকায় এত সংঘাত, অস্ত্র উদ্ধার ও হত্যার ঘটনা ঘটছে—এমন প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট জবাব দিতে পারেননি অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) সুজন চন্দ্র সরকার। তবে তিনি জানান, একাধিক অভিযানে ইতিমধ্যে ২০ জনের মতো সন্ত্রাসী গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার করা হয়েছে।
রিপোর্টারের নাম 





















