তিনি বলেছেন, “আমাদের মনে রাখতে হবে যে, রাষ্ট্র সংস্কারের জন্য আমাদের মধ্যে যে অভাবনীয় ঐক্য তৈরি হয়েছে, তা যে কোনও মূল্যে ধরে রাখতে হবে। কারণ, একটি ফ্যাসিবাদী গোষ্ঠী এই জাতিকে বিভক্ত করার জন্য সর্বশক্তি দিয়ে চেষ্টা করছে। গত ১৫ মাস ধরে আমরা সবাই মিলে তাদের বিভিন্ন ষড়যন্ত্রের মোকাবিলা করেছি। ফ্যাসিবাদকে পরাজিত করতে এবং দেশকে বাঁচাতে এই জাতীয় ঐক্য বজায় রাখা ছাড়া আর কোনও পথ খোলা নেই।” শনিবার (১ নভেম্বর) রাতে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে পাঠানো এক বিবৃতিতে এই তথ্য জানানো হয়।
বাংলাদেশে একটি স্থায়ী ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজনীয় কাঠামোগত সংস্কারের লক্ষ্য নিয়ে এই ঐকমত্য কমিশন গঠন করা হয়েছিল। চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসকে সভাপতি করে এই কমিশনের যাত্রা শুরু হয়েছিল, যা গত ৩১ অক্টোবর শেষ হয়েছে।
প্রধান উপদেষ্টা ‘জুলাই জাতীয় সনদ’-কে একটি ঐতিহাসিক অর্জন হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, “এই সনদ জাতির জন্য এক মূল্যবান দলিল, যা কেবল আগামী জাতীয় নির্বাচনের পথকেই সহজ করবে না, বরং এটি জাতীয় রাজনীতির জন্য একটি ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা হিসেবে কাজ করবে এবং আমাদের গণতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী করবে।”
তিনি আরও বলেন, “দেশের মানুষ জাতীয় জীবনে এমন কিছু পরিবর্তন দেখার আশায় আছে, যা বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির বিকাশ ঘটাবে। তারা এমন পরিবর্তন চায়, যার ফলে এই দেশে আর কখনও কোনও স্বৈরাচার ফিরে আসতে পারবে না এবং এমন পরিবর্তন চায় যা সবার নাগরিক অধিকার ও মর্যাদা রক্ষা করে জাতীয় জীবনে সার্বিক উন্নয়ন নিয়ে আসবে।”
ড. ইউনূস বলেন, “সবচেয়ে বড় আশার বিষয় হলো, এই সংস্কার প্রক্রিয়া নিয়ে আমরা নিজেরাই কাজ করেছি এবং একমত হয়েছি। বাইরের কেউ আমাদের ওপর কোনও সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেয়নি। অতীতে আমরা দেখেছি, বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংলাপে বিদেশিরা মধ্যস্থতা করতে এসেছেন। বন্ধু রাষ্ট্র বা জাতিসংঘের প্রতিনিধিরা দলগুলোকে এক টেবিলে বসানোর চেষ্টা করেছেন। কিন্তু জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক দলগুলো এই বিষয়ে একমত হয়েছে যে, আমাদের সংকট আমাদেরই সমাধান করতে হবে। এই উপলব্ধি থেকেই সব দল একস্রোতে শামিল হয়েছে, রাজনৈতিক বিতর্কে অংশ নিয়েছে এবং সমাধানের পথ খুঁজে বের করেছে। এবার আমরা সংকট সমাধানে বিশ্ববাসীকে আমন্ত্রণ জানানোর বদলে, উল্টো আমাদের জাতীয় ঐক্যকেই বিশ্বের কাছে তুলে ধরেছি।”
প্রধান উপদেষ্টা বাংলাদেশের সব রাজনৈতিক দল ও তাদের নেতাদের বিশেষভাবে ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, “এই সনদ তৈরি করতে গিয়ে রাজনৈতিক নেতারা যে অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন এবং অসম্ভবকে সম্ভব করেছেন, তার জন্য আমি পুরো জাতির পক্ষ থেকে তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।”
এই ‘জুলাই সনদ’-কে তিনি পুরো বিশ্বের জন্য একটি অনন্য উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি আরও বলেন, “বিশ্বের অন্য কোথাও এমন ঘটনা ঘটেনি। এটি পৃথিবীর রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। আমি বিশ্বাস করি, অন্যান্য দেশও ভবিষ্যতে সংকটময় মুহূর্তে দেশ গড়ার পদক্ষেপ হিসেবে এমন ঐকমত্য কমিশন গঠনের কথা ভাবতে পারে।”
ড. ইউনূস ঐকমত্য কমিশনের সহ-সভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ এবং সদস্য ড. বদিউল আলম মজুমদার, ড. ইফতেখারুজ্জামান, সফর রাজ হোসেন, বিচারপতি এমদাদুল হক, ড. মোহাম্মদ আইয়ুব মিয়া ও বিশেষ সহকারী মনির হায়দারকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। সেই সাথে, গণমাধ্যম কর্মীদের প্রতিও তিনি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন, যারা মাসের পর মাস ধরে এই দীর্ঘ আলোচনার সঙ্গী ছিলেন এবং কমিশনের সমস্ত কার্যক্রম সহজ ভাষায় সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন।
দেশের ভবিষ্যৎ গড়ার পথে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে উল্লেখ করে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, “এই চ্যালেঞ্জ কোনও একজন ব্যক্তি, একটি সংগঠন, একটি সংস্থা বা কোনও একক সরকারের পক্ষে একা মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। এ জন্য সব রাজনৈতিক দল ও পক্ষের মধ্যে একতা বজায় রাখতে হবে। সামনে যত বড়ই বাধা আসুক না কেন, এই ঐক্য আমাদের ধরে রাখতেই হবে।”
রিপোর্টারের নাম 






















