ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসের রাজপথ মঙ্গলবার হাজার হাজার মানুষের বিক্ষোভের উত্তাপে মুখরিত ছিল। সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর মুক্তির দাবিতে আয়োজিত এই সমাবেশে যোগ দেন তাঁর হাজারো সমর্থক। প্রায় এক মাস পূর্বে এক রক্তক্ষয়ী সামরিক অভিযানের পর ক্ষমতাচ্যুত হওয়া মাদুরো বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। মাদক পাচারের অভিযোগের ভিত্তিতে তাঁকে বিচারের জন্য নিউইয়র্কে নিয়ে যাওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
“ভেনেজুয়েলার জন্য নিকোলাস প্রয়োজন”—এই স্লোগান সহকারে রাজপথে নেমে আসা জনতা সরকারের প্রতি মাদুরোর মুক্তি দাবি জানায়। সরকারি উদ্যোগে আয়োজিত এই মিছিলে সরকারি কর্মচারীদের ব্যাপক অংশগ্রহণ লক্ষ্য করা গেছে। অনেক বিক্ষোভকারীর হাতে ছিল মাদুরো এবং তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসের ছবি, যিনি অভিযানের সময় তাঁর স্বামীর সাথে আটক হয়েছিলেন।
মাদুরো ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণকারী দেলসি রদ্রিগেজ বর্তমানে এক জটিল রাজনৈতিক পরিস্থিতির সম্মুখীন। একদিকে তাঁকে ওয়াশিংটনের সমর্থন বজায় রাখতে হচ্ছে, অন্যদিকে সরকার ও সমাজের অভ্যন্তরে মাদুরো–অনুগত নেতা এবং সাধারণ মানুষের আস্থা ধরে রাখার চ্যালেঞ্জও মোকাবিলা করতে হচ্ছে।
বিক্ষোভ সমাবেশে মাদুরোর পুত্র এবং জাতীয় পরিষদের ডেপুটি নিকোলাস ‘নিকোলাসিতো’ মাদুরো গেরা বলেন, “আমরা আমেরিকার অধীন নই। আমাদের মধ্যে শক্তিশালী সাম্রাজ্যবাদবিরোধী চেতনা তৈরি হয়েছে।” তাঁর এই মন্তব্য দেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
মিছিলে অংশগ্রহণকারীদের অনেকেই ভেনেজুয়েলার জাতীয় পতাকা বহন করেন এবং সাবেক প্রেসিডেন্ট হুগো চাভেজের আদর্শে অনুপ্রাণিত শাসকদল ‘চাভিস্তা’ আন্দোলনের প্রতীকী লাল পোশাক পরিহিত ছিলেন। এই উপস্থিতি চাভেজিস্তা আন্দোলনের প্রতি তাদের অবিচল সমর্থনেরই প্রতিফলন।
৫৮ বছর বয়সী পৌর কর্মচারী হোসে পেরদোমো তাঁর অনুভূতি প্রকাশ করে বলেন, “আমরা বিভ্রান্ত, শোকাহত ও ক্ষুব্ধ—অনেক অনুভূতি একসঙ্গে কাজ করছে।” তবে তিনি অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট রদ্রিগেজের সিদ্ধান্তের প্রতিও সমর্থন জানান এবং আশা প্রকাশ করেন যে, “একদিন না একদিন আমাদের প্রেসিডেন্টকে মুক্তি দিতেই হবে।”
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চাপের মুখে রদ্রিগেজ সরকার কিছু রাজনৈতিক বন্দিকে মুক্তি দেওয়া শুরু করেছে এবং রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি খাত ব্যক্তিখাতে বিনিয়োগের জন্য উন্মুক্ত করার মতো কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক টানাপোড়েনের পর যুক্তরাষ্ট্র ও ভেনেজুয়েলার মধ্যে সম্পর্ক পুনরায় উষ্ণ হওয়ার ইঙ্গিত মিলছে।
মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের মিশন থেকে প্রকাশিত এক ভিডিও বার্তায় দেশটিতে নিযুক্ত দূত লরা ডোগু “বন্ধুত্বপূর্ণ, স্থিতিশীল, সমৃদ্ধ ও গণতান্ত্রিক ভেনেজুয়েলা” গড়ার লক্ষ্যে একটি তিন ধাপের পরিকল্পনার রূপরেখা তুলে ধরেন। এটি দুই দেশের মধ্যে ভবিষ্যৎ সম্পর্কের একটি রূপরেখা প্রদান করে।
একই দিন কারাকাসে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী ও রাজনৈতিক বন্দিদের স্বজনরাও মিছিল করেন। তাঁরা অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতিশ্রুত সাধারণ ক্ষমা আইন দ্রুত পাসের দাবি জানান। সরকার জানিয়েছে, রাজনৈতিক সহিংসতা ও চরমপন্থা থেকে বেরিয়ে আসার লক্ষ্যে এই আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, যদিও এটি এখনো সংসদে উত্থাপন করা হয়নি।
২০২৪ সালের বিতর্কিত পুনর্নির্বাচনের পর সরকারবিরোধী আন্দোলন দমনের সময় দুই হাজারের বেশি মানুষ আটক হয়েছিলেন। মঙ্গলবারের বিক্ষোভ সমাবেশে দীর্ঘ বিরতির পর আবারও স্বাধীনতার স্লোগান শোনা যায়। একই সঙ্গে, মাদুরো ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর নতুন নির্বাচনের দাবিও বিরোধীদের পক্ষ থেকে জোরালোভাবে তোলা হচ্ছে, যা দেশটির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।
রিপোর্টারের নাম 






















