দেশের লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং খাতকে রপ্তানিমুখী ও বিশ্ব বাজারে প্রতিযোগিতামূলক করে তুলতে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের ওপর জোর দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ এবং এর ফলে শুল্কমুক্ত সুবিধা কমে আসার প্রেক্ষাপটে এই খাতের সক্ষমতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও নীতিগত সহায়তাকে অপরিহার্য বলে মনে করছেন তারা। গতকাল সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীতে শুরু হওয়া তিন দিনব্যাপী দ্বিতীয় ‘বাংলাদেশ লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং এক্সপো ২০২৬’ এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তারা এসব কথা বলেন।
বাংলাদেশ ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্প মালিক সমিতি (বাইশিমাস)-এর আয়োজনে এই মেলা চলবে ৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। প্রতিদিন সকাল ১১টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে এটি। মেলায় দেশের লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্পের সর্বশেষ প্রযুক্তি, যন্ত্রাংশ ও উদ্ভাবনী পণ্যসামগ্রী প্রদর্শিত হচ্ছে।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে এক্সপোর্ট কম্পিটিটিভনেস ফর জবস (EC4J) প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) মো. আবদুর রহিম খান বলেন, স্বাধীনতার পর থেকে দেশের বিভিন্ন খাতের উন্নয়ন নিয়ে বহু গবেষণা ও আলোচনা হলেও প্রত্যাশিত সাফল্য অধরা রয়ে গেছে। বিশ্বব্যাপী রপ্তানি কাঠামোতে লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং পণ্যের গুরুত্ব বাড়লেও গত ৫০ বছরে বাংলাদেশ এই সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারেনি। তিনি আরও যোগ করেন, কৃষি ও বস্ত্র খাতের পর শিল্পায়নে পরবর্তী ধাপ হিসেবে লাইট ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে আমাদের উত্তরণ সেভাবে ঘটেনি।
আব্দুর রহিম খান জানান, চলতি বছরের নভেম্বরে বাংলাদেশ এলডিসি থেকে চূড়ান্তভাবে উত্তরণ করবে। এর ফলে বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের পণ্যের শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পর্যায়ক্রমে বন্ধ হতে শুরু করবে, যা ২০২৬ বা ২০২৯ সাল থেকে কার্যকর হবে। তিনি বলেন, এই সময়ের মধ্যেই দেশের সক্ষমতা তৈরি করা উচিত ছিল, তবে এখনো সুযোগ শেষ হয়ে যায়নি। সরকারের নীতিনির্ধারক ও বাস্তবায়নকারীদের সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি উদ্যোক্তাদের ব্যবস্থাপনা, উদ্ভাবন ও গবেষণায় আরও সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানান তিনি। কেবল রপ্তানির ওপর নির্ভর না করে অভ্যন্তরীণ বাজারের বিশাল চাহিদার দিকেও নজর দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। ক্রয়ক্ষমতার দিক থেকে দেশের অন্তত ২৫ শতাংশ মানুষের উল্লেখযোগ্য বাজার রয়েছে। তিনি ইসিফোরজে প্রকল্পের আওতায় গাজীপুরে স্থাপিত টেকনোলজি সেন্টারের সুবিধা কাজে লাগানোর ওপরও গুরুত্বারোপ করেন।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের সিনিয়র প্রাইভেট সেক্টর স্পেশালিস্ট হোসনা ফেরদৌস সুমি বলেন, বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় ইসিফোরজে প্রকল্পের মাধ্যমে লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং খাতের সক্ষমতা বাড়াতে বিভিন্ন ধরনের সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, রপ্তানি বাজারের পাশাপাশি প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলারের অভ্যন্তরীণ বাজারও এই খাতের জন্য বড় সম্ভাবনা তৈরি করেছে। তবে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক উভয় ক্ষেত্রেই পণ্যের মান এবং নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য পূরণে সক্ষমতা বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ, উৎপাদন দক্ষতা বৃদ্ধি ও উৎপাদন ব্যয় কমানোকে তিনি প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেন। এই ক্ষেত্রগুলোতে অগ্রগতি হলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা অনেক বাড়বে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। তিনি আরও বলেন, বৈশ্বিক উৎপাদন প্রবণতা ও প্রবৃদ্ধির ধারা দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। ইন্টারনেট অব থিংস (আইওটি) বাস্তবায়ন, ত্রুটিপূর্ণ পণ্যের হার কমানো, সম্পদ-দক্ষ উৎপাদন এবং নির্ভুল প্রযুক্তির ব্যবহার এখন সময়ের দাবি। এক্ষেত্রে সরকার নীতিগত সহায়তা দিলেও মূল কাজটি করতে হবে বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদেরই।
সভাপতির বক্তব্যে বাইশিমাস সভাপতি আব্দুর রাজ্জাক বলেন, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং খাত কৃষি, বস্ত্র, নির্মাণ, বিদ্যুৎ, অটোমোবাইল ও গৃহস্থালি যন্ত্রপাতিসহ বহু শিল্পের ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ হিসেবে কাজ করছে। বর্তমানে দেশে প্রায় ৫০ হাজার ক্ষুদ্র ও মাঝারি লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যেখানে প্রায় ৩ লাখ দক্ষ কর্মী নিয়োজিত। জাতীয় জিডিপিতে এই খাতের অবদান প্রায় ৩ শতাংশ।
তিনি জানান, দেশের ৮.২ বিলিয়ন ডলারের অভ্যন্তরীণ চাহিদার প্রায় অর্ধেক এই শিল্প পূরণ করলেও, এখনো উল্লেখযোগ্য পরিমাণ যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশ আমদানির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। বিশ্ববাজারে প্রায় ৭ ট্রিলিয়ন ডলারের ইঞ্জিনিয়ারিং পণ্যের বাজারে বাংলাদেশের অংশ ১ শতাংশেরও কম। বর্তমানে এই খাত থেকে প্রায় ৭৯৫ মিলিয়ন ডলার রপ্তানি হচ্ছে। তবে যথাযথ নীতি সহায়তা ও বিনিয়োগ বাড়ানো গেলে ২০৩০ সালের মধ্যে ১২.৫৬ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি অর্জন সম্ভব বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
এক্সপোকে একটি কার্যকর সোর্সিং ও নেটওয়ার্কিং প্ল্যাটফর্ম হিসেবে উল্লেখ করে আব্দুর রাজ্জাক বলেন, এর মাধ্যমে নির্মাতা, ক্রেতা, বিনিয়োগকারী ও নীতিনির্ধারকদের মধ্যে সরাসরি সংযোগ তৈরি হবে। তিনি লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং জোন স্থাপন, প্রযুক্তি হস্তান্তর, গবেষণা সহায়তা, কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক হ্রাস, পেটেন্ট ও ডিজাইন সুরক্ষা, নারী ও যুবকদের প্রশিক্ষণ, নগদ প্রণোদনা এবং সহজ ব্যাংক ঋণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। সম্প্রতি প্রণীত লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং ইন্ডাস্ট্রি ডেভেলপমেন্ট পলিসি-র সময়বদ্ধ কর্মপরিকল্পনা সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হলে রপ্তানি বহুমুখীকরণে এই খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বাইশিমাস-এর ঊর্ধ্বতন সহ-সভাপতি আব্দুর রশিদ, সহ-সভাপতি রাজু আহমেদসহ কেন্দ্রীয় পরিচালকবৃন্দ এবং এক্সপোর্ট কম্পিটিটিভনেস ফর জবস (EC4J) প্রকল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।
রিপোর্টারের নাম 





















