ঢাকা ১০:০১ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৩ এপ্রিল ২০২৬

জানুয়ারিতে প্রবাসী আয়ে ৪৫ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি: ডলার প্রবাহে স্বস্তি

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৮:০২:২৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ৮ বার পড়া হয়েছে

চলতি বছরের জানুয়ারিতে দেশে প্রবাসী আয়ের উল্লেখযোগ্য উল্লম্ফন ঘটেছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪৫ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়ে এই মাসে প্রবাসীরা ৩১৭ কোটি ডলার পাঠিয়েছেন। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং আসন্ন পবিত্র রমজান মাসকে সামনে রেখে প্রবাসীদের অর্থ পাঠানো বৃদ্ধি পেয়েছে বলে খাত সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। এই বিপুল পরিমাণ রেমিট্যান্স দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারিতে দেশে মোট ৩১৭ কোটি ডলারের প্রবাসী আয় এসেছে। এটি গত বছরের জানুয়ারির ২১৮ কোটি ৫০ লাখ ডলারের তুলনায় ৪৫ দশমিক ১০ শতাংশ বেশি। খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রার্থীরা বিদেশ থেকে তহবিল সংগ্রহ করেছেন, যা রেমিট্যান্স আকারে দেশে এসেছে। এছাড়া, সামনে পবিত্র রমজান মাস থাকায় পরিবারের বাড়তি খরচের চাহিদা মেটাতেও প্রবাসীরা অর্থ পাঠিয়েছেন, যা জানুয়ারিতে রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ।

এর আগে গত ডিসেম্বরে দেশে প্রবাসী আয় এসেছিল ৩২২ কোটি ডলার। তবে তার আগের পাঁচ মাসে প্রবাসী আয় ৩ বিলিয়ন ডলারের নিচে ছিল। নভেম্বরে সর্বোচ্চ ২৮৯ কোটি ডলারের প্রবাসী আয় এলেও জুলাই ও আগস্টে তা ছিল যথাক্রমে ২৪৮ ও ২৪২ কোটি ডলার। সেপ্টেম্বরে কিছুটা বেড়ে ২৬৯ কোটি ডলারে দাঁড়ায়, তবে পরের মাসে কিছুটা কমে ২৫৬ কোটি ডলারের আয় আসে। সামগ্রিকভাবে, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের গত জুলাই থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত সাত মাসে মোট ১ হাজার ৯৪৩ কোটি ডলারের প্রবাসী আয় এসেছে, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের ১ হাজার ৫৯৬ কোটি ডলারের তুলনায় ২১ দশমিক ৮০ শতাংশ বেশি।

ব্যাংকারদের মতে, একসময় অর্থ পাচারের কারণে দেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছিল। বিভিন্ন অনিয়ম, দুর্নীতি ও জালিয়াতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থ হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে পাঠানো হতো, যার ফলে নানা প্রণোদনা সত্ত্বেও বৈধ পথে রেমিট্যান্স প্রবাহ কম ছিল। বর্তমানে অর্থ পাচার অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আসায় বৈধ পথে রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে। বৈধ পথে ডলারের সরবরাহ বাড়ায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে এর ইতিবাচক প্রভাব দেখা যাচ্ছে।

দেশে ডলারের সরবরাহ বৃদ্ধি পাওয়ায় গত জুলাই মাস থেকে ডলার কেনা শুরু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। চলতি অর্থবছরের শুরু থেকে গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংক মোট ৩৯৩ কোটি ডলার বা ৩.৯৩ বিলিয়ন ডলার বাজার থেকে কিনেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানিয়েছেন, বর্তমানে বাজারে ডলারের চাহিদার তুলনায় সরবরাহ বেশি। ডলারের দাম অস্বাভাবিকভাবে কমে যাওয়া রোধ করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডলার কিনছে, যাতে বাজারে ভারসাম্য বজায় থাকে। তার মতে, ডলারের দর কমে গেলে প্রবাসী আয় ও রপ্তানি খাত ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ডলার কেনার ফলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও বেড়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

উল্লেখ্য, ২০২২ সালে দেশের ডলার বাজার অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছিল। তখন প্রতি ডলারের দাম ৮৫ টাকা থেকে বেড়ে ১২২ টাকায় পৌঁছে যায়। সে সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নানা পদক্ষেপ নিলেও বাজার নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি এবং রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি শুরু করতে হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত তিন অর্থবছরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রায় ৩৪ বিলিয়ন ডলার বিক্রি করেছে। এর মধ্যে, ২০২১-২২ অর্থবছরে ৭.৬ বিলিয়ন ডলার, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১৩.৫ বিলিয়ন ডলার এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১২.৭৯ বিলিয়ন ডলার বিক্রি করা হয়। একই সময়ে ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে কেনা হয়েছে মাত্র প্রায় এক বিলিয়ন ডলার।

রেমিট্যান্স বৃদ্ধি ও ডলার ক্রয়ের ফলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়েছে। গত ২৯ জানুয়ারি শেষে মোট রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩৩.১৮ বিলিয়ন ডলার। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বিপিএম-৬ পদ্ধতি অনুযায়ী তা রয়েছে ২৮.৬৮ বিলিয়ন ডলার। দেশের ইতিহাসে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সর্বোচ্চ ৪৮ বিলিয়ন ডলারের ঘর অতিক্রম করেছিল ২০২১ সালের আগস্টে। তবে এক সময়ে তা কমে ২০.৪৮ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছিল।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় লিজেন্ডারি সংগীতশিল্পী আশা ভোঁসলেকে শেষ বিদায়

জানুয়ারিতে প্রবাসী আয়ে ৪৫ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি: ডলার প্রবাহে স্বস্তি

আপডেট সময় : ০৮:০২:২৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

চলতি বছরের জানুয়ারিতে দেশে প্রবাসী আয়ের উল্লেখযোগ্য উল্লম্ফন ঘটেছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪৫ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়ে এই মাসে প্রবাসীরা ৩১৭ কোটি ডলার পাঠিয়েছেন। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং আসন্ন পবিত্র রমজান মাসকে সামনে রেখে প্রবাসীদের অর্থ পাঠানো বৃদ্ধি পেয়েছে বলে খাত সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। এই বিপুল পরিমাণ রেমিট্যান্স দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারিতে দেশে মোট ৩১৭ কোটি ডলারের প্রবাসী আয় এসেছে। এটি গত বছরের জানুয়ারির ২১৮ কোটি ৫০ লাখ ডলারের তুলনায় ৪৫ দশমিক ১০ শতাংশ বেশি। খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রার্থীরা বিদেশ থেকে তহবিল সংগ্রহ করেছেন, যা রেমিট্যান্স আকারে দেশে এসেছে। এছাড়া, সামনে পবিত্র রমজান মাস থাকায় পরিবারের বাড়তি খরচের চাহিদা মেটাতেও প্রবাসীরা অর্থ পাঠিয়েছেন, যা জানুয়ারিতে রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ।

এর আগে গত ডিসেম্বরে দেশে প্রবাসী আয় এসেছিল ৩২২ কোটি ডলার। তবে তার আগের পাঁচ মাসে প্রবাসী আয় ৩ বিলিয়ন ডলারের নিচে ছিল। নভেম্বরে সর্বোচ্চ ২৮৯ কোটি ডলারের প্রবাসী আয় এলেও জুলাই ও আগস্টে তা ছিল যথাক্রমে ২৪৮ ও ২৪২ কোটি ডলার। সেপ্টেম্বরে কিছুটা বেড়ে ২৬৯ কোটি ডলারে দাঁড়ায়, তবে পরের মাসে কিছুটা কমে ২৫৬ কোটি ডলারের আয় আসে। সামগ্রিকভাবে, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের গত জুলাই থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত সাত মাসে মোট ১ হাজার ৯৪৩ কোটি ডলারের প্রবাসী আয় এসেছে, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের ১ হাজার ৫৯৬ কোটি ডলারের তুলনায় ২১ দশমিক ৮০ শতাংশ বেশি।

ব্যাংকারদের মতে, একসময় অর্থ পাচারের কারণে দেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছিল। বিভিন্ন অনিয়ম, দুর্নীতি ও জালিয়াতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থ হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে পাঠানো হতো, যার ফলে নানা প্রণোদনা সত্ত্বেও বৈধ পথে রেমিট্যান্স প্রবাহ কম ছিল। বর্তমানে অর্থ পাচার অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আসায় বৈধ পথে রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে। বৈধ পথে ডলারের সরবরাহ বাড়ায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে এর ইতিবাচক প্রভাব দেখা যাচ্ছে।

দেশে ডলারের সরবরাহ বৃদ্ধি পাওয়ায় গত জুলাই মাস থেকে ডলার কেনা শুরু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। চলতি অর্থবছরের শুরু থেকে গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংক মোট ৩৯৩ কোটি ডলার বা ৩.৯৩ বিলিয়ন ডলার বাজার থেকে কিনেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানিয়েছেন, বর্তমানে বাজারে ডলারের চাহিদার তুলনায় সরবরাহ বেশি। ডলারের দাম অস্বাভাবিকভাবে কমে যাওয়া রোধ করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডলার কিনছে, যাতে বাজারে ভারসাম্য বজায় থাকে। তার মতে, ডলারের দর কমে গেলে প্রবাসী আয় ও রপ্তানি খাত ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ডলার কেনার ফলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও বেড়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

উল্লেখ্য, ২০২২ সালে দেশের ডলার বাজার অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছিল। তখন প্রতি ডলারের দাম ৮৫ টাকা থেকে বেড়ে ১২২ টাকায় পৌঁছে যায়। সে সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নানা পদক্ষেপ নিলেও বাজার নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি এবং রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি শুরু করতে হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত তিন অর্থবছরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রায় ৩৪ বিলিয়ন ডলার বিক্রি করেছে। এর মধ্যে, ২০২১-২২ অর্থবছরে ৭.৬ বিলিয়ন ডলার, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১৩.৫ বিলিয়ন ডলার এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১২.৭৯ বিলিয়ন ডলার বিক্রি করা হয়। একই সময়ে ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে কেনা হয়েছে মাত্র প্রায় এক বিলিয়ন ডলার।

রেমিট্যান্স বৃদ্ধি ও ডলার ক্রয়ের ফলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়েছে। গত ২৯ জানুয়ারি শেষে মোট রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩৩.১৮ বিলিয়ন ডলার। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বিপিএম-৬ পদ্ধতি অনুযায়ী তা রয়েছে ২৮.৬৮ বিলিয়ন ডলার। দেশের ইতিহাসে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সর্বোচ্চ ৪৮ বিলিয়ন ডলারের ঘর অতিক্রম করেছিল ২০২১ সালের আগস্টে। তবে এক সময়ে তা কমে ২০.৪৮ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছিল।