জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, দেশের মানুষ একটি পরিবর্তন দেখতে চায় এবং ১৩ তারিখ থেকে সেই আকাঙ্ক্ষার ওপর ভর করে তারুণ্য ও যৌবনদীপ্ত বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সূচনা হবে। তিনি কোনো আধিপত্যবাদ, ফ্যাসিবাদ বা দুর্নীতিগ্রস্ত সরকার দেখতে চান না উল্লেখ করে একটি মানবিক বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। তার দাবি, ১১ দলীয় ঐক্যজোট জনগণের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী বাংলাদেশ পরিচালনা করবে। তিনি জামায়াতের নয়, ১৮ কোটি মানুষের বিজয় চান।
গতকাল শনিবার দুপুর ১২টায় চৌদ্দগ্রাম পাইলট হাইস্কুল মাঠে ১১ দলীয় নির্বাচনি ঐক্যের জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। এরপর তিনি দুপুর একটায় বুড়িচং নিমসার জুনাব আলী ডিগ্রি কলেজ মাঠ এবং দুপুর দুইটায় দাউদকান্দি ঈদগাহ মাঠে আয়োজিত নির্বাচনি সভাতেও প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন।
ডা. শফিকুর রহমান চৌদ্দগ্রামের প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন, এ অঞ্চলের মানুষ সৈয়দ আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ তাহেরকে ভালোভাবে চেনে। তাকে নির্বাচিত করলে মন্ত্রিপরিষদে একজন সিনিয়র সদস্য কুমিল্লা থেকে পাওয়া যাবে। এই সিদ্ধান্ত জনগণকে নিতে হবে।
নারীদের নিরাপত্তা ও সম্মান প্রসঙ্গে জামায়াত আমির প্রশ্ন তোলেন, যারা অন্যের সম্পদে, জীবনে হাত দেয়, যারা মায়েদের ইজ্জতে আঘাত করে এবং কাপড় খুলে নেওয়ার হুমকি দেয়, তাদের হাতে বাংলাদেশের ৯ কোটি মা-বোন নিরাপদ কিনা। তিনি বলেন, সাধারণ পোশাক পরা মহিলারাও এখন জামায়াতকে ক্ষমতায় দেখতে চাইছে, যা অনেককে পেরেশান করে তুলেছে। তিনি ঘরে থাকা মা, স্ত্রী, ও কন্যার সম্মানের দিকে তাকিয়ে নারীদের সম্মান করতে শেখার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে, যারা জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করছে, তাদের সেই পথ থেকে ফিরে আসার অনুরোধ করেন।
তিনি চাঁদাবাজিসহ সকল দুর্নীতির মূলোৎপাটন করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন এবং বলেন, মজলুম কীভাবে জালিম হয় তা তার বোধগম্য নয়। তিনি আশা করেন, সংশ্লিষ্টরা সংশোধন হবেন। কওমি মাদরাসা প্রসঙ্গে তিনি জানান, আল্লাহ যদি তাদের সরকার গঠনের সুযোগ দেন, তাহলে বেফাকের সঙ্গে বসে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
ডা. শফিকুর রহমান আরও বলেন, আগামীতে ঐক্যের সরকার গঠিত হবে। তিনি প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষদেরও তাদের সঙ্গে এসে অবদান রাখার আহ্বান জানান। তবে এ জন্য তিনটি শর্তের কথা উল্লেখ করেন: নিজেরা দুর্নীতি করবেন না ও অন্যকেও করতে দেবেন না; সবার জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে; এবং জুলাই সংস্কারের সব প্রস্তাব বাস্তবায়নে অঙ্গীকার করতে হবে। তিনি জাতিকে আর বিভক্ত করতে চান না উল্লেখ করে বলেন, ধর্ম, বর্ণ, গোষ্ঠী, পরিবার নির্বিশেষে ১৮ কোটি মানুষের স্বার্থ দেখা হবে। রাষ্ট্রের দায়িত্ব পালনে যোগ্যতা ও দেশপ্রেমকেই প্রাধান্য দেওয়া হবে, ধর্ম নয়।
শিক্ষাব্যবস্থা প্রসঙ্গে জামায়াত আমির বলেন, এখানে পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। ‘বেটার এডুকেশন, বেটার নেশন’ স্লোগান তুলে তিনি বলেন, ভালো শিক্ষা ছাড়া একটি ভালো জাতি গঠন সম্ভব নয়।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম এই নির্বাচনকে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ধারাবাহিকতা হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, অনেকে এটিকে সাধারণ ঘটনা বা তাদের ১৭ বছরের ফসল মনে করে ভুল করছে, যা জুলাই অভ্যুত্থানকে অস্বীকার করার শামিল। তিনি প্রতিবেশী দেশের গত ৫৪ বছরের ষড়যন্ত্র ও নির্বাচনে হস্তক্ষেপের চেষ্টার নিন্দা জানিয়ে বলেন, জুলাই শহীদদের রক্তের বিনিময়ে হওয়া এই নির্বাচনে কোনো ষড়যন্ত্রকে প্রশ্রয় দেওয়া হবে না এবং বিদেশি শক্তির হস্তক্ষেপ রুখে দিতে তারা প্রস্তুত। তিনি ১১ দলীয় জোটের প্রার্থীদের নির্বাচিত করার আহ্বান জানান।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক বলেন, একটি দল নিজেদের পরাজয় দেখতে পেয়ে ভীরু-কাপুরুষের মতো নারীদের গায়ে হাত তোলার মতো ঘৃণ্য কাজ করছে। তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, কেউ যদি মা-বোনদের দিকে ভিন্ন দৃষ্টিতে তাকায় বা হিজাব নিয়ে টানাটানি করে, তবে তার হাত ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতে হবে এবং চোখ উপড়ে ফেলতে হবে।
সভাপতির বক্তব্যে ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের এমন কাউকে নির্বাচিত করার আহ্বান জানান যার দ্বারা সমগ্র দেশ উপকৃত হবে। জনসভায় জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা এটিএম মা’ছুম, মাওলানা আব্দুল হালিমসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দও বক্তব্য রাখেন।
ডা. শফিকুর রহমান দাউদকান্দি কেন্দ্রীয় ঈদগাহ মাঠে ১১ দলীয় জোট সমর্থিত কুমিল্লা-১ আসনের প্রার্থী মনিরুজ্জামান বাহলুলের সমর্থনে নির্বাচনি জনসভায় বলেন, যারা মা-বোনদের রাস্তায় দেখলে কাপড় খুলে ফেলার হুমকি দেয়, তারা মানব প্রজাতির নয়। যারা নির্বাচনের আগে এমন কথা বলতে পারে, নির্বাচনের পরে তারা কী করবে তা সহজেই অনুমেয়। তিনি এমন একটি বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন, যে দেশের অসংখ্য বন্ধু রাষ্ট্র থাকবে, কিন্তু কোনো প্রভু থাকবে না। তিনি মা-বোনদের ঘরে-বাইরে, কর্মস্থলে ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মায়ের মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিয়ে চলাচলের সুযোগ এবং বৈষম্যহীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করেন।
এদিকে, জামায়াতে ইসলামী রাষ্ট্রক্ষমতায় গেলে কেরানীগঞ্জকে একটি মডেল জনপদে রূপান্তর করা হবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন দলটির আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি কেরানীগঞ্জকে প্রথম শ্রেণির পৌরসভায় উন্নীত করে পরিকল্পিত ও আধুনিক নগরায়ণের আওতায় আনার আশ্বাস দেন। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ ও নাগরিক সেবার মান উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে বলেও তিনি জানান।
গতকাল ঢাকার কেরানীগঞ্জের শাক্তা সরকারি স্কুল খেলার মাঠে নির্বাচনি জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ও জাগপা সভাপতি রাশেদ প্রদান। জামায়াত আমির বলেন, আগামী ১২ তারিখ ভোট প্রদানের মাধ্যমে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে আরও সুসংহত করতে হবে। তিনি বলেন, ১১ দলীয় ঐক্যজোটের মাধ্যমে ফ্যাসিবাদী রাজনীতির অবসান ঘটিয়ে একটি জবাবদিহিমূলক ও জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে তারা এগিয়ে যাচ্ছেন।
জামায়াত আমিরের আগমন উপলক্ষে শাক্তা উচ্চ বিদ্যালয়ের খেলার মাঠ কানায় কানায় ভরে যায় এবং স্লোগানে স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে জনসভাস্থল। বক্তব্য শেষে তিনি ঢাকা জেলার পাঁচটি আসনের ১১ দলীয় ঐক্যের প্রার্থীদের হাতে প্রতীক তুলে দেন। এ সময় প্রার্থীদের মধ্যে ঢাকা-১ আসনের ব্যারিস্টার নজরুল ইসলাম, ঢাকা-২ আসনের কর্নেল (অব.) আব্দুল হক, ঢাকা-৩ আসনের অধ্যক্ষ শাহিনুর ইসলাম, ঢাকা-১৯ আসনের দিলশানা পারুল ও ঢাকা-২০ আসনের ইঞ্জিনিয়ার নাবিলা তাসনিদ বক্তব্য রাখেন।
রিপোর্টারের নাম 























