ঢাকার কেরানীগঞ্জে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর এক নির্বাচনী জনসভায় দলের আমির ডা. শফিকুর রহমান অতীতের ফ্যাসিবাদী ও দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতির কঠোর সমালোচনা করে তা বর্জনের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, জামায়াত ক্ষমতায় এলে হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টানসহ সকল ধর্মাবলম্বীর অধিকার নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর। শনিবার শাক্তা সরকারি স্কুল খেলার মাঠে আয়োজিত এই জনসভায় তিনি এসব কথা বলেন।
ডা. শফিকুর রহমান তার বক্তব্যে বলেন, অতীতের জরাজীর্ণ রাজনৈতিক ধারা দেশকে ফ্যাসিবাদ, একনায়কতন্ত্র ও দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন করেছে। এই অকার্যকর রাজনীতিকে তাঁরা ‘লাল কার্ড’ দেখাতে চান। তিনি অভিযোগ করেন, পূর্ববর্তী শাসকরা দেশকে ভালোবাসেননি, বরং দীর্ঘ সময় ধরে শোষণ করেছেন এবং গুম, খুন ও ‘আয়নাঘর’ সংস্কৃতির মাধ্যমে দেশকে বিপর্যস্ত করে তুলেছেন। তাঁর মতে, এখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এসেছে এবং ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নের মাধ্যমে একটি নিরাপদ ও ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব।
জামায়াত আমির অঙ্গীকার করেন, আগামী দিনে জামায়াতে ইসলামী রাষ্ট্রক্ষমতায় গেলে কেরানীগঞ্জকে একটি মডেল জনপদে রূপান্তর করা হবে। এটিকে প্রথম শ্রেণির পৌরসভায় উন্নীত করে পরিকল্পিত ও আধুনিক নগরায়নের আওতায় আনা হবে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ ও নাগরিক সেবার মান উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে বলেও তিনি আশ্বস্ত করেন। তিনি আরও বলেন, আগামীর নির্বাচনে দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস, পরিবারতন্ত্র এবং ব্যাংক লুটেরাদের বিরুদ্ধে ‘লাল কার্ড’ দেখানো হবে। এসব অনিয়ম ও অন্যায়ের রাজনীতিকে আর মেনে নেওয়া হবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
আগামী ১২ তারিখের নির্বাচনে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়ে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে আরও সুসংহত করার আহ্বান জানান ডা. শফিকুর রহমান। তিনি জানান, ১১ দলীয় ঐক্যজোটের মাধ্যমে ফ্যাসিবাদী রাজনীতির অবসান ঘটিয়ে একটি জবাবদিহিমূলক ও জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে তাঁরা এগোচ্ছেন। নারীদের ওপর হামলার বিষয়ে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, “বিভিন্ন জায়গায় মা-বোনদের ওপর হাত তোলা হচ্ছে। আমরা তাদের অতি বিনয়ের সঙ্গে আহ্বান জানাব, মা-বোন আপনাদেরও রয়েছে। নিজেদের মা-বোনকে সম্মান করুন, তাহলে বাংলার সব মা ও বোনকে আপনি সম্মান করতে পারবেন।” ১১-দলীয় নির্বাচনি ঐক্যের পক্ষে ভোট চেয়ে জামায়াতের আমির বলেন, ‘দাঁড়িপাল্লার মার্কা হচ্ছে স্বাধীনতা রক্ষার মার্কা, বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার মার্কা। দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার মার্কা।’
জামায়াত আমিরের আগমন উপলক্ষে শাক্তা সরকারি স্কুল খেলার মাঠ কানায় কানায় ভরে ওঠে। স্লোগানে স্লোগানে মুখর ছিল জনসভাস্থল। বিকাল ৪টা ৪৫ মিনিটে তিনি মঞ্চে ওঠেন এবং ৫টা ১০ মিনিট থেকে ৫টা ৫০ মিনিট পর্যন্ত বক্তব্য রাখেন। বক্তব্য শেষে তিনি ঢাকা জেলার পাঁচটি আসনের প্রার্থীদের হাতে দাঁড়িপাল্লা ও শাপলাকলি প্রতীক তুলে দেন।
জনসভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন এনসিপির কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. নাইদ ইসলাম ও জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা) সভাপতি রাশেদ প্রধান। এনসিপির কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম তার বক্তব্যে বলেন, নির্বাচনে কোনো ধরনের ইঞ্জিনিয়ারিং করার চেষ্টা করা হলে ৫ আগস্ট যেভাবে রাজপথে নেমে আসা হয়েছিল, ঐক্যবদ্ধভাবে আবারও রাজপথে নেমে আসা হবে। নিজেদের গণতন্ত্র নিজেদেরকেই রক্ষা করতে হবে উল্লেখ করে তিনি ১১ দলীয় জোটের প্রার্থীদের বিজয়ী করার আহ্বান জানান। বিশেষ অতিথির বক্তব্যে জাগপা সভাপতি রাশেদ প্রধান বলেন, “১২ তারিখের জন্য সবাই প্রস্তুত হন। জুলাই বিপ্লবে বুলেটের যুদ্ধ শেষ হয়েছে, এখন ভোট যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে।” তিনি আরও বলেন, “লন্ডনের নতুন মুফতিকে জানিয়ে দিতে চাই, ভারতের তাঁবেদারি চলবে না।”
ঢাকা জেলা আমির ও কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসাইন অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন। অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন জামায়াত ইসলামের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটির পরিচালক এ টি এম মাসুম। তিনি বলেন, “আমরা কেমন বাংলাদেশ গড়ে তুলব, এর ফয়সালা হবে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি। বৈষম্যমুক্ত, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজমুক্ত সমাজ গড়তে হলে ১১-দলীয় জোটের প্রার্থীদের ভোটে জয়ী করতে হবে।” সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন জামায়াতে ইসলামী মনোনীত ঢাকা-১ আসনের প্রার্থী ব্যারিস্টার নজরুল ইসলাম, ঢাকা-২ আসনের প্রার্থী কর্নেল (অব.) আব্দুল হক, ঢাকা-৩ আসনের প্রার্থী অধ্যক্ষ শাহীনুর ইসলাম। এছাড়াও ঢাকা-১৯ আসনে ১১ দলীয় জোট মনোনীত এনসিপি প্রার্থী দিলশানা পারুল ও ঢাকা জেলার ২০ আসনের এনসিপি প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার নাবিলা তাসনিদ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া সমাবেশে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি সিবগাতুল্লাহ সিবগা, জামায়াতে ইসলামীর ঢাকা জেলা সেক্রেটারি মাওলানা আফজল হোসাইন, নায়েবে আমির আব্দুর রউফ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
রিপোর্টারের নাম 






















