ঢাকা ১১:০৫ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ০১ মে ২০২৬

প্রাণহীন দেহে প্রাণের স্পন্দন: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যতিক্রমী পাখি মেলা অনুষ্ঠিত

যে পাখিদের কলকাকলি এখন আর প্রকৃতিতে সচরাচর শোনা যায় না কিংবা যাদের ডানা ঝাপটানো এখন কেবলই স্মৃতি, সেইসব বিলুপ্তপ্রায় ও দুর্লভ পাখিদের সান্নিধ্য পেতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) আয়োজন করা হয়েছে এক ব্যতিক্রমী পাখি মেলার। বিশ্ববিদ্যালয়ের বুদ্ধিজীবী চত্বরে আয়োজিত এই মেলায় জীবন্ত পাখির পাশাপাশি বিশেষ আকর্ষন ছিল রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় সংরক্ষিত বা ‘মমি’ করা পাখির প্রদর্শনী। প্রাণহীন দেহে প্রাণের এই শৈল্পিক উপস্থিতি দর্শনার্থীদের মধ্যে ব্যাপক কৌতূহল ও সচেতনতার সৃষ্টি করেছে।

‘পাখি দেখি, পাখি ভালোবাসি, পাখি রক্ষা করি’—এই মূলমন্ত্রকে সামনে রেখে শনিবার (৩১ জানুয়ারি) সকাল ৯টায় দিনব্যাপী এই মেলার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্ড কনজারভেশন ক্লাবের উদ্যোগে এবং প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সহযোগিতায় আয়োজিত এই উৎসবের শুরুতে পাখি সংরক্ষণে জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে একটি বর্ণাঢ্য র‍্যালি বের করা হয়।

সরেজমিনে মেলা প্রাঙ্গণ ঘুরে দেখা যায়, সুসজ্জিত স্টলগুলোতে ঠাঁই পেয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির পাখির আলোকচিত্র ও সংরক্ষিত দেহ। প্রদর্শনীতে ছিল কালোপিঠ গাংচিল, সাইবেরিয়ান শিলাফিদ্দা, নীল চটক, ইউরেশিয়ান চামচঠুঁটি, জল ময়ূর এবং বিরল প্রজাতির বুটপা ঈগলের মতো অন্তত অর্ধশত প্রজাতির পাখির ছবি। পাশের স্টলে ট্যাক্সিডার্মি বা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে সংরক্ষিত পানকৌড়ি, লক্ষ্মী পেঁচা, হুতোম পেঁচা, গরিয়াল মাছরাঙা ও বালি হাঁসসহ বিভিন্ন প্রাণীর মমি দেখে দর্শনার্থীরা মুগ্ধ হন। বিশেষ করে খুদে দর্শনার্থীদের জন্য এটি ছিল এক অনন্য শিক্ষার সুযোগ।

মেলার অন্যতম আকর্ষণ ছিল স্কুল পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের জন্য আয়োজিত চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা। ক্যাম্পাস সংলগ্ন বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কয়েকশ শিক্ষার্থী তাদের তুলির আঁচড়ে পাখির প্রতি ভালোবাসা ফুটিয়ে তোলে। মেলায় আসা চতুর্থ শ্রেণির এক শিক্ষার্থী জানায়, বইয়ের পাতায় দেখা অনেক পাখি সে আজ সরাসরি দেখার সুযোগ পেয়েছে, যা তার জন্য অত্যন্ত আনন্দের অভিজ্ঞতা।

মেলায় ট্যাক্সিডার্মি বা মৃত প্রাণী সংরক্ষণের কারিগরি দিক নিয়ে কথা বলেন বিশেষজ্ঞ মো. দেলোয়ার হোসেন। তিনি জানান, প্রকৃতিতে প্রাণীরা মারা যাওয়ার পর পচে নষ্ট হয়ে যায়, কিন্তু বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে সেগুলোকে সংরক্ষণ করলে দীর্ঘ সময় গবেষণার কাজে ব্যবহার করা সম্ভব। মূলত নতুন প্রজন্মের মধ্যে বন্যপ্রাণী ও পাখি সম্পর্কে ধারণা দিতেই এই উদ্যোগ।

আয়োজক কমিটির পক্ষ থেকে প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. এ. এম. সালেহ রেজা বলেন, “পাখি ও প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় সচেতনতা তৈরির উদ্দেশ্যেই আমাদের এই নিয়মিত আয়োজন। বিশেষ করে শীত মৌসুমে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও এর আশপাশের এলাকায় প্রচুর পরিযায়ী পাখি আসে। এসব অতিথি পাখিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে মমত্ববোধ তৈরি করা জরুরি।” তিনি আরও উল্লেখ করেন, পাখিদের বিরক্ত না করে তাদের উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারলে জীববৈচিত্র্য রক্ষা পাবে।

দিনব্যাপী এই মেলায় শিক্ষক-শিক্ষার্থী ছাড়াও রাজশাহীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা প্রকৃতিপ্রেমীদের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। সমাপনী অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়ার মধ্য দিয়ে উৎসবের সমাপ্তি ঘটে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

শিক্ষা ও শিল্প খাতের দূরত্ব: দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে বড় বাধা

প্রাণহীন দেহে প্রাণের স্পন্দন: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যতিক্রমী পাখি মেলা অনুষ্ঠিত

আপডেট সময় : ০৩:২৪:২৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩১ জানুয়ারী ২০২৬

যে পাখিদের কলকাকলি এখন আর প্রকৃতিতে সচরাচর শোনা যায় না কিংবা যাদের ডানা ঝাপটানো এখন কেবলই স্মৃতি, সেইসব বিলুপ্তপ্রায় ও দুর্লভ পাখিদের সান্নিধ্য পেতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) আয়োজন করা হয়েছে এক ব্যতিক্রমী পাখি মেলার। বিশ্ববিদ্যালয়ের বুদ্ধিজীবী চত্বরে আয়োজিত এই মেলায় জীবন্ত পাখির পাশাপাশি বিশেষ আকর্ষন ছিল রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় সংরক্ষিত বা ‘মমি’ করা পাখির প্রদর্শনী। প্রাণহীন দেহে প্রাণের এই শৈল্পিক উপস্থিতি দর্শনার্থীদের মধ্যে ব্যাপক কৌতূহল ও সচেতনতার সৃষ্টি করেছে।

‘পাখি দেখি, পাখি ভালোবাসি, পাখি রক্ষা করি’—এই মূলমন্ত্রকে সামনে রেখে শনিবার (৩১ জানুয়ারি) সকাল ৯টায় দিনব্যাপী এই মেলার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্ড কনজারভেশন ক্লাবের উদ্যোগে এবং প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সহযোগিতায় আয়োজিত এই উৎসবের শুরুতে পাখি সংরক্ষণে জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে একটি বর্ণাঢ্য র‍্যালি বের করা হয়।

সরেজমিনে মেলা প্রাঙ্গণ ঘুরে দেখা যায়, সুসজ্জিত স্টলগুলোতে ঠাঁই পেয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির পাখির আলোকচিত্র ও সংরক্ষিত দেহ। প্রদর্শনীতে ছিল কালোপিঠ গাংচিল, সাইবেরিয়ান শিলাফিদ্দা, নীল চটক, ইউরেশিয়ান চামচঠুঁটি, জল ময়ূর এবং বিরল প্রজাতির বুটপা ঈগলের মতো অন্তত অর্ধশত প্রজাতির পাখির ছবি। পাশের স্টলে ট্যাক্সিডার্মি বা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে সংরক্ষিত পানকৌড়ি, লক্ষ্মী পেঁচা, হুতোম পেঁচা, গরিয়াল মাছরাঙা ও বালি হাঁসসহ বিভিন্ন প্রাণীর মমি দেখে দর্শনার্থীরা মুগ্ধ হন। বিশেষ করে খুদে দর্শনার্থীদের জন্য এটি ছিল এক অনন্য শিক্ষার সুযোগ।

মেলার অন্যতম আকর্ষণ ছিল স্কুল পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের জন্য আয়োজিত চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা। ক্যাম্পাস সংলগ্ন বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কয়েকশ শিক্ষার্থী তাদের তুলির আঁচড়ে পাখির প্রতি ভালোবাসা ফুটিয়ে তোলে। মেলায় আসা চতুর্থ শ্রেণির এক শিক্ষার্থী জানায়, বইয়ের পাতায় দেখা অনেক পাখি সে আজ সরাসরি দেখার সুযোগ পেয়েছে, যা তার জন্য অত্যন্ত আনন্দের অভিজ্ঞতা।

মেলায় ট্যাক্সিডার্মি বা মৃত প্রাণী সংরক্ষণের কারিগরি দিক নিয়ে কথা বলেন বিশেষজ্ঞ মো. দেলোয়ার হোসেন। তিনি জানান, প্রকৃতিতে প্রাণীরা মারা যাওয়ার পর পচে নষ্ট হয়ে যায়, কিন্তু বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে সেগুলোকে সংরক্ষণ করলে দীর্ঘ সময় গবেষণার কাজে ব্যবহার করা সম্ভব। মূলত নতুন প্রজন্মের মধ্যে বন্যপ্রাণী ও পাখি সম্পর্কে ধারণা দিতেই এই উদ্যোগ।

আয়োজক কমিটির পক্ষ থেকে প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. এ. এম. সালেহ রেজা বলেন, “পাখি ও প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় সচেতনতা তৈরির উদ্দেশ্যেই আমাদের এই নিয়মিত আয়োজন। বিশেষ করে শীত মৌসুমে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও এর আশপাশের এলাকায় প্রচুর পরিযায়ী পাখি আসে। এসব অতিথি পাখিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে মমত্ববোধ তৈরি করা জরুরি।” তিনি আরও উল্লেখ করেন, পাখিদের বিরক্ত না করে তাদের উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারলে জীববৈচিত্র্য রক্ষা পাবে।

দিনব্যাপী এই মেলায় শিক্ষক-শিক্ষার্থী ছাড়াও রাজশাহীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা প্রকৃতিপ্রেমীদের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। সমাপনী অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়ার মধ্য দিয়ে উৎসবের সমাপ্তি ঘটে।