ঢাকা ১১:০১ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ০১ মে ২০২৬

খালেকুজ্জামানের চাকরিজীবন

## শীতের রাতে অ্যাসিস্ট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্টের কর্পোরেট দৌড়

ঢাকা: অগ্রহায়ণের শুরুতেই শীতের তীব্রতা যেন পৌষ মাসকে হার মানিয়েছে। উত্তুরে হাওয়ার দাপটে জনশূন্য রাস্তাঘাট ও ক্রেতাশূন্য দোকানপাট সন্ধ্যারাতকেই মাঝরাতের রূপ দিয়েছে। এই কনকনে ঠান্ডার মধ্যেই কর্পোরেট জীবনের এক অসমাপ্ত চিত্র ফুটে ওঠে অ্যাসিস্ট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট (এভিপি) খালেকুজ্জামানের কর্মব্যস্ততায়।

শীতের প্রকোপ থেকে বাঁচতে ফুটপাতে কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়ে থাকা একটি কুকুরকে পাশ কাটিয়ে গৌরহরী বস্ত্রালয়ে প্রবেশ করেন খালেকুজ্জামান। বহুদিনের পরিচিত এই দোকানে তিনি সরাসরি একটি প্যাকেট সংগ্রহ করেন। এরপর দ্রুত বেরিয়ে হোটেল আল ফালাহের উদ্দেশ্যে রওনা দেন। কারণ, আজ সকালেই ঢাকা থেকে এসেছেন তার এমডি স্যার। আগামীকাল টাঙ্গাইলে একটি মিটিং শেষে তিনি ঢাকা ফিরবেন। সকাল থেকে খালেকুজ্জামান স্যারের সঙ্গেই রয়েছেন, এক মুহূর্ত স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলারও সুযোগ পাননি। রাতটিও স্যারের পাশেই কাটাতে হবে, কখন কোন প্রয়োজনে ডাক পড়ে, তা বলা যায় না।

নিজের পদবীর আড়ম্বরপূর্ণতার বিপরীতে জীবনের বাস্তবতাকে মেনে নিতেই তার মন ভারাক্রান্ত। “অ্যাসিস্ট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট” পদের আড়ালে তার কাজ মূলত জীবন বীমার পলিসি বিক্রি করা। এই কাজে প্রায়শই তাকে নানা রকম কৌশল অবলম্বন করতে হয়, কখনো অতিরঞ্জিত করে, কখনো বা কমিয়ে—বাস্তবতাকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করতে হয়।

তার কর্মজীবনের একটি ঘটনা স্মরণ করেন তিনি। প্রায় পাঁচ বছর আগে, তৎকালীন এমডি আশফাক খানের একটি ফোন কল তার জীবনে এনেছিল এক নতুন অভিজ্ঞতা। সেদিনের ঘটনা ছিল এমন—খালেকুজ্জামান তখন সবেমাত্র খাওয়া সেরে আরাম করে সিগারেট টানছিলেন। ঠিক দশটায় এমডি স্যারের ফোন আসে। “আপনি কোথায়?”—এই প্রশ্নের উত্তরে খালেকুজ্জামান দ্রুত নিজেকে ফুলপুর অফিসের পথে বলে জানান, কিন্তু এমডি স্যার নিজেই তার অফিসে পৌঁছে যান। এই ঘটনা থেকে তিনি দ্রুত শিখে নেন কীভাবে কর্পোরেট জগতে টিকে থাকতে হয়।

পরবর্তীতে একই এমডি আশফাক খান তাকে ফোন করে মাঠকর্মীদের কমিশন না দেওয়ার অভিযোগ তোলেন। খালেকুজ্জামান সত্য স্বীকার করে বলেন যে, নানা রকম প্রাতিষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক ব্যয় মেটাতেই তাকে এই পথ বেছে নিতে হয়েছে। ঈদ উপলক্ষে ড্রাইভার-পিয়নদের দেওয়া উপহারের কথা উল্লেখ করে তিনি বোঝানোর চেষ্টা করেন যে, এই ধরনের ব্যয় company-র উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষেরও অজানা নয়।

বর্তমানে নতুন এমডি স্যারের সাথেও তার সম্পর্ক এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। মাত্র আট-নয় মাস হলো তিনি এই অঞ্চলে যোগ দিয়েছেন এবং এটি তার প্রথম সফর। হোটেল আল ফালাহের আটতলায় এমডি স্যারের রুমে প্রবেশ করে খালেকুজ্জামান বসার অনুমতি পান। এমডি স্যার জানান, তিনি কোমরের ব্যথার কারণে দাঁড়িয়ে আছেন।

আলোচনার এক পর্যায়ে এমডি স্যার আসন্ন প্রমোশনের বিষয়টি উত্থাপন করেন এবং টার্গেট পূরণের উপর জোর দেন। খালেকুজ্জামানও প্রমোশনের আশা ব্যক্ত করেন। এরপর এমডি স্যার তার জন্য আনা ব্লেজারের কাপড়টি দেখতে চান। কাপড়টি দেখে এমডি স্যার অসন্তুষ্ট হন এবং কাপড়ের রঙ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। খালেকুজ্জামান মেরুন রঙের কথা বললেও এমডি স্যার এটিকে লাল বলে অভিহিত করেন। এই ঘটনায় তিনি কিছুটা বিচলিত হয়ে পড়েন এবং জানান যে, গৌরহরী বস্ত্রালয় তাকে এই ব্যাপারে ভুল তথ্য দিয়েছে।

এমডি স্যার কাপড়ের দাম জানতে চান এবং পরবর্তীতে তিনি নিজেই ঢাকা থেকে কাপড় কিনে নেবেন বলে জানান। খালেকুজ্জামান ছয় হাজার টাকা এমডি স্যারকে প্রদান করেন। কিন্তু মেকিং চার্জ দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত টাকা তার কাছে না থাকায় তিনি বিব্রত হন। এমডি স্যার বিষয়টি বুঝতে পেরে তাকে পরে টাকা পাঠিয়ে দিতে বলেন।

এমডি স্যার খালেকুজ্জামানকে বাসায় চলে যেতে বললেও তিনি স্যারের পাশে থাকার আগ্রহ প্রকাশ করেন। তবে এমডি স্যার তাকে আর কষ্ট করতে বারণ করেন এবং বাসায় ফিরে যেতে বলেন।

হোটেল থেকে বেরিয়ে খালেকুজ্জামান দ্রুত একটি সিগারেট ধরান। তার মনে ক্ষোভ জমা হয় গৌরহরী বস্ত্রালয়ের মালিকের উপর। কেন তিনি সাড়ে চার হাজার টাকার কাপড়কে পাঁচ হাজার আটশ বলে দাম বাড়িয়েছিলেন, তা নিয়ে তিনি আফসোস করেন। এই ঘটনার মূল কারণ হিসেবে তিনি গৌরহরীর ভুল তথ্যকেই দায়ী করেন। দ্রুত পা চালিয়ে তিনি গৌরহরীর উদ্দেশ্যে রওনা দেন, মনে মনে তাকে খুঁজে বের করার দৃঢ় সংকল্প নিয়ে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

শিক্ষা ও শিল্প খাতের দূরত্ব: দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে বড় বাধা

খালেকুজ্জামানের চাকরিজীবন

আপডেট সময় : ০২:৫৮:৪৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩১ জানুয়ারী ২০২৬

## শীতের রাতে অ্যাসিস্ট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্টের কর্পোরেট দৌড়

ঢাকা: অগ্রহায়ণের শুরুতেই শীতের তীব্রতা যেন পৌষ মাসকে হার মানিয়েছে। উত্তুরে হাওয়ার দাপটে জনশূন্য রাস্তাঘাট ও ক্রেতাশূন্য দোকানপাট সন্ধ্যারাতকেই মাঝরাতের রূপ দিয়েছে। এই কনকনে ঠান্ডার মধ্যেই কর্পোরেট জীবনের এক অসমাপ্ত চিত্র ফুটে ওঠে অ্যাসিস্ট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট (এভিপি) খালেকুজ্জামানের কর্মব্যস্ততায়।

শীতের প্রকোপ থেকে বাঁচতে ফুটপাতে কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়ে থাকা একটি কুকুরকে পাশ কাটিয়ে গৌরহরী বস্ত্রালয়ে প্রবেশ করেন খালেকুজ্জামান। বহুদিনের পরিচিত এই দোকানে তিনি সরাসরি একটি প্যাকেট সংগ্রহ করেন। এরপর দ্রুত বেরিয়ে হোটেল আল ফালাহের উদ্দেশ্যে রওনা দেন। কারণ, আজ সকালেই ঢাকা থেকে এসেছেন তার এমডি স্যার। আগামীকাল টাঙ্গাইলে একটি মিটিং শেষে তিনি ঢাকা ফিরবেন। সকাল থেকে খালেকুজ্জামান স্যারের সঙ্গেই রয়েছেন, এক মুহূর্ত স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলারও সুযোগ পাননি। রাতটিও স্যারের পাশেই কাটাতে হবে, কখন কোন প্রয়োজনে ডাক পড়ে, তা বলা যায় না।

নিজের পদবীর আড়ম্বরপূর্ণতার বিপরীতে জীবনের বাস্তবতাকে মেনে নিতেই তার মন ভারাক্রান্ত। “অ্যাসিস্ট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট” পদের আড়ালে তার কাজ মূলত জীবন বীমার পলিসি বিক্রি করা। এই কাজে প্রায়শই তাকে নানা রকম কৌশল অবলম্বন করতে হয়, কখনো অতিরঞ্জিত করে, কখনো বা কমিয়ে—বাস্তবতাকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করতে হয়।

তার কর্মজীবনের একটি ঘটনা স্মরণ করেন তিনি। প্রায় পাঁচ বছর আগে, তৎকালীন এমডি আশফাক খানের একটি ফোন কল তার জীবনে এনেছিল এক নতুন অভিজ্ঞতা। সেদিনের ঘটনা ছিল এমন—খালেকুজ্জামান তখন সবেমাত্র খাওয়া সেরে আরাম করে সিগারেট টানছিলেন। ঠিক দশটায় এমডি স্যারের ফোন আসে। “আপনি কোথায়?”—এই প্রশ্নের উত্তরে খালেকুজ্জামান দ্রুত নিজেকে ফুলপুর অফিসের পথে বলে জানান, কিন্তু এমডি স্যার নিজেই তার অফিসে পৌঁছে যান। এই ঘটনা থেকে তিনি দ্রুত শিখে নেন কীভাবে কর্পোরেট জগতে টিকে থাকতে হয়।

পরবর্তীতে একই এমডি আশফাক খান তাকে ফোন করে মাঠকর্মীদের কমিশন না দেওয়ার অভিযোগ তোলেন। খালেকুজ্জামান সত্য স্বীকার করে বলেন যে, নানা রকম প্রাতিষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক ব্যয় মেটাতেই তাকে এই পথ বেছে নিতে হয়েছে। ঈদ উপলক্ষে ড্রাইভার-পিয়নদের দেওয়া উপহারের কথা উল্লেখ করে তিনি বোঝানোর চেষ্টা করেন যে, এই ধরনের ব্যয় company-র উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষেরও অজানা নয়।

বর্তমানে নতুন এমডি স্যারের সাথেও তার সম্পর্ক এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। মাত্র আট-নয় মাস হলো তিনি এই অঞ্চলে যোগ দিয়েছেন এবং এটি তার প্রথম সফর। হোটেল আল ফালাহের আটতলায় এমডি স্যারের রুমে প্রবেশ করে খালেকুজ্জামান বসার অনুমতি পান। এমডি স্যার জানান, তিনি কোমরের ব্যথার কারণে দাঁড়িয়ে আছেন।

আলোচনার এক পর্যায়ে এমডি স্যার আসন্ন প্রমোশনের বিষয়টি উত্থাপন করেন এবং টার্গেট পূরণের উপর জোর দেন। খালেকুজ্জামানও প্রমোশনের আশা ব্যক্ত করেন। এরপর এমডি স্যার তার জন্য আনা ব্লেজারের কাপড়টি দেখতে চান। কাপড়টি দেখে এমডি স্যার অসন্তুষ্ট হন এবং কাপড়ের রঙ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। খালেকুজ্জামান মেরুন রঙের কথা বললেও এমডি স্যার এটিকে লাল বলে অভিহিত করেন। এই ঘটনায় তিনি কিছুটা বিচলিত হয়ে পড়েন এবং জানান যে, গৌরহরী বস্ত্রালয় তাকে এই ব্যাপারে ভুল তথ্য দিয়েছে।

এমডি স্যার কাপড়ের দাম জানতে চান এবং পরবর্তীতে তিনি নিজেই ঢাকা থেকে কাপড় কিনে নেবেন বলে জানান। খালেকুজ্জামান ছয় হাজার টাকা এমডি স্যারকে প্রদান করেন। কিন্তু মেকিং চার্জ দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত টাকা তার কাছে না থাকায় তিনি বিব্রত হন। এমডি স্যার বিষয়টি বুঝতে পেরে তাকে পরে টাকা পাঠিয়ে দিতে বলেন।

এমডি স্যার খালেকুজ্জামানকে বাসায় চলে যেতে বললেও তিনি স্যারের পাশে থাকার আগ্রহ প্রকাশ করেন। তবে এমডি স্যার তাকে আর কষ্ট করতে বারণ করেন এবং বাসায় ফিরে যেতে বলেন।

হোটেল থেকে বেরিয়ে খালেকুজ্জামান দ্রুত একটি সিগারেট ধরান। তার মনে ক্ষোভ জমা হয় গৌরহরী বস্ত্রালয়ের মালিকের উপর। কেন তিনি সাড়ে চার হাজার টাকার কাপড়কে পাঁচ হাজার আটশ বলে দাম বাড়িয়েছিলেন, তা নিয়ে তিনি আফসোস করেন। এই ঘটনার মূল কারণ হিসেবে তিনি গৌরহরীর ভুল তথ্যকেই দায়ী করেন। দ্রুত পা চালিয়ে তিনি গৌরহরীর উদ্দেশ্যে রওনা দেন, মনে মনে তাকে খুঁজে বের করার দৃঢ় সংকল্প নিয়ে।