বাংলাদেশের রাজনৈতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক এবং সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে ‘তত্ত্ব’ শব্দটি প্রায়শই একটি নেতিবাচক অনুষঙ্গ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। ‘তত্ত্ব কপচানো’—এই বহুল প্রচলিত প্রবাদবাক্যটি তত্ত্বচর্চাকে হালকাভাবে দেখার মানসিকতাকেই স্পষ্ট করে তোলে। অনেক সময় তত্ত্বকে নিছক বুদ্ধিবৃত্তিক বিলাসিতা, ইউরোপীয় চিন্তাধারার অন্ধ অনুকরণ অথবা এমন কিছু হিসেবে গণ্য করা হয়, যার কার্যকারিতা শেষ এবং এখন কেবল প্রয়োগের পালা। এই ধরনের মনোভাব আমাদের সাধারণ পরিসরে তত্ত্ব বিষয়ে এক ধরনের অবিশ্বাস, অস্বস্তি এবং চিন্তাগত সীমাবদ্ধতাকেই প্রকাশ করে। সারোয়ার তুষারের ‘চিন্তার অর্কেস্ট্রা’ নামক গ্রন্থটি এই অস্বস্তিকর বাস্তবতার পটভূমিতে ‘তত্ত্ব’ বিষয়ক আলোচনার একটি গভীর ও সময়োপযোগী সন্ধান হাজির করেছে।
গ্রন্থের শুরুতেই সারোয়ার তুষার বাংলাদেশের সাধারণ পরিসরে তত্ত্বচর্চা নিয়ে প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গির দুর্বলতা ও অসারতা তুলে ধরেন। তাঁর মতে, তত্ত্বকে এভাবে উপেক্ষা করার মাধ্যমে আমরা আসলে আমাদের সমাজ, রাষ্ট্র এবং রাজনীতিকে গভীরভাবে অনুধাবন করার সম্ভাবনাকেই অস্বীকার করি। তত্ত্ব কোনো স্থির বা তৈরি বিষয় নয়; বরং এটি একটি অবিরাম চিন্তন প্রক্রিয়া, যা বাস্তবতার সঙ্গে নিরন্তর সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বিকশিত হয়। এই উপলব্ধি থেকেই তুষার তাঁর ‘চিন্তার অর্কেস্ট্রা’ গ্রন্থে বিশ্বজুড়ে প্রভাবশালী ‘গ্লোবাল সাউথ’ (Global South) এর পাঁচজন বিশিষ্ট তাত্ত্বিকের সঙ্গে গভীর আলোচনা ও মতবিনিময়ের আয়োজন করেছেন।
এই গ্রন্থে ভারতের পাঁচজন প্রখ্যাত চিন্তাবিদ ও তাত্ত্বিক—দীপেশ চক্রবর্তী, পার্থ চট্টোপাধ্যায়, সুদীপ্ত কবিরাজ, আদিত্য নিগম এবং প্রথমা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে নেওয়া সাতটি সাক্ষাৎকার সংকলিত হয়েছে। উল্লেখিত পাঁচজনই উপনিবেশ-পরবর্তী রাষ্ট্র, রাজনীতি, ইতিহাস এবং সংস্কৃতি বিষয়ে বিশ্বজুড়ে সুপরিচিত ও প্রভাবশালী। তাঁদের গবেষণা ও চিন্তাধারা দীর্ঘকাল ধরে পুঁজিবাদ, আধুনিকতা, ইউরোপকেন্দ্রিকতা, উপনিবেশ স্থাপন, ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ, রাষ্ট্রীয় দর্শন, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধ্যয়ন (Subaltern Studies) এবং ইতিহাস চর্চার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত। ফলস্বরূপ, এই সাক্ষাৎকারগুলো কেবল সাধারণ কথোপকথন নয়; বরং এগুলো সমসাময়িক তত্ত্ব জগতে একটি বিস্তৃত ও গভীর অনুসন্ধানের প্রতিচ্ছবি।
রিপোর্টারের নাম 

























