ঢাকা ১১:০১ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ০১ মে ২০২৬

বর্ষণের আড়ালে এক বিয়োগান্তক চিত্র

প্রকৃতির অমোঘ নিয়মে যখন বর্ষণ নামে, তখন তা কেবল প্রকৃতির খেলাই নয়, কখনো কখনো তা হয়ে ওঠে জীবনের এক বিয়োগান্তক অধ্যায়ের সূচনা। মুসা আল হাফিজের কবিতাটিতে এই বর্ষণের পটভূমিতে ফুটে উঠেছে এক হৃদয়বিদারক চিত্র, যেখানে প্রকৃতির স্নিগ্ধতা আর মানব জীবনের নির্মমতা একাকার হয়ে গেছে।

বৃষ্টির প্রথম ফোঁটা যখন পৃথিবীর বুকে পড়ে, তখন তা কেবল জলধারাই নয়, বরং এক নতুন জীবনের উন্মোচন করে। ঘাসগুলো কেঁপে ওঠে, যেন প্রকৃতির আলিঙ্গনের অপেক্ষায়। পাখির পালকে জল ছুঁয়ে যায়, প্রকৃতি জুড়ে এক শিহরণ জাগিয়ে তোলে। কাদামাটির সোঁদা গন্ধে জেগে ওঠে কৃষকের প্রাণ, মাটির গভীরে যেন ইতিহাস কথা বলে ওঠে। আদমের শস্যগাঁথার মতো, প্রতিটি ধানে যেন নতুন প্রাণের স্পন্দন জাগে।

কিন্তু এই স্নিগ্ধতা সব সময় স্থায়ী হয় না। হঠাৎ করেই প্রকৃতির রুক্ষ রূপ সামনে আসে। জলবায়ুর এই পরিবর্তনের খেলায়, হাজেরা নামের একটি শিশু হয়ে ওঠে এক করুণ উপমা। পলিথিনে মোড়ানো তার অস্তিত্ব, দুপুরের ঘুমের রেশ তখনও লেগে আছে কপালে। বৃষ্টির জলে পা ভিজলে সে মাকে জিজ্ঞেস করত, “মা, মাটি কাঁদছে?” তার ছেঁড়া কাপড়ের পুতুল ‘মায়া’ ছিল তার সব খেলার সঙ্গী, যার একটি চোখের বোতাম ছিল ‘জোনাকি’র মতো। হাজেরা আর মায়ার জোনাকি একসাথেই স্বপ্ন দেখত।

কিন্তু আজ হাজেরা নেই। বন্যা মায়ের বুক জুড়ে হানা দিয়েছে। তার আদরের গামছাটিও ভেসে গেছে অচেনা দিগন্তে। হাজেরা এখন বন্যার এক স্থগিত নাম, জলের ক্ষতে লেখা এক সময়ের ইতিহাস। মায়ের আকুতি রাজ্যের পাথরের দেয়ালে প্রতিধ্বনিহীন। ত্রাণ শিবিরেও হাজেরার নাম অজানা, সংস্থার খাতায় বাজেটের সংখ্যাগুলো যেন নদীহীন মানচিত্রের মতো অর্থহীন।

আলোহীন বাতিগুলো যেন নীরব ভাষায় জলের কবিতা পাঠ করছে। প্রতিটি ছায়া যেন শব্দহীন সুরে ভিজে আছে। এই বৃষ্টিভেজা রাতে, শহরের নাভি যেন ঢেকে আছে এক গভীর ঘুমে। নদীর কাদায় মুখ গুঁজে পড়ে থাকা একটি পুতুল যেন হাজেরাকে সারারাত ডেকেছে।

ভোরের আলো ফোটার পর, রাষ্ট্র জানাল এক মর্মান্তিক খবর—১২ জন মৃত, ২৫ জন নিখোঁজ। তারপর, টেবিলে এক কাপ কফি রেখে, শুরু হলো নতুন খসড়া তৈরির কাজ। শিশুটির চোখে যে নদী ছিল, তা এখন আর কারো চোখে নেই। শুধু আকাশে, বাতাসে, গামছার ছেঁড়া প্রান্তে—জলের দহনে বারবার হারিয়ে যায় কে? হাজেরা, হাজেরা… এই প্রশ্ন যেন বাতাসে ভেসে বেড়ায়, প্রকৃতির নিষ্ঠুরতার এক নীরব সাক্ষী হয়ে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

শিক্ষা ও শিল্প খাতের দূরত্ব: দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে বড় বাধা

বর্ষণের আড়ালে এক বিয়োগান্তক চিত্র

আপডেট সময় : ০২:৩১:০৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩১ জানুয়ারী ২০২৬

প্রকৃতির অমোঘ নিয়মে যখন বর্ষণ নামে, তখন তা কেবল প্রকৃতির খেলাই নয়, কখনো কখনো তা হয়ে ওঠে জীবনের এক বিয়োগান্তক অধ্যায়ের সূচনা। মুসা আল হাফিজের কবিতাটিতে এই বর্ষণের পটভূমিতে ফুটে উঠেছে এক হৃদয়বিদারক চিত্র, যেখানে প্রকৃতির স্নিগ্ধতা আর মানব জীবনের নির্মমতা একাকার হয়ে গেছে।

বৃষ্টির প্রথম ফোঁটা যখন পৃথিবীর বুকে পড়ে, তখন তা কেবল জলধারাই নয়, বরং এক নতুন জীবনের উন্মোচন করে। ঘাসগুলো কেঁপে ওঠে, যেন প্রকৃতির আলিঙ্গনের অপেক্ষায়। পাখির পালকে জল ছুঁয়ে যায়, প্রকৃতি জুড়ে এক শিহরণ জাগিয়ে তোলে। কাদামাটির সোঁদা গন্ধে জেগে ওঠে কৃষকের প্রাণ, মাটির গভীরে যেন ইতিহাস কথা বলে ওঠে। আদমের শস্যগাঁথার মতো, প্রতিটি ধানে যেন নতুন প্রাণের স্পন্দন জাগে।

কিন্তু এই স্নিগ্ধতা সব সময় স্থায়ী হয় না। হঠাৎ করেই প্রকৃতির রুক্ষ রূপ সামনে আসে। জলবায়ুর এই পরিবর্তনের খেলায়, হাজেরা নামের একটি শিশু হয়ে ওঠে এক করুণ উপমা। পলিথিনে মোড়ানো তার অস্তিত্ব, দুপুরের ঘুমের রেশ তখনও লেগে আছে কপালে। বৃষ্টির জলে পা ভিজলে সে মাকে জিজ্ঞেস করত, “মা, মাটি কাঁদছে?” তার ছেঁড়া কাপড়ের পুতুল ‘মায়া’ ছিল তার সব খেলার সঙ্গী, যার একটি চোখের বোতাম ছিল ‘জোনাকি’র মতো। হাজেরা আর মায়ার জোনাকি একসাথেই স্বপ্ন দেখত।

কিন্তু আজ হাজেরা নেই। বন্যা মায়ের বুক জুড়ে হানা দিয়েছে। তার আদরের গামছাটিও ভেসে গেছে অচেনা দিগন্তে। হাজেরা এখন বন্যার এক স্থগিত নাম, জলের ক্ষতে লেখা এক সময়ের ইতিহাস। মায়ের আকুতি রাজ্যের পাথরের দেয়ালে প্রতিধ্বনিহীন। ত্রাণ শিবিরেও হাজেরার নাম অজানা, সংস্থার খাতায় বাজেটের সংখ্যাগুলো যেন নদীহীন মানচিত্রের মতো অর্থহীন।

আলোহীন বাতিগুলো যেন নীরব ভাষায় জলের কবিতা পাঠ করছে। প্রতিটি ছায়া যেন শব্দহীন সুরে ভিজে আছে। এই বৃষ্টিভেজা রাতে, শহরের নাভি যেন ঢেকে আছে এক গভীর ঘুমে। নদীর কাদায় মুখ গুঁজে পড়ে থাকা একটি পুতুল যেন হাজেরাকে সারারাত ডেকেছে।

ভোরের আলো ফোটার পর, রাষ্ট্র জানাল এক মর্মান্তিক খবর—১২ জন মৃত, ২৫ জন নিখোঁজ। তারপর, টেবিলে এক কাপ কফি রেখে, শুরু হলো নতুন খসড়া তৈরির কাজ। শিশুটির চোখে যে নদী ছিল, তা এখন আর কারো চোখে নেই। শুধু আকাশে, বাতাসে, গামছার ছেঁড়া প্রান্তে—জলের দহনে বারবার হারিয়ে যায় কে? হাজেরা, হাজেরা… এই প্রশ্ন যেন বাতাসে ভেসে বেড়ায়, প্রকৃতির নিষ্ঠুরতার এক নীরব সাক্ষী হয়ে।