বিশ্বের বৃহত্তম দেশ রাশিয়ায় জনসংখ্যা কম হওয়ায় কৃষি, শিল্পকারখানা, অবকাঠামো নির্মাণ ও জাহাজ নির্মাণশিল্পে বর্তমানে বিপুলসংখ্যক বিদেশি কর্মীর চাহিদা তৈরি হয়েছে। এই সুযোগ কাজে লাগাতে এশিয়ার দেশগুলো যখন জোর প্রতিযোগিতা শুরু করেছে, তখন রাশিয়ার শ্রমবাজারে ভারতের সঙ্গে ৭০ হাজার কর্মী পাঠানোর চুক্তি হলেও বাংলাদেশের অংশগ্রহণ এখনো অত্যন্ত সীমিত। অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা এই পরিস্থিতিকে নতুন বাজার অনুসন্ধানে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অভাব এবং বিদ্যমান প্রস্তাবনা বাস্তবায়নে ব্যর্থতার ফল হিসেবে দেখছেন। যদিও প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, রাশিয়ার সঙ্গে শ্রমবাজার চুক্তি নিয়ে প্রক্রিয়া চলমান।
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মধ্যে ৪০ হাজার ভারতীয় নাগরিক রাশিয়ায় কাজ করতে যাবেন। রুশ সংবাদমাধ্যম রিয়া নভস্তির বরাত দিয়ে এই তথ্য জানানো হয়। গত ডিসেম্বরে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মধ্যে শ্রমিক রপ্তানি বিষয়ক একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তি অনুযায়ী, ২০২৬ সাল নাগাদ মোট ৭০ হাজার ভারতীয় নাগরিককে রাশিয়ায় পাঠানো হবে। মূলত রাশিয়ায় শ্রমিকস্বল্পতা পূরণের জন্যই ভারত থেকে কর্মী নেওয়া হচ্ছে। স্বল্পদক্ষ ভারতীয় শ্রমিকদের মাসিক মজুরি ৫০০ থেকে এক হাজার ১০০ ডলারের মতো হবে বলে জানা গেছে।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড (বোয়েসেল) সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য রাশিয়ার শ্রমবাজার উন্মুক্ত হওয়ার পর সরকারিভাবে জাহাজ নির্মাণ, সাধারণ নির্মাণ ও পোলট্রি খাতে এ পর্যন্ত মাত্র ৩২৫ জন শ্রমিক পাঠানো হয়েছে। জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি)-এর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে রাশিয়ায় অবস্থানরত বাংলাদেশি শ্রমিকের সংখ্যা ছয় হাজার ২৬৬ জন। ভারতের বিশাল চুক্তির তুলনায় বাংলাদেশের এই সংখ্যা অত্যন্ত নগণ্য, যা দেশটির শ্রমবাজারে বাংলাদেশি শ্রমিকদের গুরুত্বের নাজুক চিত্র তুলে ধরে।
মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, রাশিয়ার তীব্র ঠান্ডা ও বরফ পড়ার মতো প্রতিকূল আবহাওয়ায় বাংলাদেশি শ্রমিকরা কাজ করতে অনীহা প্রকাশ করে। অধিকাংশ কর্মী কোম্পানির অভ্যন্তরে কাজ করতে আগ্রহী হলেও, রুশ নিয়োগকর্তারা প্রায়শই বাইরের কাজ দাবি করেন। এটি রাশিয়ার শ্রমবাজার দখলে বাংলাদেশের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
তবে অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই সম্ভাবনাময় শ্রমবাজার ধরতে দীর্ঘমেয়াদি ও সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি। তাঁদের মতে, বাংলাদেশের দূতাবাসগুলোর কর্মকর্তাদের ভিন্ন কৌশল নিয়ে কাজ করতে হবে এবং দেশের দক্ষ শ্রমিকদের সক্ষমতা রুশ কর্তৃপক্ষের কাছে তুলে ধরতে হবে। এক্ষেত্রে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় অপরিহার্য। তাঁরা আরও পরামর্শ দেন যে, শ্রমবাজার অনুসন্ধান ও চুক্তি স্বাক্ষরের ক্ষেত্রে বেসরকারি খাতের অভিজ্ঞ ব্যক্তি এবং অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের পরামর্শ নেওয়া উচিত, যাতে সমন্বিত অভিজ্ঞতার মাধ্যমে ত্রুটিগুলো চিহ্নিত ও সমাধান করা যায়।
এক অভিবাসন বিশেষজ্ঞ বলেন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয়ের অভাবই আমাদের মূল সমস্যা। দুই মন্ত্রণালয় ভিন্নভাবে চিন্তা করায় এই ব্যবধান তৈরি হয়। তিনি শ্রমখাতে উন্নতির জন্য একটি স্থায়ী শ্রমবাজার গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার ওপর জোর দেন, যেখানে নিয়মিত গবেষণা করে দক্ষতা বৃদ্ধির প্রস্তাবনা সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হবে। তাঁর মতে, অতীতে সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণ ফলপ্রসূ হয়নি, কারণ তাঁদের অনেকেই এ বিষয়ে দক্ষ ছিলেন না এবং রিক্রুটিং এজেন্সির প্রতিনিধিরাও এসব টিমে অনুপস্থিত ছিলেন, যা শ্রমবাজার অনুসন্ধান ও দখলে একটি বড় ফাঁক তৈরি করে।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের কর্মসংস্থান অনুবিভাগের যুগ্ম সচিব মো. শহিদুল ইসলাম চৌধুরী জানান, রাশিয়ার শ্রমবাজার নিয়ে তাঁরা কাজ করে যাচ্ছেন এবং আলোচনা চলছে। একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং এর খসড়া রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, রাশিয়া প্রত্যাবর্তন চুক্তি (যারা অবৈধ তাদের ফেরত পাঠানো) চাইছে, যা নিয়ে কিছুটা জটিলতা আছে। তবে তিনি আশাবাদী যে রাশিয়ার সঙ্গে চুক্তি হয়ে গেলে বাংলাদেশের জন্য ভালো কিছু হবে এবং এ বিষয়ে দূতাবাসের সঙ্গেও তাঁদের আলোচনা চলছে।
রিপোর্টারের নাম 

























