অর্থনৈতিক চাপ ও সরকারের আমদানি নিরুৎসাহিতকরণ সত্ত্বেও দেশের গাড়ির বাজারে গত ছয় মাসে নজিরবিহীন তেজিভাব দেখা দিয়েছে। বিশেষত জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ব্যক্তিগত ও রিকন্ডিশনড গাড়ির আমদানি ও বিক্রি বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে গত ছয় মাসে সাত হাজারেরও বেশি গাড়ি আমদানি হয়েছে, যার ফলে রেকর্ড পরিমাণ প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা রাজস্ব আয় হয়েছে। এটি গত কয়েক বছরের মন্দা কাটিয়ে গাড়ির বাজারে এক নতুন গতিশীলতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
গাড়ি ব্যবসায়ীরা এই উল্লম্ফনের মূল কারণ হিসেবে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে দায়ী করছেন। তাদের মতে, নির্বাচনকালীন বিভিন্ন প্রয়োজনে মাইক্রোবাস ও হায়েচ মডেলের গাড়ির চাহিদা বেড়েছে। পাশাপাশি, নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে—এমন প্রত্যাশায় অনেক ক্রেতা ব্যক্তিগত গাড়ি ক্রয়ে আগ্রহী হয়েছেন। এর ফলে গত তিন-চার বছরের স্থবিরতা কাটিয়ে বাজার চাঙা হতে শুরু করেছে।
চট্টগ্রাম বন্দরের কার শেডে বর্তমানে গাড়ির ডেলিভারি কার্যক্রমে ব্যাপক ব্যস্ততা দেখা যাচ্ছে। বন্দরের নিরাপত্তা কর্মীরা জানান, গত তিন-চার মাস ধরে দৈনিক ৪০ থেকে ৫০টি গাড়ি ডেলিভারি হচ্ছে, যা পূর্বে দৈনিক আট থেকে ১০টির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। বন্দরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই মাসে মাত্র ৪৩৯ ইউনিট গাড়ি আমদানি হলেও, আগস্টে তা বেড়ে ১ হাজার ৫০৫ ইউনিটে দাঁড়ায়। পরবর্তী মাসগুলোতেও এই ধারা অব্যাহত থাকে এবং গত ডিসেম্বরে ১ হাজার ৫৮টি গাড়ি আমদানি হয়। সব মিলিয়ে গত ছয় মাসে ১৬টি বিশেষায়িত রো-রো জাহাজে করে ৮৪১টি ব্র্যান্ড নিউ এবং ৬ হাজার ২২৫টি রিকন্ডিশনড গাড়ি এসেছে।
চট্টগ্রাম বন্দরের পরিচালক (প্রশাসন) ওমর ফারুক জানান, বন্দরে গাড়ি নামার ৩০ দিনের মধ্যে আমদানিকারকদের ডেলিভারি নেওয়ার নিয়ম রয়েছে। অতীতে এই সময়সীমা অতিক্রম করে জরিমানা দিয়ে গাড়ি ছাড় করানোর প্রবণতা থাকলেও, গত ছয় মাসে নির্ধারিত সময়ে ডেলিভারির হার অনেক বেড়েছে। আমদানি হওয়া প্রায় ৭ হাজার গাড়ির মধ্যে মাত্র ১০৩টি নির্ধারিত সময়ের পর কাস্টমসের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। বর্তমানে বন্দরের ১ হাজার ২৫০টি গাড়ি ধারণক্ষমতার দুটি কার শেডে অপেক্ষমাণ গাড়ির সংখ্যা মাত্র ৪৭১টি, যা কয়েক মাস আগেও দেড় হাজারের বেশি ছিল। চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের সহকারী কমিশনার শরীফ আল আমিন নিশ্চিত করেছেন যে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে ৬ হাজার ৬৫১টি গাড়ি ছাড়করণের মাধ্যমে ১ হাজার ১৫৩ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছে। এটি গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ১ হাজার ৩৪টি গাড়ি বেশি এবং রাজস্ব আদায়ে ১২৪ কোটি টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে।
আগ্রাবাদের নিঝুম অটোমোবাইল শো-রুমের ম্যানেজার শাহনেওয়াজ জানান, নির্বাচনের কারণে জিপ, মাইক্রো ও হায়েচ গাড়ির চাহিদা বেড়েছে। ব্যক্তিগত গাড়ির বিক্রিও গত কয়েক মাস ধরে ঊর্ধ্বমুখী। তার মতে, ক্রেতারা দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিরতার পর এখন স্থিতিশীলতার প্রত্যাশায় গাড়ি কিনছেন। বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও এক বছর বিরতির পর নতুন করে গাড়ি কেনা শুরু করেছে, যা বাজারে চাপ সৃষ্টি করেছে।
তবে, রিকন্ডিশনড গাড়ি ব্যবসায়ীদের সংগঠন বারভিডার সাবেক সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রহমান ভিন্ন মত পোষণ করেছেন। তিনি বলেন, সামগ্রিকভাবে গাড়ি বিক্রি খুব বেশি বাড়েনি। সম্প্রতি মোংলা বন্দরে ৪০ দিনের বেশি সময় ধরে গাড়ি রাখার জন্য প্রতি ইউনিটে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা আরোপের কারণে অনেক আমদানিকারক মোংলার পরিবর্তে চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহার করছেন। পাশাপাশি, চট্টগ্রাম বন্দরে স্টোর রেন্ট তুলনামূলক বেশি হওয়ায় ব্যবসায়ীরা দ্রুত শুল্ক পরিশোধ করে গাড়ি ডেলিভারি নিয়ে শো-রুমে রাখছেন। এসব কারণে চট্টগ্রাম বন্দরে আমদানি বৃদ্ধি পেলেও, তা প্রকৃত বাজার বিক্রির চিত্র নয় বলে তিনি মনে করেন।
রিপোর্টারের নাম 

























