বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, হত্যা, দমন-পীড়ন ও ভোটাধিকার হরণের মাধ্যমে দেশে এক যুগ ধরে যে সংকট তৈরি হয়েছে, তা থেকে মুক্তির একমাত্র পথ ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠা। মঙ্গলবার বিকেলে ময়মনসিংহের সার্কিট হাউস মাঠে এক জনসভায় যোগ দিয়ে তিনি এই মন্তব্য করেন। আগামী ১২ তারিখে জনগণ যে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে যাচ্ছে, তাকে দেশের মালিকানা জনগণের হাতে ফিরিয়ে দেওয়ার একটি অপরিহার্য সুযোগ বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
তারেক রহমান অভিযোগ করেন, গত এক যুগে হাজারো মানুষ হত্যা ও আহত হওয়ার পাশাপাশি জনগণের ভোটাধিকার হরণ করা হয়েছে। এই ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের একমাত্র উপায় হিসেবে তিনি ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠার ওপর জোর দেন। তিনি মনে করেন, এই অধিকার জরুরি, কারণ দেশের মালিক জনগণ এবং তাদের ইচ্ছানুযায়ী দেশ পরিচালিত হওয়া উচিত। জনগণের সেই ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটাতে ভোট অপরিহার্য বলে তিনি মন্তব্য করেন।
তারেক রহমান আরও দাবি করেন, ভোটাধিকার না থাকায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মৌলিক সমস্যাগুলো দীর্ঘকাল ধরে অমীমাংসিত রয়ে গেছে। নদীভাঙন, কর্মসংস্থান সংকট, ব্রিজ-কালভার্ট নির্মাণ, স্কুল-কলেজ, রাস্তাঘাট ও স্বাস্থ্যসেবার অবকাঠামো সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা থাকলেও গত এক যুগে এ বিষয়ে কার্যকর কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। এর কারণ হিসেবে তিনি ‘নিশিরাতের তথাকথিত নির্বাচন’কে দায়ী করে বলেন, এর মাধ্যমে প্রকৃত জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হতে পারেননি।
তিনি বলেন, ভোটাধিকার হরণের কারণে যুবসমাজের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়নি, নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়নি এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় জনবল ও ওষুধের সরবরাহ অপ্রতুল রয়ে গেছে। তার মতে, সুশিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ, নিরাপদ ব্যবসা এবং সময়মতো চিকিৎসা মানুষের মৌলিক চাহিদা।
ময়মনসিংহ অঞ্চলকে কৃষিভিত্তিক এলাকা হিসেবে উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, মাছের পোনা চাষসহ কৃষি ও মৎস্য খাতে ব্যাপক সম্ভাবনা বিদ্যমান। বিএনপি সরকার গঠন করলে মাছের পোনা বিদেশে রপ্তানি এবং এই খাতে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে। একই সাথে তিনি কৃষকদের জন্য ‘কৃষক কার্ড’ চালুর ঘোষণা দিয়ে বলেন, এর মাধ্যমে সার, বীজ ও কীটনাশক সরাসরি কৃষকের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে।
নারীদের ক্ষমতায়ন প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার শাসনামলে প্রথম শ্রেণি থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত মেয়েদের জন্য অবৈতনিক শিক্ষা চালু করা হয়েছিল। সেই ধারাবাহিকতায় বিএনপি সরকার গঠন করলে নারীদের জন্য ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালু করে গৃহিণী ও দরিদ্র পরিবারগুলোকে সহায়তা দেওয়া হবে।
স্বাস্থ্য খাত নিয়ে তারেক রহমান বলেন, জেলা ও উপজেলা হাসপাতালগুলো সম্প্রসারণের পাশাপাশি গ্রামভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা জোরদার করা হবে। মা ও শিশুরা যেন ঘরে বসেই প্রাথমিক চিকিৎসা পান, সেই ব্যবস্থা করা হবে বলে তিনি প্রতিশ্রুতি দেন।
তিনি আরও দাবি করেন, বিএনপির দেশ পরিচালনার সুদীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে, যার মধ্যে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি, অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষা বিস্তার, আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ ও দুর্নীতি দমন উল্লেখযোগ্য। তারেক রহমান বলেন, যারা বর্তমানে বিএনপির সমালোচনা করছেন, তাদেরই দুইজন সদস্য একসময় বিএনপি সরকারের অংশ ছিলেন, যা তাদের বক্তব্যের অসারতা প্রমাণ করে।
মাদক সমস্যা প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, এর মূল সমাধান কর্মসংস্থান। ভোকেশনাল ও আইটি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তরুণদের দক্ষ করে তুললে তারা দেশে-বিদেশে কাজের সুযোগ পাবে এবং মাদক থেকে দূরে থাকতে পারবে।
পরিশেষে তিনি ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাইকে ঐক্যের আহ্বান জানিয়ে বলেন, একাত্তরের এবং চব্বিশের আন্দোলনের মতো এবারও সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। তার মতে, ঐক্যবদ্ধ থাকলেই জনগণের শাসন ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা সম্ভব। বক্তব্যের শেষাংশে তিনি “করবো কাজ, গর্ব দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ” স্লোগান দেন।
উল্লেখ্য, জনসভার শুরুতে ময়মনসিংহ বিভাগের ২৪ জন ধানের শীষ প্রতীকের মনোনীত প্রার্থী বক্তব্য রাখেন। তারেক রহমান তার বক্তব্য শেষে উপস্থিত সকল প্রার্থীকে সমাবেশে পরিচয় করিয়ে দেন। এই জনসভাকে ঘিরে সকাল থেকেই ময়মনসিংহ বিভাগের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা থেকে বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মী ও সমর্থক সার্কিট হাউস মাঠে সমবেত হন। সভাস্থলে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং সিসিটিভি নজরদারি ছিল।
রিপোর্টারের নাম 

























